নিউইয়র্কের ঈদ স্মৃতি, শিক্ষণীয় নানাদিক



ফয়সল আহমদ জালালী, অতিথি লেখক, ইসলাম
নিউইয়র্কে খোলা মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়, পুরোনো ছবি

নিউইয়র্কে খোলা মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়, পুরোনো ছবি

  • Font increase
  • Font Decrease

নিউইয়র্ককে বলা হয় বিশ্বের রাজধানী। দুনিয়ার সব জাতি ও গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস এখানে। ভাষার বৈচিত্র্যময় শহর ও এটি। নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষ এই শহরে জীবনযাপন করেন। যার যার ধর্ম পালন করেন অবাধে। ধর্মীয় আচার-আচরণ পালনে নেই কোনো বিধি-নিষেধ। দিন হোক আর রাত হোক চলাচলে নেই কোনো ভয়-আশংকা। লিঙ্গ বৈষম্যমহীনের দেশ আমেরিকা। নারীরা ও চলছে নিজ নিজ গন্তব্যে একা একা। কেউ কাউকে বিরক্ত করছে না।

আমার প্রথম সফর
২০১৮ সালের কথা। আমার প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর ছিল রমজান মাসের শেষ দশকে। নিশ্চিত করে বললে ঈদুল ফিতরের ২দিন আগে। নিউইয়র্ক ঈদগাহের আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্র সফরের দুয়ার খুলে। এই ঈদগাহের প্রতিষ্ঠাতা ইমাম কাজী কাইয়ুম। এই নামেই তিনি খ্যাত। আমেরিকাজুড়ে মুসলিম কমিউনিটিতে তার বেশ প্রভাব ও খ্যাতি রয়েছে। তীক্ষ্ম প্রতিভার অধিকারী বন্ধুবর মাওলানা আবদুল কাইয়ূম খান। শুধু ঈদগাহ প্রতিষ্ঠা করেননি তিনি মুহাম্মাদী সেন্টার নামে জ্যাকসন হাইটসে গড়ে তুলেছেন শিক্ষা ও সংস্কৃতিমূলক একটি প্রতিষ্ঠান। নিউইয়র্কে ইন্টারফেইথ, এন্টি টেরোরিজম এওয়ারনেসেও তিনি সক্রিয়ভাবে কাজ করেন।

নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমান বন্দরে দুই সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে আমাকে ফুলেল অভ্যর্থনা জানান। পরে নিজে গাড়ি চালিয়ে তার অফিসে নিয়ে যান। সে স্মৃতি কোনোদিন ভুলবার মতো নয়। এ বিষয়ে স্বতন্ত্র একটি প্রবন্ধ লেখব- ইনশাআল্লাহ।

অতিথি ইমাম হিসেবে লেখককে সম্মাননা জানাচ্ছেন স্থানীয় কাউন্সিলম্যান, ছবি: সংগৃহীত

‘চাঁদ রাত’ সংস্কৃতি
নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসকে বলা হয় মিনি বাংলাদেশ। এখানে প্রচুর বাংলাদেশি বসবাস করেন। ঈদের চাঁদ ওঠার রাতকে ওখানকার মুসলিম সমাজ ‘চাঁদ রাত’ হিসেবে পালন করেন। আমি এই সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত ছিলাম না। এশার নামাজের পর বের হয়ে দেখি রাস্তায় প্রচুর নারী ও শিশু। ভিড়ের কারলে ফুটপাতে হাঁটা যাচ্ছে না। এক বাংলাদেশিকে জিজ্ঞেস করলাম, রাস্তায় এত ভিড়ের কারণ কী। তার পাল্টা প্রশ্ন, আপনি এ এলাকায় নতুন এসেছেন? আমি বললাম, শুধু এলাকায় নতুন নয়, আমেরিকাতেই আমি নতুন। মাত্র দু'দিন পূর্বে এসেছি। বলল, আজ চাঁদ রাত। মহিলা ও শিশুরা ঈদের আগের রাতে এখানে রাস্তায় বেরিয়ে এসে আনন্দ করে। হাতে মেহেদী লাগায়। পরিচিতদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ উপভোগ করে। অনেক রাত পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকবে। এটিকে ঈদ উপলক্ষ্যে মেহেদী উৎসবও বলা চলে।

একই সুতোয় বেঁধে ফেলা ঈদ
নিউইয়র্কে রয়েছে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত মুসলিম সমাজ। এশিয়ান, আমেরিকান, ইউরোপিয়ান ও আফ্রিকান মহাদেশীয় সংস্কৃতির মাঝে তো ভিন্নতা আছেই। এছাড়া বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্ডিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়া, মিসর, মরক্কো, গায়ানা, সুদান, সোমালিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন দেশের মানুষের আচার-আচরণেও রয়েছে ভিন্নতা। রয়েছে ভাষা ও বর্ণের বহু সমীকরণ। ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো পালনে গড়ে ওঠা বিভিন্ন চিন্তা-চেতনা ও দর্শনের মানুষ রয়েছে এখানে। যাকে আমরা মাজহাব বলি। আর পশ্চিমা লেখকরা যাকে school of thought বলে আখ্যায়িত করেন।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাইরের কেউ মনে করতে পারেন- মাজহাব নিয়ে বিভক্তি ইসলামের মাঝে উপদলীয় কোন্দল। যা অন্যান্য ধর্মে তীব্রভাবে লক্ষ্য করা হয়। তা মোটেই সত্য নয়। মাজহাব হলো, ইসলামের বিধান পালনে দৃষ্টিভঙ্গির ভিন্নতা। একই ইমামের পেছনে সব মাজহাবের মানুষের নামাজ আদায়ই এর বড় প্রমাণ। ঈদের মাঠে ঈদের নামাজে সবাই এক ও অভিন্ন। নামাজ শেষে সবাই একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করছে। করছে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়। নেই তাদের মাঝে কোনো বর্ণ বৈষম্য। দেশ-মহাদেশের নেই কোনো ভেদাভেদ। নিউইয়র্কের ঈদ মনে হয় গোটা বিশ্বকে একই সুতোয় বেঁধে ফেলে। নিউইয়র্ক যেন এক আদমের সন্তানের মিলন ভূমি।

মুসলিম ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলো কোরবানির অর্ডার গ্রহণ করে, ছবি: সংগৃহীত

মাঠে-ময়দানে ঈদের জামাত
নিউইয়র্কে ঈদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো- মাঠে-ময়দানে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। বাদল দিন হলে ভিন্ন কথা। তখন বাধ্য হয়েই মসজিদে ঈদের আয়োজন করা হয়। স্কুল-কলেজের মাঠ ঈদের জামাতের জন্য খুলে দেওয়া হয়। পার্কগুলোও ব্যবহার করা যায়। এমনকি অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায়ও ঈদের নামাজ আদায় করা হয়। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। আমেরিকা নিয়ম-কানুন মেনে চলা দেশ। আইন-কানুনকে অবজ্ঞা করে যাচ্ছে-তাই করা যাবে না সেখানে। ওখানকার মানুষ আইনের প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল। ধর্ম-কর্ম পালনে কোনো বাধা-বিপত্তি নেই। আমার দেখামতে ধর্মাচারীকে আমেরিকার সমাজে শ্রদ্ধা করা হয়। সে যেকোনো ধর্মের মানুষ হোক।

কোভিড-১৯ এর কারণে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল সব ধরনের উপাসনালয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এক মৌখিক নির্দেশে সব খুলে দেওয়া হয়েছে। ধর্মের প্রতি সহানুভূতিশীল না হলে এই অজুহাত আরও দীর্ঘ হতো। বন্ধ থাকত মসজিদ, মন্দির, চার্চ ও প্যাগোডা ইত্যাদি।

জনপ্রতিনিধিদের শুভেচ্ছা
নামাজ শেষে ঈদগাহে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য উপস্থিত হন নিউইয়র্কের জনপ্রতিনিধিরা। এমনকি অন্য ধর্মের গুরুরাও আসেন শুভেচ্ছা জানাতে। অবশ্য সেটি নির্ভর করে আয়োজকদের দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। নিউইয়র্ক ঈদগাহের প্রতিষ্ঠাতা কাজী কাইয়ুম আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির একজন অন্যতম ব্যক্তিত্ব। তার প্রতিষ্ঠিত ঈদগাহে যেকোনো জনপ্রতিনিধিকে স্বাগত জানানো হয়। এমনকি ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রদর্শনের জন্য আন্তধর্মীয় নেতাদেরকেও গ্রহণ করা হয়। ২০১৮ সালে আমি প্রথম আমেরিকা যাই। নিউইয়র্ক ঈদগাহ আমাকে ইমাম হিসেবে আমন্ত্রণ জানায়। ঈদের জামাত শেষে জ্যাকসন হাইটস এলাকার নির্বাচিত কাউন্সিলম্যান নিজে উপস্থিত হয়ে শুভেচ্ছা জানান। এমনকি অতিথি ইমাম হিসেবে নিউইয়র্ক সিটির মনোগ্রাম সম্বলিত প্যাডে তার স্বাক্ষরিত একটি সাইটেশন প্রদান করেন। আমাকে নিয়ে ছবি তুলেন। সেখানকার গণমাধ্যম ও সোস্যাল মিডিয়ায় তা ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।

অন্যরাও ঈদের দৃশ্য উপভোগ করে
যুক্তরাষ্ট্রে ধর্ম নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। এ জন্য দেশটির পরিসংখ্যান ব্যুরো থেকে এর কোনো তথ্য জানা যায় না। তবে মুসলিম জনসংখ্যা রয়েছেন প্রচুর। ওপরে বর্ণিত ঈদের জামাতের সমাগম থেকে কিছুটা অনুমান করা যেতে পারে। তবে মাঠে-ঘাটে ও পার্কে ঈদের জামাত আয়োজনের দৃশ্য অন্য ধর্মাবলম্বীরা উপভোগ করেন। সুশৃঙ্খল দৃশ্য দেখে অনেকেই পুলকিত হন। অনেকে এগিয়ে এসে অভিনন্দন জানান। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খুৎবা শুনেন। জ্যাকসন হাইটসের ডাইভার্সিটি প্লাজায় নিউইয়র্ক ঈদগাহের কার্যক্রম পালিত হয়। আমার খুৎবা প্রদান শেষে অনেক অমুসলিম এগিয়ে এসে আমাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

কোরবানি নির্দিষ্ট স্থানে আদায়
কোরবানি যত্রতত্র আদায় করার সুযোগ নেই। নির্দিষ্ট স্থানে কোরবানি আদায় করতে হয়। সশরীরে উপস্থিত হয়ে নিজ হাতে সেখানে কোরবানি করার ব্যবস্থা রয়েছে। চামড়া পৃথক করা ও গোশত কাটাকুটি প্রশিক্ষিত মানুষ দিয়ে করতে হয়। মুসলিম ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোও কোরবানির অর্ডার গ্রহণ করে। কোরবানির ঈদ আসন্ন হলে বড় বড় সাইনবোর্ড টাঙানো হয় দোকানের সম্মুখে। ভাগে যারা কোরবানি করেন তারা বেশিরভাগ তাদের হাতেই কোরবানির দায়িত্ব অর্পণ করেন। এ জন্য বিশ্বস্ত দোকান মালিক বেছে নিতে হয়। খাসি, ভেড়া বা দুম্বা কোরবানি যারা করেন তারা নির্দিষ্ট স্লটারিং স্থলে হাজির হন।

নিয়মানুবর্তিতা
সবক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলতে আমেরিকানরা অত্যন্ত সচেতন। আগে আসলে আগে পাবেন, উঁচু-নীচু সবাই এই নিয়ম মেনে চলেন। মুদির দোকানেও সুশৃংখলভাবে এই নিয়ম মানা হয়। মূল্য পরিশোধের সময় লাইন বেঁধে ক্রেতারা দাঁড়িয়ে থাকেন। কোরবানির ক্ষেত্রেও এই নিয়ম ভঙ্গ করার প্রশ্নই আসে না। যারা কসাইখানায় পরে যাবেন তাদের পরেই ফিরতে হয়। অনেকের সিরিয়াল পরের দিনও আসতে দেখা যায়, কিচ্ছু করার নেই। ওখানকার মানুষগুলোর স্বভাব হয়ে গেছে নিয়ম মেনে চলার। সিরিয়াল ভঙ্গ করার মানসিকতা কারো হয় না। একান্ত কেউ এর ব্যত্যয় ঘটানোর চেষ্টা করলে তার কাজ করে দেওয়া হয় না। আমেরিকা শ্রেণি বৈষম্যহীনতার এক মনোরম ভূখণ্ড।

ফয়সল আহমদ জালালী: ভিজিটিং ইমাম, নিউইয়র্ক ঈদগাহ, যুক্তরাষ্ট্র