করোনা পরিস্থিতিতে রমজানের দানশীলতা



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
অসহায়দের সাহায্যের জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করাও প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব, ছবি: সংগৃহীত

অসহায়দের সাহায্যের জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করাও প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

দানশীলতা ইসলামের সৌন্দর্যময় আমল, যা মানব কল্যাণমুখী কাজের অন্যতম। ফরজ বা অবশ্য পালনীয় জাকাত ছাড়াও সাধ্যমতো দান, সাদাকা করার নির্দেশ ইসলামে বার বার দেওয়া হয়েছে। ইসলাম ধর্ম তার অনুসারী মুসলমানদের নিজ নিজ সম্পদকে পুঞ্জিভূত নয়, সুষম বণ্টন ও কল্যাণের পথে ব্যয় করার নির্দেশ দেয় এবং রমজানে অধিকতর দান, সাদাকা করতে উদ্বুদ্ধ করে।

কিন্তু ইসলাম ও বিশ্বের ইতিহাসে ২০২০ সাল করোনার প্রাদুর্ভাবের জন্য এক ব্যতিক্রমী রমজান নিয়ে এসেছে। মানুষ ঘরবন্দী এবং সামাজিক যোগাযোগহীন দূরত্বের জীবন কাটাচ্ছে। ফলে এমন অভাবনীয় রমজানে মানুষের পক্ষে ঘরে ঘরে গিয়ে দান দেওয়া বা সংগ্রহ করা, উভয়টিই অসম্ভব। আবার, দীর্ঘদিন ঘরবন্দী থাকায় গরিবদুঃখী ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সাহায্যের প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।

ফলে রমজানে দানের গুরুত্ব সম্পর্কে ইসলামের ইতিহাস ও শিক্ষার আলোকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হওয়া দরকার এবং বিদ্যমান করোনাভাইরাস-সঙ্কুল পরিস্থিতিতে চলমান এই রমজানে দান, সাদাকার আমল জারি রাখার প্রচেষ্টা নেওয়াও প্রতিটি মুসলমান নর-নারীর কর্তব্য।

বিশেষত রমজান মাসে দানশীলতা বৃদ্ধি করার তাগিদ ইসলামে সুস্পষ্ট। অনেকগুলো হাদিসের মাধ্যমে এবং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের দৃষ্টান্তের আলোকে ইসলামে দানশীলতার গুরুত্ব সম্পর্কে জানা যায়। এটাও জানা যায়, দান, কল্যাণ ও পরহিতের উজ্জ্বলতম আদর্শ মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের দান, সাদাকা করার হাজার হাজার উদাহরণ রয়েছে। নিজে না খেয়ে মানুষকে খাদ্য দেওয়া, নিজের জন্য কিছুই না রেখে বিপন্ন মানুষের জন্য বিলিয়ে দেওয়ার অসংখ্য দৃষ্টান্ত ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়।

মাহে রমজানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দানশীলতার চরম শ্রেষ্ঠত্বকে আরব কবিগণ এই মর্মে উল্লেখ করেছেন: ‘তিনি পূবালী হাওয়া আর কল্যাণ বায়ুর চেয়ে দানশীল।’

রহমতের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে তার স্বাভাবিক দানশীলতাকে বহু বহু গুণে বৃদ্ধি করতেন, যা আমল ও অনুসরণ করা নবীর অনুসারী-উম্মত হিসেবে আমাদের কর্তব্য। যে মহান নবী মানুষের বিপদে সব সময় পাশে দাঁড়িয়েছেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে, সেই নবীর উম্মতের মধ্যেও দান ও সাহায্য নিয়ে বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বৈশিষ্ট্য থাকা অত্যাবশ্যক।

সমগ্র বিশ্ব জানে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল মানুষের চেয়ে অধিক দানশীল ছিলেন। নিজের বা পরিবারের জন্যেও বিশেষ কিছু তিনি রাখেননি। প্রায়-সবকিছুই উম্মতের জন্য দান করেছেন। অভাবী, বিপন্ন ও ক্ষুধার্ত মানুষের জন্য ব্যয় করেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সিরাত বা কার্যক্রমের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও মহত্তম গুণ হলো তার দানশীলতা। দানশীলতার দিক থেকে পৃথিবীর কেউ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চেয়ে অগ্রগামী হতে পারবে না। এমনকি, তুলনীয়ও হতে পারবে না। কারণ তিনি তার পুরো জীবন ও সম্পদ মানুষ ও মানবতার কল্যাণে দান করেছেন।

আর মাহে রমজানে যখন হযরত জিবরাইল (আ.) তার সাথে সাক্ষাত করতেন, তখন তিনি আরও বেশি বদান্যতা প্রকাশ করতেন। হযরত জিবরাইল (আ.) মাহে রমজানের প্রত্যেক রাতেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে দেখা করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছ থেকে কোরআনে কারিম তেলাওয়াত শুনতেন। সহিহ মুসলিম শরিফের ২৩০৮ নম্বর হাদিসে বলা হয়েছে, ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত জিবরাইল (আ.)-এর সাথে সাক্ষাতকালে কল্যাণবহ মুক্ত বায়ুর চেয়ে বেশি দানশীল হতেন।’

ইসলাম ও সিরাতের ইতিহাসে বস্তুনিষ্ঠভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দানশীলতার বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে। এমন বহু দৃষ্টান্তও রয়েছে যে, কেউ কোনও কিছু প্রার্থনা করলে তিনি না করতেন না। এমনকি, তার পরিধেয় কাপড়ও যদি কেউ চাইতো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে তা দিয়ে দিতেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দানশীলতার অনেক চমৎকার বিবরণ হাদিসের প্রায় সকল গ্রন্থেই উল্লেখিত হয়েছে। যখন রমজান মাসের আগমন হতো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদারতা ও দানশীলতার মনোভাব দিয়ে রহমত, বরকত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাসকে স্বাগত জানাতেন। আনসার ও মুহাজিরদের সুযোগ-সুবিধার খোঁজ-খবর করতেন। সবাইকে দানশীলতা অবলম্বনের জন্য তাগিদ দিতেন।

শুধু নিজেই নন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার প্রিয় উম্মতকেও রমজান মাসে দানশীলতা অবলম্বন করতে উৎসাহিত করেছেন। রমজানে দানশীলতার যে সুযোগ বৃদ্ধি পায়, ইফতার ও সাহরি দিয়ে মানুষকে আপ্যায়নের মাধ্যমে, তা গ্রহণ করতেও বলেছেন তিনি। রোজাদারকে একটি খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার করানোর পাহাড় পরিমাণ নেকির কথাও জানিয়েছেন তিনি।

রমজানে প্রতিটি ভালো কাজ সত্তর গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এ মাসে যত বেশি দান, সাদাকা করা যাবে, তা বহু গুণে বৃদ্ধি পাবে। এজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র রমজান মাসে নিজে দানশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রিয় উম্মতকেও দান, সাদাকা বৃদ্ধির উপদেশ দিয়েছেন। রমজানে রোজা, তেলাওয়াত, জিকির ইত্যাদি নানা আমলের সঙ্গে সঙ্গে জাকাত, দান, সাদাকা দেওয়ার আমলগুলো করাও সকলের কর্তব্য। এতে আল্লাহ হুকুম পালন করা এবং রমজানের বদৌলতে নেকি বৃদ্ধি পাওয়ার সৌভাগ্য লাভ করা যায়।

বিশেষত, বিদ্যমান করোনা উপদ্রুত পরিস্থিতিতে আগত এই রমজানে নিজের পরিবারের প্রয়োজনের প্রতি নজর রাখা এবং আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও বিপন্ন মানুষের প্রতি খেয়াল রাখা জরুরি। দান ও সাদাকার মাধ্যমে পীড়িত, ক্ষুধার্ত, কর্মহীন, অসহায়দের সাহায্যের জন্য সাধ্যমতো চেষ্টা করাও প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব।

বিশ্ব-মানবতার ধর্ম ইসলামের অনুসারীদের জন্য মানব কল্যাণের পথ ধরে এগিয়ে চলাই সফলতার অন্যতম পূর্বশর্ত, যা দান, সাদাকার মাধ্যমে করা সম্ভব। বিশেষত এই রমজানে আগে থেকেই চলমান করোনায় আক্রান্তদের বা করোনার প্রতিক্রিয়ায় কর্মহীন, বেকার ও বিপদগ্রস্ত মানুষদের দান, সাদাকা, সাহায্যের সুযোগ রয়েছে এবং এই মহাসুযোগকে সাধ্যমতো কাজে লাগানো আমাদের সকলেরই কর্তব্য।