গৃহবন্দী ১৪ দিন এবং জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাস

আহসান ইমাম
ফাঁকা ক্যাম্পাস/ ছবি: বার্তা২৪.কম

ফাঁকা ক্যাম্পাস/ ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

১৭ তারিখ বাবাকে নিয়ে ধানমন্ডি আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল রেখে দুপুর ২টায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে রওনা দিই। রাস্তায় তেমন লোক নেই, গাড়ি নেই, যানজট নেই, সব কেমন ফাঁকা। চিরচেনা শহরটিকে অচেনা লাগছিলো।

বাবাকে যেদিন হাসপাতালের এম.আর.আই রুমে দিয়ে গিয়েছিলাম সেদিন ছিলো মঙ্গলবার। নিউ মার্কেটে দোকানপাট বেশিরভাগই বন্ধ ছিলো। তবুও এমন শহর আমার জীবনে দেখা হয়নি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকীর দিনও এমন শহর দেখবো ভাবিনি।

জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাস

দুপুর তিনটে নাগাদ বাসায় চলে এলাম। এরপর থেকেই গৃহবন্দী। তবে গত কয়েকদিন বাবা-মার চিকিৎসার জন্য প্রায় ৪-৫টি হাসপাতালে ছুটোছুটি করতে হয়েছে। আমরা তার আগেই জেনেছিলাম করোনা (কোভিড-১৯) এদেশে হানা দিয়েছে। তবুও আমরা চিকিৎসার প্রয়োজনে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। গৃহবন্দীকালে হঠাৎ সংবাদ মাধ্যমে জানতে পারি আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে একজন করোনা আক্রান্ত রোগী মারা গিয়েছেন। মারা যাওয়ার আগে থেকেই তিনি ঐ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

বার্তা২৪.কম 

শুরু হলো ১৪ দিনের অপেক্ষা। বাবার নানাবিধ শারীরিক জটিলতা আগে থেকেই। এখন কী হবে? শুরু হয়ে গেলো ঘরোয়া টোটকা চিকিৎসাসহ অতিরিক্ত সতর্কতা। অবশেষে করোনা ভাইরাসের কোন ধরনের উপসর্গ ছাড়াই ১৪ দিন শেষ হলো। আমরা কাউকে বাসায় প্রবেশ করতে দিইনি, আমরা কোথাও যাইনি, এমনকি ছাদেও না। ঘরের কাজে সাহায্যকারীকেও বাড়িতে পাঠিয়েছি। এই ১৪ দিনে ইবাদত করে, লেখালেখি করে, ঘরের কাজ করে আমরা সময় কাটিয়েছি।

ফাঁকা ক্যাম্পাস

এবার আসা যাক ১৪ দিন পরের কথায়। আমাদের কয়েকজন সহকর্মীর উদ্যোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের অসহায় মানুষদের সাহায্যের জন্য তহবিল গঠন করা হয়। এর সুবাদে আমার গৃহবন্দী জীবনের সাময়িক অবসান। ১৪ দিন পর বাইরে গিয়ে যা দেখি তা অন্যরকম এক ক্যাম্পাস। যা আগে কখনোই দেখি নি। চারদিক নীরব, সবুজ সতেজ গাছপালা, রাস্তা পরিষ্কার, জনশূন্য চারদিক, টলটলে স্বচ্ছ লেকের পানি, পাখির কলতান, গাছে গাছে ফুল।

এই প্রথম অনুভব করলাম প্রকৃতির নীরবতা। একদিকে চারদিক খাঁ খাঁ, অন্যদিকে প্রকৃতির সজীবতা। ভাবতে পারছিলাম না শিক্ষার্থী, শিক্ষক-কর্মকর্তা শূন্য ক্যাম্পাস। বুঝে উঠতে কষ্ট হচ্ছিলো চোখে দেখা পার্থক্য। আসলে এও কি জরুরি ছিলো? পরিবেশ তার আপন রূপ ফিরে পাক? আমরা মানুষ কতভাবেই না প্রকৃতির কষ্টের কারণ।

ছবি: বার্তা২৪.কম

Cultural Ecology পড়েছিলাম। এখন বুঝতে পারছি, দেশে দেশে এই বিষয় পড়া কতটা জরুরি। Symbiotic relationship ভালোভাবে বুঝতে পারলাম ১৪ দিন পর বাইরে গিয়ে। এমন ক্যাম্পাস আর দেখতে চাই না। শিক্ষক-শিক্ষার্থী আর চিরচেনা পরিবেশ ফিরে আসুক। সেই সাথে পরিবেশ রক্ষার সকল দায়িত্ব তুলে নেয়ার প্রতিশ্রুতি হোক আমার, আপনার, সকলের। মানুষ আর প্রকৃতি একসঙ্গে বাঁচুক, এটাই হোক আমাদের আগামীর অঙ্গীকার।

আহসান ইমাম

শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়;
পিএইচ.ডি গবেষক, গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত।

আপনার মতামত লিখুন :