একটু হাওয়া খাইতে বাইর অইছি!



আনিসুর বুলবুল
মাটিকাটা মোহনগঞ্জ বস্তির সামনে আড্ডা

মাটিকাটা মোহনগঞ্জ বস্তির সামনে আড্ডা

  • Font increase
  • Font Decrease

কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই রাজধানীর অলিগলি থেকে প্রধান সড়ক সব জায়গায় কারণে-অকারণে লোকজনের বাইরে বের হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। পাড়া-মহল্লা-বাজার এলাকায় রীতিমতো আড্ডায় মেতেছে মানুষ। স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা করছে না অনেকেই। যদিও বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কেউ নিয়ম না মানলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়াও হচ্ছে।

রাজধানীর মিরপুর, ভাষাণটেক, মাটিকাটা, বাগানবাড়ি, ইসিবি চত্বর ও মানিকদি এলাকা ঘুরে এমন দৃশ্য চোখে পড়ে। এসব এলাকার অনেকেই বিনা কারণে ঘর থেকে বের হয়েছেন। অনেকে মাস্ক পরছেন না, কেউবা ঝুলিয়ে রাখছেন থুতনিতে কিংবা হাতে।

সকালে মাটিকাটা কাঁচাবাজারে গিয়ে দেখা যায়, মানুষের প্রচণ্ড ভিড়। কেউ ভিড় করে সবজি কিনছেন। কেউ বিনা কারণে ঘোরাঘুরি করছেন। অধিকাংশের মুখে মাস্ক দেখা যায়নি। একই অবস্থা ভাষাণটেক ও মানিকদি বাজারেরও।

মাটিকাটা মোহনগঞ্জ বস্তির সামনে পানির পাম্পের কাছে লোকজনকে অকারণেই বসে থাকতে দেখা গেছে। সকাল থেকে শুরু করে সন্ধ্যা পর্যন্ত শিশু-কিশোর-তরুণ-বৃদ্ধ সব বয়সিদের রীতিমতো আড্ডা চলে সেখানে। অনেককে দেখা গেছে চেয়ার নিয়েও বসে থাকতে। পাশের চায়ের দোকানে অর্ধেক শাটার নামিয়ে চা বিক্রি করতেও দেখা যায়।

বিকেলে রাজধানীর ইসিবি চত্বর এলাকায় কথা হয় ইমরান নামের এক তরুণের সঙ্গে। ইমরান বলেন, গাড়িতে হেলপারি করতাম। এহোন তো গাড়ি বন্ধ। ঘরে থাকতে মন চাইছিলো না। তাই একটু হাওয়া খাইতে বাইর অইছি।

মাটিকাটা বাজারের প্রবেশমুখে একজন মোটরসাইকেল আরোহীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি সবজি কিনতে এসেছেন বাজারে। বললেন, ঈদের পর আর বাজারে আসা হয়নি। বাসার সব সবজি শেষ। মাত্রই এসেছি, কিছু সবজি কিনে নিয়েই বাসায় চলে যাবো।

বাজার করে ফিরছিলেন বাগানবাড়ি এলাকার বাসিন্দা সাজ্জাদ হোসাইন। তিনি বললেন, রাস্তায় আজ লোকজন একটু বেশি। দেখে মনে হলো বেশিরভাগই লোকজনই অকারণে হাঁটাহাঁটি করছেন।

মানিকদি এলাকার রিকশাচালক জাকারিয়া বললেন, ঈদে বাড়িতে গেছিলাম। পরশুদিন গাবতলী থেকে হেটে এসেছি। চার ঘণ্টা লেগেছে মানিকদি আসতেই। এতো মানুষের ভিড় ছিল যে ভাবতেও পারি নাই। সেদিনের সেই তুলনায় আজকে মানুষ তো কমই!

একই চিত্র রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও বাজার এলাকাতেও। প্রধান সড়কগুলোতে গণপরিবহন না চললেও রিকশা, মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত পরিবহন সবই চলছে। কঠোর লকডাউনের তৃতীয় দিনে রাজধানীতে ফিরছে অনেকেই।

এদিকে আজ দুপুরে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বরে বিজিবির তত্ত্বাবধানে মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম শুরু হয়। এ সময় মাস্ক না পরা ও বিনা প্রয়োজনে বাইরে বের হয়ে লকডাউনের আইন অমান্য করায় ২২ জনকে জরিমানা করা হয়।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট খায়রুন নাহার গণমাধ্যমকে বলেছেন, করোনা প্রতিরোধে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী লকডাউন বাস্তবায়নে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কেউ আইনের ব্যত্যয় ঘটালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সোপর্দ করছে। মাস্কবিহীন কাউকেই ছাড় দেয়া হচ্ছে না। করোনা প্রতিরোধে সবাইকে মাস্ক পরিধান করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। কেউ আইন অমান্য করলে জরিমানা অব্যাহত থাকবে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. এ এস এম আলমগীর গণমাধ্যমকে বলেছেন, মানুষকে কিছুতেই স্বাস্থ্যবিধি মানানো যাচ্ছে না। একধরনের লোক স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। সে কারণে লকডাউন কঠিন করা দরকার। এই শ্রেণির মানুষ কোনোভাবেই স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। মনে করছেন, অন্যদের হবে, তাদের হবে না। এটাই সমস্যা। যারা স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না, তারাই সংক্রমিত হচ্ছেন। এমনকি এই শ্রেণির মানুষ বাসার লোকজনদেরও আক্রান্ত করছেন। তার যখন অবস্থা ক্রিটিক্যাল হচ্ছে, তখন টেস্ট করলে দেখা যাচ্ছে বাসার সবাই করোনা পজিটিভ।

করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দুই সপ্তাহের এই বিধিনিষেধ কষ্ট করে হলেও সবাইকে মানতে হবে বলে মনে করছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন।

গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, চলমান বিধিনিষেধ কষ্ট করে হলেও মানতেই হবে। কারণ এখন ডেঞ্জার লেভেলের অনেক ওপরে আছি। সংক্রমণ হার ৫ শতাংশের নিচে নামতে হবে ও মৃত্যু দৈনিক ৫০ জনের নিচে নামতে হবে। তা না হলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় খোলা যাবে না। এখন যদি বিধিনিষেধ মানি, তারপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসতে ১৪ দিনের বেশি লাগতে পারে।