‘টাকা জমাচ্ছি, আল্লাহর কাছ থেকে বাবাকে কিনে আনবো’

  • স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
  • |
  • Font increase
  • Font Decrease

ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

'টাকা জমাচ্ছি, আল্লাহর কাছ থেকে বাবাকে কিনে আনবো' কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন ২৮ অক্টোবর নিহত কনস্টেবল আমিরুল পারভেজের ৫ বছরের অবুঝ শিশু তানহা।

রোববার (১০ ডিসেম্বর) সকালে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা অডিটোরিয়ামে 'মায়ের কান্না ও অগ্নি-সন্ত্রাসের আর্তনাদ' এর যৌথ উদ্যোগে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও এর বিচারের দাবিতে আয়োজিত আলোচনা সভা হয়ে উঠে এমনই নানা দুঃসহ ঘটনার সাক্ষী। পুরো পরিবেশ ভারি হয়ে উঠে বিএনপি-জামায়াতের আগুন সন্ত্রাসে নিহত পরিবারের স্বজনদের কান্না ও আহাজারিতে।

বিজ্ঞাপন

নিহত কনস্টেবলের স্ত্রী বলেন, যদি আমার মেয়েকে কেউ টাকা দেয়, সে টাকা জমায়। আমি যদি জিজ্ঞেস করি, এই টাকা দিয়ে কী করবে? মেয়ে বলে, এ টাকা দিয়ে আমি বাবাকে আল্লাহর কাছ থেকে কিনে আনবো। এই কথার পরে আমি তাকে কী উত্তর দিব? আমার কাছে তো কোনো উত্তর নেই।

গত ২৮ অক্টোবর রাজধানীর ফকিরাপুল এলাকায় বিএনপির সঙ্গে সংঘর্ষে পুলিশ সদস্য কনস্টেবল আমিরুল পারভেজ নিহত হন। এছাড়াও ২০১৩/১৪ সালে বিএনপি জামায়াতের আগুন সন্ত্রাসে নিহত পরিবারের স্বজন ও ভিক্টিমরাও ছিলেন এ আলোচনা অনুষ্ঠানে। উপস্থিত হয়েছিলেন, ১৯৭৭ সালে সামরিক আদালতে বিচার হওয়া বিমান ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের স্বজনরা। ২১ এ আগস্টের গ্রেনেড হামলার স্বীকার মানুষজনও তাদের কষ্টের কথা বলে কাঁদিয়েছেন উপস্থিত দর্শনার্থীদের।

বিজ্ঞাপন

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি গাড়ি নিয়ে যাবার সময় দিনাজপুরে জামায়াত-বিএনপির লোকজন পেট্রোল বোমা মেরে পুরো শরীরে আগুন ধরে যায় জানিয়ে গাড়ি চালক বিল্লাল হোসেন বলেন, আমি তো কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি ছিলাম না। আমি তো কোনো রাজনৈতিক দলের সাথেও যুক্ত ছিলাম না। আমি আমার সংসার চালানোর জন্য গাড়ি চালায়। গাড়ি না চালালে আমার পরিবার খাবে কী? তাহলে কি আমি না খেয়ে থাকবো? আমি এখনো সুস্থ হয়ে হাঁটতে পারি না। আমার হাত, পা'সহ শারা শরীরে ব্যথা। আমার কী দোষ ছিল? আমাকে কেন পুড়তে হলো পেট্রোল বোমায়? এটাই আমার জানতে চাওয়া। 

আমাকে কেন পুড়তে হলো পেট্রোল বোমায়? 

উপস্থিত দর্শনার্থীদের প্রতি প্রশ্ন রেখে বেসরকারি চাকরিজীবী নোমান বলেন, আমার কী দোষ ছিল? ২০১৫ সালে অফিস শেষে বাসা যাবার পথে যাত্রাবাড়ীতে আমাদের গাড়ির উপর জামায়াত-বিএনপির সন্ত্রাসীরা পেট্রোল বোমা মারে। এতে পুরো গাড়িতে আগুন ধরে যায়। আমার পুরো শরীরেও আগুন লেগে যায়। আমি তো সাধারণ মানুষ। তাহলে আমাকে কেন পুড়তে হলো? শরীর পুড়ে যাবার অসহ্য যন্ত্রণা আজও বেড়াতে হচ্ছে আমাকে।

এসময় ভুক্তভোগীরা বিএনপি-জামায়াতের এই নৈরাজ্য বন্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আহবান জানান। তারা বলেন, আমরা যে অসহ্য যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি তা যেন আর কোনো মানুষ ভোগ না করে। আমরা এর অবসান চাই। আমরা চাই এই আগুন-সন্ত্রাসীদের কঠিন থেকে কঠিনভাবে বিচার করা হউক। এই বাংলাদেশে এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে কেউ যেন কোনো মায়ের বুক খালি করতে না পারে। স্ত্রী যেন তার স্বামীকে না হারায়। সন্তান যেন পিতা হারিয়ে এতিম না হয়। 

কেউ যেন কোনো মায়ের বুক খালি করতে না পারে 

সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের শাসনামলে স্বামী হারানো এক স্ত্রী বলেন, আমি জানতেও পারলাম না আমার স্বামীর কী দোষ। কেন আমার স্বামীকে বিচারের নামে প্রহসন করে হত্যা করা হলো? আমার স্বামীর লাশটা পর্যন্ত আমি দেখতে পারিনি। আমার শিশু সন্তানকে তার বাবার একটা ছবি দেখাবো, সে ছবিটি পর্যন্ত আমাকে দেয়া হয়নি। কত কান্না করলাম, কিন্তু আমার স্বামীর একটা ছবিও পেলাম না।

ভুক্তভোগীদের অসীম দুঃখের এমন অবর্ণনীয় দুঃখগাথায় ভারী হয়ে উঠে পুরো অডিটোরিয়াম। চোখের কোনায় জল নিয়ে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে দর্শনার্থীরা। এ যেন কষ্টের সাথে কাঁধ মেলানো। দুঃখ তাড়িয়ে একে অপরকে সান্ত্বনা দেয়ার অপচেষ্টা। তবুও একটুখানি দুঃখ তাড়ানোর উপায় পেয়ে, সেটাকেই সম্বল করে সমাপ্তি আসে অনুষ্ঠানের।