লুসি হল্ট পেলেন বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র ও বয়স্ক ভাতার কার্ড



জহির রায়হান, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, বরিশাল
লুসি হল্ট পেলেন জাতীয় পরিচয়পত্র

লুসি হল্ট পেলেন জাতীয় পরিচয়পত্র

  • Font increase
  • Font Decrease

১৯৩০ সালের ১৬ ডিসেম্বর ব্রিটিশ শহর সেন্ট হেলেন্সে জন্ম গ্রহণ করেন লুসি হেলেন ফ্রান্সিস হল্ট । তিনি কোল হিলস জুনিয়র স্কুলের শিক্ষকতা থেকে বিদায় নেওয়ার পর মাত্র ১৯ বছর বয়সে মানবতার সেবায় অনুপ্রাণিত হয়ে নার্সিংকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। লুসি হেলেন শৈশবের পর থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করেছিলেন।

জানা গেছে, মানবতার সেবার অঙ্গীকার নিয়ে তিনি ১৯৬০ সালে বাংলাদেশে আসেন। ওই বছরেই বরিশাল অক্সফোর্ড মিশনে যোগদান করেন এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের পড়াতে শুরু করেন লুসি হেলেন । পরে তিনি যশোর, খুলনা, নওগাঁ, ঢাকা ও গোপালগঞ্জে ৫৭ বছর ধরে কাজ করেছেন। আরও জানা গেছে , লুসি হল্ট বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অসামান্য অবদান রেখেছেন।

নিজের জীবনকে তুচ্ছ করে যুদ্ধকালে তিনি যুদ্ধাহত লোকদের সেবা করেছেন। এ সময় লুসি যশোর ক্যাথলিক চার্চে কাজ করছিলেন, সেখানে তিনি শিশুদের ইংরেজি শেখাতেন। যুদ্ধ শুরু হলে স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য খুলনা চলে যান। মানুষের জীবন যখন বিপন্ন সেই বিপদের মধ্যেও তিনি নিকটবর্তী ফাতেমা হাসপাতালে ছুটে যান এবং যুদ্ধাহত সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসা সেবা দিতে চেয়েছেন।

তখন হাসপাতালের চিকিৎসকরা একজন বিদেশি নাগরিকের আগ্রহ দেখে বিস্মিত হন এবং দ্রুত সম্মতি দেন। এরপর তিনি যুদ্ধাহত মানুষদের সেবা করে আসছেন। এরপর ২০০৪ সালে তিনি অবসরে যান এবং ওই বছরেই বরিশাল অক্সফোর্ড মিশনে ফিরে আসেন। এরপর তিনি আর নিজের দেশ ব্রিটিশ শহরে ফেরেননি এবং এই দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি ভালোবাসার আকর্ষণে বরিশালেই অবস্থান করেন।

বরিশাল জেলা নির্বাচন অফিস ও সমাজসেবা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের জন্য তার অমিত ভালোবাসা ও মানবতার সেবায় নিবেদিত থাকার জন্য ২০১৮ সালের ৩১ মার্চ গণভবনে লুসি হেলেনকে নাগরিকত্ব সনদ প্রদান করে সম্মানে ভূষিত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা । সেই থেকে তার জন্য বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র ও বয়স্কভাতা বহি প্রদানের কার্যক্রম শুরু হয়।

এরপর চলতি মাসের সোমবার (০৮ মার্চ) বরিশাল সার্কিট হাউজ মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য মুজিব শতবর্ষে উপলক্ষে ৫ নারীকে সম্মাননার আয়োজন করে জেলা প্রশাসন। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখায় লুসি হেলেন ফ্রান্সিস হল্টকে বিশেষ সম্মাননা স্বারক প্রদান করা হয়। এছাড়াও তাকে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র ও বয়স্ক ভাতার বহি প্রদান করেন বিভাগীয় কমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম বাদল।

এসময় বরিশাল মেট্রোপলিটনের পুলিশ কমিশনার শাহাবুদ্দিন খান, জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন হায়দার, জেলা পুলিশ সুপার মো.মারুফ হোসেন, বরিশালের সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুল আলম, বরিশাল মহিলা পরিষদের সভাপতি রাবেয়া খাতুন, বরিশাল সনাকের সভাপতি শাহ সাজেদা ও জেলা প্রবেশন অফিসার মো. সাজ্জাদ পারভেজ প্রমুখ। এরপরে আরও চার নারীকে বিশেষ অবদানের জন্য সম্মাননা স্বারক প্রদান করেন অতিথিরা।

লুসি হেলেন ফ্রান্সিস হল্ট বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্র ও বয়স্ক ভাতার বহি পেয়ে অত্যন্ত খুশি। তার সব ইচ্ছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পূরণ করেছেন। এজন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। মৃত্যুর পর বাংলাদেশের মাটিতেই সমাহিত হতে চান লুসি হল্ট ।

বয়স্কভাতার বহি প্রদানের বিষয়টি বার্তা২৪.কম-কে নিশ্চিত করে বরিশাল জেলা প্রবেশন অফিসার মো. সাজ্জাদ পারভেজ জানান, লুসি হেলেন ফ্রান্সিস হল্ট বাংলাদেশি নাগরিকত্ব সনদে ভূষিত হওয়ার পর তার বয়স অনুযায়ী তাকে বয়স্ক ভাতার কার্যক্রম শুরু হয়। সে অনুযায়ী গত ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের ৮ মার্চ পর্যন্ত তার বয়স্কভাতার বকেয়া ৯ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়। এখন থেকে লুসি হল্ট অনলাইনে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে বয়স্কভাতার টাকা গ্রহণ করবেন বলেও জানান তিনি।

বরিশালের সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুল আলম বার্তা২৪.কম-কে জানান, প্রধানমন্ত্রী লুসি হল্টকে বাংলাদেশি নাগরিকত্ব সনদ দেওয়ার পরপরই তার জাতীয়পত্রের কার্যক্রম শুরু হয়।

এরপর রোববার (০৭ মার্চ) বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার দ্রুতভাবে লুসি হল্টের জাতীয় পরিচয় পত্রের ব্যবস্থা করতে বলে। তারপর সাথে সাথে নির্বাচন কমিশন-কে বিষয়টি অবহিত করলে সোমবার (০৮ মার্চ) সকালে নির্বাচন কমিশন থেকে অনুমতি পেলে দুপুরে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অনুষ্ঠানে লুসি হল্টকে তার জাতীয় পরিচয়পত্র তুলে দেওয়া হয়।