বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের রমজান চিত্র



নুসরাত জাবীন বিভা, নিউজরুম এডিটর, বার্তা২৪.কম
ইন্দোনেশিয়ার বিখ্যাত ইস্তিকলাল মসজিদের করিডোরে প্রার্থনা করছেন এক মুসলিম, ছবি: সংগৃহীত

ইন্দোনেশিয়ার বিখ্যাত ইস্তিকলাল মসজিদের করিডোরে প্রার্থনা করছেন এক মুসলিম, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মুসলমান লকডাউন অবস্থায় রয়েছে। মুসলিম প্রধানদেশগুলোতেও সব ধরনের জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ফলে প্রতি বছরের মতো রমজানের স্বাভাবিক কার্যক্রম প্রায় সবদেশেই ব্যাহত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে মুসলিম প্রধান দেশে মসজিদের বদলে নামাজ বাড়িতে আদায় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে পাকিস্তানসহ কিছু দেশে মসজিদ খোলা রাখা হয়েছে। সমালোচকরা বলছেন, এর ফলে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং করোনাভাইরাস বিস্তার রোধের চেষ্টা ব্যাহত হবে।

বাংলাদেশ
২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশে লকডাউন চলছে। প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার এই দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ মুসলিম। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রমজান মাসে সবাইকে বাড়িতে নামাজ পড়তে বলেছেন। করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতিতে ১০ জন মুসল্লি ও ২ জন হাফেজসহ মোট ১২ জনের অংশগ্রহণে রমজান মাসে মসজিদসমূহে এশা ও তারাবির নামাজ আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে এর সঙ্গে ইতোপূর্বে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত মসজিদে জুমা ও জামাত বিষয়ক নির্দেশনা কার্যকর থাকবে। এছাড়া রমজান মাসে ইফতার মাহফিলের কোনো ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যাবে না।

শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) সরকারি নির্দেশনা মেনে মসজিদে ও নিজ ঘরে এশা-তারাবির নামাজ আদায় করছেন দেশের কোটি কোটি মুসলমান। ফলে এবার মসজিদে মসজিদে নীরবতা, নেই হাজার হাজার মুসল্লির পদধ্বনি।

ভারত
ভারতে প্রায় ৩০ কোটি মুসলিমের বাস। ভারতজুড়ে কঠোর লকডাউন চললেও ২০ এপ্রিল কয়েকটি রাজ্যে নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। যদিও এটা নিয়ে চলছে প্রচণ্ড তর্ক-বিতর্ক। তবে দেশটির ইসলামি নেতারা মুসলিমদের বাড়িতে নামাজ আদায়ের অনুরোধ করেছেন এবং দেশব্যাপী জারি করা লকডাউন মেনে চলতে বলেছেন। মার্চের শুরুর দিকে নয়াদিল্লীর একটি মসজিদে মুসলিমদের জমায়েতকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। করোনাভাইরাস ছড়ানোর জন্য তাদের দায়ী করা হয়। তবে অন্য ধর্মে বিশ্বাসীরাও মার্চে ভারতের বিভিন্ন স্থানে জমায়েত হয়েছে।

সরকারি নির্দেশনা মেনে বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদে চলছে তারাবির জামাত, ছবি: সংগৃহীত 

ইন্দোনেশিয়া
ইন্দোনেশিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) দেশটির ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক প্রত্যাবর্তন অনুষ্ঠান ‘মুদিক’ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। রমজান শেষে ঈদুল ফিতর উদযাপনের জন্য গ্রামের বাড়িতে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হতে লাখ লাখ মানুষের শহর ছেড়ে যাওয়াকে মুদিক বলে। সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য অনুষদের গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি বাড়ি ফেরায় অনুমোদন দেওয়া হয় তাহলে জুলাইয়ের মধ্যে দশ লাখ মানুষ আক্রান্ত হবে।

প্রেসিডেন্ট উইদোদো দেশটিতে এখনও লকডাউন জারি করেননি। তবে এপ্রিলের শুরুর দিকে রাজধানী জাকার্তা সীমিত আকারে বন্ধ করা হয়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিও এই বন্ধের আওতাধীন। দেশটির ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী জানিয়েছেন, তারাবির নামাজ এবং কোরআন তেলাওয়াত বাড়িতে বসে করতে হবে, ঈদের জামাতও বাতিল করা হয়েছে।

ফ্রান্স
ইউরোপের দেশগুলো মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুসলিমের বসবাস ফ্রান্সে। দেশটির ২ হাজার ৮০০ মসজিদের সবগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ১৫ মার্চ থেকে। ফ্রেঞ্চ কাউন্সিল অব মুসলিম ফেইথের প্রেসিডেন্ট মুসাউয়ি মুসাউয়ি জানিয়েছেন, রমজান মাসে তারাবির নামাজ বাতিল করা হয়েছে এবং সবাইকে বাড়িতে নামাজ পড়তে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা ইমামদের জনসাধারণের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সব ধরনের মাধ্যম ব্যবহার করার জন্য বলেছিলাম। তাই কিছু ইমাম খুতবা এবং নামাজ রেকর্ড করে অনলাইনে আপলোড করেছেন।’

নাইজেরিয়া
আফ্রিকার সবচেয়ে বেশি মুসলিম জনসংখ্যার দেশ নাইজেরিয়ায় রমজানের মধ্যে সামাজিক এবং ধর্মীয় জমায়েত এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে। নাইজেরিয়ার সবচেয়ে পুরাতন ইসলামিক গোষ্ঠী নাইজেরিয়ান সুপ্রীম কাউন্সিল ফর ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স কোভিড-১৯ এর কারণে মসজিদে তারাবির নামাজ নিষিদ্ধ করে আইন জারি করেছে।

পাকিস্তানের এমন জমজমাট ইফতার বাজার এবার নেই, ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তান
অন্য মুসলিম দেশগুলো থেকে পৃথক আচরণ করেছে পাকিস্তান। রমজান মাস উপলক্ষে এখানে মসজিদে জামাত করে নামাজ আদায়ের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনসংখ্যার এই মুসলিম দেশে এক মাসেরও কম সময় আগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ফলে মসজিদে মাত্র তিন থেকে পাঁচ জন একসাথে নামাজ আদায় করার অনুমতি দেওয়া হয়। পরে ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভির আলোচনা শেষে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। অর্থাৎ রমজানে মুসলিমরা মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারবেন। তবে মসজিদে যাওয়া মুসল্লিদের অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে এবং পরস্পরের মধ্যে ২ মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।

এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য সরকার চাপের মুখে ছিল এবং দেশের সবচেয়ে বড় শহর করাচীতে মসজিদে নামাজ পড়তে যাওয়া মুসল্লিদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।

যুক্তরাজ্য
মার্চের শেষ দিকে যুক্তরাজ্য সরকার মসজিদসহ সব ধরনের ধর্মীয় উপাসনালয় লকডাউনের অন্তর্ভুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছে। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) দেশটির অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মুসলিম ব্যক্তিত্ব ক্বারি আসিম জানান, লকডাউন না তোলা পর্যন্ত রমজানে মসজিদ বন্ধ থাকবে। মসজিদ এবং ইমামদের জাতীয় উপদেষ্টা বোর্ডের চেয়ারম্যান আসিম বলেন, রমজানে তারাবির নামাজ পড়ার জন্য মসজিদে বা কারও বাড়িতে জমায়েত হওয়া ভীষণ নির্বুদ্ধিতার কাজ হবে।

যুক্তরাষ্ট্র
এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হওয়া দেশ যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে লকডাউন এবং ধর্মীয় জমায়েতের নিয়ম একেক রাজ্যে একেক রকম। যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় সাড়ে দশ লাখ মুসলিম রয়েছে, যা ট জনসংখ্যার ১ শতাংশ। উত্তর আমেরিকার ইসলামিক সোসাইটি এবং অন্যান্য মুসলিম গোষ্ঠী রমজানে নামাজ এবং জমায়েত বাতিল করেছে।

-আল আরাবিয়া অবলম্বনে