কলকাতার জেমস প্রিন্সেপ ঘাট

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
কলকাতার জেমস প্রিন্সেপ ঘাট, ছবি: সংগৃহীত

কলকাতার জেমস প্রিন্সেপ ঘাট, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

কলকাতার পশ্চিম সীমান্তরেখা ধরে প্রবহমান গঙ্গা বা হুগলি নদীতে ঘাটের ছড়াছড়ি। অনেক ঘাট নজরে আসে, অনেকগুলোই আসে না। কিন্তু কলকাতাবাসী বা কলকাতা ভ্রমণকারী যে কোনো মানুষের চোখে জেমস প্রিন্সেপ ঘাট অনিন্দ্য সৌন্দর্যে ধরা দেবেই।

ময়দান, ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, ফোর্ট উইলিয়াম থেকে দেখা যায় ঘাটের গ্রিকো-গথিক স্থাপত্যটি। নগরবাসীর কাছে গঙ্গার ধারে বেড়াতে যাওয়া মানেই প্রিন্সেপ ঘাট হয়ে মিলেনিয়াম পার্কের দিকে ভ্রমণ।

কলকাতায় আমি প্রিন্সেপ ঘাটে সামনের দিক দিয়ে না গিয়ে উত্তর প্রান্তের বাবুঘাট হয়ে গিয়েছি। হাইকোর্টের পাশে বাবুঘাটের সামনে বিরাট বাসস্টপ। শহরের নানা স্থানের বাস এখানে যাত্রা শেষ করে। এদিক দিয়ে দেখতে দেখতে প্রিন্সেপ ঘাট পর্যন্ত পৌঁছানো  আমার পছন্দ।

প্রিন্সেপ ঘাট খুব বেশি প্রাচীন নয়। কারণ কলকাতায় আরো অনেক প্রাচীন ঘাট আছে। ব্রিটিশ যুগে ঘাটটি নির্মিত হয় প্রাচীন ভারতের প্রসিদ্ধ নৃপতি সম্রাট অশোকের শিলালিপির পাঠোদ্ধারকারী প্রাচ্যবিদ জেমস প্রিন্সেপের স্মৃতিতে। ঘাটের নান্দনিক ও অতিকায় প্যালাডিয়ান পোর্চটির নকশা করেন ডব্লিউ ফিজগেরাল্ড। ঘাটটি নির্মিত হয় ১৮৪১ সালে।কলকাতা-হাওড়ার মধ্যে যোগাযোগকারী বিদ্যাসাগর সেতু এই ঘাটের ঠিক পাশেই তৈরি হয়েছে।

প্রিন্সেপ ঘাট ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের ওয়াটার গেট ও সেন্ট জর্জেস গেটের মাঝে অবস্থিত। ঔপনিবেশিক আমলের  প্রথম দিকে প্রিন্সেপ ঘাটই ব্রিটিশদের সব যাত্রীবাহী জাহাজের যাত্রী ওঠানামার কাজে ব্যবহার করা হত।

প্রিন্সেপ ঘাট কলকাতার অন্যতম দর্শনীয় স্থানগুলোর একটি। সপ্তাহান্তে অনেক মানুষ এখানে বেড়াতে আসেন। নদীর গা ঘেঁষে রাস্তায় খাবারের দোকান রয়েছে। ঘাটের কাছে চল্লিশ বছরের পুরনো আইসক্রিম ও ফাস্ট ফুড বিক্রির একটি কেন্দ্র আছে। তরুণদের মধ্যে এই কেন্দ্রটি বেশ জনপ্রিয়। এখান থেকে অনেকে নদীতে নৌকায় প্রমোদভ্রমণে যান।

প্রিন্সেপ ঘাট থেকে বাজে কদমতলা ঘাট পর্যন্ত দুই কিলোমিটার পথ নদী তীর ধরে সুরম্যভাবে আলোকমালা, বাগান, প্রমোদপথ, ফোয়ারা দিয়ে সাজানো এবং এই অংশের ঘাটগুলোরও সংস্কার করা হয়েছে। বলিউডের 'পরিণীতা' ছবির একটি গানের দৃশ্য প্রিন্সেপ ঘাটে চিত্রায়িত হয়েছে। অনেক বাংলা ছবির রোমান্টিক দৃশ্যও এখানে গৃহীত হয়েছে।

প্রিন্সেপ ঘাটের পাশেই কলকাতা শহরকে আবর্তিত চক্ররেলের লাইন। এখানে একটি স্টেশন আছে প্রিন্সেপ ঘাট নামে। ঘাটের নিকটবর্তী ম্যান-অ-ওয়ার জেটিটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কলকাতা বন্দরের ভূমিকার স্মৃতি বহন করছে।

ঘাটটি সবার চেনা হলেও যার নামে এটি স্থাপিত, সেই অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান প্রত্নতাত্ত্বিক-ইতিহাসবিদ জেমস প্রিন্সেপ সম্পর্কে লোকজন খুব কমই জানেন। প্রিন্সেপ যখন ব্রাহ্মীলিপিতে অশোকের দীর্ঘ অনুশাসনের পাঠোদ্ধার করেন, তখন অশোক ও প্রাচীন ভারত সম্পর্কে কেউই বিশেষ কিছু জানতেন না। ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত তিনি দ্বিভাষিক মুদ্রাগুলো পড়ে পড়ে কী লেখা আছে তা বোঝার চেষ্টা করতেন।

প্রাচীন মুদ্রাগুলোতে গ্রিক ও ব্রাহ্মীলিপিতে রাজার নাম লেখা থাকতো। প্রিন্সেপ গ্রিক হরফ জানতেন, ব্রাহ্মীলিপিতেও দক্ষতা অর্জন করেন। তাঁর কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পাঠোদ্ধারের ফলেই বিশ্বের মানুষ প্রাচীন ভারতের শক্তিশালী শাসক বিহারের অশোক সম্পর্কে জানতে পারে। একই সূত্র ধরে জানা যায় গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কেও। তাঁর এই স্মরণীয় অবদান ভারতবর্ষের প্রাচীনকালের ইতিহাস পুনরাবিষ্কারে ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভূমিকা রূপে স্বীকৃত।

আপনার মতামত লিখুন :