নিষেধাজ্ঞার শেষ সময়েও বরাদ্দের চাল পাননি জেলেরা



মীর ফরহাদ হোসেন সুমন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, লক্ষ্মীপুর
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মা ইলিশ রক্ষার্থে লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীতে গত ৪ অক্টোবর থেকে যেকোন ধরনের মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা চলছে। ২২ দিনের এ নিষেধাজ্ঞা শেষ হবে আগামীকাল ২৫ অক্টোবর। গত ২০ দিনে এখানে ২১৯ অভিযানে ১৩ জেলে আটক এবং ৩ লাখ মিটার জাল জব্দ করা হয়েছে।

এদিকে নিষেধাজ্ঞার সময় শেষ পর্যায়ে এলেও এখন পর্যন্ত মেঘনা উপকূলবর্তী বেশীরভাগ জেলে পূনর্বাসনের বরাদ্দকৃত ভিজিএফ এর চাল পাননি। এমন অভিযোগ করেছেন জেলেরা। তারা অভিযোগে আরও জানায়, ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় জেলেপ্রতি মাত্র ২০ কেজি চাল বরাদ্দ রয়েছে। যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। অথচ তা-ও বিতরণে দেরী হওয়ায় পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্টে রয়েছেন নিষেধাজ্ঞা মানে নদীতে না যাওয়া জেলেরা।

অপরদিকে জানা যায়, গত ২০ দিনে ২১৯টি অভিযান চালিয়েছে জেলা মৎস্য বিভাগ। অভিযানে ১৩ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। জাল জব্দ করা হয়েছে তিন লাখ ৯ হাজার সাতশ মিটার। আর ইলিশ মাছ জব্দ করা হয়েছে এক হাজার ২০ কেজি।

জেলা মৎস্য জরিপ কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম তালুকদার জানান, গত ৪ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে ২৪টি এবং মামলা হয়েছে ১৫টি।

তিনি জানান, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে আটক ১৩ জেলেকে ৩৩ হাজার টাকা অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জব্দকৃত ইলিশ মাছগুলো বিভিন্ন এতিম খানায় বিতরণ করা হয়েছে এবং মাছ শিকারের জালগুলো পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে।

সরেজমিনে গেলে জেলেরা অভিযোগ করে বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেরা যেন নদীতে মাছ ধরতে না যায় সেজন্য সরকার তাদের জন্য চাল বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় ১৯ দিনেও বেশীরভাগ জেলে বরাদ্দের সেই চাল পায়নি। বিশেষ করে জেলার রামগতি ও কমলনগর উপজেলায় জেলেরা এখনো চাল পায়নি। অথচ এ দুই উপজেলাতেই প্রায় ৩৫ হাজার কার্ড ধারী জেলে রয়েছে।

জেলার রামগতির বড়খেরি, চর গাজি, চর আলেকজান্ডার, পোড়াগাছা, পৌরসভা এবং কমলনগরের চর ফলকন, হাজির হাট, পাটারীরহাট ইউনিয়নের এখনো চাল বিতরণ হয়নি বলে জেলেদের সূত্রে জানা যায়।

জেলেরা আরও জানায়, ২২ দিনের অবরোধে জেলে প্রতি মাত্র ২০ কেজি করে চাল দেয়া হচ্ছে। মাত্র ২০ কেজি চাল দিয়ে কারো সংসার চলে না। তারা জানায়, জেলেরা নদীতে মাছ শিকার ছাড়া কোন কাজ করতে পারে না। তাদের প্রধান পেশা নদীতে মাছ শিকার করা। সরকার জেলেদের সুবিধা চিন্তা করে বরাদ্দ আরও বাড়ালে এবং সঠিক সময়ে বরাদ্দকৃত চাল বিতরণ করলে সমস্যার কিছুটা সমাধান হতো।

তারা আরও দাবি করেন, সরকার জেলেদের চাল বরাদ্দের পাশাপাশি সহজ শর্তে লোনের ব্যবস্থা করলে জেলে সম্প্রাদায়ের কষ্ট আরও লাঘব হতো।

তফসিল মাঝি নামের জেলে জানান, তিনি কমলনগর উপজেলার চর ফলকন ইউনিয়নের বাসিন্দা। তার জেলে কার্ড রয়েছে। নদীতে অবরোধ চলছে। যার কারণে মাছ শিকারে যাচ্ছেনা তিনি। অবরোধের সময় শেষ হয়ে এলেও তিনি সরকারি বরাদ্দের ২০ কেজি চাল এখনো পাননি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, এমনিতে ২০ কেজি চাল খুবই সামান্য বরাদ্দ। তারপরও সঠিক সময়ে না পেলে কিভাবে সংসার চলে?

গিয়াস উদ্দিন মাঝি নামের আরেক জেলে জানান, তিনি রামগতির আলেকজান্ডার ইউনিয়নের বাসিন্দা। নিষেধাজ্ঞা থাকায় নদীতে মাছ ধরতে যাচ্ছেন না। জেলে কার্ড থাকা স্বত্ত্বেও তিনিও এখন চাল পাননি। একারনে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

জেলা মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, লক্ষ্মীপুরের মেঘনা নদীতে গত ৪ অক্টোবর থেকে আগামীকাল ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত ২১ দিন সকল প্রকার মাছ শিকার নিষিদ্ধ করে মৎস্য বিভাগ। নিষিদ্ধ সময়ে ইলিশ মাছ ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন, মজুদ আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ জন্য নদীর পাশাপাশি উপকূলীয় মাছঘাট এবং হাটবাজারে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে জেলা মৎস্য অধিদফতর।

জেলা এবং উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ডসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। তাদের সমন্বয়ে নদীতে নিয়মিত অভিযান চালানো হয়।

সূত্র আরো জানায়, নদীতে মাছ শিকার থেকে বিরত রাখতে জেলার তালিকাভুক্ত ৩৮ হাজার ৭৩৬ জন জেলেকে ভিজিএফ এর আতওায় ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। জেলাতে প্রায় ৫৪ হাজারের বেশি জেলে রয়েছে। তাদের মধ্যে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৯ হাজার ৯৩৩ জন।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, কোনো জেলে যেন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ শিকার করতে না পারে, সেজন্য নদীতে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। অভিযান সফল হলে নদীতে ইলিশ মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।

এসময় তিনি আরও জানান, জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত চাল স্ব-স্ব ইউনিয়ন পরিষদে অনেক আগেই দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবুও জেলেরা এখনো চাল পাননি কেন তা তিনি জানেন না। এ বিষয়ে তিনি খোঁজ নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে জেলা মিটিং এ উত্থাপন করা হয়েছে। বরাদ্দ যেন বৃদ্ধি করা হয় তা নিয়ে প্রক্রিয়া চলছে।