উদর বা পেটের রোজা



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

রোজার মূল দাবি হলো পানাহার ত্যাগ করা এবং রিপুকে নিয়ন্ত্রণ করা। পানাহারের সঙ্গে উদর বা পেটের সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ রসনা তৃপ্ত করার জন্য উদর পূর্তি করে খাবার গ্রহণে ইচ্ছুক। রোজায় তা করা যায় না। চোখের সামনে এবং হাতের নাগালের মধ্যে মুখরোচক, স্বাদু খাবার থাকলেও সেগুলো রোজা পালনকালে গ্রহণ করা যায় না। তদুপরি প্রতিটি মুসলমানকে খাবারের হালাল ও হারাম সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হয়। কারণ, খাবার হালাল-হারামের বিষয়ে সতর্ক থাকা এজন্য জরুরি যে, তা মানুষের জীবন ও চরিত্রে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। হালাল খাবারের যে পবিত্রতা ও ইতিবাচক শক্তি, তা হারাম খাবারে নেই। হারাম খাবার বলতে নিষিদ্ধ পশুর মাংস ও পানীয় যেমন আছে, তেমনি হারাম উপার্জনের মাধ্যমে আহরিত খাবারও তেমনি ভাবে রয়েছে। অর্থাৎ হারাম উপার্জনের মাধ্যমে হালাল খাবার কিনে খেলেও সেটা হালাল হয় না, হারাম হয়। মনে রাখা দরকার যে, আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা এ বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন:

‘হে রাসুলগণ, তোমরা পাক পবিত্র জিনিস খাও এবং নেক আমল করো’ (সুরা মুমিনুন: আয়াত ৫১)।

ইসলামী শরিয়তে ও জীবন ব্যবস্থায় হালাল বা পাক-পবিত্র বস্তু গ্রহণে রয়েছে উৎসাহ। আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা বলেছেন:

‘হে বিশ্বাসীগণ, আমি যেসব পাক জিনিস তোমাদের দান করেছি, তা তোমরা খাও এবং আল্লাহ তায়ালার শোকর আদায় করো, যদি তোমরা আল্লাহর ইবাদত করে থাকো’ (সুরা বাকারা: আয়াত ১৭২)

পাক-পবিত্র জিনিস বলতে সেসব বস্তুকেই গণ্য করা হয়, যেগুলো আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুমিনদের জন্য হালাল করেছেন। আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা আরো বলেছেন:

‘তিনি তাদের জন্য যাবতীয় পাক জিনিসকে হালাল ও নাপাক জিনিসগুলোকে তাদের জন্য হারাম ঘোষণা করেন’ (সুরা আরাফ: আয়াত ১৫৭)।

ফলে মুসলমানদের খাবারের ব্যাপারে সদা-সর্বদা হালাল ও হারাম বিচার করতে হয়। পেটে বা উদরে কোন খাবার গ্রহণ করা হচ্ছে, সে ব্যাপারে সর্বক্ষণ সতর্ক থাকতে হয় মুসলমান নর-নারীকে। আর রোজার সময় এ ব্যাপারে অধিকতর মনোযোগী হওয়া বাঞ্ছণীয়। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, পেটের রোজা হলো হারাম খাবার থেকে বেঁচে থাকা। পাশাপাশি রোজা পালনকালে দিনের বেলা সব ধরনের খাদ্য ও পানীয় থেকে বেঁচে থাকা, তা না হলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। তবে, হারাম খাবার থেকে শুধু দিনের বেলা বেঁচে থাকলেই চলবে না, রাতের বেলা ইফতার ও সাহরির সময়ও বেঁচে থাকতে হবে, যেমনভাবে জীবনের বাকী সময়ের দিন ও রাতে হারাম খাবার থেকে পুরোপুরি বেঁচে থাকতে হবে। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে:

‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দূর-দূরান্তে সফর করে, যার দেহ ধূলি-মলিন, চুল উসকো-খুসকো। সে ব্যক্তি আসমানের দিকে দু’হাত তুলে কাতর স্বরে বলে, হে প্রভু, হে প্রভু। অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম এবং সে হারামই খেয়ে থাকে। তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে’ (মুসলিম শরিফ: ১০১৫)।

হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, একদিন তিনি খাদেমের দেয়া খাবার খেয়ে খাদেমকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি এ খাবার কোথায় পেলে? খাদেম উত্তর দিল যে, সে বিধর্মী থাকা অবস্থায় একজনের ভাগ্য গণনা করেছিল। সে গণনার মজুরি বকেয়া ছিল। এ খাবার হলো সেই বকেয়া মজুরি। কথাাট শ্রবণ করে হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু তার নিজের গলার মধ্যে আঙুল দিয়ে বমি করে পেটের সব খাবার বের করে দিলেন। হারাম খাবার সম্পর্কে এমন কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন ইসলামের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। কারণ, আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা কর্তৃক ঘোষিত হারাম জিনিস এবং হারাম অর্থে কেনা জিনিস খাওয়া ইসলামে সুস্পষ্টভাবে এবং সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। নিষিদ্ধ জন্তু ও পানীয়ের মতোই সুদ, ঘুষ, জালিয়াতি, আত্মসাৎ, জুলুম, অবৈধ ও নিষিদ্ধ পন্থায় উপার্জিত অর্থে সংগৃহীত খাবার খাওয়াও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এতিমের মাল বা কারো হক বা সরকারি বা বেসরকারি সম্পদ চুরি করে সেসব অর্থে কেনা খাবার হারাম। সে অর্থে ভালো বা মন্দ, যা-ই করা হোক, তা আজাবের কারণ। ফলে  স্বাভাবিক অবস্থার মতো রোজার সময়েও এসব নিষিদ্ধ খাবার ও অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে সংগৃহীত খাবার পরিতাজ্য। মনে রাখা দরকার যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:

‘কারো জন্য নিজ হাতের উপার্জনের চেয়ে উত্তম কোনো খাবার নেই’ (বোখারি শরিফ: ১৫২)।

আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা আরো ইরশাদ করেছেন:

‘হে বিশ্বাসীগণ, তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২৭৫)।

‘তোমরা কখনো এতিমের মালের নিকটবর্তীও হবে না, তবে উদ্দেশ্য যদি নেক হয়’ (সুরা আনয়াম: আয়াত ১৫২)।

‘যারা অন্যায়ভাবে এতিমের মাল খায়, তারা যেন আগুন দিয়েই নিজেদের পেট ভর্তি করে। অচিরেই এ লোকগুলো জাহান্নামের আগুনে জ্বলতে থাকবে’ (সুরা নিসা: আয়াত ১০)।

‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করো না। আবার জেনে বুঝে অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদের কোনো অংশ ভোগ করার জন্য বিচারকদের সামনে ঘুষ হিসেবেও উপস্থাপন করো না’ (সুরা বাকারা: আয়াত ১৮৮)।

‘যারা সুদ খায় তারা সে ব্যক্তির মতো দাঁড়াবে, যাকে শয়তান নিজ পরশ দ্বারা মোহাচ্ছন্ন করে দিয়েছে’ (সুরা বাকারা: আয়াত ২৭৫)। 

‘তাদের অনেককেই তুমি দেখতে পাবে গোনাহ করা এবং বিদ্রোহ ও হারাম মাল ভোগ করার কাজে এরা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে চলেছে, এরা যা করে তা বড়ই নিকৃষ্ট কাজ’ (সুরা মায়েদা: আয়াত ৬২)।   

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:

‘আল্লাহ তায়ালা সুদদাতা, সুদখোর, সুদের লেন-দেন-লেখক, সুদের সাক্ষীর উপর অভিসম্পাদ করেছেন। আল্লাহর রাসুল বলেন, তারা সবাই সমান’ (মুসলিম শরিফ: ১৫৯৮)।

‘ঘুষদাতা ও ঘুষ-গ্রহীতার উপর আল্লাহ তায়ালা অভিসম্পাদ করেছেন’ (আবু দাউদ শরিফ: ৩৫৮০)। 

অতএব, হারাম ও অবৈধ উপার্জন এবং তা দ্বারা ক্রয়কৃত খাদ্য সর্বাবস্থায় সম্পূর্ণ রূপে হারাম বা অবৈধ। যার মধ্যে নেশা জাতীয় দ্রব্যও শামিল। এসব অবৈধ ও হারাম উপার্জনের কেনা বা সরাসরি হারাম খাবার রোজার সময়ে বা স্বাভাবিক-সাধারণ পরিস্থিতিতেও খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করলেও তা হারামই এবং সেগুলো রোজাকে বরবাদ করে দেওয়ার কারণ হবে। একাধিক ইসলামী ব্যক্তিত্ব হারাম, অবৈধ ও সন্দেহযুক্ত খাবারের বিষয়ে চরম সাবধানতা ও সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। এমনও দেখা গেছে যে, নিয়মিতভাবে অবৈধ উপার্জন ও হারাম খাবার গ্রহণের ফলে বহু মানুষের জীবন দুর্বিসহ হয়েছে। নিজের দ্বীন বিনষ্ট হয়েছে। হৃদয় অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়েছে এবং সন্তান-সন্ততি ধ্বংস হয়েছে।

বস্তুতপক্ষে, আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা যেসব খাবার হারাম করেছেন, সেগুলো বিজ্ঞানের পরীক্ষায় ক্ষতিকর করে প্রমাণিত হয়েছে। যার মধ্যে শুকরের মাংস ও মদ অন্যতম, যাতে খারাপ ছাড়া কিছুই নেই। তেমনিভাবে, আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত হারাম বা অবৈধ উপার্জনের দ্বারা খাবার গ্রহণ করা কেবল আখেরাতের শাস্তির কারণই নয়, দুনিয়াতেও লাঞ্ছনার কারণ এবং মানবজীবনকে ধ্বংসের জন্যে যথেষ্ট। ফলে বছরের অন্যসব সময়ের মতো মাহে রমজানের সময় পেট বা উদরকে সম্পূর্ণভাবে এসব অবৈধ ও হারাম উপার্জন ও খাদ্য থেকে সম্পূর্ণভাবে পবিত্র রাখা একান্ত অপরিহার্য্য।