উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৬০০ পরিবার



ইমাম খাইর, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, কক্সবাজার
উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৬০০ পরিবার

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৬০০ পরিবার

  • Font increase
  • Font Decrease

দুর্বৃত্ত ও বখাটেদের কারণে নিরাপত্তাহীনায় রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিকতার উদ্যোগ ‘খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প’-এর বাসিন্দারা। পথে গাড়ি আটকিয়ে ছিনতাই, বিনা কারণে ধরে ধরে মারধর, ফ্ল্যাটে গিয়ে বেপরোয়া বিচরণ ও উত্যক্তকরণে বিরক্ত জলবায়ু উদ্বাস্তুরা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বিচার দিলেও পাওয়া যায় না প্রতিকার।

বেশ কিছু দিন ধরে এমন অভিযোগের সূত্র ধরে সরেজমিন পরিদর্শনে গেলে বেরিয়ে আসে আরো অনেক অভিযোগ। এ সময় দুঃখের কথা তুলে ধরেছে ভুক্তভোগীরা।

শনখালী ভবনের ৫০৩ নম্বর ফ্ল্যাটের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম (৩৪)। পেশায় একজন দিনমজুর। মা জরিনা বিবি, বাবা আলী হোসেনসহ পরিবারের ৫ সদস্য নিয়ে সেখানে থাকে। কর্ম শেষে গত ১৭ অক্টোবর রাত ৮ টার দিকে বাসায় ফিরছিলেন। খুরুশকুল টাইম বাজার থেকে টমটমে করে মনুপাড়া পর্যন্ত পৌঁছতেই আটকে যায়। গাড়ির গতিরোধ করে নজরুলকে নামিয়ে ফেলে দুর্বৃত্তের দল। সারা শরীর তল্লাশি করে। এরপর পকেটে রাখা মজুরির টাকা ও ব্যবহারের একটি মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। দুর্বৃত্তরা তাতে ক্ষান্ত হননি। পার্শ্ববর্তী ধানক্ষেতে নিয়ে নির্দয়ভাবে মারধর করে। গলায় ফাঁস লাগিয়ে মেরে ফেলতে উদ্যত হয়। মাথা, হাত ও পায়ে ব্যাপক আঘাত করে। তাতে রক্তক্ষরণ হয় দিনমজুর নজরুলের। স্থানীয়দের সহায়তায় প্রাণে বেঁচে কোনমতে ফ্ল্যাটে গিয়ে ঠেকে।

আঘাতের যন্ত্রণায় সারারাত ছটফট করলেও হাসপাতালে যেতে সাহস পান নি নজরুল ইসলাম

তখনো শরীর থেকে রক্ত ঝরছে। আঘাতের যন্ত্রণায় সারারাত ছটফট করলেও হাসপাতালে যেতে সাহস পান নি নজরুল ইসলাম। কারণ, একদিকে সন্ত্রাসীদের ভয়। অন্যদিকে চিকিৎসা করার কোন টাকা পয়সা নেই। সারাদিন যা কামাই করেছিল তা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।

গত রবিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুর ১২ টার দিকে শনখালী ভবনের নীচে কথা হয় আহত নজরুল ইসলামের মা জরিনা বিবির সঙ্গে। সংবাদকর্মী পরিচয় পেয়ে অশ্রু গড়িয়ে নির্যাতনের বর্ণনা দিচ্ছিলেন তিনি।

ঝিনুক ভবনের ৫০১ নং ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম (২৮)। স্ত্রী, দুই সন্তান নিয়ে বসবাস। ফ্ল্যাটের নীচ তলায় একটি ছোট্ট একটি মুদির দোকান করে সংসার চালায়।

দুপুর সাড়ে ১২ টার দিকে দোকানের জন্য মালামাল নিয়ে ফিরছিলেন সিরাজ। মাঝপথে ছুরি দেখিয়ে তার গাড়ির গতিরোধ করে ৭ জনের দুর্বৃত্তের দল। সারা শরীর তল্লাশি করে কোন টাকা পয়সা না পেয়ে ক্ষুব্ধ দুর্বৃত্তরা জানান, পকেটে টাকা ছাড়া যেন বের না হয়।

সিরাজুল ইসলাম জানান, ৮০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে দোকান করছেন। প্রতি সপ্তাহে কিস্তির টাকা দিতে হয়। কোন মতে চলছে সংসার। কিন্তু এলাকার চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, দুর্বৃত্তদের কারণে জীবনের অনিরাপত্তাহীনায় ভুগছেন।

অট্টালিকার ফ্ল্যাটে থাকলেও সুখে নেই সিরাজের মতো জলবায়ু উদ্বাস্তুরা। প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী ও দুর্বৃত্তদের ভয় তাড়া করছে তাদের। চলতে ফিরতে জান হারানোর আশংকা। 

স্বামী ও ২ ছেলে নিয়ে গন্ধরাজ ভবনের ২০১ নং ফ্ল্যাটে বসবাস মরিয়মের। ১৭ অক্টোবর বিকালে অসুস্থ এক ছেলেকে ডাক্তার দেখাতে শহরে যাচ্ছিলেন। স্বাভাবিক পথে যেতে বাধা, তাই নৌকা নিয়ে বেক্রিমকোঘাট দিয়ে পার হচ্ছিলেন। কিন্তু নৌকাটি কূলে ভিড়তেই তা উল্টিয়ে দেয় স্থানীয় দুর্বৃত্তরা। কোলের সন্তানসহ পানিতে পড়ে সারা শরীর ভিজে যায় মরিয়মের। অসুস্থ সন্তানকে আর ডাক্তার দেখানো হলো না, ফিরে গেলেন বাসায়।

স্থানীয় কাউন্সিলরের কাছে অভিযোগ দিচ্ছেন বাসিন্দারা

কামিনী ভবনের নিচতলায় দেখা গেল অনেকগুলো মানুষের জটলা। তাঁরা কক্সবাজার পৌরসভার সংরক্ষিত ওয়ার্ডের (১,২,৩) কাউন্সিলর কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র শাহেনা আকতার পাখিকে নানা সমস্যার কথা তুলে ধরছেন।

সবার সামনে দুঃখের কথা বর্ণনা দেন প্রবাল ভবনের ৫০৬ নং ফ্ল্যাটের বাসিন্দা সায়রা বেগম (৪৫)। স্বামী নুরুল ইসলাম ও ৩ সন্তান নিয়ে তারা সেখানে থাকেন।

চার দিন আগে ছেলে রবিউল ইসলাম (১৬) এশার পর বাসায় ফেরার পথে ১০/২০ জনের কিশোর গ্যাং মিলে ব্যাপক মারধর করে। এমনভাবে মেরেছে যে, ঘটনাস্থলেই সে পায়খানা করে দিয়েছে। কি কারণে মেরেছে, কেউ জানে না। এখনো উত্তর পায় নি। ঘটনার পর থেকে ছেলে রবিউল বাসা থেকে আর বের হয় নি।

গত ১৭ অক্টোবর সকালে ৬ নং ঘাট দিয়ে নৌকাযোগে ফেরার পথে মারধরের শিকার হন সাদ্দাম হোসেন নামের জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারের আরেক সদস্য।

সাদ্দামের বর্ণনা, ফেরার পথে তার সন্দেহ হলে উল্টো দিকে যাচ্ছিলেন তিনি। তখন স্পিডবোট নিয়ে তাকে দৌঁড়িয়ে ধরে মারধর করে খুরুশকুল এলাকার কিছু বখাটে ছেলে। ফ্ল্যাটে না যেতে হুমকি দিয়ে চলে যায় তারা।

এভাবে প্রতিদিন ঘটনা ঘটাচ্ছে স্থানীয় বখাটে ছেলেরা। এসব ঘটনার কারণে আতংকিত ও উদ্বিগ্ন ‘খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পে’র বাসিন্দারা। তারা জীবন ও মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দাবি তুলেছে।

এদিকে, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের অভাব অভিযোগের কথা শুনতে (১৮ অক্টোবর) আশ্রয়ণ প্রকল্পে  ছুটে যান কক্সবাজার পৌরসভার সংরক্ষিত ওয়ার্ডের (১,২,৩) কাউন্সিলর কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র শাহেনা আকতার পাখি।

শাহেনা আকতার পাখি জানান, খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতার ফসল। জলবায়ু উদ্বাস্তুদের প্রতি তিনি আন্তরিক বলেই এত বিরাট কাজটি করেছেন। কিন্তু ফ্ল্যাটের বাসিন্দাদের প্রতি প্রতিনিয়ত এমন ঘটনার সংবাদ খুবই দুঃখজনক। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৬০০ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের দাবি তুলেন কাউন্সিলর পাখি।

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন জানান, ছোটখাটো ঘটনাগুলো প্রশাসন ইতোমধ্যে অবগত হয়েছে। স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি করার জন্য ঢাকায় প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। তার আগ পর্যন্ত অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প বসানোর চিন্তা চলছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের আইন শৃঙ্খলাসহ সার্বিক বিষয়ে সদর ইউএনও দেখভাল করছেন।

জেলা প্রশাসক জানান, ইতোমধ্যে এসব বিষয়ে জনপ্রতিনিধি, ফ্ল্যাটের বাসিন্দা ও স্থানীয় লোকজন নিয়ে সচেতনতামূলক সভা করা হয়েছে।

কক্সবাজার শহর থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার উত্তরে বিশ্বের বৃহত্তম ‘খুরুশকুল বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্পে’র অবস্থান। গত ২৩ জুলাই গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রথম ধাপে তৈরি ২০টি ভবনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় অন্তত ৬০০ জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবারের হাতে ফ্ল্যাটবাড়ির চাবি হস্তান্তর করা হয়। চাবিতে লেখা আছে, ‘আশ্রয়ণের অধিকার, শেখ হাসিনার উপহার।

আশ্রয়ণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর রামু ১০ পদাতিক ডিভিশন। এখানে নির্মাণাধীন ১৩৭টি পাঁচতলা ভবনের প্রতিটিতে ৬৫০ বর্গফুট আয়তনের ৩২টি করে ইউনিট (ফ্ল্যাট) থাকছে। সেখানে আশ্রয় নেবে ৩২টি করে পরিবার।

এ প্রকল্পে ১০ তলার আরেকটি দৃষ্টিনন্দন ভবন হচ্ছে। ভবনটির নামকরণ হয়েছে ‘শেখ হাসিনা টাওয়ার’।

২০১৮ সালে কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের করতে সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়। রানওয়েসহ অন্যান্য অবকাঠামো তৈরির জন্য অধিগ্রহণ করতে হয়েছে বিমানবন্দরের পশ্চিম পাশ লাগোয়া কুতুবদিয়াপাড়া, ফদনারডেইল, নাজিরারটেক উপকূলের বিপুল পরিমাণ সরকারি খাসজমি। সেখানে এক যুগের বেশি সময় ধরে বসবাস করছিল চার হাজারের বেশি জলবায়ু উদ্বাস্তু পরিবার।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে জেলার কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, পেকুয়াসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ঘরবাড়ি হারিয়ে বিমানবন্দরের পাশে সমুদ্র উপকূলে আশ্রয় নিয়েছিলেন এসব গৃহহীন মানুষ।

প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজারে এসে জনসভায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, মাথা গোঁজার বিকল্প ঠাঁই না করে সরকারি খাসজমি থেকে কাউকে উচ্ছেদ করা হবে না।

এরপর অধিগ্রহণ করা সরকারি খাসজমিতে বসবাসকারী ৪ হাজার ৪০৯ পরিবারের অন্তত ২০ হাজার জলবায়ু উদ্বাস্তুকে পুনর্বাসনের জন্য খুরুশকুল আশ্রয়ণ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। প্রকল্পের জন্য খুরুশকুলে অধিগ্রহণ করা হয় ২৫৩ দশমিক ৩৫০ একর জমি। প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে।

এ পর্যন্ত পাঁচতলাবিশিষ্ট ১৯টি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। আরও একটি ভবনের নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। এখন এসব ভবনে ফ্ল্যাট বরাদ্দ পেয়েছে ৬০০টি পরিবার।

প্রকল্পের একটি বিশেষ ব্যাপার হচ্ছে দৃষ্টিনন্দন ২০টি ভবনের নান্দনিক নামও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই।

নামগুলো হচ্ছে- দোলনচাঁপা, কেওড়া, রজনীগন্ধা, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, কামিনী, গুলমোহর, গোলাপ, সোনালি, নীলাম্বরী, ঝিনুক, কোরাল, মুক্তা, প্রবাল, সোপান, মনখালী, শনখালী, বাঁকখালী, ইনানী এবং সাম্পান।