করোনাভাইরাস থেকেও শেখা যায়

সারিনা সামিন
গ্রাফিক: বার্তা২৪.কম

গ্রাফিক: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

যখন চীনে প্রথম করোনাভাইরাস হানা দেয়, আমি তখন চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্রী। আমি ভাবলাম, পৃথিবীতে আরো কত রকমের রোগ আছে: প্লাগ, কলেরা, সার্স—করোনাও হয়তো তেমন কোনো রোগ। পরে জানতে পারলাম, এটা অন্যগুলার চেয়ে আরো ভয়ংকরভাবে ছড়িয়েছে। যদিও আগে থেকে স্যানিটাইজার ব্যবহার করতাম, সুরক্ষা নিয়ে থাকতাম; এখন আরো সুরক্ষা নিয়ে থাকি যেমন খাওয়ার আগে হাত ধুয়ে নিই, বন্ধুদের সাথে বেশি কাছাকাছি দাঁড়াই না।

মার্চ মাসে আমাদের পরীক্ষা ছিল। কিন্তু ছুটি দিবে বলে সব পড়া তাড়াতাড়ি শেষ করে দিত। এক পিরিয়ডে মাঝে মাঝে দুইটা সাবজেক্টও পড়াত। পরে ১৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে একটা অনুষ্ঠান ছিল।

এর পর থেকে এক মাসের মতো ছুটি কাটাচ্ছি। এই ছুটিতে শুরু হয় এক ধরনের বন্দী জীবন। ঠিক ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরির মতো। এই আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি কয়েকদিন আগে শেষ করেছি। হিটলার যখন জার্মানিতে ইহুদিদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন শুরু করল আনা ফ্রাঙ্ক ১৯৪২ সালের জুনের ১৪ তারিখ থেকে ডায়েরি লেখা শুরু করে। আনা ফ্রাঙ্কের আরেকটা বোন আছে, মারগোট। বাবার নাম অটো ফ্রাঙ্ক আর মায়ের নাম এডিথ। ধর্ম ইহুদি। ১২ জুন জন্ম নেয় আনা। হিটলার যখন অত্যাচার শুরু করল তখন সবাই দেশ থেকে চলে গেল। অটো ফ্রাঙ্ক দেশ ছেড়ে হোলান্ড চলে গেল ১৯৩৩ সালে। আনা ফ্রাঙ্কের বয়স তখন ৪ বছর। ১৩ বছর থেকে আনা ডায়েরি লেখা শুরু করে। তারপর দুই বছর দুই মাসের লেখা। সেই দুই বছরের কাহিনী পড়া শেষ করেছি। তারপর ‘হাঁকলেবেড়ি ফিন’, ‘ট্রেসার আইলান্ড’, ‘আশি দিনে বিশ্ব ভ্রমণ’—পড়েছি এই তিনটিই কিশোর ক্লাসিক। স্কুল থেকে পড়তে আনা বই। বাসার সবগুলা বই পড়ে ফেলব নাকি ভাবছি। এই সময় এটা লিখতে খুব ভালো লাগছে। ক্লাসের পড়াও পড়ি। প্রতিদিন কুরআন ও নামাজ পড়ি।

আমি ও আমার ছোটবোন

বন্দী জীবন কাটানোর অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে, ঘুম থেকে মাঝে মাঝে দেরিতে উঠি। মাঝে মাঝে সকালে নাস্তা খাই না, দুপুরে একসাথে খাই। মাঝে মাঝে মায়ের সাথে রোজা রাখি। তিন বছরের বোনের সাথে খেলি। ওর সাথে বারান্দায় থাকি। বিকালবেলা পুরোটা সময় বারান্দায় সময় কাটাই। নিচে খেলতে যাওয়ার বদলে বারান্দায় থাকি। বারান্দায় বসে অনেক কিছুই করি। সামনের বিল্ডিংয়ের মেয়েটাও ওর বাসার বারান্দায় আসে, ওর সাথে কথা বলি । পরে সন্ধ্যায় পড়তে বসি, স্কুলের ওয়েবসাইট থেকে যা পড়া দেয়। দেরিতে ঘুমাই, বাসার মধ্যে ঘুরে বেড়াই। ছোট বোন ঘুমিয়ে যায়, আমি রাতের ১২-১ টা পর্যন্ত জাগি। এরপর ঘুমিয়ে যাই।

আমরা যেখানে থাকি সেখানে অনেক আগে থেকেই আইসোলেটেড এক ধরনের ভাব। এখন মানুষ বের হয়ই না। শুধু বাসার দারোয়ানরা হেঁটে বেড়ায়। দূরত্ব নিয়ে থাকে। বাসায় নতুন নতুন অদ্ভুত রেসিপি করি। বোনের সাথে বাসায় স্কুল-স্কুল খেলি, স্টিকারকে ব্যান্ডেজ ভেবে ব্যথা পেয়ে স্টিকার হাতে-পায়ে লাগাই, আবার খুলে ফেলি। ফোনে কথা বলি। মেসেজ পাঠাই অনেককে। আগে যখন বাইরে থেকে কেউ কিছু নিয়ে আসত, সবসময় আমার ছোট বোন দরজা খুলত, কিন্তু এখন তো আর তাকে দরজা খুলতে দেওয়া হয় না! কিন্তু তারপরও ও দরজা খুলতে চায়।

নববর্ষে আমাদের বইয়ের দোকান

যেহেতু এখন বাইরে যাওয়া নিষেধ, এবারকার নববর্ষ উদযাপন করেছি ঘরে। আমরা দুই বোন, আমার অনেকগুলো বই একত্রিত করে বইয়ের দোকান সাজিয়েছি। আমরা অনেক আনন্দ পেয়েছি!

বিভিন্ন জায়গায় করোনাভাইরাসের আপডেট দেখি। এই করোনাভাইরাস যেটা চোখে দেখা যায় না, সেটা কত ক্ষতিকর। যদিও এই করোনাভাইরাস থেকে অনেক কিছু শেখা যায়। এই ভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য বারবার হাত ধুতে হবে, হাঁচি-কাশি আসলে মুখ ঢাকতে হবে।

একটাই আশা, আমরা সবাই যেন ভালো থাকি।


সারিনা সামিন
৪র্থ শ্রেণী, চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল এন্ড কলেজ (সিইএসসি), চট্টগ্রাম

আপনার মতামত লিখুন :