হিজরি সন গণনার গুরুত্ব

  • মাওলানা আবদুল জাব্বার, অতিথি লেখক, ইসলাম
  • |
  • Font increase
  • Font Decrease

হিজরি সন গণনাকে ফরজে কেফায়া হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, ছবি: সংগৃহীত

হিজরি সন গণনাকে ফরজে কেফায়া হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, ছবি: সংগৃহীত

চন্দ্র ও সূর্য উভয়টির মাধ্যমে সন-তারিখ নির্দিষ্ট করা যায়। চাঁদের গতি-প্রকৃতি হিসাবে যে সন গণনা করা হয়, সেটাকে বলা হয় চান্দ্রসন, আর সূর্যের গতি-প্রকৃতি হিসাবে যে সন গণনা করা হয়, তাকে বলা হয় সৌরসন। বাংলাদেশে ইংরেজি, বাংলা ও হিজরি এই তিনটি সালের প্রচলন রয়েছে। আমরা যে বাংলা এবং ইংরেজি সাল গণনা করি- এটা সৌর সন। হিজরি সন হচ্ছে চন্দ্রসন। নানা পরিবর্তন, পরিমার্জন, পরিবর্ধন, বিবর্তন এবং যোগ-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে বর্ষ গণনায় বর্তমান কাঠামো লাভ করে। আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় হিজরি সন নিয়ে।

পৃথিবীতে আল্লাহতায়ালা সব কিছু সুনির্ধারিত করেছেন সহজ ও সুষ্ঠ হওয়ার জন্য। তারই ধারাবাহিকতায় মহান আল্লাহ আরবি ১২ মাসের নামসমূহ নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সূরা তওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই পৃথিবী ও আকাশ সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর নিকট মাসসমূহের সংখ্যা ১২টি। তার মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান!

বিজ্ঞাপন

কোরআন মাজিদের অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে, ‘লোকেরা আপনাকে নবচন্দ্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে, আপনি বলুন, তা হলো মানুষের এবং হজের জন্য সময় নির্ধারণকারী।’ -সূরা বাকারা : ১৮৯

বর্ণিত আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে বুঝা যায়, আল্লাহতায়ালা বান্দাদের হিসাব-নিকাশের সুবিধার্থে পঞ্জিকাস্বরূপ চন্দ্রকে সৃষ্টি করেছেন। এ জন্য, চন্দ্র মাস তথা হিজরি সনের গুরুত্ব অপরিসীম।

বিজ্ঞাপন

হিজরি সন গুরুত্বপূর্ণ হলেও মুসলিম হিসেবে হিজরি নববর্ষ উদযাপন কিংবা মুসলিমদের গৌরবের দিনটি পালনের ঐতিহ্য আমাদের সংস্কৃতিতে ব্যাপকতা লাভ করেনি। অনেক মানুষই জানেন না, মুসলিমদের নববর্ষ কোন মাসে হয়? কেউ হয়ত হিজরিবর্ষ গণনার সঠিক ইতিহাস জানেন না, হিজরি সনের তারিখের খবর রাখেন না; এর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেন না- এটা খুবই দুঃখজনক।

হিজরি সন মুসলমানদের ধর্মীয় প্রেক্ষাপটেই ব্যবহার করা হয়। ইসলামের অধিকাংশ ইবাদত-বন্দেগি যথা: রোজা, হজ, কোরবানি, শবেকদর, শবেবরাত, আশুরা ও জাকাতের হিসাব ইত্যাদি ইবাদত হিজরি সনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। হিজরি সন ব্যবহারের মাধ্যমে সঠিক সময়ে ইবাদত-বন্দেগি পালন করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন লাভ করা সম্ভব হয়। এ জন্য হিজরি সন গণনাকে ফরজে কেফায়া হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।

হিজরি সনের সঙ্গে মুসলিম উম্মাহর আদর্শ ও ঐতিহ্যের ভিত্তি সম্পৃক্ত। যার সঙ্গে জড়িত বিশ্বমানবতার মুক্তির অমর কালজয়ী আদর্শ হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় ও পুণ্যময় জন্মভূমি মক্কা ত্যাগ করে মদিনায় গমনের ঐতিহাসিক ঘটনা। নবী কারিম (সা.) হিজরি সন চালু করেননি। এটি প্রবর্তন করেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর বিন খাত্তাব (রা.)। এ ইতিহাস কমবেশি সবারই জানা।

সন নির্ধারণী ওই সভায় অনেক সাহাবি উপস্থিত ছিলেন। সেখানে পরামর্শক্রমে হিজরতের দিন থেকে ইসলামি তারিখ গণনার সিদ্ধান্ত হয়। কারণ, হিজরতের মাধ্যমে সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য সূচিত হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে মুসলমানদের উন্নতি, অগ্রগতি, বিজয় ও সাফল্যের প্রতীক ও শ্রেষ্ঠ তৌহিদী বিপ্লব ছিল হিজরত। যেহেতু হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় জন্মভূমি ত্যাগ করা ছিল ইসলামের ইতিহাসে একটি মহান ঘটনা। সে কারণেই হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে হিজরি সন গণনা শুরু হয়।

সুতরাং এ কথা মনে করার কোনো অবকাশ নেই যে, হিজরি সনটি আসলে আরবি বা কেবল আরবদের একটি সন। বরং এটি মুসলমানদের সন এবং ইসলামি সন। তাই সবার উচিত ইসলামি সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া এবং হিজরি সন ও তার তৎপর্য স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা।