আনুষ্ঠানিকতায় ভিন্নতা নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে রমজান শুরু



নুসরাত জাবীন বিভা, নিউজরুম এডিটর, বার্তা২৪.কম
আনুষ্ঠানিকতায় ভিন্নতা নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে রমজান শুরু, ছবি: সংগৃহীত

আনুষ্ঠানিকতায় ভিন্নতা নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোতে রমজান শুরু, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) থেকে রমজান মাস শুরু হচ্ছে। রোজা পালনের জন্য বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাতে এশার নামাজের পর অতিরিক্ত বিশ রাকাত তারাবির নামাজ ও শেষ রাতে সেহেরি খাবেন মুসলমানরা। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে এবার বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে রোজা পালন করতে হবে, এর নজির ইতিহাসে বিরল।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই মুসলিমরা এবার প্রথামত দলবেঁধে তারাবি আদায়, আত্মীয়-পরিজন-প্রতিবেশিদের নিয়ে সন্ধ্যায় ইফতারি করতে পারবেন না। অতীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগ এসেছে- সে সময়ও মুসলমানরা রমজানের সময় একসঙ্গে তাদের ধর্মীয় আচার পালন করেছেন। কিন্তু এবারই ব্যতিক্রম।

বরাবরই মুসলিমপ্রধান দেশ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোতে রমজান ভিন্নমাত্রা যোগ করে। ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন ও নানাবিধ প্রথাপালনের মধ্য দিয়ে তারা রমজান কাটান ভিন্নমাত্রায়। উপসাগরীয় দেশ বলতে মূলত পারস্য উপসাগরের উপকূলবর্তী ৮টি দেশকে বুঝানো হয়। দেশগুলো হলো- সৌদি আরব, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ইরাক ও ইরান। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক এসব এলাকার মুসলিমরা কীভাবে রমজান মাস পালন করবেন।

সৌদি আরব
ইসলামের পবিত্রতম শহর মক্কা ও মদিনার দেশ সৌদি আরবে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলছে। ভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে বেশ কিছু কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। যার অংশ হিসেবে মসজিদে সব রকম নামাজ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

দেশটির গ্র্যান্ড মুফতি শেখ আবদুল আজিজ আল শেখ ঘোষণা দিয়েছেন, মসজিদে জামাত করে তারাবির নামাজ অনুষ্ঠিত হবে না, বাড়িতে পড়তে হবে। মুফতি আরও বলেছেন, যদি করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হয় তাহলে ঈদুল ফিতরের নামাজও বাড়িতে পড়তে হবে।

বুধবার (২২ এপ্রিল) সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ মক্কা-মদিনার প্রধান দুই মসজিদে সীমিত মুসল্লিদের অংশগ্রহণে সংক্ষিপ্ত তারাবির জামাতের অনুমতি দিয়েছেন। মক্কা-মদিনায় সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ। অন্য সময় রমজানে প্রায় ২৫-৩০ লাখ মুসলমান বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে উমরা, ইতেকাফ ও কিয়ামুল লাইলে অংশ নিতে সৌদি যান। এবার সৌদি আরবের চিরায়ত রমজান আয়োজন বলতে গেলে কোনোটাই নেই। অনেকটা নিরানন্দ পরিবেশে এবার তাদের রমজান কাটাতে হবে। দেশটির ধর্মীয় নেতারা মানুষদের বাড়িতে নামাজ পড়ার আহবান জানানোর পাশাপাশি বেশি বেশি তওবা ও দান-খয়রাতের অনুরোধ জানিয়েছেন।

মদিনার মসজিদে নববীর ইফতার আয়োজন এবার থাকছে না, ছবি: সংগৃহীত

সংযুক্ত আরব আমিরাত
সোমবার (২০ এপ্রিল) ফতোয়া এবং ধর্মীয় আইন প্রণয়নকারী সংস্থা আমিরাত ফতোয়া কাউন্সিল সংযুক্ত আরব আমিরাতে মুসলিমদের বাড়িতে নামাজ পড়ার আহবান জানিয়েছে এবং বাড়িতেই তারাবি পড়া যাবে বলে রায় দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বর্তমানে মসজিদ বন্ধ রয়েছে। দেশটির ধর্মীয় কাউন্সিল আরও জানিয়েছে, করোনা আক্রান্ত রোগী এবং তাদের চিকিৎসা প্রদানকারী স্বাস্থ্যকর্মীদের রোজা রাখা থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার দেশটির ঐতিহ্যবাহী ‘তাঁবু ইফতার’ প্রথা বাতিল করা হয়েছে।

কুয়েত
কুয়েতে চলমান কারফিউ মে মাসের শেষ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। ফলে পুরো রমজান মাস কারফিউর আওতায় থাকছে। ১৩ মার্চ থেকে দেশটির মসজিদগুলো বন্ধ করে দিয়ে সবাইকে বাড়িতে নামাজ পড়তে বলা হয়েছে। তেল সমৃদ্ধ ছোট্ট দেশে কুয়েতেও থাকছে না ঐতিহ্যবাহী কোনো রমজান আয়োজন।

ওমান
করোনাভাইরাসের বিস্তার বাড়ায় রমজানের নামাজসহ ওমানে সব ধরনের বড় জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) কোভিড-১৯ বিষয়ক ওমানের সুপ্রীম কমিটি এক বিবৃতিতে জানায়, শুধুমাত্র আজান দেওয়া ছাড়া সবসময় মসজিদ বন্ধ থাকবে। এমনকি তারাবির সময়ও।

কাতারের মসজিদে জামাত বন্ধ রাখা হয়েছে, ছবি: সংগৃহীত

কাতার
কাতারেও মসজিদ এবং নামাজের জামাত বন্ধ রাখা হয়েছে। রমজানে মসজিদ চালু করার কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। রমজান উপলক্ষে মসজিদে ইফতার আয়োজন, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

বাহরাইন
বাহরাইনের আল ফাতেহ মসজিদে অল্প সংখ্যক সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে তারাবির নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। যা আরব উপসাগরীয় অন্য দেশ থেকে ব্যতিক্রম। সামাজিক দূরত্ব বিধি মেনে ইমাম এবং ৫ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজে অংশ নেবেন। এই নামাজ টেলিভিশনে সম্প্রচারিত হবে। তবে ২৩ মার্চের ঘোষণা অনুযায়ী, দেশের অন্য সব জায়গার মসজিদ বন্ধ রয়েছে।

ইরান
করোনায় মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি ইরান। করোনার প্রকোপ এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ধীরে ধীরে অপরিহার্য ব্যবসা-বাণিজ্য চালু করা হচ্ছে। তবে জুমার নামাজের জামাতসহ সারাদেশের মসজিদ বন্ধ রয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানিদের রমজানের সময় ঘরে বসে নামাজ আদায়ের আহ্বান জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে একাকীত্বের মাঝে প্রার্থনা এবং নম্রতাকে অবহেলা না করার তাগাদাও দিয়েছেন।

ইরাক
রমজানকে সামনে রেখে ইরাকে ১৫ মার্চ থেকে জারি করা কারফিউ কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। ফলে রাজধানী বাগদাদে সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত চলাচল করা যাবে এবং কিছু দোকান আবার খোলা রাখা যাবে। তবে রমজান উপলক্ষে কোনো ধরনের গণজমায়েত করা যাবে কিনা সে বিষয়টি এখনও স্পষ্ট নয়।

-আল আরাবিয়া অবলম্বনে