চাকরিতে প্রবেশের বয়স না বাড়িয়ে সমন্বয় করার পরিকল্পনা



শাহজাহান মোল্লা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

দেশের শিক্ষিত তরুণদের দীর্ঘ দিনের দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩৫ বছর করার। সেই দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে অনেক সংসদ সদস্য সংসদে প্রস্তাব তুলেছেন। তবে কিছুতেই মন গলছে না নীতি নির্ধারণী মহলের। তাই চাকরিতে প্রবেশের বয়সসমী বাড়ানোর কোন পরিকল্পনাই নেই সরকারের।

বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘ প্রায় দুই বছর স্বাভাবিক নিয়োগ প্রক্রিয়া কার্যত বন্ধ। মাঝে দুই একটি মন্ত্রণালয় বা সংস্থায় নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিলেও পুনরায় করোনার প্রকোপ বাড়ায় সেই নিয়োগ প্রক্রিয়াও স্থগিত। ফলে শিক্ষিত তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে হতাশ দীর্ঘ হচ্ছে। অনেকে বসে বসে বয়স পার হয়ে যাওয়ায় চরম হতাশায় ভুগছেন।

আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নাজিবুল্লাহ রাব্বি হিসাব বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এমবিএ কোর্স শেষ করেছেন ২০১৬ সালে। এরপর থেকে ঢাকাতে বসেই সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় চাকরির জন্য আবেদন করে আসছেন। কয়েকটিতে পরীক্ষা দিলেও শেষ পর্যন্ত টেকেননি।

নাজিবুল্লাহ রাব্বি বার্তা২৪.কম বলেন, “এমবিএ শেষ করার পর থেকে সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। তারমধ্যে জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে একটি পরীক্ষা দিয়েছি কিন্তু করোনার কারণে সেই পরীক্ষার ফল এখনো বের হয়নি। এছাড়া সবশেষ গত মাসে বাংলাদেশের মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে একটি পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল সেটিও করোনার কারণে পিছিয়ে যাচ্ছে। এদিকে আমার সার্টিফিকেটের বয়স শেষ হয়েছে ২০২০ সালের অক্টোবরে। এখন খুব চিন্তায় পড়ে গেছি। করোনা না থাকলে হয়তো পরীক্ষাটা অন্তত দিয়ে দেখতে পারতাম নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী। কিন্তু সেই সুযোগও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, আমি আমার বাবা-মার একমাত্র ছেলে। বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরিজীবী। আমার ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে ভাবতে বাবা-মা ও অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। লেখাপড়া শেষে একটা চাকরি না হলে বেকার জীবনে বন্ধুও থাকে না। প্রতিদিন নানা দুশ্চিন্তায় ঘুম হয় না। করোনায় মারা যাওয়ার চাইতে কষ্টের মনে হচ্ছে বেকার জীবন।

সরকারি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরে চাকরি প্রত্যাশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কোন সুযোগ না থাকলেও একবছর পুষিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এজন্য সকল মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরে এরইমধ্যে নির্দেশনা পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বার্তা২৪.কম-কে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন।

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে জনপ্রশান প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, এরকম কোন পরিকল্পনা নাই। তবে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত চাকরি প্রত্যাশীদের একটা সুযোগ থাকছে সেটি হচ্ছে আমাদের অনেকগুলো মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরে ২০২০ সালের আগস্ট মাসে একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হওয়ার কথা ছিল সেটা হয়তো এখন হবে বটে কিন্তু আমরা তারিখ দেব যে ২০২০ সালের ১৪ আগস্ট পর্যন্ত যাদের বয়স ৩০ বছর হয়েছে তারাও আবেদন করতে পারবে। এই নির্দেশনা প্রতিটি জায়গায় দিয়ে দিয়েছি।

তিনি বলেন, সরকারের পলিসি হচ্ছে সরকারি চাকরিতে ৩০ বছরের মধ্যে যোগদান প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে আর ৫৯ বছরে পিআরএল এ যাবে। এর বাইরে কোন পরিকল্পনা আপাতত নেই। তবে আমরা দেখেছি এক শতাংশও না যাদের বয়স ৩০ পার হয়েছে এই সময়ে। তারপরেও আমরা বিষয়টা ২০২০ সালের আগস্ট ধরে পুষিয়ে দেব।

গত ১৫ জুন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত সরকারি চাকরিজীবীদের তথ্যসংক্রান্ত ‘স্ট্যাটিসটিকস অব সিভিল অফিসার্স অ্যান্ড স্টাফস, ২০২০’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে সরকারি চাকরিতে ৩ লাখ ৮০ হাজার ৯৫৫টি পদ শূন্য। এর মধ্যে তৃতীয় শ্রেণিতে সবচেয়ে বেশি পদ শূন্য। এই স্তরে প্রায় দুই লাখ পদ শূন্য রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে মোট অনুমোদিত পদ ১৮ লাখ ৮৫ হাজার ৮৬৮ জন। এর মধ্যে কর্মরত ১৫ লাখ ৪ হাজার ৯১৩ জন। এদের মধ্যে নারী ৪ লাখ ১৪ হাজার ৪১২ জন।

প্রতিবেনে বলা হয়েছে, শূন্য পদের মধ্যে প্রথম শ্রেণির পদ ৪৬ হাজার ৬০৩টি, দ্বিতীয় শ্রেণির পদ ৩৯ হাজার ২৮টি, তৃতীয় শ্রেণির পদ ১ লাখ ৯৫ হাজার ৯০২টি এবং চতুর্থ শ্রেণির পদ ৯৯ হাজার ৪২২টি।

এদিকে বেকার সংখ্যা নিয়ে সবশেষ ২০১৯ সালের ২০ জুন একটি পরিসংখ্যান সংসদে প্রশ্নোত্তরে তুলে ধরেছিলেন শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান। সংসদে দেওয়া ওই তথ্যানুযায়ী দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ ৭৭ হাজার। এসব বেকারদের মধ্যে ১০ লাখ ৪৩ হাজার শিক্ষিত তরুণ-তরুণী, যারা উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পাস। অর্ধশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৪০ শতাংশ।

সরকারি চাকরিতে প্রবেশে একসময় সর্বোচ্চ বয়স ছিল ২৫ বছর। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুর দিক থেকেই এই বয়স ২৭ বছরে উন্নীত করা হয়। ১৯৮০-এর দশকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় সেশনজটের ফলে শিক্ষার্থীদের অধিকাংশ স্নাতক, বিশেষত স্নাতকোত্তর শিক্ষা ২৭ বছর বয়সের মধ্যে শেষ করতে পারছিল না। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত প্রায় ১৫ বছরের সামরিক-আধা সামরিক শাসনের পর নতুনভাবে দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে এলে সরকার বিষয়টি অনুধাবন করে ১৯৯১ সালে চাকরিতে প্রবেশের বয়স তিন বছর বাড়িয়ে ৩০ বছরে উন্নীত করে।