যে জীবন ছিল ভাসমান জাল জলে, সে জীবন এখন এগিয়ে সমতলে



মীর ফরহাদ হোসেন সুমন, ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, লক্ষ্মীপুর
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার মজু চৌধুরীর ঘাটে মেঘনা ও রহমতখালীর মোহনায় নদীর জলে নৌকায় ভাসমান জীবনযাপন মানতা (জেলে) সম্প্রদায়ের। সেই মানতা সম্প্রদায়ের সর্দার সোহরাব মাঝি। তার জীবনের গল্প এগিয়ে চলার। স্বপ্ন ভেঙে স্বপ্ন গড়ার।

ভাগ্য বিড়ম্বনায় শিকার হয়ে সোহরাব মাঝির বাপ-দাদারা সমতলের জীবন থেকে ছিটকে পড়েন নৌকায় ভাসমান জীবনে। সমতলে একসময় তাদের জমিজমা সাজানো বাড়ি ছিল। সেইসব দেখার সৌভাগ্য হয়নি তার। বাবা মায়ের মুখে গল্প শুনেছেন কেবল। সেটি তার জন্মের এগারো বছর আগের ইতিহাস। নদী ভাঙনের কবলে বাপ-দাদার সহায় সম্পত্তি বাড়ী ঘর বিলিন হওয়ার এগারো বছর পর তার জন্ম। ততদিনে নদীতে তাদের ভাসমান জীবন যাপন। জন্মের পর থেকেই জল আর জালের সখ্যতায় বেড়ে উঠেছেন তিনি। বয়সের সিংহভাগ সময় নদীতে ভাসমান জীবন কাটিয়েছেন।

এখন ষাট বছরের সোহরাব মাঝি। ভাসমান জীবনে বাবার পর নিজে নেতৃত্ব দিয়েছেন মানতা সম্প্রদায়ের। খেয়ে না খেয়ে কোন রকম দিন কেটেছে তার। জীবিকার প্রয়োজনে নদীর জলে জীবন চাকা ঘুরাতে ঘুরাতে প্রকৃতি সহ নানান প্রতিকূলতার সাথে যুদ্ধ করেছেন একজীবন। তবুও জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়ার বাসনায় স্বপ্ন পুষেছেন একান্ত মনে। আবার এক সময় সমতলের জীবনে ফিরে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর থেকে দিনমান অক্লান্ত খাটুনি খেটেছেন জাল জলে।

সমতলে নিজের একটুকরো জমি হবে। ছোট্ট একটি সাজানো বাড়ী হবে। সমতলের সমাজে আর দেশ জনের মতো সামাজিক অধিকার সহ পরিবার পরিজন সহ জীবন কাটবে। লক্ষ্যে অটুট থেকে একটু একটু করে এগিয়ে নিয়েছেন লালিত স্বপ্নকে। ঠিকই ভাগ্য পরিক্রমায় সেই তিনি আজ ডাঙায়। সমতলের জীবন যাপন করছেন। কর্ম জীবনের শুরুটা একটি জাল নৌকা দিয়ে। সেই একটি নৌকা ধীরে ধীরে পাল্টে দিয়েছে তার জীবন চিত্র। আজ সোহরাব মাঝির আছে এক টুকরো জমি, পরিপাটি ঘর ও ছোট্ট একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

নদীতে ভাসমান জীবন পেরিয়ে তার স্বপ্ন এখন আরও প্রসারিত। ডাঙায় জনজীবনের সাথে জড়িয়ে তার স্বপ্ন এখন এগিয়ে চলছে সামনের দিকে। সভ্য সমাজে আত্ম প্রতিষ্ঠাসহ সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করতে এখন প্রচেষ্টা সোহরাব মাঝির।

গল্পের মতো বদলে যাওয়া জীবনে তিনি এখন জাল নৌকা ছেড়ে ব্যাবসায়ী জীবনে।

মজু চৌধুরীরহাট এলাকায় নদীর পাড়ে রয়েছে তার ছোট্ট একটি দোকান। সেই দোকানে চা-বিস্কিটসহ নিত্য প্রয়োজনীয় মালামাল সাজানো থরে থরে। নিজস্ব মালিকানার জমিতে এখন তার সাজানো ঘরে সুখের সংসার। এছাড়া সমতলের জীবনে তিনি নিজগুণে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছেন সামাজিক বিভিন্ন কর্মকান্ডে। বর্তমানে স্কুল, মসজিদ-মাদ্রাসাসহ নানা সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন একসময়ের ভাসমান জীবনধারী সোহরাব মাঝি। তিনি মেঘনাপাড় ধীবর বিদ্যা নিকেতনের পরিচালক, স্থানীয় জামে মসজিদের কোষাধ্যক্ষ এবং ডা. আব্দুল হক উচ্চ বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির অভিবাবক সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

জানা যায়, তার বাবা মৃত আরব আলী সর্দারের বসবাস ছিল চাঁদপুরে। তার জন্মের প্রায় ১১ বছর পূর্বে তাদের পরিবার সমতল ভূমিতে ছিল। ওই ভূমি মেঘনার ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকেই বসবাস নৌকায় ভাসমান জেলেদের (মানতা) সঙ্গে। তার জন্ম, বিয়ে, সংসার সবটাই নৌকায়। আর জীবিকা নির্বাহের একমাত্র পেশাও ছিল নদীতে মাছ ধরা। নদী থেকে ডাঙায় ফিরে গেলেও, মানতারা তাদের বহরের সর্দার হিসাবে তাকেই রেখেছেন। সোহরাব মাঝি নৌকায় নিজের ভাগ্যের বদল ঘটালেও তিনি এখন আর নৌকা চালান না। একটি নৌকা থেকে একপর্যায়ে দুইটি নৌকার মালিক হয়েছেন। বর্তমানে দুটো নৌকাই বিক্রি করে দিয়েছেন। জাল জলে এখন তার আর কোন সম্পর্ক নাই। তবু মানতা সম্প্রদায়ের জন্য মন কাঁদে তার।

সোহরাব মাঝি জানান, একসময় নদীতে মাছ ধরা শেষে বিকালে ঘাটে ফিরতেন। সে সময় নদী পাড়ে থাকতো পর্যটকদের ভিড়। তারা নৌকা করে নদীতে ঘুরতে চাইতেন। ক্লান্তি ও মাছ বিক্রির ব্যস্ততায় তার পক্ষে সেটা সম্ভব হয়ে উঠতোনা। এছাড়া তিনি ভাবতেন মাছ শিকার তার কাজ, মানুষকে নৌকায় ঘুরানো নয়। সেই সময় জেলাজুড়ে ছিল না বিনোদনের ভালো কোন ব্যবস্থা। তাই প্রতিনিয়ত প্রায় সকল বয়সীরাই দলে দলে আসতেন সদর উপজেলার মজু চৌধুরীর হাট ফেরি ঘাটে। নদী ও তীরবর্তী চরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসতেন তারা। চিত্তে আনন্দ লাভে নদী তীরে এই স্থানটি টানতো মানুষজনকে। তবে নদীতে নৌকায় ঘুরে বেড়াতে সেখানে ছিল না কোন নৌকা ঘাট। তাইতো বিনোদনের ষোলকলা পূরণ হতো না ভ্রমণ পিপাসুদের।

সোহরাব মাঝি বলেন, পর্যটকদের কথা ভেবে সিদ্ধান্ত নেই নিজের ছোট নৌকায় করে মানুষদের নদীতে ঘুরানোর। কখনো দুপুর থেকে বিকাল। আবার কখনো সন্ধ্যা পর্যন্ত। তাতে ভালো টাকা আসে। যা মাছ বিক্রির চেয়েও বেশি। আয় বেশি হওয়ায় একপর্যায়ে মাছ ধরা বন্ধ করে দিয়েছি। সারাদিন মেঘনায় মানুষদের ঘুরিয়েছি। এছাড়া চরগুলো থেকে নৌকা করে কৃষকদের ফসল আনা-নেওয়াও করতাম।

তিনি বলেন, কিছুদিন পর নতুন আরেকটি নৌকা কিনলাম। অন্য একজন মাঝি দিয়ে সেটি চালিয়েছি। পরবর্তীতে তার দেখাদেখি একে একে আরো ১৬ জন মাঝি ভ্রমণপিপাসুদের নদীতে ঘুরানোর কাজটি শুরু করেন। একসময় সকল মাঝি একত্রিত হন। গঠন করেন একটি সমিতি। ওই সমিতির নিয়মানুসারে পরিচালিত হতো ঘাটটি। তাছাড়া সমিতির প্রধান ছিলেন তিনি।

সোহরাব মাঝি জানালেন, দুইটি নৌকার আয় দিয়েই সংসারে সুখ ফিরে তার। পাশাপাশি কিছু টাকা সঞ্চয় করেছেন। জমানো ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ২০১১ সালে মজু চৌধুরীর হাট এলাকায় ১২ শতাংশ জমি কিনেছেন। এর ৪ বছর পর ওই জমিতে একটি পাকা ঘর তুলেছেন। পরিবার নিয়ে এখন তার ডাঙায়ই বসবাস। এ ছাড়াও সোহরাব মাঝি ২০১৯ সালে আরো ২ শতাংশ জমি কিনেছেন।

তিন ছেলের পিতা সোহরাব মাঝির স্বপ্ন এখন সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করার। যদিও একসময় আর্থিক সংকটের কারণে বড় ছেলে মো. আরিফ হোসেনকে পড়ালেখা করাতে পারেননি। এখন মেঝো ছেলে মো. শরীফ নবম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট ছেলে মো. রাতুলের বয়স ৫ বছর।

তিনি আরও বলেন, ভাসমান জেলেরা নদীতে যে টাকা আয় করেন তার বেশিরভাগ চলে যায় নৌকা ও জাল মেরামতে। তাই সঞ্চয় বলতে কিছু থাকে না তাদের। এজন্য যুগ যুগ ধরে তারা নদীতে ভাসমান থাকছেন। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ডাঙায় ফিরতে পারেন না।

তবে তিনি মনে করেন, সরকার পরিকল্পিতভাবে ডাঙায় আবাসস্থলের ব্যবস্থা করলে, মানতা সম্প্রদায়ের মানুষেরা একটা নিশ্চিত সুন্দর জীবনের অধিকারী হতো।

স্থানীয়ভাবে মানতা সম্প্রদায়ের উন্নয়নের কাজে জড়িত কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (কোডেক) প্রজেক্ট অফিসার সমাজকর্মী মোহাম্মদ হানিফ বলেন, নৌকা দিয়ে পর্যটকদের ঘুরে বেড়ানো সোহরাব মাঝি এখন ডাঙায় বসবাস করছেন। তার একটি দোকান রয়েছে। এতে তার জীবনমান অনেক উন্নত হয়েছে। তিনি ২০০৮ সাল থেকে মজু চৌধুরী হাট এলাকায় বসবাস করছেন বলে জানান তিনি।

কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (কোডেক) এর প্রকল্প সমন্বয়কারী মোরশেদা বেগম বলেন, মেঘনা উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার চররমনী মোহন ইউনিয়নে ৩৬টি গ্রামের ১৮০০ জেলে নিয়ে কাজ করছে কোডেক। তাদের মধ্যে সোহরাব মাঝি মানতা সম্প্রদায়ের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছে শক্তি থাকলে সবই সম্ভব।