রমজানে পাপ ও অপচয়ের কুফল



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

রমজান মাসে ইবাদত ও ভালো কাজের জন্যে যেমন সুসংবাদ ও সুফল রয়েছে, রয়েছে বহুগুণ সাওয়াবে নিশ্চয়তা, তেমনি রমজানের মতো পবিত্র মাসে পাপ ও অপচয়ের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি ও বিপদ। বস্তুত পাপ ও অপচয় পরস্পর সম্পর্কিত। পাপ কাজে অর্থ, শরীর, স্বাস্থ্য, চাহিদা, সময় ব্যয় করা পাপ তো বটেই অপচয়ও বটে। অতএব যেকোনো পাপই সঠিক ব্যয়ে বদলে অপচয়কে চিহ্নিত করে। আবার যেকোনো অপচয়ই পাপের দিকে ধাবিত করে।

গভীরভাবে চিন্তা করলে অপচয় ও পাপের মধ্যে সম্পর্ক এবং অপচয়ের কারণে পাপের আধিক্য ও ধ্বংসের বিষয়গুলো বিভিন্ন ব্যক্তি ও জাতির জীবনে পরিলক্ষিত হয়। অপচয়ের মাধ্যমে সংঘটিত পাপের কারণে অতীতে বহু মানুষ ও জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা অপচয়ের মতো ঘৃণিত পাপ থেকে বিরত থাকার জন্যে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা ইরশাদ করেছেন:

‘তোমরা অপব্যয় করো না, নিশ্চয় আল্লাহ অপব্যয়কারীকে পছন্দ করেন না’ (সুরা আনআম: আয়াত ১৪১)।

‘তোমরা অপচয় করো না। নিশ্চয় অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই আর শয়তান তার পালনকর্তার অকৃতজ্ঞ’ (সুরা বনী ইসরাঈল: আয়াত ২৬-২৭)।

অপচয় মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি। টাকা-পয়সা থাকলে সেটাকে কারণে-অকারণে খরচ করা মানুষের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। নিজের দম্ভ, আভিজাত্য, আর্থিক সাফল্য জাহির করার জন্য মানুষ অপচয়মূলক অনেক খরচ করে এবং যার মাধ্যমে নিজের প্রচার ও আমিত্বকে প্রদর্শন করতে চায়। নিঃসন্দেহে এই অপচয় একটি বড় পাপ, যা হিংসা, অহঙ্কার, গর্ব প্রভৃতি বড় বড় পাপের জন্ম দেয়। যে কারণে অপচয় ও অপব্যয় সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে।

সারা বছরের অপচয়-অপব্যয় এবং আমিত্ব রমজান মাসেও বহু লোক বহাল রাখে। বরং রমজান যে কৃচ্ছ্বতার মাস, এই মূল সত্যটিকেই অনেকে ভুলে যায়। বেশি বেশি খাবার, বিভিন্ন ধরনের পোষাক রমজানে অনেকের স্টাইলে পরিণত হয়। বহু খাবার নষ্ট করে ডাস্টবিনে ফেলে দিতেও দেখা যায়। বিশেষত ইফতার ও সাহরিতে বহু আইটেম সাজিয়ে রাখা হয়, যার অধিকাংশ অর্ধ-ব্যবহৃত হয়। অভাবী, অসহায় মানুষকে না দিয়ে খাবার নষ্ট করা বা কিয়দাংশ খেয়ে খাবার অপচয়-অপব্যয় করা ধর্মীয় দৃষ্টিতে যেমন বিরাট পাপ, তেমনি নৈতিক দিক থেকেও মহা অপরাধ। কারণ, মানুষকে অভুক্ত ও ক্ষুধার্ত রেখে অপচয়-অপব্যয় করার অধিকার কারোই থাকতে পারেনা। এহেন অপকর্ম দ্বীন, ধর্ম, আইন, কানুনের দিক থেকে শাস্তিযোগ্য হওয়াই উচিত।

অথচ আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালার অনুগত ও নেক বান্দা অপচয়-অপব্যয়ের কাছ দিয়েও যাবে না, যেমনভাবে যাবে না পাপের কাছ দিয়েও। বরং তারা হবে এমন গুণে গুণান্বিত, যা আল্লাহ সোবহানহু তায়ালা পবিত্র কোরআনে বর্ণনা করেছেন:

‘এরা শুধু আল্লাহর ভালোবাসায় মিসকিন, এতিম ও কয়েদিদের খাবার দেয়। (খাবার দেবার সময় এরা বলে) আমরা শুধু আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য তোমাদের খাবার দিচ্ছি। আমরা তোমাদের কাছে কোনোরূপ প্রতিদান চাই না, না চাই কোনো রকম কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন। আমরা তো সে দিনটির বিষয়ে আমাদের মালিককে ভয় করি, যেদিনটি হবে অতীব ভয়ঙ্কর’ (সুরা দাহর: ৮-১০)।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন:

‘শেষ বিচারের দিবসে আল্লাহ তায়ালা বলবেন, হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছি, তুমি আমাকে খাবার দাওনি। মানুষ বলবে, আপনাকে কিভাবে খাবার খাওয়াবো? আপনি তো জগতের প্রতিপালক। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি কি জানো না, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল, তুমি তাকে খাবার দাওনি। যদি তুমি তাকে খাবার দিতে, তাহলে আমার কাছে তার সাওয়াব পেতে’ (মুসলিম শরিফ: ২৫৬৯)।

শুধু অর্থ-বিত্তের দিক থেকেই নয়, অন্যান্য দিক থেকেও রমজান মাসে রোজা রেখে অপচয়ে লিপ্ত হয় বহু মানুষ। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো অধিক ঘুমানোর মাধ্যমে মূল্যবান সময়ের অপচয়। অনেকেই রমজান মাসে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ঘুমানো দ্বারা রোজাকে হাল্কা এবং সময়ের অপচয় করে। বিশেষ করে, দিনের বেলায়। অনেক রোজাদার তাদের দিনগুলোকে আলস্য ও অবহেলায় অতিরিক্ত আরাম-আয়েশ, ঘুম ও বিশ্রামে কাটায়। আবার অনেকে অফিস-আদালতে বা কর্মক্ষেত্রে অযথা কথাবার্তা, আড্ডার মাধ্যমে রমজানের দামি সময়গুলোকে নষ্ট করে। বহুজন এমন আছে, যারা হাট-বাজারে মুখরোচক ও রসনা নিবৃত্তকারী খাবারের সন্ধানে রমজানের অধিকাংশ সময় নষ্ট করে ফেলে। আর মেয়েদের মধ্যে ঈদকে সামনে রেখে রমজানের বৃহদাংশ সময়ই মার্কেটিং-এর নামে অর্থ ও সময় অপচয় করার প্রবণতাও লক্ষণীয়।

বস্তুতপক্ষে, রমজানের সময় টাকা-পয়সা, সময় ইত্যাদি চার ধরনের পন্থায় অপচয় বা অপব্যয় হয়ে থাকে। যেগুলো হলো:

*   গোনাহের ক্ষেত্রে অপচয় হলো টিভি, মোবাইলে অশ্লীলতা দেখে বা পরচর্চা, পরনিন্দা ইত্যাদি গোনাহের মাধ্যমে রমজানের অতিমূল্যবান সময়কে অপব্যয়-অপচয় করে বোকার মতো সাওয়াবের বদলে পাপ কামানো এবং শাস্তির ভাগীদার হওয়া।

*   সরাসরি পাপ না করলেও আলস্য, অবহেলায় রমজানের মূল্যবান সময় নষ্টকারী, যারা রমজান পেয়েও আমল করতে না পারার জন্য আফসোসকারী হবে।

*   রমজানে ভোগ-বিলাসের জন্য কিংবা লোক দেখানোর জন্য খাবার, পোষাকে টাকা-পয়সা অপচয়কারী, যারা একই সঙ্গে শাস্তি ও আফসোসের শিকার হবে।

*   সামাজিকতা ও আনুষ্ঠানিকতার নামে নিজের সময়কে নষ্টকারীরা নিজের প্রয়োজনীয় আমল না করার জন্য ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

অতএব, যেভাবে বা যে পন্থায় হোক, অপচয় সর্বদা পরিতাজ্য এবং পাপের নামান্তর। বছরের সব সময় তো বটেই, রমজানে অবশ্যই সময়, অর্থ, কথা, কাজ ইত্যাদি যাবতীয় ক্ষেত্রে অপচয় ও অপব্যয়ের কবল থেকে মুক্ত থাকা প্রতিটি রোজাদার নর-নারীর অবশ্য কর্তব্য। জীবনের সর্বক্ষেত্রে অর্থ, সময়, সম্পদ, শক্তি ও চরিত্রের অপচয়ের মাধ্যমে মানুষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশেষত, তরুণ-যুবকগণ এই অপচয়ের কুফলের কারণে জীবনের সাফল্য লাভে বঞ্চিত হয় এবং অতি মূল্যবান স্বাস্থ্য-সম্পদ হারায়। ফলে অনেকের জীবনের অবশিষ্ট দিনগুলো কাটে অপচয় ও পাপের মাধ্যমে অর্জিত ক্ষতির জন্য কষ্টকর যন্ত্রণা ভোগ করে এবং হায়-আফসোস করার মাধ্যমে।

এসব ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে রমজানে অধিকতর সতর্ক হতে হবে। অপচয় ও পাপ যে জীবনে আসতে না পারে, সেজন্য হুশিয়ার থাকতে হবে। বিশেষত মাহে রমজানে অপচয় ও পাপ এসে যেন মূল্যবান ও দামি সময় আর আমলের সুযোগ নষ্ট করতে না পারে, সেজন্য বিশেষভাবে তৎপর ও মনোযোগী থাকা প্রতিটি মুসলমান নর-নারীর একান্ত কর্তব্য হওয়া উচিত।