কাতারি কোম্পানির আড়াই কোটি টাকা নিয়ে চম্পট দুই বাংলাদেশির

মাহমুদুল হাসান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, গাজীপুর
নাজমুল ও মুহাম্মদ রফিক

নাজমুল ও মুহাম্মদ রফিক

  • Font increase
  • Font Decrease

কাতারভিত্তিক ফুড সরবরাহ প্রতিষ্ঠান ‘কুইক ডেলিভারি’র ১০ লাখ ৫৪ হাজার ২৯৮ রিয়াল (২ কোটি ৪৫ লাখ ৫০ হাজার ৫৪৫ টাকা) আত্মসাৎ করে দেশে পালিয়ে এসেছে বাংলাদেশের দুই নাগরিক। এতে প্রতিষ্ঠানটির ১২০ জন রাইডার চরম অর্থাভাবে পড়েছে। পাশাপাশি কোম্পানিটির তিন বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠাতাকে ঋণের চাপে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। দেনা পরিশোধ করতে না পারলে তাদের দেশে ফেরা তো দূরের কথা দাঁড়াতে হবে কাঠগড়ায়। দেশে পালিয়ে আসা অন্য দুই সহ-প্রতিষ্ঠাতার এমন কাণ্ডে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিটি দেউলিয়া হওয়ার পথে।

ইতিমধ্যে অর্থ উদ্ধারে কাতারের দোহারে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছেন কোম্পানিটির তিনজন প্রতিষ্ঠাতা। যাদের দুজন বাংলাদেশি ও একজন কাতারের নাগরিক। আড়াই মাস আগে দূতাবাস থেকে পাঠানো চিঠিতে ঢাকার ডিসি, এসপি ও মিরপুরের ইউএনও এবং ওসিকে দুই প্রতারকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিলেও তারা কোনোও পদক্ষেপ নেননি।

চলতি বছরের ২১ জুলাই দুই প্রবাসীর বিরুদ্ধে ওই দেশের বাংলাদেশ দূতাবাসে করা অভিযোগ (স্মারক-৫৬৮) ও দূতাবাস থেকে দেশে পাঠানো ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনাপত্র বার্তা২৪.কমের হাতে এসেছে।

দূতাবাসে করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকার মিরপুরের (সেকশন-২, ব্লক-সি, রোড-৩, হাউজ-২) বাসিন্দা মুহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদের ছেলে মুহাম্মদ রফিক ও গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার উত্তর খামের এলাকার আব্দুল বাতেনের ছেলে নাজমুল ‘কুইক ডেলিভারি’ কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা। দুজন সুযোগ বুঝে কোম্পানি থেকে প্রতারণার মাধ্যমে হাতানো বিপুল অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে দেশে পাচার করে গত ২০ জুলাই পালিয়ে এসেছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, কাতারের নাগরিক হাসান এ কাদির হাসান সালেহ, কাতার প্রবাসী বাংলাদেশি নাগরিক মোহাম্মদ রনি মিয়া, ইমরান হুসাইন, রুবেল খান এবং অর্থ আত্মসাৎ করে দেশে পালিয়ে আসা মুহাম্মদ রফিক (পাসপোর্ট নম্বর- বিওয়াই ০৯১৯১৩৮, কাতারি আইডি- ২৭৫০৫০১১৯৮৩) ও নাজমুল (পাসপোর্ট নম্বর- বিআর ০৫৭৩১০৭, কাতারি আইডি- ২৭৬০৫০০৪৭১৩) এক বছর আগে অংশীদার ভিত্তিক ‘কুইক ডেলিভারি’ কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা করেন। যেটি কাতারের খ্যাতিমান ডেলিভারি কোম্পানি ‘তালাবাত’-এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে। কুইক ডেলিভারি কোম্পানির ১২০ জন রাইডার তালাবাতের অর্ডার সরবরাহে নিয়োজিত। প্রতিমাসের লভ্যাংশ ও রাইডারদের বেতন বাবদ কোটি টাকা কুইক ডেলিভারি কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে পাঠিয়ে দিতো তালাবাত। বাংলাদেশি নাগরিকদের হাতে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিটি বেশ সুনামের সঙ্গে সফলতার দিকে এগিয়ে গেলেও সব ভেস্তে দিয়েছে এই দুই প্রতারক। একই সঙ্গে তারা ক্ষুণ্ণ করেছে দেশের ভাবমূর্তিও।

গত ১২ জুলাই ১২০ জন রাইডারের জুনের বেতন বাবদ ৩ লাখ ৯ হাজার ৪৮ রিয়াল (৭১ লাখ ৯৫ হাজার ৩৭৪ টাকা) ব্যাংকে জমা করে তালাবাত। কিন্তু পাঁচজন অংশীদারের মধ্যে তিনজনকে না জানিয়ে কৌশলে অভিযুক্ত দুজন রাইডারদের বেতনের সব টাকা ব্যাংক থেকে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছে। একই সঙ্গে কুইক ডেলিভারি’র ১৫টি মোটরসাইকেল প্রতিটি ৯ হাজার ৫০০ রিয়াল বিক্রি করে (২ লাখ ২১ হাজার ১৮২ টাকা) মোট ১ লাখ ৪২ হাজার ৫০০ রিয়ালও (৩৩ লাখ ১৭ হাজার ৭৪০ টাকা) মেরে দিয়েছে। এছাড়াও ভোক্তাদের কাছ থেকে রাইডারদের সংগৃহীত ক্যাশ অন ডেলিভারির ৫০ হাজার রিয়াল (১১ লাখ ৬৪ হাজার ১১৯ টাকা) তালাবাতের ব্যাংক হিসাবে জমা না করে তারা হাতিয়ে নেয়। শুধু তাই নয়, কুইক ডেলিভারির ব্যাংক হিসাবের ক্ষমতাপ্রাপ্ত এই দুই প্রতারক কাতারি নাগরিকসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের কাছ থেকে কোম্পানির চেকের বিপরীতে ৫ লাখ ৫২ হাজার ৭৫০ রিয়াল (১ কোটি ২৮ লাখ ৬৯ হাজার ৩৩৭ টাকা) হাতিয়ে নিয়েছে।

উল্লেখিত অভিযোগ আমলে নিয়ে দেশে পালিয়ে আসা দুই প্রবাসীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দোহারে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের পরামর্শদাতা (শ্রম) ড. মুহাম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনাপত্র গত ২৩ জুলাই ঢাকার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও পুলিশ সুপার (এসপি), মিরপুর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর পাঠানো হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত দেশে পালিয়ে আসা দুই প্রবাসীর বিরুদ্ধে কোনোও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কুইক ডেলিভারি কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও নরসিংদীর বাসিন্দা মোহাম্মদ রনি মিয়া বার্তা২৪.কম-কে জানান, কাতারি একজন ও বাংলাদেশের চারজন অংশীদার ভিত্তিক ওই কোম্পানি প্রতিষ্ঠার পর মাশরাফ আল রাইয়ান ব্যাংকের করপোরেট শাখায় মেসার্স কুইক ডেলিভারি নামে চলতি হিসাব (নম্বর ১০০-১০৫৪৮৯-০০১০) খোলা হয়। এই হিসাবের ক্ষমতাপ্রাপ্ত (অথরাইজড) তিন জনের মধ্যে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া মুহাম্মদ রফিক ও নাজমুল রয়েছেন। অপর জন কাতারি নাগরিক হাসান এ কাদির হাসান সালেহ। মূলত রফিক ও নাজমুলই কোম্পানির হিসাব বিভাগটি পরিচালনা করতেন। সব সময় তারাই আর্থিক বিষয়গুলো দেখতেন। আমাদের কোম্পানিটি প্রতিষ্ঠা পেয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ তারা কৌশলে সব অর্থ হাতিয়ে ও কোম্পানির চেকের বিপরীতে দেনা করে পথে বসিয়ে দিল। এখন পাওনাদারদের হামলা-মামলার ভয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। এ কারণে দেশে আসাও অনিশ্চিত। এই বিপদ থেকে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা ছাড়া বাঁচার উপায় নেই।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বার্তা২৪.কম-কে বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর আছে। যেহেতু আইনি বিষয় তদন্ত করতে ও আসামি ধরতে সময় লাগে। বাংলাদেশের পুলিশ এবং গোয়েন্দা সংস্থা এখন আগের চেয়েও অনেক বেশি সক্ষম। আশা করি দ্রুতই তারা বিষয়টির সুরাহা করতে পারবে।

আড়াই মাসেও কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা না নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিষয়টা এমন নয় যে ব্যবস্থা নিচ্ছে না। হয়তো আসামিদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা আদৌ বাংলাদেশে আছে না অন্য কোথাও পালিয়ে গেছে অনেক বিষয় থাকে।