ঈদের রাত, দোয়া কবুলের রাত



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ঈদের রাত, দোয়া কবুলের রাত, ছবি: সংগৃহীত

ঈদের রাত, দোয়া কবুলের রাত, ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রত্যেক জাতিরই একটি দিন নির্ধারিত থাকে, যে দিনটি তারা ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালন করে। সে দিনটিতে সর্বোচ্চ আনন্দ প্রকাশ করে। উত্তম পোশাক পরিধান করে, ভালো খাদ্য গ্রহণ করে নিজেদের সন্তুটি প্রকাশ করে। মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত আনন্দের দিন দু’টি। এক. ঈদুল ফিতর, আরেকটি ঈদুল আজহা।

বাংলাদেশে সোমবার ঈদুল ফিতর উদযাপিত হবে। এবার বিশ্বের মুসলমানদের ভিন্ন পরিস্থিতিতে, ভিন্ন আবহে ঈদ উদযাপন করতে হচ্ছে। এবার খোলা ময়দানে কিংবা ঈদগাহে ঈদের নামাজ আদায় করা যাবে না। নিষেধ করা হয়েছে কোলাকুলি করা থেকেও। ঈদুল ফিতর উদযাপন শুরু হয় হিজরি দ্বিতীয় সাল থেকে। এর পর থেকে কোনো কোনো দেশে মহামারি কিংবা যুদ্ধাবস্থার কারণে সীমিত আকারে ঈদ উদযাপন করা হলেও এবারই বোধহয় প্রথম তাবৎ বিশ্ববাসী রূদ্ধশ্বাস পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ঈদ পালন করত যাচ্ছেন।

ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে খুশি। ঈদ মানে আমোদ, আহলাদ, উৎসব, বিনোদন। আর মনের শত অভিব্যক্তি আশা-আকাঙ্খার আত্মপ্রকাশ। এক কথায় ঈদ মানে এক বৈচিত্র্যময় উৎসব আর বিনোদন। যার আত্মপ্রকাশ শুধু তাতেই পরিলক্ষিত হয়। যা কল্পনার ঊর্ধ্বে, ধারণাতীত। এবার এসবের কিছুই নেই, আর জীবনও থেমে থাকে না। এরই মধ্যে ঈদের দিন মসজিদে যেয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে একই কাতারে দাঁড়িয়ে প্রভুর করুণা কামনায় সেজদায় লুটাবে মুসলমানরা। আল্লাহর রহমত কামনা করবে সমস্বরে। মূলত ঈদ শুধু আনন্দ উৎসব নয়, এটা আল্লাহতায়ার জন্য নিবেদিত এক ইবাদতও বটে।

নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর করোনাকে সঙ্গে নিয়ে রমজান পালন করেছি শুধু আল্লাহর হুকুম রক্ষার জন্য। রমজানের প্রতিনিয়ত আল্লাহর রহমত প্রত্যাশা করেছি। আসন্ন ঈদে ও ঈদের রাতেও আমরা আল্লাহর রহমত প্রত্যাশা করি। আমাদের চাওয়া ঈদের আনন্দ দাওগো প্রভু করোনা মুক্তি দিয়ে।

আমরা জানি, ঈদের রাত দোয়া কবুলের রাত। এ রাতেও আমরা প্রাণভরে আল্লাহর রহমত প্রত্যাশা করবো। রমজান মাস শেষে ঈদের আগের রাতে দয়াময়ের পক্ষ থেকে রোজাদারের জন্য পুরস্কার হিসেবে রয়েছে বেশুমার ফজিলত। হজরত মুয়াজ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি পাঁচটি রাত জেগে থাকবে, তার ওপর জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। রাতগুলো হলো- ১৫ শাবানের রাত, ঈদুল ফিতরের রাত, ৮ জিলহজ রাত, ৯ জিলহজের রাত ও ঈদুল আজহার রাত।

হজরত নবী করিম (সা.) ইরশাদ করেন, ‘যে দুই ঈদের রাতে সওয়াবের নিয়তে ইবাদত করবে, তার অন্তর সেদিন মরবে না, যেদিন অন্যদের অন্তর মরে যাবে।’ -ইবনে মাজাহ

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করিম (সা.)-কে বলতে শুনেছি যে আল্লাহতায়ালা চার রাতে সব ধরনের কল্যাণের দরজা খুলে দেন। সেগুলো হলো- ঈদুল আজহার রাত, ঈদুল ফিতরের রাত ও ১৫ শাবানের রাত (এ রাতে সব প্রাণীর জীবন ও জীবিকা নির্ধারণ করা হয়) ও আরাফার রাত। আর তা এভাবে ফজরের আজান পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।- তারিখে বাগদাদ

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) সম্পর্কে বর্ণিত আছে, তিনি দুই ঈদের রাত জেগে থেকে ইবাদত-বন্দেগিতে কাটিয়ে দিতেন। হজরত ওমর ইবনে আবদুল আজিজ (রা.) আদি বিন আরতকে বললেন, চারটি রাতকে খুবই গুরুত্ব দেবে। সেগুলো হলো- ১ রজবের রাত, শবেবরাতের রাত, ঈদুল ফিতরের রাত ও ঈদুল আজহার রাত। আল্লাহতায়লা এসব রাতে অশেষ রহমত বর্ষণ করেন।

ঈদের রাতটি মুমিনদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি রাত, এ রাতের ইবাদত ও জেগে থাকার ফলে মুমিনের জন্য জান্নাত ওয়াজিব হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। তাই এই রাতে অনর্থক কাজে লিপ্ত থাকা, বাজারে বা মার্কেটে ঘোরাফেরা করে সময় নষ্ট করা কোনো মুমিনের কাজ নয়। এ রাতে নিজের গোনাহ মাফের জন্য দোয়া করা, গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য দোয়া করা, আল্লাহর অনুগত বান্দা হওয়ার জন্য দোয়া করা, সুন্নাহ মোতাবেক জীবন চলার জন্য দোয়া করা।

ঈদের রাতে অন্যের কাছে অপদস্থ না হওয়ার দোয়ার পাশাপাশি বদ নজর থেকে বাঁচার জন্য, বিপদ ও বালা-মসিবত থেকে বেঁচে থাকার জন্য, নিজের হেদায়েতের জন্য, নিজের পরিবারবর্গের জন্য, পিতা-মাতার জন্য, সন্তান-সন্ততির জন্য দোয়া, স্বামী-স্ত্রীর জন্য, সন্তানাদি যেন প্রকৃত মানুষ হয়- সেজন্য, আত্মীয়-স্বজনদের জন্য, রোগমুক্তির জন্য, হালাল রিজিক সহজ হওয়ার জন্য, হারাম কাজ থেকে বেঁচে থাকার জন্য, সহজে ঋণ পরিশোধ হওয়ার জন্য, অন্যের ওপর বোঝাস্বরূপ না হওয়ার জন্য, লোক দেখানো ইবাদত থেকে মুক্ত থাকার জন্য, বদঅভ্যাস থেকে মুক্ত থাকার জন্য, জান্নাতুল ফেরদৌসের জন্য, জাহান্নাম থেকে মুক্ত থাকার জন্য, কবরের আজাব থেকে মুক্তির জন্য, নবীজির শাফায়াত নসিব হওয়ার জন্য, সব ধরনের ফেতনা থেকে মুক্ত থাকার জন্য দোয়া ও চলমান করোনো মহামারি থেকে বিশ্ববাসীর নিরাপত্তার জন্য দোয়া করা।

ইসলামে জ্ঞান চর্চার গুরুত্ব



তাসফিয়া ইয়াসফা, অতিথি লেখক, ইসলাম
ইসলাম জ্ঞান চর্চায় মানুষকে উৎসাহ দেয়

ইসলাম জ্ঞান চর্চায় মানুষকে উৎসাহ দেয়

  • Font increase
  • Font Decrease

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। দুনিয়ায় সৃষ্টিকর্তার যত রকম সৃষ্টি রয়েছে, সবার ওপরে মানুষের স্থান। মানুষের সুবিধার্থে আল্লাহতায়ালা এত রকমের নেয়ামত দান করেছেন। তার পরিধেয় বস্ত্র থেকে নিত্য আহার্য পর্যন্ত মানুষ সৃষ্টিকূল থেকে সংগ্রহ করে। তাই মহান আল্লাহ যা বলেছেন বা যা সৃষ্টি করেছেন, এসব সম্পর্কে জানা এক প্রকার ইবাদত। যেখানে আমরা জ্ঞান অন্বেষণকে শুধুমাত্র পার্থিব জীবনে অর্থ উপার্জনের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করি, সেই জ্ঞান অর্জনকে ইসলামিক জীবনাদর্শে ফরজ করা হয়েছে। নবী মুহাম্মাদ (সা.) বলেন, ‘ইলম (জ্ঞান) অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ।’ -ইবনে মাজাহ

জানা, জ্ঞান ইত্যাদি শব্দের আরবি প্রতিশব্দ হচ্ছে- ইলম। ইসলামি পরিভাষায় এর অর্থ, কোনো বস্তুর প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করা। মহান আল্লাহ মানুষকে শুধুমাত্র একটি শরীর দিয়ে এই দুনিয়াতে পাঠান। পরবর্তীতে তার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশের মাধ্যমে সে জীবন উপলব্ধি করতে শেখে। ভালো-মন্দের পার্থক্য, ভুল-সঠিকের পথ, সত্য-মিথ্যা সবকিছু সম্পর্কে তার ধারণা আসে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে। তাই কোনো কিছু জানার ইচ্ছাকে সমুন্নত রাখতে হবে, সচল রাখতে হবে। নবী-রাসুলদের জীবনী থেকে, হাদিস-কোরআনের বাণী থেকে দ্বীনি ইলম সম্পর্কে জানতে হবে এবং অন্যান্য বই-পুস্তকের মাধ্যমে দুনিয়াবি জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

হাদিসে বর্ণিত আছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুমিন বান্দা কল্যাণ হতে কখনও তৃপ্তি পায় না। কল্যাণ অর্থ জ্ঞানার্জন এবং শিক্ষা। অতপর বান্দা জান্নাতে প্রবেশ করে।’ –সুনানে তিরমিজি

যে ব্যক্তি দ্বীন-দুনিয়া সম্পর্কে জানে, সে কখনও দুশ্চরিত্রবান হতে পারে না। কারণ সে ভালো-খারাপের তফাৎ করতে জানে। সে জানে মন্দের শাস্তির ব্যপারে। একজন মূর্খ এবং একজন বিজ্ঞ কখনও এক হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তুমি বলে দাও, যারা জ্ঞানী এবং মূর্খ তারা কি সমান হতে পারে?’ -সুরা যুমার

বস্তুত শেখার কোনো শেষ নেই। নানা রকম ডিগ্রী অর্জন করতে পারলে কিংবা জীবনের পঞ্চাশ-ষাট বছর কাটিয়ে দিতে পারলেই মানুষে নিজেকে মহাজ্ঞানী ভাবতে পারে না, সে জ্ঞানী হয়ও না। অনেক বিষয় সম্পর্কে জানা শেষ হলেও, প্রকৃত অর্থে মানুষ বিশাল এ সৃষ্টিজগত সম্পর্কে খুব সামান্য পরিমাণ জানার সুযোগ পায়।

তাই জ্ঞানার্জনের প্রচেষ্টা সবসময় চালিয়ে যেতে হবে। জানার মধ্যে যে আনন্দ রয়েছে, তা পৃথিবীর কোনো ধন-সম্পদ উপার্জনের মধ্যে নেই।

;

পানির ওপর জায়নামাজে নামাজ পড়ার ঘটনা প্রসঙ্গে



ইসলাম ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
প্রতীকী ছবি

প্রতীকী ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

হজরত রাবেয়া বসরি (হবে রাবেয়া বসরিয়্যাহ্) দ্বিতীয় হিজরি শতকের একজন প্রসিদ্ধ আবেদা নারী ছিলেন। ইমাম জাহাবি (রহ.)-এর সিয়ারু আলামিন নুবালা, ইবনে খাল্লিকান (রহ.)-এর অফাইয়াতুল আইয়ান, শারানি (রহ.)-এর আততাবাকাতুল কুবরাসহ আরও বিখ্যাত বিখ্যাত বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে তার জীবনী সন্নিবেশিত হয়েছে। তার বিষয়ে সমাজে বিভিন্ন বানোয়াট কিচ্ছা-কাহিনী প্রচলিত আছে।

তার ও প্রসিদ্ধ তাবেয়ী হজরত হাসান বসরি (রহ.)-এর বিষয়ে একটি কাহিনী অনেককে বলতে শোনা যায়। সেটি হলো-

একবার হজরত হাসান বসরি (রহ.) পানির ওপর জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়লেন। হজরত রাবেয়া বসরি একথা জানতে পারলেন এবং তিনি শূন্যের ওপর জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়লেন। হজরত হাসান বসরি (রহ.) যখন একথা জানতে পারলেন তখন বললেন, রাবেয়ার মাকাম (স্থান) আমার অনেক ওপরে।

বস্তুত এ কিচ্ছার কোনো ভিত্তি নেই। এটি একেবারেই কল্পনাপ্রসূত একটি কাহিনী, বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। নির্ভরযোগ্য কোনো ইতিহাসগ্রন্থ কিংবা রাবেয়া বসরির ওপর রচিত কোনো নির্ভরযোগ্য জীবনীগ্রন্থে এ ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় না।

তারা কত বড় বুজুর্গ ছিলেন, এ কথা বুঝাতে এ জাতীয় কিচ্ছা-কাহিনীর অবতারণা করা হয়।

হ্যাঁ, তারা অনেক বড়মাপের বুজুর্গ ছিলেন, একথা স্বীকৃত। তারা জুহ্দ (সাধনা) ও তাকওয়ায় (আল্লাহভীতি), দুনিয়াবিমুখতা ও খোদাভীতিতে অনেক অগ্রগামী ছিলেন। কিন্তু এ ধরনের কাহিনী দিয়ে তাদের বুজুর্গি প্রমাণ করার কোনো প্রয়োজন নেই। আর এ সবের সঙ্গে বুজুর্গির কোনো সম্পর্ক নেই।

আর আল্লাহর অলিদের থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কারামত প্রকাশিত হয় এ কথা স্বীকৃত। সেই সঙ্গে এ কথাও স্বীকৃত যে, কারামতের সঙ্গে বুজুর্গির কোনো সম্পর্ক নেই। বুজুর্গি ও আল্লাহর প্রিয়পাত্র হওয়ার মাপকাঠি হলো, তাকওয়া তথা আল্লাহর ভয় ও সুন্নত অনুযায়ী জীবন-যাপন করা।

আর বানোয়াট এ ঘটনায় আরেকটি দিক দেখা যাচ্ছে। তা হলো, একজন পানির ওপর জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়েছেন তা শুনে অপরজন শূন্যের ওপর জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজ পড়ছেন; যেন বুজুর্গি প্রকাশে প্রতিযোগিতা চলছে। এর দ্বারাই বুঝা যায়, এগুলো বানোয়াট গল্প। কারণ, আল্লাহওয়ালারা নিজেদেরকে আড়াল করতে চান। আর তাদের মতো অনুসরণীয় বুজুর্গরা যেন নিজেদের বুজুর্গির প্রদর্শন করছেন। নাউযুবিল্লাহ। এটা তাদের ব্যাপারে মস্তবড় অপবাদও বটে!

আরেকটি বিষয় হলো, হজরত হাসান বসরি (রহ.) ইন্তেকাল করেছেন ১১০ হিজরিতে। আর রাবেয়া বসরির জন্মই হয়েছে ৯৯ অথবা ১০০ হিজরিতে। অর্থাৎ হাসান বসরি (রহ.)-এর ইন্তেকালের সময় রাবেয়া বসরির বয়স ছিলো সর্বোচ্চ ১১/১২ বছর। সিয়ারু আলামিন নুবালায় (৮/২৪১) ইমাম জাহাবি (রহ.) বলেন, রাবেয়া বসরি ১৮০ হিজরিতে ইন্তিকাল করেছেন। কথিত আছে, তিনি আশি বছর হায়াত পেয়েছেন। সুতরাং এ বিষয়টিও এ ঘটনার অসারতা প্রমাণ করে।

;

ইসলামে হিজড়াদের অধিকার



ইসরাত জাহান সারা, অতিথি লেখক, ইসলাম
ইসলামি স্কলাররা মতে দিয়েছেন, হিজড়াদের অবহেলা করা যাবে না। তাদের গালি দেওয়া যাবে না

ইসলামি স্কলাররা মতে দিয়েছেন, হিজড়াদের অবহেলা করা যাবে না। তাদের গালি দেওয়া যাবে না

  • Font increase
  • Font Decrease

সমাজে হিজড়াদের অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে ইসলাম দিক-নির্দেশক। ইসলাম মতে, মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। তদ্রূপ হিজড়াও মহান আল্লাহর সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব আশরাফুল মাখলুকাতের এক অনন্য মানব সম্প্রদায়। সুরা ত্বীনের ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি শ্রেষ্ঠতম-সুন্দর আকৃতিতে।’

বাংলা একাডেমীর সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান বলছে, ‘হিজড়া’ শব্দটি হিন্দি ভাষা থেকে এসেছে। হিজড়া বিষয়ক গবেষকদের মতে, হিজড়া শব্দটি এসেছে ফার্সি থেকে। ফার্সি ভাষায় হিজড়া অর্থ হলো- ‘সম্মানিত ব্যক্তি।’

নারীও নয় আবার পুরুষও নয়, এ ধরনের এক শ্রেণির মানুষকে আমরা প্রায়ই রাস্তাঘাটে বিভিন্ন রকম অঙ্গভঙ্গি করে চাঁদা তুলতে দেখি, এই অবহেলিত শ্রেণির লোকদেরকে ‘হিজড়া’ বলা হয়।

হিজড়াদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হিজড়া শব্দকে তারা অভিশাপ বা গালি হিসেবে মনে করেন। তারা এক ধরনের প্রতিবন্ধী। প্রতিবন্ধীরা সমাজে নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলে হিজড়ারা এসব থেকে বঞ্চিত। সমাজ তাদেরকে বোঝা মনে করে দূরে ঠেলে দেয়। তাদের প্রতি ঘৃণা নয় বরং ভালোবাসা ও স্নেহ দরকার। প্রতিবন্ধী মানুষের যেমন শারীরিক ত্রুটি থাকে তদ্রূপ এটিও একটি ত্রুটি।

মনে রাখতে হবে, মহান আল্লাহর কাছে মানুষের বাহ্যিক আকার-আকৃতির কোনো মূল্য নেই। হাশরের ময়দানে তিনি দেখবেন শুধু মানুষের আমল। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তোমাদের চেহারা এবং সম্পদ দেখেন না বরং তিনি তোমাদের হৃদয় এবং আমলসমূহ দেখেন।’ -সহিহ মুসলিম : ৬৭০৮

ইসলামি স্কলাররা মতে দিয়েছেন, হিজড়াদের অবহেলা করা যাবে না। তাদের গালি দেওয়া যাবে না। তাদেরকে নিয়ে উপহাস করা যাবে না। তারা সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করবে। তাদের ওপর ইসলামের বিধান কার্যকর হবে। যার মধ্যে মেয়েলি ভাব বেশি তার ওপর নারীদের বিধান এবং যার মধ্যে পুরুষের স্বভাব বেশি বিদ্যমান, তার ওপর পুরুষদের বিধান কার্যকর হবে।

ইসলাম মানবতার ধর্ম। তাই ইসলাম হিজড়াদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ মনে করে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে অঙ্গ ও আকৃতির ভিত্তিতে মানুষকে ভাগ করা হয়নি। আল্লাহতায়ালার কাছে সব ত্রুটিহীন অথবা ত্রুটিপূর্ণ মানুষই সমান এবং হাশরের ময়দানে সব ধরনের মানুষই জিজ্ঞাসিত হবে। সে জন্যই সকলের মতো নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত- পালন করা হিজড়াদের ওপর ফরজ।

ইসলামের দৃষ্টিতে সব মানুষ সমান। ইমান ও তাকওয়া হচ্ছে- মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড। যে যত বেশি মুত্তাকি, আল্লাহ তাকে তত বেশি ভালোবাসেন। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে; পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে বেশি মর্যাদাসম্পন্ন, যে বেশি মুত্তাকি।’ -সুরা হুজুরাত : ১৩

;

নামাজের উপকারিতা



মোহাম্মদ এনামুল হক ফজলে রাব্বী, অতিথি লেখক, ইসলাম
শাশ্বত আহ্বান, এসো নামাজের দিকে, এসো নামাজের দিকে

শাশ্বত আহ্বান, এসো নামাজের দিকে, এসো নামাজের দিকে

  • Font increase
  • Font Decrease

ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম হচ্ছে- নামাজ। ঈমানের পরেই নামাজের মর্যাদাগত অবস্থান। রাব্বুল আলামীন পবিত্র কোরআনে এ সম্পর্কে ইরশাদ করেছেন, ‘বলুন! আমার বান্দাদেরকে, যারা ঈমান এনেছে তারা যেন নামাজ প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি যা তাদেরকে দান করেছি তা হতে ব্যয় করে।’

ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় নামাজ বলা হয়, রুকু, সিজদাসহ নির্দিষ্ট আহকাম সম্বলিত এমন বিশেষ ইবাদত অনুষ্ঠানকে- যার মাধ্যমে বান্দা ও স্রষ্টার মাঝে সুনিবিড় সম্পর্ক সৃষ্টি হয়। দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক নর-নারী মুসলিমের ওপর আদায় করা ফরজ।

নামাজ ফরজ ইবাদত হলেও নামাজ আদায়ের মূল উপকারিতা হচ্ছে, অন্যায় ও অশ্লীলতা থেকে মানুষকে বিরত রাখা। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় নামাজ অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে বিরত রাখে।’

এ প্রসঙ্গে হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যদি কোনো ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও প্রতিটি জুমার নামাজ রীতিনীতিসহ আদায় করে এবং প্রতি বছর রমজানের রোজাগুলো যথাযথভাবে পালন করে, তাকে আল্লাহতায়ালা এক নামাজ হতে অপর নামাজ, এক জুমা হতে অপর জুমা এবং এক রমজান হতে অপর রমজানের মধ্যকার সময়ে সংঘটিত যাবতীয় গোনাহ ক্ষমা করে দেন। তবে শর্ত হলো, তাকে কবিরা গোনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে।’ কেননা আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা যদি নিষেধাজ্ঞাসমূহের পাশাপাশি কবিরা গোনাহ থেকে বিরত থাকো, তবে আমি তোমাদের সগিরা গোনাহগুলো মিটিয়ে দেব।’ সুতরাং সগিরা গোনাহ থেকে ক্ষমালাভের জন্য আমাদের উচিত কবিরা গোনাহ থেকে বিরত থেকে যথাযথভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমা ও রমজানের রোজাগুলো পালন করা। আল্লাহতায়ালার হুকুম পালনের পাশাপাশি নামাজের মাধ্যমে অনেক বৈষয়িক উপকারিতা ও অর্জিত হয়। যেমন-

মুসলিম ঐক্য : নামাজ মুসলিম ঐক্যের এক শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। মুসলমানগণ দৈনিক পাঁচ বার নামাজের উদ্দেশ্য মসজিদে একত্রিত হয়ে ঐক্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

আনুগত্যের শিক্ষা : নামাজে ইমামের অনুসরণ ও আনুগত্যের মাধ্যমে নেতার আনুগত্যে শিক্ষা লাভ হয়।

চরিত্র গঠন : নামাজ চরিত্র গঠনের উত্তম উপায়। দৈনিক পাঁচ বার তাওহিদ, রেসালাত ও আখেরাতকে স্মরণের মাধ্যমে চরিত্রের মন্দ দিকগুলো দূরীভূত হয়।

নেতৃত্বের দায়িত্ববোধ : নামাজ দ্বারা নেতৃত্বের দায়িত্ববোধের শিক্ষা অর্জিত হয়। এমনকি সমাজ ও জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার শিক্ষা এখান থেকে অর্জিত হয়।

পারস্পরিক সহযোগিতা : সমাজে মসজিদ তৈরি ও এর রক্ষণাবেক্ষণকারী ইত্যাদি কার্যাবলী মাধ্যমে মানুষ মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সামাজিক গুণ সৃষ্টি হয়।

পারস্পরিক সম্প্রীতি সৃষ্টি : মুসলমানগণ প্রত্যহ পাঁচ বার নামাজ কায়েমের লক্ষ্যে মসজিদে সমবেত হওয়ায় তাদের মাঝে সামাজিক সম্প্রীতি, একতার বন্ধন, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সহযোগিতামূলক মনোভাব গড়ে ওঠে।

শৃঙ্খলার প্রশিক্ষণ : মুসলমানরা নামাজ আদায়ের লক্ষ্যে প্রত্যেহ পাঁচ বার নির্ধারিত সময়ে মসজিদে সমবেত হয় এবং কাতারবন্দি হয়ে কঠোর নিয়মানুবর্তিতা ও শৃঙ্খলার সঙ্গে নামাজ আদায় করে। এতে মানুষ নিয়ম শৃঙ্খলার প্রশিক্ষণ লাভ করে।

নামাজ পরিত্যাগের পরিণাম : ইচ্ছেকৃতভাবে নামাজ পরিত্যাগকারীর ব্যাপারে হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। এ ছাড়া বেনামাজির জন্য ১৪ প্রকার শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি নামাজের ব্যাপারে অবহেলা প্রদর্শন করে। আল্লাহতায়ালা তাকে চৌদ্দ প্রকার শাস্তি প্রদান করেন।’

নামাজে যত্নবান হওয়া মুমিনের দায়িত্ব

 

দুনিয়ায় পাঁচ শাস্তি
১. তার জীবন ও জীবিকার বরকত কেড়ে নেওয়া হবে।
২. তার চেহারা হতে নেককার লোকদের নূর মুছে ফেলা হবে।
৩. সে যেকোনো নেক আমল করুক, আল্লাহ তাতে কোনো সওয়াব দান করেন না।
৪. তার কোনো দোয়াই কবুল করা হয় না।
৫. নেককারদের দোয়ায় তার কোনো অংশ থাকে না।

মৃত্যুকালীন তিন শাস্তি
১. অপমানিত ও লাঞ্ছিত অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
২. ক্ষুধার্ত অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করবে।
৩. চরম তৃষ্ণার্ত অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করে। যদি সমস্ত পৃথিবীর সাগরের পানিও তাকে পান করানো হয়, তবুও তার তৃষ্ণা কমবে না।

কবরের তিন শাস্তি
১. তার কবর এত সংকীর্ণ করা হবে যে, তার এক পাঁজরের হাড় অন্য পাঁজরের মধ্যে ঢুকে যাবে।
২. তার কবরে আগুন জ্বালানো হয়, সে আগুনের শিখার ওপর দিনরাত উলট-পালট অবস্থায় দগ্ধ হতে থাকবে।
৩. তার কবরে একটি ভয়ংকর বিষধর অজগর নিয়োগ করা হবে। যার চোখ দু’টি আগুনের এবং নখরগুলো লোহার মতো শক্ত কিছু দ্বারা তৈরি হবে। অজগরটি বজ্রের ন্যায় আওয়াজ দেবে এবং মৃত ব্যক্তিকে চব্বিশ ঘন্টা রাতদিন কেয়ামত পর্যন্ত দংশন করতে থাকবে।

কেয়ামতের তিন শাস্তি
১. অত্যন্ত কড়াকড়িভাবে বেনামাজির হিসাব নেওয়া হবে।
২. তাকে কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি দেওয়া হবে।
৩. অত্যন্ত অপমানের সঙ্গে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, কেয়ামতের দিন বেনামাজি কপালে তিনটি লাইন লেখা অবস্থায় উঠবে। ‘হে আল্লাহর হক বিনষ্টকারী।’ ‘হে আল্লাহর গজবের পাত্র! দুনিয়াতে তুমি যেভাবে আল্লাহর হক নষ্ট করেছো, সেরূপ আজ তুমি আল্লাহর রহমত হতে বঞ্চিত।’ অতএব জ্ঞান থাকা অবস্থায় কোনো মুমিন-মুসলমানের জন্য কোনো অবস্থায় নামাজ পরিত্যাগ করা বৈধ নয়।

;