মাওয়া ঘাটে অ্যাম্বুলেন্স-লাশবাহী গাড়ি দেখে ‘ঘরমুখো’ যাত্রীর উল্লাস!



নাজমুল হাসান সাগর, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
অ্যাম্বুলেন্স-লাশবাহী গাড়ি দেখে ‘ঘরমুখো’ যাত্রীর উল্লাস!

অ্যাম্বুলেন্স-লাশবাহী গাড়ি দেখে ‘ঘরমুখো’ যাত্রীর উল্লাস!

  • Font increase
  • Font Decrease

মাওয়া থেকে: ভোরের আলো তখনও ফোটেনি। তারও আগে রাজধানী ঢাকাসহ আরো কয়েকটি এলাকার মানুষ দলে দলে এসেছেন মাওয়া-শিমুলিয়া তিন নাম্বার ফেরি ঘাটে। সকালের আলো ফুটতে ফুটতেই দলে দলে আসা মানুষ হাজারে পরিণত হয়েছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে রোদের তাপ। মগজ গলানো রোদের তাপ মাথায় নিয়ে সহস্রাধিক মানুষ ঘাটের পাটাতনে অপেক্ষা করছেন বসে, দাঁড়িয়ে। সবাই জানে ফেরি বন্ধ, তবুও চাতক পাখির মতো অপেক্ষায় আছেন নদী পার হওয়ার জন্য। অপেক্ষমাণ এসব মানুষ ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে আসা অপরিচিত হলেও কয়েক ঘণ্টার আড্ডায় সবাই অনেক আপন হয়ে গেছে।

‘আমরা না হয় ঈদ করতে যাব কিন্তু এই যে এই মহিলা তার শ্বশুরকে শেষ বারের মতো দেখতে যাবে কিন্তু তার যাওয়া কেন হবে না। অন্তিম সময়ে তার শ্বশুর ফরিদপুর হাসপাতালে ভর্তি। এই সময়ে যদি দেখতে না পারে তাহলে সারা জীবনের জন্য একটা আফসোস থেকে যাবে না?’

সালেহা নামে একজন পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী তারই পাশে বিধ্বস্ত অবস্থায় বসে থাকা নাজনীন আকতারকে দেখিয়ে এসব বলছিলেন। এবার মুখ খুললেন আসলাম মাতুব্বর নামে মাদারীপুর শিবচর এলাকার পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তি।

তাই সবাই অ্যাম্বুলেন্স দেখে এভাবে চিৎকার দিয়ে উঠেছেন

তিনি বলেন, এখানে অনেকেই আছেন আমার মতো বাধ্য হয়ে বাড়ি ফিরছেন। ছোট ছেলেটা অসুস্থ। এই সময় বাড়িতে না থাকলে তাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করার মানুষ নাই। আমি না থাকা অবস্থায় ছেলেটার কিছু হলে মরার আগ পর্যন্ত অপরাধী মনে হবে নিজেকে।

এমন সময় অপেক্ষমান যাত্রীরা সমস্বরে চিৎকার করে উঠলো। প্রথমে মনে হলো, যার জন্য এত অপেক্ষা সেই ফেরি এসে ঘাটে ভিরেছে! তাই এমন আনন্দ ধ্বনি। নদীর দিকে তাকালে দেখা যায়, না কোন ফেরি তো ঘাটে ভেরেনি। তাহলে কেনো এই আনন্দ ধ্বনি?

প্রশ্নের জবাব পাওয়া গেলো ফরিদপুর গামী এক যুবকের কথায়। আলামীন নামে এই যুবক পেশায় একজন শ্রমিক, কাজ করেন পুরান ঢাকার জুতার কারখানায়। তিনি বলেন, ওই দেখেন ঘাটে একটা অ্যাম্বুলেন্স আসছে। অ্যাম্বুলেন্স আর লাশবাহী গাড়ি আসলে ফেরি ঘাটে ভেড়াতে হবেই। আর ফেরি ঘাটে ভেরালে যাত্রীদের ফেরিতে উঠতে দিতে বাধ্য।

তিনি জানান, এখন বাজে সাড়ে আটটা। ভোর চারটার পরে এই ঘাট থেকে আর কোন ফেরি ছেড়ে যায়নি। এর মধ্যে তিনটা ফেরি এপারে আসলেও ঘাটে ভেরায়নি। এখন অ্যাম্বুলেন্স আর লাশবাহী গাড়ি ঘাটে আছে তাই একটা ফেরি তো ভেরাতেই হবে। আর ফেরি ঘাটে ভিরলেই নদী পার হওয়া নিশ্চিত। তাই সবাই লাশবাহী গাড়ি দেখে এভাবে চিৎকার দিয়ে উঠেছেন।

এবার এগিয়ে গিয়ে কথা হয় লাশবাহী গাড়ির ড্রাইভার অন্তরের সাথে। তিনি জানান, ঢাকা মেডিকেল থেকে লাশ নিয়ে ভাঙ্গায় যাব। কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে এটাই এখন দেখার বিষয়। আমাদের গাড়ি দেখে তো মানুষের আনন্দ আর ধরে না। কী এক নির্মম বাস্তবতা মুখোমুখি আমরা!

অ্যাম্বুলেন্স আর লাশবাহী গাড়ি আসলে ফেরি ঘাটে ভেড়াতে হবেই। আর ফেরি ঘাটে ভেরালে যাত্রীদের ফেরিতে উঠতে দিতে বাধ্য

বিশ মিনিট সময়ের ব্যবধানে আরো দুটি লাশবাহী গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স এসে দাঁড়ালো ঘাটে। প্রত্যেকবারই অপেক্ষমান যাত্রীরা চিৎকার করে উল্লাস প্রকাশ করেছেন! অবশেষে ঘাটে ভেরানো হলো, শাহ পরাণ নামে একটি ফেরি। ফেরির প্রবেশ দ্বার খুলে দিতেই অপেক্ষমান যাত্রীরা উঠে পড়লো। যেন বিশাল এক অ্যানাকোন্ডা গোগ্রাসে গিলছে সব!

সব যাত্রী ওঠা শেষ হলে একের পর একে উঠলো লাশবাহী গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্সগুলো।

এর ফাঁকেই চোখে পড়েছে অ্যাম্বুলেন্স ও অপেক্ষমান যাত্রীদের অভিনব এক ফন্দি! সব শেষে আসা অ্যাম্বুলেন্সটিতে কোন রোগী না থাকায় ফেরিতে ওঠার আগ মুহূর্তে সেটার পেছন ডালা দিয়ে বেশ কয়েকজন সাধারণ যাত্রীকে উঠে বসতে দেখা গেছে।

ওই অ্যাম্বুলেন্সের চালক বলেন, অনেকে ধারণা করেছিলো আজ ফেরিতে সাধারণ যাত্রীদের উঠতে দেবে না। তাই আমার ফাঁকা অ্যাম্বুলেন্সে তারা নদীটা পার হতে চেয়েছিলো। আমিও মানবতার খাতিরে রাজি হয়েছি এখন তো সবাই যাচ্ছে ফেরিতে। তবুও তারা আমার গাড়িতেই যাবে এসি আছে তাই।

কোন ধরণের টাকা পয়সা লেনদেন হয়েছে কী না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই আর কী, চা পানি খাওয়ার জন্য দেবে কিছু।

অবশেষে অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় হাজারো মানুষের। সকাল নয়টা ৫০ মিনিটে তিন নাম্বার ঘাট থেকে যাত্রীতে ঠাসা শাহ পরাণ ফেরি ছেড়ে যায় নদী পারের উদ্দেশ্যে।