হজরত রাসুলুল্লাহ সা.-এর বংশধারা



মাওলানা মুহাম্মদ মুনিরুল হাছান, অতিথি লেখক, ইসলাম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

মহান আল্লাহ যখন কাউকে নবুওয়ত ও রেসালাতের জন্য মনোনীত করেন তখন তাদেরকে পুতঃপবিত্র এবং শ্রেষ্ঠতম বংশেই পাঠিয়ে থাকেন। সকল নবী-রাসুল পবিত্র পুরুষদের ঔরসে এবং পবিত্র নারীর গর্ভে প্রেরিত হয়েছেন। পৃথিবীতে আগমনকারী কোনো নবীর বংশ সম্পর্কে কোনো ধরনের বিরুপ সমালোচনা কেউ করতে পারেনি। এটা আল্লাহর বিশেষ রহমতও বটে। আল্লাহতায়ালা শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধারাকে তৎকালীন জাহেলিয়াতের যাবতীয় মন্দত্ব ও ব্যভিচার থেকে হেফাজত করেছেন।

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, ‘আবু সুফিয়ান তার কাছে বর্ণনা করেছেন, রোমান সম্রাট হেরাকল তাকে ওই সময় ডেকে পাঠান; যখন তিনি কোরাইশ ব্যবসায়ীদের দলপতি হিসেবে ব্যবসার উদ্দেশ্যে শাম গিয়েছিলেন। রোমান সম্রাট আবু সুফিয়ানের নিকট নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশ সম্পর্কে প্রশ্ন করে বলেন, তোমাদের মধ্যে তার বংশ মর্যাদা কিরূপ? (আবু সুফিয়ান বলেন) আমি বললাম, তিনি আমাদের মধ্যে উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সম্ভ্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন।’ –সহিহ বোখারি : ৬

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আমার বেলাদত পরিক্রমায় জাহেলি যুগের ব্যভিচারীদের কোনো অংশ নেই, আমার জন্ম ইসলামি রীতি অনুসারে হয়েছে।’ -বায়হাকি, আসসুনানুল কুবরা : ১৪০৭৬

ইমাম আবু নুয়াইম (রহ.) হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেন, হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার পিতা-মাতা কখনও জাহিলি যুগের রীতিতে একজন আরেকজনের সঙ্গে মিলিত হননি, আর আল্লাহতায়ালা আমাকে সর্বদা পবিত্র পৃষ্ঠদেশ হতে পবিত্র রেহেমে স্থানান্তরিত করেছেন যা ছিল পুতঃপবিত্র এবং স্বচ্ছ। যখনই দু’টি শাখা হতো- তম্মধ্যে আমি উত্তম শাখার মধ্যেই ছিলাম। -ইবনে কাসির, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ২/৩১৮

উপরোক্ত বর্ণনা থেকে এই দাবি প্রতিষ্ঠিত হয়, প্রিয়নবীর পিতৃকুল ও মাতৃকুলের পূর্বপুরুষগণ সবাই তাওহিদের ওপর বিশ্বাসী ছিলেন। তারা কুফর, শিরক ও অনৈতিক আচরণ থেকে পুতঃপবিত্র ছিলেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের নিকট রাসুল আগমন করেছেন, তোমাদেরই মধ্য হতে তোমাদের জন্য যা ক্ষতিকর তা তার নিকট অসহনীয়, আর তোমাদের উপকারের জন্য তিনি অত্যন্ত আগ্রহী। বিশেষত মুমিনদের সঙ্গে তিনি অত্যন্ত দয়াবান, অতীব মেহেরবান।’ -সুরা তাওবা : ১০৩

উক্ত আয়াতের দু’টি প্রসিদ্ধ কেরাতরীতি রয়েছে। একটি হলো- ‘আনফুসিকুম’ অপরটি হলো- ‘আনফাসিকুম।’ হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) এবং ইমাম জুহরি (রহ.) ‘ফা’ অক্ষরে জবর দিয়ে অর্থ নির্ধারণ করে বলেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম এবং সম্ভ্রান্ত (বংশধর)। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত আয়াত তেলাওয়াতের সময় ‘আনফুসিকুম’ শব্দের ‘ফা’ বর্ণে জবর দিয়ে পড়ে ইরশাদ করেন, আমি বংশগত দিক থেকে বৈবাহিক সূত্রে, আত্মীয়তা এবং আভিজাত্যের দিক থেকে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। আমার বাপ-দাদার মধ্যে কেউ ব্যভিচার দ্বারা নয় বরং বিবাহ দ্বারা জন্মগ্রহণ করেছেন। -ফাতহুল কাদির : ২/৪৭৭

হজরত ওয়াসিলা ইবনে আসকা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সন্তানদের মধ্য হতে হজরত ইসমাইল (আ.) কে নির্বাচন করেছেন এবং হজরত ইসমাইল (আ.)-এর বংশধরদের মধ্যে হতে কিনানা গোত্রকে বংশ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। অতঃপর কিনানা গোত্র হতে কোরাইশ বংশকে বেছে নিয়েছেন। আর কোরাইশ বংশ থেকে হাশিম উপগোত্রকে বেছে নিয়েছেন এবং বনুহাশিম হতে আমাকে বেছে নিয়েছেন।’ –সহিহ মুসলিম : ২২৭৬

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা নিশ্চয়ই মাখলুক সৃষ্টি করেছেন, আমাকে তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দলে রেখেছেন, আর দুই দলের উত্তম গোত্রে রেখেছেন। অতঃপর ঘরসমূহের মধ্যে উত্তম ঘরে রেখেছেন। সুতরাং আমি সত্তাগতভাবে এবং বংশের দিক দেখে সর্বোৎকৃষ্ট।’ -জামে তিরমিজি : ৩৬০৭

আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘মুশরিকরাই তো অপবিত্র, নাপাক‌।’ -সুরা তাওবা : ২৮

যেখানে আল্লাহতায়ালা নিজেই মুশরিকদেরকে অপবিত্র বলে ঘোষণা দিয়েছেন, আর আল্লাহর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুনিয়াতে প্রেরিত হয়েছিলেন কুফর ও শিরককে সমূলে ধ্বংস করার জন্য। সুতরাং তার বংশধারার মধ্যে অপবিত্র কিছু থাকবে সেটা কল্পনাও করা যায় না। পৃথিবীর সকল শ্রেষ্ঠতম মানুষগুলো প্রিয় নবীজির সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিলেন। কেননা প্রিয় নবীজি সত্বাগতভাবে খুব সুন্দর ছিলেন। তার চরিত্র ছিল আরও সুন্দর, এক কথায় অনিন্দ্য সুন্দর। প্রিয় নবীজির সাহাবি হজরত হাসসান বিন সাবিত (রা.)-এর ভাষায় বলা যায়, ‘সকল প্রকার ত্রুটি থেকে মুক্ত করে আপনাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আপনি যেমনটি চান ঠিক তেমনভাবে যেন আপনাকে বানানো হয়েছে।’