অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অপব্যবহার ভয়াবহ পরিণতির কারণ

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অপব্যবহার দুনিয়া ও আখেরাতে ভয়াবহ পরিণতির কারণ, ছবি: সংগৃহীত

অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অপব্যবহার দুনিয়া ও আখেরাতে ভয়াবহ পরিণতির কারণ, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বাহ্যিকভাবে একটি নির্দিষ্ট সময় পানাহার ও কাম রিপুকে দমন করা হয় রোজায়, যা শরীরকে যেমন নিয়ন্ত্রণ করে, তেমনি শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, যেমন শ্রবণ, দৃষ্টি, মন, মেজাজ, চিন্তাকেও নিয়ন্ত্রণ করে। সার্বিকভাবে রোজা একজন মানুষকে সামগ্রিকভাবে সংযত ও সুশৃঙ্খল করে। ফলে পরিপূর্ণ রোজার জন্য একজন মানুষের শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এবং মন-মানসিকতা পূর্ণভাবে আল্লাহর আদেশের অনুসারী সুনিয়ন্ত্রিত হওয়া দরকার।

কারণ, প্রতিটি মানুষ তার কাজ ও দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে এবং এই জিজ্ঞাসাবাদ মানুষের সামগ্রিক কাজ ও দায়িত্ব সম্পর্কে যেমন, তেমনি তার প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘কান, চোখ ও অন্তর, এ সব কয়টির ব্যবহার সম্পর্কে জিজ্ঞাস করা হবে।’ -সূরা বনি ইসরাইল: ৩৬

ফলে মানুষের অমূল্য নিয়ামত, এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সঠিক ও যথাযথভাবে ব্যবহার করার প্রয়োজন আছে। ভুল কাজে বা ভুলভাবে এসব মূল্যবান অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অপব্যবহার শুধু দুনিয়াতেই নয়, আখেরাতেও মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনবে ও কঠিন জবাবদিহির সম্মুখীন করবে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালা আরও ইরশাদ করেছেন, ‘বস্তুত বহু সংখ্যক মানুষ ও জিন আমি জাহান্নামের জন্যই সৃষ্টি করেছি। তাদের কাছে যদিও অন্তর আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা চিন্তা করে না। তাদের কাছে চোখ থাকলেও তারা তা দিয়ে দেখে না। আবার তাদের কাছে কান আছে, কিন্তু তাদের কান দিয়ে শোনে না। এরা জন্তু-জানোয়ারের মতো, বরং কোনও কোনও ক্ষেত্রে এরা তাদের চেয়েও বেশি পথভ্রষ্ট; এসব লোকেরাই মারাত্মক উদাসীন।’ –সূরা আরাফ: ১১৮৯

উদাসীনতা হলো সঠিক চিন্তা এবং নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সঠিক ব্যবহার না করা বা সঠিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বেখেয়াল থাকা। আর এসবের ভুল ব্যবহার পথভ্রষ্টতার কারণ। কেননা, মানুষের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুনির্দিষ্ট কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে মানুষের জীবন সুন্দর ও সার্থক হয়। এসবের সঠিক ব্যবহার না করে ভূল-ব্যবহার করা হলে উদাসীনতা ও পথভ্রষ্টতার মাধ্যমে মানুষের সুন্দর ও সার্থক জীবন অসুন্দর ও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।

মানুষের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধরে ধরে এই আলোচনা করা যায়, যাতে চোখ, কান, কণ্ঠ, হাত, পা, মন-মস্তিস্ক তথা সকল কিছুই অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ কান বা শ্রবণ শক্তির কথা বলা যায়। বস্তুতপক্ষে মানুষের কান বা শ্রবণ শক্তি হলো মানুষের একটি বিরাট নিয়ামত, যা শোনার জন্য ব্যবহৃত হয়। একজন মানুষ ইচ্ছা করলে এই কান বা শ্রবণ শক্তিকে ভালো কাজে যেমন ব্যবহার করতে পারেন, তেমনি মন্দ কাজে ব্যবহার করেও নিজের বিরাট ক্ষতি করতে পারেন।

আমরা সবাই জানি, ভালো কথা, ভালো সুর, ভালো ধ্বনি শোনার জন্য কানের ব্যবহার শরীরে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। নেককার, ভালো মানুষ কান দিয়ে তা-ই করেন। বিজ্ঞানও বলছে যে, ভালো ও পরিমিত শব্দ না শুনলে শ্রবণ শক্তি নষ্ট হয়ে যায়। আবার বিজ্ঞান এই হুঁশিয়ারিও দিয়েছে যে, শব্দ দুষণ, মন্দ শব্দ, কটূ বাক্য ও হৈচৈ মানুষের কানকে খাটো করে এবং মনে চাপ সৃষ্টি করে হৃৎ ও মানসিক পীড়ার জন্ম দেয়, চিন্তাকে বিশৃঙ্খল করে।

অতএব কান বা শ্রবণ শক্তিকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এবং পরিমিত ও ভালো কিছু শোনার কাজে ব্যবহার করা অত্যাবশক। যার মাধ্যমে কানের কার্যক্ষমতা যেমন ঠিক থাকবে, তেমনি শরীরও অহেতুক শব্দের কবলে নিপতিত হয়ে দুষিত না হয়ে সুস্থ, সবল ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকবে।

আর যারা ভালো কথা ও সদুপদেশ না শোনে নিজের কান বা শ্রবণেন্দ্রিয়কে ভুল পথে পরিচালিত করে, তাদেরকে পশুর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। যে কান সৎ ও সঠিক কথা শুনতে অপারগ, সে কান ও কানের মালিক সত্য ও ন্যায়ের চেয়ে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে কারণে পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, ‘হে নবী! আপনি কি মনে করেন, তাদের অধিকাংশ লোক আপনার কথা শোনে কিংবা এর মর্ম বোঝে; আসলে এরা হচ্ছে পশুর মতো; বরং তারা আরও বেশি বিভ্রান্ত।’ –সূরা ফোরকান: ৪৪

অতএব যে কান বা শ্রবণ শক্তিকে সঠিক, সত্য, হেদায়েতের কথা শোনার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, রমজান মাসে রোজার আওতায় সে কানকে আরও সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। কোনও মিথ্যা, অশ্লীলতা, ভুল ও বিভ্রান্তিকর বিষয় দিয়ে কানকে মোটেও কলুষিত করা যাবে না। শ্রবণকে কলুষিত করার মাধ্যমে শরীর ও মনকে দুষিত করার বিপদ থেকে বাঁচতে হবে এবং এজন্য সর্বাগ্রে কান বা শ্রবণকে সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে।

সে কারণেই, কানের রোজা হলো, হারাম, মিথ্যা, ভুল, বিভ্রান্তিকর কথা থেকে হেফাজত থাকা। উদ্দেশ্যমূলক, অপবাদমূলক, হিংসা ও বিদ্বেষমূলক কথা ও প্রচারণা থেকেও সযত্নে দূরে সরে থাকা। মূল কথায়, দ্বীন ও সত্যের বাইরে শ্রবণকে নিয়ে না যাওয়া, যা রোজার পরও বজায় রাখা জরুরি, যা কান বা শ্রবণের স্বাভাবিক ও নিয়মতান্ত্রিক কাজ।

এজন্য, কান ও শ্রবণ শক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্ব মানবতার সামনে 'সত্যের স্বাক্ষ্য দানকারীরূপে মর্যাদাবান' মুসলিমদের হতে হবে সত্যের শ্রবণকারী বা সঠিক শ্রোতা। যে দিক-নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কোরআনে কারিমে, ‘রাসূলের ওপর যা নাজিল হয়েছে তা যখন এরা শোনে, তখন সত্য চেনার কারণে আপনি এদের অনেকেরই চোখকে দেখতে পাবেন অশ্রুসজল।’ –সূরা মায়েদা: ৮৪

এ কারণেই ইসলামিক স্কলারগণ কান বা শ্রবণ শক্তিকে কেবলমাত্র সত্য ও সঠিক কথা শোনায় নিয়োজিত করতে তাগিদ দিয়েছেন এবং নিরর্থক কথা শোনা থেকে সরে আসতে বলেছেন। কারণ, কান বা শ্রবণ ক্ষমতা হলো জ্ঞান ও ভালো ভালো কথা, উপদেশ, নির্দেশ ও প্রজ্ঞার জানালাস্বরূপ। ফলে কানের মাধ্যমে সেই আলোচনা ও জিকিরই হৃদয়ে সংরক্ষিত করে নেওয়া উচিত, যা হলো ‘আফজালুল জিকির’ বা সর্বোত্তম জিকির, আলোচনা ও কথা। আর স্বতঃসিদ্ধভাবে ‘আফজালুল জিকির’ হলো ‘জিকরুল্লাহ’ (আল্লাহর জিকির বা আলোচনা) এবং ‘কালামুল্লাহ’ (আল্লাহর কালাম বা কথা তথা আল কোরআন)।

আল্লাহ ও আল্লাহর কথা, উপদেশ, আদেশ, নিষেধ আলোচনার মাধ্যমে কানকে যেমন সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তেমনি মনকে আলোকিত করা যায়। আবার বাজে, বেফুজুল, বেহুদা, বেশরম, মিথ্যা ও অসার কথা-বার্তার মাধ্যমে কান বা শ্রবণ শক্তির অপব্যবহার হয় এবং মন ও হৃদয় এই অপব্যবহারের দ্বারা কালিমালিপ্ত ও কলুষিত হয়।

ফলে তাকওয়া ও পরহেজগারি লাভের উদ্দেশ্যে রোজা রাখবো আর কানকে ভুল ব্যবহার করে হৃদয়-মন কলুষিত, অপবিত্র ও অন্ধকারাচ্ছন্ন করবো, তা কোনও কাজের কাজ হতে পারে না। বরং এতে রোজার যে মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, সেটাই নস্যাৎ হয়ে যেতে পারে। অতএব পরিপূর্ণভাবে রোজার হক আদায় করার জন্য শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যক্ষ, বিশেষত কান বা শ্রবণ শক্তিকেও সংযমের মাধ্যমে রোজায় শরিক করা অত্যাবশ্যক। এবং রোজার পরেও কান বা শ্রবণকে ভালো কথা শোনার জন্য ও খারাপ কিছু না-শোনার জন্য সুনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যবহার করাই নেককার, সফল, বুদ্ধিমানের কাজ।

কানের মতোই চোখ, অন্তর তথা শরীরের সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ক্ষেত্রেও আমাদের উচিত সঠিক, ভালো, বৈধ ব্যবহার নিশ্চিত করে সফল হওয়া এবং ভুল বা অন্যায় বা অবৈধ ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে ব্যর্থতা, অসফলতা, আজাব থেকে রক্ষা পাওয়া। রোজার কৃচ্ছ্রতার মাধ্যমে নিজের ও নিজের অঙ্গ-প্রত্যক্ষের ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ, নিয়ন্ত্রণ, সংযমের প্রশিক্ষণ নিয়ে সারা জীবন সেগুলোকে পবিত্র কোরআন-সুন্নাহ নির্দেশিত সঠিক, ভালো, কল্যাণের পথে পরিচালনা করাই দুনিয়া ও আখেরাতের চিরস্থায়ী সাফল্যের পূর্বশর্ত।