‘তুমি যে গিয়াছো বকুলও বিছানো পথে’

ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
শচীন দেব বর্মণ।

শচীন দেব বর্মণ।

  • Font increase
  • Font Decrease

উপমহাদেশের সঙ্গীত ঘরানায় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল শচীন দেব বর্মণ ১৯০৬ সালের ১ অক্টোবর বাংলাদেশের কুমিল্লায় জন্ম নিয়ে ৩১ অক্টোবর ১৯৭৫ সালে বোম্বাই (মুম্বাই) শহরে ইতি টেনেছিলেন সুর ও তালে সমৃদ্ধ সুদীর্ঘ জীবনযাত্রার। কিন্তু তার গান বেঁচে আছে লক্ষ-কোটি শ্রোতার হৃদয়ে। তিনি রয়েছেন সঙ্গীতের মুকুটহীন সম্রাট ‘শচীন কর্তা’ নামে ও পরিচিতিতে।

জন্মের শতবর্ষ পেরিয়ে এবং মৃত্যুর ৪৫ বছর পরেও শচীন কর্তা ‘কে যাস রে ভাটির গাঙ বাইয়া’ বলে কোনো বিরহী হৃদয়ের মানুষকে ডাক দেন। বেদনাদীর্ণ কণ্ঠে হারানো প্রেমের স্মৃতি-স্পন্দিত কথামালায় উচ্চারণ করেন, ‘তুমি যে গিয়াছো বকুলও বিছানো পথে’।

পারিবারিক সূত্রে তিনি ত্রিপুরা রাজ বংশের ছেলে। কুমিল্লা তখন ত্রিপুরার অংশ। বাল্য, শৈশব, কৈশোরের দুরন্ত দিনগুলো তার কেটেছে কুমিল্লা শহরে। সঙ্গীতের তালিম ও আদি শিক্ষাও তিনি লাভ করেন কুমিল্লায়।

১৯২০ সালে কুমিল্লা জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯২২ সালে এইচএসসি এবং ১৯২৪ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করেন তিনি। তারপর চলে যান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। গান বাজনার পাশাপাশি ভালো ফুটবল, ক্রিকেট ও টেনিস খেলতেন তিনি।

কলকাতায় শচীন কর্তা কুড়ি বছর অবস্থান করেন। ‘আকাশবাণী’তে সঙ্গীত পরিবেশনা ছাড়াও পল্লীগীতি শিল্পী হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। এ সময় তার পিতৃবিয়োগ হলে আর্থিক সংকট ও বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন তিনি। তথাপি কোনো বিরূপতাতেও তিনি সঙ্গীত সাধনার পথ পরিত্যাগ করেননি।

১৯৩৪ সালকে বলা যেতে পারে তার জীবনের টার্নিং পয়েন্ট। সেবছর তিনি অল ইন্ডিয়ান মিউজিক কনফারেন্সে গান গেয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৯৩৫ সালে বেঙ্গল মিউজিক কনফারেন্সে ঠুমরী গেয়ে বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ ফৈয়াজ খাঁ সাহেবকে মুগ্ধ করেন, যা তার জন্য বিরাট স্বীকৃতি হিসেবে কাজ করে।

এই সময়েই শচীন দেব বর্মণকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে আসে শেখ ভানু রচিত ‘নিশিথে যাইয়ো ফুলবনে’ শীর্ষক দেহ ও সাধনতত্ত্বের কঠিন একটি গান, যা কবি জসীমউদ্দীন প্রেমের গানে রূপান্তরিত ও নববিন্যাস করে দেন। গ্রামোফোন রেকর্ডে গানটি প্রভূত বাণিজ্যিক সাফল্যও লাভ করে।

১৯৪৪ সাল থেকে স্থায়ীভাবে বোম্বাই শহরে বাস করেন শচীন কর্তা। বিভিন্ন গানে কণ্ঠদানের পাশাপাশি সঙ্গীত পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন বহু হিন্দি চলচ্চিত্রে। একদার ছাত্রী মীরা ধরকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। তার পুত্র রাহুল দেব বর্মণ বা এসডি বর্মণ সঙ্গীতাঙ্গনের আরেক দিকপাল।

শচীন কর্তার জীবনের প্রথম ২০ বছর কেটেছে জন্মস্থান কুমিল্লায়, মধ্যের ২০ বছর কলকাতায় আর শেষ ৩০ বছর বোম্বাই-এ। তবে ৭০ বছরের পুরো জীবনে তিনি একমনে বেয়েছেন গানের ভেলা, যা বর্ণিত আছে তার আত্মজীবনী ‘সরগমের নিখাদ’ শীর্ষক গ্রন্থে।

কিছুটা ‘অনুনাসিক কণ্ঠস্বর’ শচীনকর্তার ট্রেডমার্ক, যা তাকে আলাদাভাবে পরিচিতি ও বিশিষ্টতা দান করেছে এবং কালোত্তীর্ণ শিল্পীর মর্যাদায় বিপুল শ্রোতার অন্তরে স্মরণীয় করে রেখেছে।