কারাবন্দী থেকে মন্ত্রী হয়ে ওঠার কাহিনি



মুফতি মাহফূযুল হক, অতিথি লেখক, ইসলাম, বার্তা২৪.কম
কোরআনে কারিমে হজরত ইউসুফ আ.-এর কাহিনি সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে, ছবি: সংগৃহীত

কোরআনে কারিমে হজরত ইউসুফ আ.-এর কাহিনি সবিস্তারে বর্ণিত হয়েছে, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

চলতি রমজানের ১০ম তারাবিতে পাঠ করা হবে কোরআনে কারিমের ১৩ নম্বর পারা অর্থাৎ সূরা ইউসুফের ৫৩ নম্বর আয়াত থেকে সূরা ইবরাহিমের শেষ পর্যন্ত। আজকের তারাবির অন্যতম বিষয় আল্লাহর নবী ইউসুফ আলাইহিস সালামের ধারাবাহিক ঘটনা। এতে বিশেষভাবে থাকছে ইউসুফ-জুলায়খার কাহিনী, আরও থাকছে পারিবারিক চক্রান্ত কিভাবে একটি সুখের সংসারে অশান্তির আগুন জ্বাললো, পথের শিশু কিভাবে মন্ত্রী হলো, একজন বন্দী কিভাবে মন্ত্রী হলো, পিতা সুদীর্ঘকাল পর কিভাবে তার হারানো ছেলে ফিরে পেল, কাঁদতে কাঁদতে হারিয়ে ফেলা দৃষ্টিশক্তি কিভাবে বৃদ্ধটি ফিরে পেল, সমৃদ্ধশালী একটি দেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগে মহাদুর্ভিক্ষ কবলিত হলে কিভাবে একজন সফল কৃষিমন্ত্রী দেশের জনগণকে রক্ষা করলো, একজন কৃতদাস কিবাবে ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন থেকে রাজার সুনজর কাড়ল, একজন মন্ত্রী তার শিশুকালের জানের দুশমনদের অসহায় অবস্থায় পেয়ে কী করল, ধনীর সুন্দরী বধূর প্রেমের আহ্বান থেকে একজন যুবক কিভাবে নিজের কৌমার্য ধরে রাখল ইত্যাদি লোমহর্ষক, স্নায়ূ উত্তেজনা সৃষ্টিকারী সব প্রসঙ্গ।

কোরআনে কারিম কোনো ঘটনা কিংবা গল্পের বই নয়। এমনকি কোনো জীবনী বা উপন্যাস গ্রন্থও নয়। একটি জীবন্ত উপদেশ আর বিধানের বই। তবে এতে অনেক ঘটনা, কাহিনী আসে যা শুধু উপদেশের স্বাক্ষী হিসেবে আসে। তাই কোনো ঘটনা এ বইয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে থাকে না, পরম্পরাগতভাবেও থাকে না। আবার একই ঘটনা বহুস্থানেও থাকে। সবই উপদেশের স্বার্থে। উপদেশের জন্য যেখানে যে ঘটনার যতটুকু দরকার শুধু ততটুকুই থাকে। আবার বিভিন্ন উপদেশ প্রমাণ করার জন্য একই ঘটনাকেও বারংবার আনা হয়। একমাত্র ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনা ব্যতিক্রম। মোটামুটিভাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এসেছে আবার ঘটনার পরম্পরাগত ধারাও অনেকটা ঠিক রাখা হয়েছে।

‘প্রেম কইরাছেন ইউসুফ নবী’-এ বিখ্যাত গানের কলি আমাদের গ্রাম বাংলায় সুপ্রাচীনকাল থেকে সবার মুখে মুখে। অথচ এ বচন সম্পূর্ণ মিথ্যা। আর এ মিথ্যা বচনকে ভিত্তি করে যুব সমাজ বলে থাকে- ‘পবিত্র প্রেম, স্বর্গীয় প্রেম।’ প্রেম বলতে মানুষের সচরাচর ব্যবহারে বিবাহপূর্ব বা বিবাহ বহির্ভূত ছেলে-মেয়ের ভালোবাসার সম্পর্ককেই বুঝানো হয়ে থাকে। সাধারণত: স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসার সম্পর্ককে প্রেম শব্দে ব্যক্ত করতে খুব একটা দেখা যায় না।

বিবাহ বহির্ভূত অথবা বিবাহপূর্ব ছেলে-মেয়ের ভালোবাসার সম্পর্ককে ইসলাম হারাম ঘোষণা করেছে। কোনো নবীই এমনকি ইউসুফ (আ.)ও নবুওয়ত প্রাপ্তির আগে বা পরে এহেন জঘন্য নিকৃষ্ট নোংর- নির্লজ্জ কাজে এক মুহূর্তের জন্য লিপ্ত হননি। প্রত্যেক নবী নবুওয়ত লাভের আগে ও পরে নৈতিক চরিত্রে শতভাগ পবিত্র, পরিচ্ছন্ন, স্বচ্ছ, নির্মল ছিলেন। প্রেম করা হারাম। আর হারাম কাজ মাত্রই নাপাক অপবিত্র। তাই পবিত্র প্রেম বলতে বাস্তবে কিছু নেই। সবই নাপাক, অপবিত্র। আবার আল্লাহ যদি মাফ না করেন তবে প্রতিটি হারাম কাজের পরিণতি জাহান্নাম। তাই প্রেম কখনও স্বর্গীয় হতে পারে না। বিবাহ বহির্ভূত প্রেম মাত্রই অপরাধ।

ইউসুফ-জুলায়খার সম্পর্ক ছিল সম্পূর্ণ একতরফা। মন্ত্রী বধূ জুলায়খা ছিল তরুণ কৃতদাস ইউসুফ (আ.)-এর প্রেমে উন্মাদ। ইউসুফ (আ.) কে ফুসলানোর জন্য সম্ভাব্য করণীয় সবকিছুই জুলায়খা করেছিল। নিজের বাসনা ইউসুফ (আ.) কে দিয়ে নিবারণ করার জন্য যতভাবে ফাঁদ পাতা যায় তার সবই করেছিল জুলায়খা। জুলায়খা এতে এতটাই অস্থির হয়ে পড়েছিল যে, সামাজিক মান-সম্মান তাকে আটকাতে পারেনি, বান্ধবীদের তিরস্কার তাকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। কিন্তু জুলায়খার থেকে উষ্ণতা ছিল যে পরিমাণ ইউসুফ থেকে শীতলতা ছিল সে পরিমাণ। জুলায়খার আকাশে ঝড়ের গতি ও তাণ্ডব যত তীব্র ছিলো ইউসুফের আকাশ ছিল ততই শান্ত, স্থির। মালিকের বধূ হয়ে, মন্ত্রীর বধূ হয়ে, অঢেল ধন-সম্পদের মালিক, রাজক্ষমতার ছড়ি হাতে নিয়ে, চোখ ঝলসানো রুপ নিয়ে, তারুণ্যের দেহ নিয়ে জুলায়খা ব্যর্থ হয়েছে। একটিবারের জন্যও নিজেরই তরুণ দাসকে ‘হ্যাঁ’ বলাতে পারেনি।

কোরআনে কারিমে বর্ণিত হয়েছে, ‘রাজা নারীগণকে বলল, যখন তোমরা ইউসুফ থেকে অসৎকম কামনা করেছিলে তখন কী হয়েছিল? তারা বলল, আল্লাহর মাহাত্ম্য অদ্ভুত! আমরা ইউসুফের মধ্যে কোনো দোষ দেখিনি। আজিজের স্ত্রী জুলায়খা বলল, এখন সত্য প্রকাশ পেয়েই গেছে। আমিই তার থেকে অসৎকর্ম কামনা করেছিলাম। সে তো সত্যবাদী।’ -সূরা ইউসুফ: ৫১

রাজ দরবারে প্রমাণিত হলো ইউসুফ পবিত্র। সে পরনারীর আমন্ত্রণে নিজের কৌমার্য বিসর্জন দেয়নি।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদিসে ইরশাদ করেছেন, সাত শ্রেণির ব্যক্তি হাশরের মাঠে আল্লাহর আরশের নিচে স্থান পাবে। তাদের মধ্যে একশ্রেণি হলো- যাকে কোনো সম্ভ্রান্ত সুন্দরী নারী মন্দ কর্মে আমন্ত্রণ জানায় আর সে আল্লাহর ভয়ে তাকে ‘না’ বলে।

যুবক কালের চরিত্র শেখার জন্য জুলায়খার ঘরের ইউসুফকে অনুসরণ করতে হবে। বিপদে দুর্দিনে-দুর্যোগে সবকিছু হারা হলে মনের ধৈর্য ও বল ফিরে পেতে গভীর রাতের অন্ধকার কূপের ইউসুফকে অনুসরণ করতে হবে। ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মিথ্যা মামলায় কারাগারে বন্দী থাকলে বন্দী ইউসুফকে বুঝতে হবে। দেশের শাসন ক্ষমতা পেলে মন্ত্রী ইউসুফকে পাঠ করতে হবে। মানব জীবনের বাঁকে বাঁকে ইউসুফ (আ.) আদর্শ হয়ে থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত।