রসিকে দুর্নীতি: অভিযুক্তরা বাদ, সাক্ষীই একমাত্র আসামি



স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, রংপুর
রংপুর সিটি করপোরেশন। ছবি: বার্তা২৪.কম

রংপুর সিটি করপোরেশন। ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

রংপুর সিটি করপোরেশনের (রসিক) ৩০ কোটি টাকার কাজ ভাগিয়ে নেওয়ার ঘটনায় মূল অভিযুক্তদের আড়াল করার অভিযোগ উঠেছে। ওই ঘটনায় ঠিকাদারি কাজের জন্য গণমাধ্যমে দরপত্র প্রকাশ না করে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের যোগসাজশে অর্থ আত্মসাতে যাদের নাম আসে অভিযোগপত্রে তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। উল্টো ওই ঘটনার সাক্ষী রসিকের সাবেক ক্যামেরাম্যান গোলজার হোসেনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) রংপুর কার্যালয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুই বছর আগে সাবেক মেয়র প্রয়াত সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টুর মেয়াদকালে গোপনে ৩০ কোটি টাকার ৪৯টি প্যাকেজের দরপত্র ও ১৮টি কোটেশন আহ্বান করা হয়। পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে রসিকের সেই সময়ের টেন্ডার কমিটির আহবায়ক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আকতার হোসেন আজাদ ও সদস্য সচিব তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এমদাদ হোসেনের বিরুদ্ধে। সংবাদপত্রে দরপত্র আহ্বান না করে জালিয়াতির এই ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় শুরু হলে বিষয়টি আমলে নেয় দুদক। ঘটনার তদন্তে দুদকের রংপুর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক জাহাঙ্গীর আলমকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা অভিযুক্ত প্রধান নিবার্হী আকতার হোসেন আজাদ ও প্রকৌশলী এমদাদ হোসেনসহ দুই ঠিকাদারের জবানবন্দী দেন। ক্যামেরাম্যান গোলজার হোসেনের জবানবন্দী নেন স্বাক্ষী হিসেবে।

পরে দুদকের তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন হলে সে সময়ের অভিযোগের সাক্ষী ক্যামেরাম্যান গোলজার রহমানকেই একমাত্র আসামি করে গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রংপুরের জেলা ও দায়রা জজ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপসহকারী পরিচালক নূর আলম।

আসামি গোলজার রহমানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযোগ করেন, চাকরির শর্ত অনুযায়ী, দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও অনুমোদনের কোনো ক্ষমতা ক্যামেরাম্যান গোলজারের ছিল না। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল বিভাগের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলী দরপত্রসহ সব কাজে সই করেন। সেই সময়ের রসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আকতার হোসেন আজাদ বর্তমানে দুদকের পরিচালক হিসেবে কর্মরত। নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদ হোসেনও পদোন্নতি পেয়ে রসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হয়েছেন। ঘটনায় তাদের দায় এড়াতে কৌশলে ক্যামেরাম্যানকে আসামি করা হয়েছে। প্রভাবশালী প্রকৌশলীদের আড়াল করতেই তাকে ফাঁসানো হয়েছে।

অভিযোগে জানা যায়, দরপত্র সংবাদপত্রে প্রকাশে ক্যামেরাম্যান-কাম-জনসংযোগ সহকারীর কোনো ক্ষমতা বা প্রমাণ না থাকলেও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আকতার হোসেন আজাদের একটি প্রত্যয়নপত্র আদালতে দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা। সাক্ষীকে আসামি বানানোর মামলার অভিযোগপত্রে সে সময় সংশ্লিষ্টরা স্বাক্ষর করার ক্ষমতা থাকার কারণে অভিযুক্ত হতে পারেন এই শঙ্কায় কর্মকর্তা আজাদ ও এমদাদ হোসেনও হন সাক্ষী। সাক্ষী করা হয়েছে পাঁচ মাস আগে মারা যাওয়া দৈনিক দাবানল সম্পাদক খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুলকেও।

ঘটনার সময় প্রয়াত সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু দায়িত্বে থাকলেও সাক্ষী করা হয় বর্তমান মেয়র মোস্তাফিজুর রহমানকে। বর্তমান মেয়র দায়িত্ব নেওয়ার পরই ২০১৮ সালের মার্চে রসিকের ১৭৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে (অস্থায়ী নিয়োগ) ছাঁটাই করে, সে সময় ছাঁটাই হন সাক্ষী থেকে আসামি বনে যাওয়া ক্যামেরাম্যান গোলজার।

আসামি গোলজারের অভিযোগ, সিটি করপোরেশনের সাবেক কর্মকর্তা আকতার হোসেন আজাদ পরে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত হন। সম্প্রতি তিনি দুদকের তদন্ত শাখার পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পান। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এমদাদ হোসেনও বর্তমান মেয়রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। গোলজারকে সে সময় ছাঁটাই করা হলেও অভিযোগপত্রে লেখা হয় ‘বরখাস্ত’। তিনি ক্যামেরাম্যানের দায়িত্বে থাকলেও অভিযোগপত্রে তা এড়িয়ে তাকে সহকারী জনসংযোগ কর্মকর্তা বলা হয়। গোলজারের দাবি, হঠাৎ সাক্ষী থেকে তাকে আসামি বানানোর তথ্য পেয়ে অবাক হন এবং দুদকের চেয়ারম্যান বরাবর পুনঃতদন্তের আবেদন করেন। এরপরও প্রভাবশালীদের চাপে তাকে মামলার একক আসামি করা হয়। সর্বশেষ গত ১৬ ফেব্রুয়ারি গোলজার দুদক চেয়ারম্যানের কাছে পুনঃ তদন্তের আবেদন করেন।

প্রভাবশালীচক্রকে রেহাই দিতে গোলজারকে ফাঁসানো হচ্ছে এমন অভিযোগের ব্যাপারে দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা উপসহকারী পরিচালক নূর আলম বলেন, ‘মামলার অভিযোগে যেমন ছিল, সে অনুযায়ী প্রতিবেদন দিয়েছি। প্রয়াত মেয়র ঝন্টু ওই দুর্নীতি করেছেন এবং গোলজার তার সহযোগী ছিলেন।’

পত্রিকায় দরপত্র আহ্বান না করে গোপন রাখা হলে সংশ্লিষ্ট কমিটি ফের টেন্ডার আহ্বান করতে পারতেন, তারা কেন সেই ব্যবস্থা নেয়নি- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেগুলো আমাদের তদন্তের বিষয় না।’

তবে যারা সংশ্লিষ্ট তাদের দায় নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দিতে পারেন নি।