স্বাধীনতার ৫০ বছরেও পরিবর্তন হয়নি যাদের জীবন



উম্মে হানি
নূরপুর ছড়ারপাড় তৃতীয় লিঙ্গ কমিটির সদস্য,২৭ মার্চ ২০২১,রংপুর। ছবি: উম্মে হানি।

নূরপুর ছড়ারপাড় তৃতীয় লিঙ্গ কমিটির সদস্য,২৭ মার্চ ২০২১,রংপুর। ছবি: উম্মে হানি।

  • Font increase
  • Font Decrease

**স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তিতে এসেও জীবনের চরম কষাঘাতে এখনো বিবর্জিত বাংলাদেশের তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ।

রংপুর নগরের জে.এন.সি রোডের ছড়ারপাড় এলাকার একটি জীর্ণ বাসায় ভাড়া থাকেন তৃতীয় লিঙ্গের প্রায় ২০ জন মানুষ। সামাজিক বৈষম্য,অসম দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বজন-বন্ধুহীন এই মানুষগুলো স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও অতিবাহিত করছেন এক পরাধীন অস্পৃশ্য জীবন।

স্নাতক তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত পড়া অপু একজন তৃতীয় লিঙ্গের। আশা ছিল পড়ালেখা শেষ করে শুরু করবেন চাকরি,নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে যোগ্যতানুসারে চেষ্টাও করেছিলেন বেশ কিছু জায়গায়। কিন্তু প্রতিবারই আশাহত হতে হয়েছে তাকে, তৃতীয় লিঙ্গের হওয়ায় ভাগ্য এবং চাকরি দুটোর কাছেই হার মানতে হয়েছে তাকে। অনেকটা বাধ্য হয়েই এখন তিনি জড়িয়ে পরেছেন ভিক্ষাবৃত্তির সাথে।

শুধু চাকরিক্ষেত্রে নয়, অপুর মতো এমনকি তৃতীয় লিঙ্গের সকলেই কষাহত সামাজিক অমর্যাদার জালে। সরকারি ভাবে রাষ্ট্রীয় জাতীয়তার স্বীকৃতি মিললেও বাস্তবে তার বাস্তবায়ন হয়েছে খুবই অল্প। শুধু সমাজ নয় পরিবার এবং স্বাভাবিক জীবন থেকেই বঞ্চিত এই মানুষগুলো।

নূরপুর ছড়ারপাড় তৃতীয় লিঙ্গ কমিটির সদস্য মনিষা এবং অন্যান্য সদস্যবৃন্দ, ২৭ মার্চ ২০২১,রংপুর। ছবি: উম্মে হানি

অপু জানান, স্কুলে পড়াকালীন সময়ে তাকে স্কুল পরিবর্তন করতে হয়েছিল বারবার। সহপাঠিদের নেতিবাচক দৃষ্টির পাশাপাশি শিক্ষকরাও করতেন অবমাননা। শেষ পর্যন্ত এখন তিনি আশ্রয় নিয়েছেন নূরপুরের এই বাড়িটিতে।

রংপুর জেলায় ৩৭০ জনেরও বেশি তৃতীয় লিঙ্গের বসবাস। নূরপুরের এই জরাজীর্ণ ভাড়া বাসাতেই রয়েছেন ২০ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। যাদের মধ্যে ১০-১২ জন রয়েছেন যারা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন। প্রত্যেকটি মানুষই স্বপ্ন দেখেছিলেন সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজের ভাগ্য ফেরাবেন। কিন্তু সমাজ এবং সহপাঠিদের অসম দৃষ্টিভঙ্গি বেশিদূর আগাতে দেয়নি তাদের।

স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও তাদের মতো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের জীবনে খুব বেশি পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করেন না নূরপুরের বসবাসরত তৃতীয় লিঙ্গ জনগোষ্ঠীর দলনেতা আনোয়ারুল ইসলাম রানা।

বেশ আক্ষেপের সূরেই তিনি বলেন, প্রথম থেকেই আমরা চাকরি থেকে শুরু করে নিজে স্বাবলম্বী হওয়ার চেষ্টা তো করেছি। চাকরিতে গেলে যখন দেখে আমরা অন্যরকম, অনেকটাই আলাদা অন্যের থেকে তখন আর কেউ চাকরিতে নেয় না। আর এ থেকেই বাধ্য হয়েছি আমরা ভিক্ষাবৃত্তিতে। সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টি থেকে বেড়তে পারিনা আমরা।

তৃতীয় লিঙ্গ হয়ে জন্ম নেয়াটাই শাস্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে এই মানুষগুলোর কাছে। দীর্ঘকাল ধরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। সমাজের যে মূলস্রোতধারা রয়েছে তা স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসেও যেন নামেমাত্র স্পর্শ করেছে তাদের।

কারিগরি শিক্ষায় নিজেকে বদলে ফেলতে চেয়েছিলেন মনিষা। কিন্তু সেখান থেকে ছিটকে পরেছেন শুধুমাত্র তৃতীয় লিঙ্গ হওয়ার প্রতিবন্ধকতার জন্য। এরপর সেই পথ ছেড়ে জড়িয়ে পড়েছেন ভিক্ষাবৃত্তির মত কাজে। স্বাধীনতার প্রসঙ্গ আসতেই বললেন "দেশ স্বাধীন হয়েছে তো অনেক বছর, আমরা স্বাধীন আর হলাম কই? এখনো পাইনা চাকরি করতে,পাইনা সম্মানের সাথে মাথা উচু করে দাঁড়াতে।আমাদের স্বাধীনতা স্পর্শ করে না"

২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে ভোট দেয়ার ভোটাধিকার প্রধান করেন। এর আগে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের ছেলে কিংবা মেয়ে হিসেবে ভোট প্রদান করার নিয়ম ছিল। তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি মিললেও মৌলিক ও মানবিক অধিকার আজও এই স্বাধীন দেশে তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

ভোটার আইডি কার্ডে উল্ল্যেখিত "হিজরা" শব্দটিতেও ভীষণ আপত্তি দলনেতা রানার। তার মতে হিজরা শব্দটি ব্যবহার করে তাদের আরো ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে তারা বৈষম্যপীড়িত। তিনি মনে করেন "হিজরা" শব্দটির জায়গায় আরো মার্জিত শব্দ ব্যবহার করা যেতে পারত।

তৃতীয় লিঙ্গের এসব মানুষেরা স্বপ্ন দেখেন নিজের জীবন পরিবর্তন করার। কিন্তু চোখে মুখে হাজারটা স্বপ্ন নিয়েও স্বাধীনতার এত বছর পরেও এই মানুষগুলো কাটাচ্ছেন পরাধীন ভাসমান জীবনযাপন।