৬ মাসের মধ্যে দেশেই ভ্যাকসিন উৎপাদন সম্ভব



শাহজাহান মোল্লা, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
করোনা ভ্যাকসিন

করোনা ভ্যাকসিন

  • Font increase
  • Font Decrease

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মোকাবিলায় একমাত্র উপায় ভ্যাকসিন প্রয়োগ ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। ঘণবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও মানানো দুষ্কর। তাই বেশি সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনার বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু দেশের অধিকাংশ মানুষকে করোনা ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হলে শুধু সাহায্য বা বিদেশ থেকে আমদানির জন্য বসে থাকলে চলবে না।

এমন প্রেক্ষাপটে বিশেষজ্ঞরা দেশেই ভ্যাকসিন উৎপাদনের পরামর্শ দিয়েছেন। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভ্যাকসিন আমদানির ওপর নির্ভর না করে দেশেই ভ্যাকসিন উৎপাদনের ওপর জোর দিয়েছেন। ইতিমধ্যে এ বিষয়ে তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা মোতাবেক স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে। ভ্যাকসিন উৎপাদন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য দুটি কমিটি গঠন করা হয়। একটি হচ্ছে কোভিড-১৯ প্রতিরোধী ভ্যাকসিন উৎপান উপদেষ্টা কমিটি। এই কমিটির উপদেষ্টা করা হয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীকে। এছাড়া কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ও এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লি: এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। 

এছাড়া ৯ সদস্য বিশিষ্ট একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে। এজাড়া সদস্য হিসেবে রয়েছেন- ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর, অতিরিক্ত সচিব (জনস্বাস্থ্য) স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ, আইইডিসিআর এর পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ( পরিকল্পনা ও গবেষণা) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইন ডিরেক্টর (এমএনসিএন্ডএএইচ), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ডিন ড. আব্দুর রহমান, সদস্য সচিব এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লি: এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। 

কমিটি দুটির কাজ দেশে কার্যকর ও নিরাপদ ভ্যাকসিন উৎপাদনের পদক্ষেপ গ্রহণ, এ সংক্রান্ত প্রস্তাবসমূহ পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে সুপারিশ প্রদান, ভ্যাকসিন উৎপাদনে দেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রচেষ্টা গ্রহণ, উৎপাদন, সংরক্ষণ ও ব্যবহার পর্যায়ে মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাকরণ।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, কোন দেশ হতে ‘র ম্যাটেরিয়াল’ আমদানি করে দেশীয় উৎপাদন কেন্দ্রে ফিনিশ করা হবে তা আগে নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার অনুমোদন নিয়ে দেশীয়ভাবে ভ্যাকসিন তৈরির প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে। ইডিসিএল ভবনে ঔষধ প্রস্তুত করার কিছু যন্ত্রপাতি ইতোমধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। সেক্ষত্রে করোনা ভ্যাকসিন তৈরি করতে হলে ওইসব যন্ত্রপাতি অন্য নিরাপদ স্থানে স্থানান্তরের বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

দ্রুততম সময়ের মধ্যে ভ্যাকসিন উৎপাদনে সংসদীয় কমিটির নিকট পরামর্শ প্রদান করেছেন পারে। বিজ্ঞানী ড. সনজন কুমার দাস। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন, স্টিলের তৈরি অবকাঠামোর অভ্যন্তরে তৈরিকৃত ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করা সম্ভব। একটি ফিল্ড এন্ড ফিনিস ল্যান্ড করতে ১০ হাজার বর্গফুট অবকাঠামো পর্যাপ্ত। ফিল এন্ড ফিনিস যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে ৩ থেকে ৬ মাস সময় প্রয়োজন হতে পারে।

মন্ত্রীর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইডিসিএল ‘র যে অবকাঠামো রয়েছে তা পরিবর্তন করে সেখানে ৬ মাসের মধ্যে ভ্যাকসিন তৈরির অবকাঠামো নির্মাণ করা সম্ভব এবং দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক দক্ষ ছাত্র রয়েছে, যাদেরকে নিয়োজিত করে ভ্যাকসিন বোতলজাত করা যেতে পারে।

কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভ্যাকসিন উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করার লক্ষ্যে স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপ হিসেবে সরকারকে কার্যকর ও নিরাপদ ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য ফেইস-১ ফরর্মুলেশন ফিল্ড ফিনিশিং এন্ড প্যাকেজিং ইউনিট স্থাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। গোপালগঞ্জ প্রকল্পে আরডিপিপি পুনরায় সংশোধন করত ভ্যাকসিন উৎপাদন ইউনিট অর্ন্তভুক্ত করে কাজটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে।

আগামী ৬ মাসের মধ্যে ভ্যাকসিন তৈরির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও ‘র ম্যাটেরিয়ালসমূহ’ বিশেষজ্ঞ পরামর্শক্রমে করোনা ভ্যাকসিন তৈরির লক্ষ্যে মূল যন্ত্রপাতি ইউরোপ, আমেরিকা ও জাপান প্রভৃতি দেশ এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ হতে আমদানি করা হবে। ভ্যাকসিন তৈরির ‘র ম্যাটারিয়াল’ আমদানি ও টেকনোলজি ট্রান্সফারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি M/S Dyadic এর সাথে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের লক্ষ্যে খসড়া এমওইউ তৈরি করা হয়েছে। তাছাড়া রাশিয়ার স্পুটনিক ভি ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আবিষ্কৃত প্রোটিন ভ্যাকসিন তৈরির জন্য আলোচনা চলমান। ভ্যাকসিন উৎপাদনের লক্ষ্যে বিভিন্ন বিদেশি যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও সরবরাহ প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে প্রাথমিকভাবে প্রাক্কলিত দর তৈরি করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শক্রমে স্বল্প সময়ের মধ্যে স্টিলের অবকাঠামো নির্মাণ করে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপনের মাধ্যমে ভ্যাকসিন উৎপাদন ইউনিট চালু করার জন্য বিভিন্ন প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগাযোগ করে পরামর্শ গ্রহণ করা হয়েছে এবং সে অনুযায়ী স্টিলের অবকাঠামো তৈরি করা হবে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শমতে ২ ডিগ্রি থেকে ৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট এর কোল্ডরুম এবং কুলরুম নির্মাণের মাধ্যমে ভ্যাকসিন সংরক্ষণ করা যাবে।

ভ্যাকসিন উৎপাদনের বিষয়টি নিয়ে বুধবার (১৩ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকেও আলোচনা হয়। করোনার তৃতীয় ঢেউ যদি আবার আছড়ে পড়ে তাহলে সেক্ষেত্রে নিজেদের দেশে তৈরি ভ্যাকসিন যেন মানুষকে দেয়া যায় সেই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত করার করার পরামর্শ দিয়েছে।

বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য মুহিবুর রহমান মানিক বার্তা২৪.কম-কে মোবাইল ফোন বলেন, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দিক নির্দেশনা এবং দৃঢ়চেতা মানসিকতার কারণে করোনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম। বিশ্বের মধ্যে ২৬তম তারপরেও আমরা চাই একটি মানুষও যেন মারা না যায়। যেহেতু বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশে তৃতীয় ঢেউ দেখা দিয়েছে তাই আমরা শঙ্কিত। সেজন্য বলা হয়েছে তৃতীয় ঢেউ যদি এসেই যায় তাহলে আমাদের আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। কি করে দ্রুত ভ্যাকসিন উৎপাদন করে মানুষকে প্রয়োগ করার যায় সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে ৭ কোটি মানুষকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে কমিটিকে অবহিত করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। করোনার শুরুতে অনেক সমালোচনা থাকলেও প্রধানমন্ত্রীর সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তের কারণে আমরা অনেক ভাল অবস্থানে আছি।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি শেখ ফজলুল করিম সেলিম এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিটি সদস্য ও মন্ত্রী  জাহিদ মালেক, আ.ফ.ম রুহুল হক,  মুহিবুর রহমান মানিক, মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরী,  মোঃ আব্দুল আজিজ, সৈয়দা জাকিয়া  নুর, রাহগির আলমাহি এরশাদ ও মোঃ আমিরুল আলম মিলন অংশগ্রহণ করেন।