নিজেকে গড়ে তোলার ব্যতিক্রমধর্মী অনুশীলন ইতিকাফ

মুহাম্মদ ইমদাদুল হক ফয়েজী, অতিথি লেখক, ইসলাম
নিজেকে গড়ে তোলার ব্যতিক্রমধর্মী অনুশীলন ইতিকাফ, ছবি: সংগৃহীত

নিজেকে গড়ে তোলার ব্যতিক্রমধর্মী অনুশীলন ইতিকাফ, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

পুণ্যময় রমজানের প্রতিটি ক্ষণ-মুহূর্ত আল্লাহতায়ালার কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও মূল্যবান। তাই মুমিন জীবনে এ মাসটি খুবই তাৎপর্যময় ও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত এ মাসের শেষ দশক অধিক ফজিলতময়।

হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপরাপর মাসের তুলনায় রমজানে ইবাদত-বন্দেগি অধিক পরিমাণে করতেন। আর রমজানের শেষ দশকে তা আরও বাড়িয়ে দিতেন। এ দশকের অন্যতম আমল হচ্ছে ইতিকাফ। এটি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)- এর এমন একটি আমল, যা হিজরতের পর তিনি কখনও ছাড়েননি।

হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজান মাসের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। এক বছর তিনি ইতিকাফ করতে না পেরে পরবর্তী বছর ২০ দিন ইতিকাফ করেছেন।’ -আবু দাউদ

অন্য বর্ণনায় এসেছে এটি ছিল তার ইন্তেকালের বছর।

উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত প্রতি রমজানের শেষ দশক ইতিকাফ করেছেন এবং তার ইন্তেকালের পর তার স্ত্রীগণ ইতিকাফ করেছেন। -সহিহ বোখারি ও মুসলিম

ইতিকাফের পরিচয়
আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে রমজানের শেষ দশক মসজিদে বিশেষ নিয়মে অবস্থান করাই হচ্ছে- ইতিকাফ। অভিধানে ইতিকাফ অর্থ অবস্থান করা, আবদ্ধ করা, আটকে রাখা। বান্দা যেহেতু নিজেকে যাবতীয় পার্থিব বিষয়াবলী থেকে মুক্ত করে শুধুমাত্র মহান প্রভুর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি হাসিলের লক্ষ্যে নিজেকে মসজিদে আবদ্ধ রাখেন, তাই এটিকে ইতিকাফ বলা হয়।

ইতিকাফের প্রকারভেদ
ইতিকাফ তিন প্রকার। ওয়াজিব, সুন্নতে মোয়াক্কাদায়ে কেফায়া ও মোস্তাহাব। বিশেষ উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বা এমনিতেই রমজানের শেষ দশক ইতিকাফের মান্নত করলে তা ওয়াজিব ইতিকাফ। মান্নতকারীর জন্য এটি আদায় করা ওয়াজিব। এ ছাড়া রমাজানের শেষ দশকে ইতিকাফ শুরু করার পর কোনো কারণে তা পূর্ণ করা সম্ভব না হলে বা ইতিকাফ ভেঙে গেলে পুনরায় তা আদায় করা ওয়াজিব।

প্রতি জামে মসজিদে রমাজানের শেষ দশক ইতিকাফ করা সুন্নতে মোয়াক্কাদা কেফায়া। এ দুই প্রকার ইতিকাফের জন্য রোজা শর্ত। ওয়াজিব ও সুন্নত ইতিকাফ ছাড়া যেকোনো সময় মসজিদে ইতিকাফের নিয়তে অবস্থান করা হচ্ছে মোস্তাহাব। যেমন, যেকোনো সময় মসজিদে প্রবেশকালে অন্তরে এ ইচ্ছা রাখা- আমি ইতিকাফের নিয়তসহ মসজিদে প্রবেশ করছি। এটি সহজে অতিরিক্ত পুণ্য লাভের একটি সুন্দর পন্থাও। মসজিদে প্রবেশকালে এভাবে প্রবেশ করা উত্তমও বটে।

ইতিকাফের সময়কাল
ওয়াজিব ও সুন্নতে মোয়াক্কাদা কেফায়া ইতিকাফের সময়সীমা হচ্ছে- ২০ রমজানের সূর্যাস্তের পূর্ব থেকে ঈদুল ফিতরের চাঁদ উদিত হওয়া পর্যন্ত। তাই এ দুই প্রকার ইতেকাফকারী ২০ রমজান সূর্যাস্তের পূর্বে মসজিদে প্রবেশ করবেন।

ইতিকাফের জন্য উত্তম স্থান
ইতিকাফের সর্বোত্তম স্থান বায়তুল্লাহ বা মসজিদে হারাম, মর্যাদার অবস্থানে দ্বিতীয় হচ্ছে- মসজিদে নববী (সা.) এবং তৃতীয় বায়তুল মোকাদ্দাস। অতঃপর জামে মসজিদসমূহ, সবশেষে ওইসব মসজিদ যেগুলোতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয় অর্থাৎ পাঞ্জেগানা মসজিদ।

মহিলাদের ইতিকাফ
মহিলারা নিজ নিজ ঘরের নির্জন স্থানে বা একটি কক্ষে ইতিকাফ করবেন। ইবাদত, পানাহারসহ সব কাজে ওই স্থানেই নিজেকে সবসময় আবদ্ধ রাখবেন। অনর্থক ও পার্থিব কথাবার্তা, কাজকর্ম থেকে বিরত থাকবেন। প্রাকৃতিক প্রয়োজন ও অজুর প্রয়োজন ছাড়া নির্দিষ্ট স্থান হতে বের হবেন না।

ইতিকাফকারীর জন্য জরুরি কিছু মাসয়ালা
ইতিকাফকারী ব্যক্তিকে এ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, আমি পৃথিবীর সর্বোচ্চ সম্মানিত ও সর্বোত্তম স্থান মসজিদে, বছরের শ্রেষ্ঠ সময়ে অবস্থান তথা ইতিকাফ করছি। মূল্যবান সময় ও স্থানে ইবাদতের জন্য সওয়াব যেমন কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়, এর বিপরীত ক্ষেত্রেও তাই। অর্থাৎ অধিক মূল্যবান সময় ও স্থানে পাপাচারে লিপ্ত হলে গোনাহও বেশি হয়। সুতরাং ইতিকাফকারী সবসময় নিজেকে বিভিন্ন নফল আমল, ইবাদত, ধর্মীয় বইপত্র পাঠ ও জ্ঞানার্জনে নিজেকে ব্যস্ত রাখবেন। গোনাহের কাজ, অনর্থক কথাবার্তা, গল্পগুজব থেকে অবশ্যই বেঁচে থাকবেন। মসজিদের আদব পরিপন্থী যাবতীয় কাজ থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি ইতিকাফ বিশুদ্ধ হওয়ার আবশ্যকীয় মাসয়ালাসমূহ অনুসরণ করবেন।

ইতিকাফকারী অনুমতি ছাড়া কারও কোনো কিছুতে হাত দেবেন না, ব্যবহার করবেন না। মসজিদ বা মুসল্লির ক্ষতি হয় এরূপ কাজকর্ম থেকে সর্বদা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবেন। ইতিকাফ সঠিক ও পুণ্যময় হওয়ার জন্য ইতিকাফকারীকে বিষয়গুলোর প্রতি অবশ্যই যত্নবান হতে হবে।

যেসব প্রয়োজনে মসজিদের বাইরে যাওয়ার অনুমতি রয়েছে
ইতিকাফকারী প্রাকৃতিক প্রয়োজন, অজু ও ফরজ গোসল, পাঞ্জেগানা মসজিদে ইতিকাফ করলে জুমার নামাজের জন্য জামে মসজিদে যাতায়াত এবং মসজিদে খাবার এনে দেওয়ার মতো কেউ না থাকলে পানাহারের জন্য গৃহে যাতায়াতের জন্য (অবশ্য তা একদম প্রয়োজন অনুযায়ী ও চুপচাপ হতে হবে) মসজিদের বাইরে যাওয়ার অনুমতি রয়েছে। এগুলো ব্যতীত ব্যক্তিগত, ধর্মীয় বা জনসেবামূলক কোনো কাজের জন্য বাইরে বের হওয়ার অনুমতি নেই।

যেসব কাজে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যায়
ইতিকাফকারী ব্যক্তির রোজা ভেঙে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলে বা রোজা রাখার সক্ষমতা না থাকলে অথবা রোজা অবস্থায় নিষিদ্ধ কোনো কাজ যেমন- পানাহার, স্ত্রী সহবাস ইত্যাদি ইতিকাফকারীর পক্ষ থেকে সংঘটিত হলে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। যেসব কাজের জন্য মসজিদের বাইরে যাওয়ার অনুমতি রয়েছে, এগুলো ব্যতীত অন্যকোনো কারণে মসজিদ থেকে বের হলে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে অনুমোদিত বিষয়গুলোর কোনো একটির জন্য বের হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত মূহূর্তকাল সময়ও বাইরে থাকা বৈধ নয়। এমনকি কেউ ইতিকাফের কথা ভুলে গিয়ে বাইরে অল্প সময় অতিবাহিত করলেও ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে। তাই অভ্যাসগত সাধারণ গোসল, কাপড় কাঁচা, হাত-মুখ বা অন্য কিছু ধোয়া-মুছা, পরিষ্কার করা, ধুমপান, গল্পগুজব প্রভৃতির জন্য বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যথায় ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যাবে।

ইতিকাফের ফজিলত ও মাহাত্ম্য
হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একদিন ইতিকাফ করল, আল্লাহ পাক তার ও দোজখের মধ্যখানে এমন তিনটি পরিখা তৈরি করে দেবেন, যার একটি থেকে অপরটির দূরত্ব হবে পূর্ব ও পশ্চিমের দূরত্ব থেকেও বেশি। -সুনানে তিরমিজি ও বায়হাকি

হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘রমজানের শেষ দশক ইতিকাফের সওয়াব হচ্ছে- দু’টি হজ ও উমরার সমপরিমাণ।’ -বায়হাকি

ইতিকাফকারী বান্দা শুধুমাত্র আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি ও পুণ্যলাভের উদ্দেশ্য পার্থিব সকল প্রয়োজন পেছনে ফেলে দশটি দিন স্বীয় প্রভুর ঘর মসজিদে তারই বন্দেগিতে নিবিষ্ট থাকে। কেবল দরবারে এলাহিতে আরাধনা, প্রার্থনা করে। তাসবিহ-তাহলিল, কোরআন তেলাওয়াত, জিকির-আজকার, নামাজ তথা ইবাদাত-বন্দেগিতে নিজেকে সবসময় ব্যস্ত রাখে। প্রাণভরে সেজদা করে, নীরবে-নিভৃতে অশ্রু ঝরায়, কাকুতি-মিনতি করে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল চাওয়া-পাওয়া মহান মনিবের হাতে সোপর্দ করে। পেছনের জীবনের পাপের জন্য ব্যথিত হৃদয়ে অনুতপ্ত হয়। লজ্জিত হয়ে প্রতিশ্রুতি দেয়, ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি না করারভ প্রকৃত প্রেমাস্পদের ভালোবাসা পেতে উদগ্রীব হয়ে ওঠে।

এক কথায়, নিজেকে আপাদমস্তক সপে দেয় রাব্বে কারিমের হাতে। বুঝাতে চায়, প্রভু! আমি তোমার অনুগত বান্দা। আমি তোমাকে পেতে, তোমার ভালোবাসা পেতে, তোমার সন্তুষ্টি পেতে তোমার ঘরে ছুটে এসেছি, তোমার দুয়ারে পড়ে রয়েছি। আমাকে বঞ্চিত করো না; কবুল করে নাও, তোমার প্রিয় করে নাও।

দুনিয়ার কোনো কৃপণ প্রকৃতির লোকের কাছ থেকে কেউ দুয়েক বার বিফল হয়ে ফিরে এসে যখন আবার যায়, মিনতি করতে থাকে, শেষ পর্যন্ত কিছুটাও হলেও সফল হয়। অফুরন্ত দয়ার সাগর, অকল্পনীয় ভালোবাসার মহান অধিপতির পক্ষে কী করে সম্ভব, তার বান্দাকে রিক্তহস্তে ফিরিয়ে দেওয়া, তার প্রেমসাগর আর ভালোবাসার মোহনায় অবগাহন না করিয়ে তাড়িয়ে দেওয়া?

ইতিকাফকারী ব্যক্তি যেহেতু পার্থিব সকল বিষয় থেকে বিমুখ হয়ে মসজিদে, মহান প্রভুর দরবারে অবস্থান করে, ফলে তার প্রতিটি মূহূর্ত ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। পাশাপাশি যে কোনো ইবাদত-বন্দেগি তার জন্য অত্যন্ত সহজ হয়ে যায়। বিশেষত লাইলাতুল কদর লাভ করার সৌভাগ্য অনায়াসে অর্জন করা যায়।

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন, ‘ইতিকাফের মাহাত্ম্য হলো, আল্লাহর সঙ্গে রুহ ও অন্তরের সম্পর্ক স্থাপন করা। ইতিকাফকারীর দৃষ্টান্ত ওই ব্যক্তির মতো, যে কারো দরবারে হাজির হয়ে এ কথা বলে যে, আমার দরখাস্ত কবুল না করা পর্যন্ত আমি ফিরবো না।’

ইতিকাফ মহান প্রভুর ভালোবাসা এবং সান্নিধ্য লাভের সোপান। নিজেকে পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে পবিত্র জীবন গঠনের অবারিত সুযোগ রয়েছে ইতিকাফে। যাবতীয় পাপকাজ থেকে মুক্ত থেকে একনিষ্ঠভাবে খোদাভীরু-মুত্তাকি হিসেবে যে কেউ নিজেকে গড়ে তুলার ব্যতিক্রমধর্মী অনুশীলন হচ্ছে ইতিকাফ।