বাঁধে ভাঙন: উৎকণ্ঠায় পদ্মাপাড়ের বাসিন্দারা



ডিস্ট্রিক করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার দেবীনগর ইউনিয়নের ছয়রশিয়া থেকে হড়মা পর্যন্ত পদ্মায় তিন বছর আগে নির্মিত নদী রক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। বন্যা পরবর্তী সময়ে গত প্রায় ৩ মাস থেকে শুকনো মৌসুমেও পদ্মায় তলিয়ে যাচ্ছে রক্ষা বাঁধ। এতে হাজারো উদ্বেগ-উৎকন্ঠা নিয়ে দিন পার করছে প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে পদ্মাপাড়ে বসবাস করা বাসিন্দারা।

নদী ভাঙনের কারণে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে ফসলি জমি ও বসতবাড়ি। শুষ্ক মৌসুমে হঠাৎ পদ্মা নদীর এমন আগ্রাসী ভাঙনে ঝুঁকিতে রয়েছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাঠ, মসজিদ, গোরস্থানসহ হাজার হাজার বসতবাড়ি ও হাজারও একর ফসলি জমি।

সরেজমিনে দেখা গেছে, পদ্মা তীরবর্তী হড়মা ঘাট এলাকায় থাকা নদী রক্ষা বাঁধের এক কিলোমিটারের মধ্যেই প্রায় ১৫-২০টি জায়গা ব্লকসহ নদীতে তলিয়ে গেছে। মাত্র ৩ বছরেই বাঁধ তলিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা। গত কয়েক বছরে ১০-১২ বার বাড়ি ভাঙতে হয়েছে ষাটোর্ধ আনোয়ার হোসনকে। অনেক আশা নিয়ে বাঁধের পাশে বাড়ি করেছেন গত বছর। তবে রক্ষা বাঁধ তলিয়ে যেতে শুরু করায় মাথায় হাত আনোয়ার হোসেনের।

আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ব্লক বিছানো ৩ বছর হলো, তাতেই তলিয়ে যেতে শুরু করেছে। হঠাৎ করে রাত-বিরাতে ব্লক খসে পড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে কিভাবে থাকবো আমরা? রক্ষা বাঁধ থাকলেও যে অবস্থা, না থাকলেও একই অবস্থা আমাদের।’

বাঁধে ভাঙন
খসে পরছে বাঁধের ব্লক। ছবি: বার্তা২৪.কম

হড়মা দানেশ আলীর টোলা গ্রামের আলহাজ্ব আমজাদ আলীর ছেলে মো. টিপু সুলতান বলেন, ‘মরা নদীর মুখ থেকে হড়মা ঘাট পর্যন্ত অন্তত ২০ জায়গায় এমন ভাঙন হয়েছে। বাঁধ ভেঙে এই এলাকার সবকিছুই অনেক ঝুঁকিতে পড়ে গেছে। এখানকার মানুষ এখন নিরুপায় হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছে।’

সত্তর বছর বয়সী প্রবীণ আজহার আলী বলেন, ‘বারবার বাড়ি ভাঙছি, বারবার নদী ভাঙনের শিকার হচ্ছে। জমিজমা হারিয়ে অন্যের আম বাগানে ১০ হাজার করে ভাড়া দিয়ে বসবাস করছি।’

দিনমজুর সাত্তার আলী বলেন, ‘নদীর ভাঙনে সবকিছু হারিয়েছি। এই মুহূর্তে কোনও জায়গা-জমি নাই। পরের জায়গায় বসবাস করছি। এতো কম সময়ে কিভাবে ভাঙলো? অব্যশই কাজে গাফিলতি আছে, তাই বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।’

ভাঙন শুরু হলেই চোখে পানি চলে আসে- জানিয়ে মেসের আলীর স্ত্রী নাজমা বেগন বলেন, ‘নদীর পানি যখন ভরপুর ছিল, তখনও ভাঙন ছিল না। অথচ এখন বাঁধ ভাঙছে।’

ভাঙন কবলিত এলাকার রহিমা বেগম বলেন, ‘তিন মাস আগের ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়েছি। এরপর থেকে অনেক কষ্টে দুই মেয়ে ও এক ছেলেকে নিয়ে অন্যের জায়গায় কুঁড়ে ঘরে বসবাস করছিলাম। ওই সময়ের ভাঙন থেকে রেহাই পাওয়া ১২ শতাংশ জমিতে টমেটোর চাষ করেছিলাম। অসময়ে হঠাৎ নদী ভাঙনে নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে আমার শেষ সম্বলও। এখন আমার দারানোর কোনও জায়গা নেই। এই ভাঙন আমার জীবনের প্রথম নয় এর আগে ও আরও তিন বার ভেঙেছে, তবে এবার নিঃস্ব হলাম।’

পদ্মা পাড়ের এক গ্রাম্য চিকিৎসক জানান, ভাঙন মৌসুমে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা নদী শাসনের আশ্বাস দিলেও তার কোনও বাস্তবায়ন নেই। যে কারণে প্রতি বছর পদ্মা নদীর ভাঙনে বসতি ও আবাদি জমি নদী গর্ভে চলে যায়। এখন শুকনো মৌসুম। নদী শাসনের উপযুক্ত সময়। কিন্তু তার কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। আমরা কোনও চাল বা গম চাই না, চাই নদী শাসন।

দেবীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রহিম বলেন, ‘নদীর পানির লেয়ার নিচে নেমে যাওয়ায় বর্ষা মৌসুমের মতোই অসময়ে নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করি, খুব দ্রুতই কাজ শুরু হবে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওদুদ বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে বাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যে মন্ত্রী ও সচিব বরাবর কয়েকদফা ডিও লেটার দিয়েছি। চরবাগডাঙ্গা ও দেবীনগর এলাকার নদী রক্ষা বাঁধ নির্মাণে ৫৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। প্রকল্পের কাজ খুব দ্রুত সময়ে শুরু হবে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মেহেদী হাসান মুঠোফোনে জানান, হড়মা ঘাটের নদী রক্ষা বাঁধ তলিয়ে যাওয়ার মূল কারণ হলো, সেখানকার ভিন্ন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। পদ্মা-মহানন্দার মোহনা ও অতিরিক্ত গভীর হওয়ায় এমনটি হতে পারে।

বাঁধ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আরও বলেন, কয়েক দফার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে। খুব শিগগিরই কাজ শুরু হবে।