অদৃশ্যের খবর আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না



মুফতি মাহফূযুল হক, অতিথি লেখক, ইসলাম
অদৃশ্যের খবর আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না, ছবি: সংগৃহীত

অদৃশ্যের খবর আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানেন না, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

চলতি রমজানের ৯ম তারাবিতে পাঠ করা হবে কোরআনে কারিমের ১২ নম্বর পারা অর্থাৎ সূরা হুদের ৬ নম্বর আয়াত থেকে সূরা ইউসুফের ৫২ নম্বর আয়াত পর্যন্ত। আল্লাহ ব্যতীত আর কেউই অদৃশ্যের জ্ঞান রাখেন না- এটি আজকের তারাবির অন্যতম একটি বিষয়।

আল্লাহর নবী নূহ (আ.) নিজ সম্প্রদায়কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদের বলি না, আমার নিকট আল্লাহর ধন-ভাণ্ডার আছে, আর না অদৃশ্য সম্বন্ধে আমি অবগত।’ -সূরা হুদ: ৩১

আল্লাহতায়ালা নবী হজরত নূহ (আ.)-এর বৃত্তান্ত বর্ণনা করার পর শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলেছেন, ‘এ সমস্ত অদৃশ্যলোকের সংবাদ আমি তোমাকে অহি দ্বারা অবহিত করছি, যা এর পূর্বে তুমি জানতে না এবং তোমার সম্প্রদায়ও জানত না।’ -সূরা হুদ: ৪৯

আজকের তারাবির উপরোক্ত দু’টি আয়াত দ্বারা বুঝা যাচ্ছে নবীগণ গায়েব জানতেন না। দ্বিতীয় আয়াতেতো মহান আল্লাহ সুস্পষ্ট করে বললেন, ‘আমি জানানোর পূর্বে তুমি জানতে না’। গায়েব তো ওই জ্ঞান যা কোনো মাধ্যম ব্যতীত সরাসরি জানা থাকে। মাধ্যম ব্যতীত কোনো কিছু সরাসরি জানা একমাত্র আল্লাহর পক্ষেই সম্ভব। সৃষ্টির পক্ষে তা সম্ভব নয়। সৃষ্টি জ্ঞান লাভ করে থাকে মাধ্যমে। আমরা সাধারণ মানুষ জ্ঞান লাভ করে থাকি পঞ্চইন্দ্রীয় দ্বারা। আর নবীগণ ষষ্ঠ আরেকটি মাধ্যম দ্বারা জ্ঞান লাভ করে থাকেন যার নাম অহি। গায়েবের সংবাদ যখন অহির মাধ্যমে নবীর নিকট পৌঁছতেছে তখন তাতো নবীর জন্য আর গায়েব থাকে না। কেননা, নবী তো তা সরাসরি জানেননি, মাধ্যমে জেনেছেন।

গায়েবের মালিক একমাত্র আল্লাহ। আর গায়েবের জ্ঞানীও একমাত্র আল্লাহ। এটা ইসলামের বিশ্বাসসমূহের একটি।

এ বিশ্বাসটি কোরআনের আরও বহু আয়াতে উচ্চারিত হয়েছে। যেমন:
‘(হে নবী!) বল, আমি তোমাদের ইহা বলি না যে, আমার নিকট আল্লাহর ধনভাণ্ডার আছে। আর অদৃশ্য সম্বন্ধেও আমি অবগত নই।’ -আনআম: ৫০

‘(হে নবী!) বল, আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত আমার নিজের ভালো-মন্দের ওপর আমার কোনো অধিকার নাই। আমি যদি অদৃশ্যের খবর জানতাম তবে তো আমি প্রভূত কল্যাণই লাভ করতাম এবং কোনো অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না। আমি তো শুধু মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদবাহী।’ -সূরা আরাফ: ১৮৮

নবী যে গায়েব জানেন না, তা এ আয়াতে মহান আল্লাহ একটি সহজ যুক্তি দিয়ে উম্মতকে বুঝাতে বললেন। নবী যদি গায়েবই জানতেন তাহলে তো পার্থিব জীবনে তিনি কখনও কষ্টে পড়তেন না, ক্ষতিগ্রস্ত হতেন না, বিপদগ্রস্ত হতেন না। আমরা নবী জীবনী অধ্যয়নে জানতে পারে, জীবনে অনেক বারই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কষ্ট পেয়েছেন, দুশমনের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তিনি যদি গায়েবই জানতেন তাহলে ইহুদি নারী তাকে বিষ পান করাতে সক্ষম হলো কিভাবে, তিনি যদি গায়েবই জানতেন তাহলে ইহুদিদের জাদুর শিকার হয়ে অনেক দিন পর্যন্ত অসুস্থ থাকলেন কিভাবে, তিনি যদি গায়েবই জানতেন তাহলে খেজুর পরাগায়ন করতে নিষেধ করলেন কেন।

‘(হে নবী!) বল, অদৃশ্যের জ্ঞান তো কেবল আল্লাহরই আছে। -সূরা ইউনুস: ২০

এ বিষয়ে সবচেয়ে সুষ্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা এ আয়াত।

‘ইহা অদৃশ্যলোকের সংবাদ যা তোমাকে আমি অহি দ্বারা অবহিত করছি, ষড়যন্ত্রকালে যখন তারা মতৈক্যে পৌঁছেছিল তখন তুমি তাদের সঙ্গে ছিলে না।’ -সূরা ইউসুফ: ১০২

‘আল্লাহ ব্যতীত আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে কেউই অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান রাখে না।’ -সূরা নামল: ৬৫

‘তখন জিনরা বুঝতে পারল যে, তারা যদি অদৃশ্য বিষয় অবগত থাকত তা হলে তারা লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তিতে আবদ্ধ থাকত না’। -সূরা সাবা: ১৪

সমাজের অনেক মানুষ মনে করে জিনরা গায়েব জানে। তাই দেখা যায়, তারা তান্ত্রিককে আসনে বসিয়ে জিন হাজির করে বিভিন্ন তথ্য জিজ্ঞাসা করে। অথচ এ আয়াতে জিনরা নিজেদের অক্ষমতা, সীমাবদ্ধতা, অজ্ঞতা পরিষ্কার করে বলে দিচ্ছে। আমরা যদি গায়েবই জানতাম তাহলে তো নবী হজরত সোলামাইন (আ.)-এর মৃত্যুর পরেও এতদিন পর্যন্ত না জেনে কষ্ট করতে থাকতাম না।

‘(হে নবী!) বল, আমি জানি না তোমাদের যে শাস্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়ে তা কি আসন্ন, নাকি আমার প্রতিপাল এর জন্য কোনো দীর্ঘ মেয়াদ স্থির করবেন। তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তার অদৃশ্যের জ্ঞান কারও নিকট প্রকাশ করেন না। তার মনোনীত রাসূল ব্যতীত। সে ক্ষেত্রে আল্লাহ রাসূলের অগ্রে এবং পশ্চাতে প্রহরী নিয়োজিত করেন’। -সূরা জিন: ২৫-২৭

মহান আল্লাহ রাসূলকে অহি মারফত গায়েব জানান। কিন্তু অহি আসার পর তো আর তা গায়েব থাকে না। আর আল্লাহ যতটুকু অহি দিয়েছেন নবী গায়েবের শুধু ততটুকুই জানেন। এর চেয়ে বেশি জানেন না।