করোনাকালে ঘরবন্দীর জন্য টেলিসভায় জনপ্রতিনিধির আশ্বস্তকর কণ্ঠ

সৈকত রুশদী
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

সন্ধ্যার কিছু আগে আজ, ঠিক সাড়ে সাতটায়, বেজে উঠলো বাড়ির ফোন। খানিকটা বিস্ময়ের সাথেই ফোন তুলে বললাম, "হ্যালো!"

কারণ বাড়ির ফোনে আজকাল কল আসে কদাচই। যে ক'টি কল আসে তার বেশিরভাগই টেলিমার্কেটারদের কাছ থেকে। বাড়ির ধূয়ো বের হওয়ার পাইপ (air duct) পরিষ্কারকরা থেকে অনলাইনে কোরআন শিক্ষার সুযোগের প্রস্তাব বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে। এমন কী কানাডা রেভিনিউ এজেন্সির (রাজস্ববোর্ড) প্রতিনিধি সেজে অর্থ আদায়ের লক্ষ্যে প্রতারকদের ফোনও আসে!

তবে করোনা মহামারির কারণে ১৬ মার্চ থেকে কানাডা জুড়ে ঘরবন্দী পর্ব শুরু হওয়ার পর থেকে এসব কলও আসেনি আর।

রেকর্ড করা বার্তায় একটি পুরুষ কণ্ঠ ইংরেজিতে অন্টারিও প্রাদেশিক আইন পরিষদে আমাদের ডনভ্যালি ইস্ট নির্বাচনী এলাকার জনপ্রতিনিধি মাইকেল কটু হিসেবে পরিচয় দিয়ে আমন্ত্রণ জানালো তাঁর নির্বাচকমণ্ডলীর জন্য টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে এক ভার্চুয়াল টাউন হল বৈঠকে যোগ দেওয়ার।

তাঁর সাথে থাকবেন প্রতিবেশী ডনভ্যালি ওয়েস্ট নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য ক্যাথলিন ওয়েন।

দু'জনই প্রাদেশিক আইন পরিষদে বর্তমানে তৃতীয় স্থানের দল লিবারেল পার্টির জনপ্রতিনিধি, এমপিপি।

নির্বাচনী এলাকা পুনর্বিন্যাসের আগে আমরা ছিলাম ডনভ্যালি ওয়েস্ট নির্বাচনী এলাকার অন্তর্ভুক্ত। ২০০৩ সাল থেকে প্রাদেশিক আইন পরিষদে আমাদের প্রতিনিধি ছিলেন ক্যাথলিন ওয়েন। তিনি এমপিপি থেকে প্রাদেশিক মন্ত্রী হন এবং প্রদেশের প্রিমিয়ার বা মুখ্যমন্ত্রী। অমায়িক এক মাটির মানুষ এই নারী।সর্বদাই সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত এবং সর্বত্র তাঁর উপস্থিতি।

অফিসের কাজে টেলিকনফারেন্স থেকে শুরু করে ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দেওয়া এক নিয়মিত ঘটনা আমার স্ত্রী শিউলী জাহান ও আমার জন্য। কিংবা কোনো রেডিও বা টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে যোগদান।

কিন্তু আইন পরিষদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সাথে তাঁদের ভোটার বা নির্বাচনী এলাকার অধিবাসী হিসেবে টেলিকনফারেন্সে যোগদান এক নতুন অভিজ্ঞতা।

করোনার কালো ছায়ার বিপদের কালে ঘরবন্দী থাকা অবস্থায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সাথে কার্যকর মতবিনিময় ও সহযোগিতা লাভের পন্থা হিসেবে এর বিকল্পও নেই। এ এক নতুন বাস্তবতা!

এক ঘণ্টা স্থায়ী এই টেলিসভায় ১২-১৩ জন নাগরিক তাঁদের প্রশ্ন করার সুযোগ পেলেন। উত্তরও পেলেন।

মাইকেল কটু

একজন ফোনে জানালেন, ঘরবন্দী হয়ে থাকা বয়োবৃদ্ধ ও প্রবীণ এবং অসুস্থদের জন্য তাঁদের প্রয়োজন মতো নিত্য ব্যবহার্য পণ্য ও মুদি দোকানের সামগ্রী বাড়ি পৌঁছে দিতে নেওয়া স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মসূচীর কথা।

নাগরিকদের প্রশ্নগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়ে ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইন বা সঙ্গরোধের পর স্ত্রীসহ আজ স্থানীয় ক্লিনিকে যেয়ে স্ত্রীর জন্য সেবা না পাওয়ার অভিযোগ এবং করোনাভাইরাস থেকে মুক্তিলাভের পর সমাজে পুনরায় ফিরে আসার প্রক্রিয়া নিয়ে।

দুই এমপিপি তাঁকে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার মতো প্রতিকূলতা জয় করে সুস্থ হয়ে ওঠার জন্য অভিনন্দন জানালেন।বললেন, এটি এক নতুন বাস্তবতা।তবে এর জন্য প্রদেশের কর্মসূচি রয়েছে। ফোন নম্বর জানিয়ে সেখানে যোগাযোগের পরামর্শ দিলেন তাঁরা।

উৎকণ্ঠাপূর্ণ প্রশ্ন ছিল একজনের। অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগফোর্ডের গতকালের বক্তব্যের সূত্র ধরে তাঁর প্রশ্ন, প্রদেশে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য মাস্কসহ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) রয়েছে মাত্র সাত দিন চলার মতো। অথচ যুক্তরাষ্ট্র সরকার সে দেশের মাস্ক প্রস্তুতকারী থ্রিএম ও পিপিই প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে কানাডায় পণ্য রফতানি বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় কী?সাবেক প্রিমিয়ার ক্যাথলিন ওয়েন জানালেন, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের কিছুটা পরিবর্তন এসেছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ও প্রিমিয়ার ডাগফোর্ড একযোগে কাজ করে যাচ্ছেন।তিনি আশা করেন যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে সক্ষম হবে যে দুই প্রতিবেশী দেশ কেবল ব্যবসায় নয়, সামাজিক ও সেবা ক্ষেত্রে পরস্পরের অংশীদার ও নির্ভরশীল।

প্রদেশের লিবারেল পার্টির সাবেক প্রধান নেতা ও সাবেক প্রিমিয়ার ক্যাথলিন ওয়েন প্রদেশের কনজারভেটিভ পার্টির প্রধান নেতা ও বর্তমান প্রিমিয়ার ডাগফোর্ডের কর্মতৎপরতার প্রতি সমর্থনই জানালেন। আর মাইকেল কটু এই নজিরবিহীন মানবিক বিপর্যয়ের সময়ে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে একযোগে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিলেন।

ক্যাথলিন ওয়েন

প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক সহনশীলতার দেশ কানাডার রাজনীতিতে জনগণকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে নিজেদের মতপার্থক্যকে পেছনে সরিয়ে রেখে একযোগে কাজ করার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ এটি।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, কোভিড-১৯ এর কারণে চাকরি বা উপার্জন হারানো নাগরিকদের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষিত চার মাসের জন্য প্রতিমাসে দুই হাজার ডলার করে কানাডা আপৎকালীন ভাতা (কানাডা ইমার্জেন্সি রেসপন্স বেনেফিট-সিইআরবি) পাওয়ার যোগ্যতা এবং তার জন্য আবেদন করার নিয়ম-কানুন ব্যাখ্যা।

টেলিকনফারেন্সে অন্য কলগুলোর বিষয়ের মধ্যে আরও ছিল, ঘরবন্দী হয়ে পড়া অন্ধ বাবাকে বাজার পৌঁছে দেওয়ার জন্য সহযোগিতা কামনা, অটিস্টিক শিশু সন্তানের জন্য বিশেষ সাহায্যের প্রয়োজনের কথা এবং মাস্ক পরার গুরুত্ব নিয়ে বিতর্কের উল্লেখ সঠিক পরামর্শ আহ্বান।

এমপিপি ক্যাথলিন ওয়েন দেশের শীর্ষ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ড. থেরেসা ট্যাম ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। জানালেন, আগে মাস্ক পড়াকে আবশ্যক মনে করা না হলেও জীবাণুর সংক্রমণ রোধে অসুস্থ ছাড়াও সুস্থ মানুষদের বাড়ির বাইরে ও দোকানে গেলে মাস্ক পরা আবশ্যক বলে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তৈরি মাস্কের সরবরাহ কম বলে অনলাইনে নকশা দেখে কাপড় দিয়ে ঘরেই নিজেদের মাস্ক তৈরির পরামর্শও দেন তিনি।

এছাড়া কারও কম্পিউটার বা ইন্টারনেট না থাকলে ফোনের মাধ্যমে সেবা ও তথ্য পাওয়ার সুযোগের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন কেউই এমপিপি ও সঞ্চালক।

অনেকে প্রশ্নের সুযোগ না পেলেও তাঁদের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ওয়েবসাইটের ঠিকানা ও ফোন নম্বর দিয়ে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হলো। আর জরুরি সহযোগিতার জন্য দুই এমপিপির অফিসে ফোন করে ভয়েস মেইল রাখার জন্য অনুরোধ করা হলো।

টেলিকনফারেন্স শেষে নির্বাচনী এলাকার অধিবাসীদের সাথে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা আবারও অনুধাবন করলাম।

এই টেলিকনফারেন্সের আয়োজন করা এবং আমাকে ও আমার পরিবারকে তার সাথে সংযুক্ত করার জন্য এমপিপি মাইকেল কটু ও এমপিপি ক্যাথলিন ওয়েনকে সবিশেষ ধন্যবাদ।

টরন্টো
৬ এপ্রিল ২০২০

আপনার মতামত লিখুন :