প্রবাসীদের ভার্চুয়াল ঈদ!

কবির আল মাহমুদ, স্পেন
গত বছর ঈদের ফাইল ছবি: সংগৃহীত

গত বছর ঈদের ফাইল ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ঈদ মানে আনন্দ, উৎসব ও আয়োজন। তবে এ বছর ঠিক বিপরীত একটি ঈদ উদযাপন করতে যাচ্ছি আমরা। বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের জন্য এমন বিবর্ণ একটা ঈদ এসেছে, যা আগে কখনো আসেনি। এবারের ঈদ হবে কষ্টের, এবারের ঈদ হবে বেদনার। এবারের ঈদ স্বজন হারানোর এবং বন্দি দশার মধ্যে ঈদ হবে। করোনা দিনের ব্যতিক্রমী এক ঈদ হতে যাচ্ছে আমাদের স্পেনে। কারণ স্পেনে লকডাউন ৭ জুন পর্যন্ত চলবে। সুতরাং সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে সবাইকে। কোথাও ঈদের জামাত হবে না। ঘরে বসেই ঈদের নামাজ পড়তে হবে। দশজনের বেশি একত্রিত হতে পারবে না। দুই মিটার দূরত্ব মেনে চলতে হবে।

যারা করোনা মাথায় করে ঈদের কেনাকাটা করেছেন, তারা অনলাইনেই বন্ধুদের কাপড়-মেকআপ দেখিয়ে দিতে পারেন। খামোখা বন্ধুর বাড়ি গিয়ে করোনা ছড়িয়ে লাভ নাই। ডিজিটাল এই দুনিয়ায় আপ্যায়ন, গল্প, ডেটিং, শুভেচ্ছা ও উপহার বিনিময় সবই চলতে পারে ভার্চুয়ালি।

আমরা যারা দূর প্রবাসে থাকি এখানেও রোজা আসে, তারাবি হয়, ইফতার পার্টি হয়। সবকিছুই হয়। কিন্তু কোনোভাবেই তা দেশের মতো না। দেশে যেমন রোজা শুরু হলেই একটা উৎসবের আমেজ তেরি হয়। কেনাকাটা, ঈদের বোনাস, লাইটিং, ঈদ ফ্যাশন, ঈদ সংখ্যা পত্রিকা, টিভিতে ঈদের বিশেষ অনুষ্ঠান, ঈদ পুনর্মিলনী, সিনেমা হলে নতুন সিনেমা মুক্তি পাওয়া কত কী। প্রবাসে এসব কিছুই নেই। প্রবাসে ঈদের দিনটা উইকেন্ডে হবে কিনা এই নিয়ে চলে গবেষণা। কারণ উইকডেতে হলে ঈদের দিন কাজে যেতে হবে। বাচ্চাদের যেতে হবে স্কুলে। দেশে যখন সবাই ঈদ উৎসবে মেতে থাকবে তখন প্রবাসে আমাদের থাকতে হয় কর্মস্থলে। কখন ঈদের দিনটা চলে যায় টেরও পাওয়া যায় না। বাসে-সাবওয়েতে বসে বা গাড়ির ড্রাইভিং সিটে হাত রেখে আর চোখের জলে বাবা-মা, ভাই-বোনদের কথা মনে পড়ে যায়। যারা বাবা-মাকে হারিয়েছেন বা হারিয়েছেন কোনো আপনজনকে তাদের কথা বেশি বেশি মনে পড়ে এই দিনে। প্রবাসে অনেক সন্তান হারা মা লুকিয়ে কাঁদেন। তার যাদুসোনা আর ফিরবে না এই আনন্দের দিনে।

যে যুবকটি তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে দেশে রেখে এসেছে, তার কি খুব কষ্ট হবে না! যাদের বৃদ্ধ মা-বাবা, ভাই-বোন রয়েছে দেশে, কোনো এক নির্জন মুহূর্তে সে-কি চোখের পানি ফেলবে না! বিশেষ করে প্রবাসী মেয়েরা ভীষণভাবে মিস করবে তার আত্মীয়-পরিজনকে। কেউ কেউ ঈদের দিন কাজের মধ্যেই আনমনা হয়ে পড়বে। বাসে, সাবওয়েতে চলার সময় খুব গোপনে একটু কেঁদে নেবে। অনেকেই ঈদের দিন আপনজনদের ফোন করবে। সার্কিটগুলো ব্যস্ত হয়ে পড়বে। যে মায়ের একমাত্র মেয়ে বা একমাত্র ছেলে বিদেশ থেকে ফোন করবে সেই মার কণ্ঠ জড়িয়ে আসবে আবেগরুদ্ধ কান্নায়। যে ব্যক্তি অনেকদিন তার স্ত্রী-সস্তানকে রেখে এসেছেন তার বুকটা কি ভেঙে যাবে না!

আনন্দ-বেদনার ঈদের নাম হচ্ছে প্রবাসের ঈদ। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের মতো করে আনন্দ খুঁজে নেয় প্রবাসীরা। তারাও ঈদের নামাজ পড়ে, কোলাকুলি করে, বেড়াতে যায় বন্ধুর বাড়িতে। কিন্তু তারা প্রিয়জন থেকে অনেক অনেক দূরে। তাদের শূন্যতা কিছু দিয়ে পূরণ হবার নয়।

এই করোনার কারণে সৃষ্ট অভাব আমাদের আবার স্মরণ করিয়ে দিল ‘সাধ্যের বাইরে যে সাধ তা কোন কালে পূরণ হবার নয়, সাধ্যের মধ্যেই আছে সকল সত্য।’ আসুন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে বাঁচি। আর সেটাই হবে এই করোনা আক্রান্ত পৃথিবীতে ভার্চুয়াল ঈদের আনন্দ।

আপনার মতামত লিখুন :