শান্তি-ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় টেকসই উন্নয়ন সম্ভব

ইসমাঈল হোসাইন রাসেল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ইউএনডিপির আয়োজনে দিনব্যাপী সম্মেলন, ছবি: শাহরিয়ার তামিম/ বার্তা২৪.কম

ইউএনডিপির আয়োজনে দিনব্যাপী সম্মেলন, ছবি: শাহরিয়ার তামিম/ বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

শান্তি, ন্যায়বিচার ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব বলে মত দিয়েছেন দেশি-বিদেশি বিশ্লেষকরা। তারা বলেছেন, বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে (এসডিজি) পৌঁছাতে হলে বৈষম্য, সংঘাত ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে হবে। বাড়াতে হবে জবাবদিহিতা এবং বেরিয়ে আসতে হবে দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে। আর নারী ও যুবসমাজের উন্নয়নে কার্যকর সহযোগিতা বাড়ানোর উপর জোর দিয়েছেন তারা।

সোমবার (২ ডিসেম্বর) রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি'র (ইউএনডিপি) আয়োজনে দিনব্যাপী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে চারটি অধিবেশনে প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে অংশ নিয়ে জাতিসংঘের নারীবিষয়ক সংস্থার বাংলাদেশের প্রতিনিধি সোকো ইসিকাওয়া বলেন, 'সামাজিক বাধা একটি মৌলিক সমস্যা। আমাদের অবশ্যই জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা চাই নারী ও যুবসমাজের উন্নতি করতে, তবে আমাদের অবশ্যই তাদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।"

সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ উইমেন চেম্বার প্রতিষ্ঠাতা কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট সেলিমা আহমেদ বলেন, একজন নারী জন্মের পর থেকেই বৈষম্যের শিকার হয়। ছেলে শিশুদের মতো মেয়ে শিশুরা সমান সুযোগ পায় না। এটি ধারাবাহিকভাবেই চলতে থাকে। তারা বড় হয়ে ব্যবসার ক্ষেত্রেও বৈষম্যের শিকার হন। আমরা নারীদের ব্যবসায় অংশগ্রহণে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছিলাম। সেগুলো হলো- অর্থ প্রাপ্তি, সক্ষমতা এবং সামাজিক বাধা। তবে মূল চ্যালেঞ্জটি হল সামাজিক বাধা। এই জাতীয় চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে কেবল অন্তর্ভুক্তিই যথেষ্ট নয়, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য অবশ্যই সহযোগিতা প্রয়োজন।

যুব সংগঠনের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতার উপর জোর দিয়েছেন বক্তারা

দ্বিতীয় অধিবেশনে অংশ নিয়ে বক্তারা তরুণ নেতৃত্ব এবং তাদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্য অর্জনে স্টেকহোল্ডার এবং যুব সংগঠনের মধ্যে কার্যকর সহযোগিতার উপর জোর দিয়েছেন। তরুণ সংসদ সদস্য নাহিম রাজ্জাকের সভাপতিত্বে এতে বক্তব্য রাখেন কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (কোইকা) কান্ট্রি ডিরেক্টর হিউঙ্গু জো, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আফতাব আহমেদ, আইসিটি মন্ত্রণালয়ের স্টার্টআপ বিনিয়োগ ও নীতি বিষয়ক উপদেষ্টা টিনা জাবীন, ইয়ুথ অপরচুনিটিজের প্রতিষ্ঠাতা ওসামা বিন নূর।

আর তৃতীয় অধিবেশনে ডাটা, ডিজিটালকরণ ও প্রযুক্তি ব্যবহার না করে প্রশাসনের উন্নতি করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি সেক্টরকে অবশ্যই একসাথে কাজ করতে হবে বলে মত দেন বক্তারা। এই আলোচনায় অংশ নেন ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইএসডিবি) রিজিউনাল কান্ট্রি হেড মোহাম্মদ নাসিস বিন সুলেমান, সংসদ সদস্য আহসান আদেলুর রহমান, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি ওসামা তাসির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মহাপরিচালক মো. তাজুল ইসলাম। তারা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের সময় প্রযুক্তি ব্যবহার করে তথ্যের ফাক-ফোঁকর বন্ধ করার উপর জোর দেন।

সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি সমন্বয়ক মিয়া সেপ্পো। তার এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, আমরা মামলা জটের দ্রুত সমাধান দিতে চেষ্টা করছি, তবে আলোচিত মামলাগুলো আমরা দ্রুত নিষ্পত্তি করছি। আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার নিশ্চিতের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তবে সাক্ষীদের অনুপস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বাড়ছে। এখন পর্যন্ত ৩৪ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। নিম্ন আদালতের মামলাজট কমানো এবং ফৌজদারি মামলাসংক্রান্ত সমস্যা দ্রুত মিটিয়ে ফেলতে প্রতিটি জেলায় বিশেষ কমিটি গঠন করা হবে। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে কমিটি পদক্ষেপ নেবে। জেলা জজ, সহকারী কমিশনার এবং পুলিশ সুপারদের সমন্বয়ে এ কমিটি গঠন করা হবে।

তিনি বলেন, মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিচার করা। কিন্তু আমাদের দেশে বিচার হতে অনেক লম্বা সময় লাগতো। এর জন্য আমরা জাস্টিস অডিট সিস্টেম চালু করি। আদালতে পেন্ডিং থাকা মামলার প্রায় ৪০ শতাংশই মাদক সংক্রান্ত মামলা। আমরা এগুলোকে দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করছি। এগুলো নিষ্পত্তি হলে বিচারকরা অন্য মামলাগুলো নিষ্পত্তিতে বেশি সময় দিতে পারবে। আমরা চেষ্টা করছি অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ধারার মামলাগুলোর নিষ্পত্তি আদালতের বাইরে করার। আদালতও এ বিষয়ে উৎসাহ দেয়। যদি বাইরে সমাধান করা না যায়, তারপর তো আদালত আছেই। মাদক মামলায় এমন অনেক আসামি আছেন যারা হয়তো প্রথমবার মাদকের সংস্পর্শে এসেই মামলার মুখোমুখি হয়েছে। এদের জেলে দেওয়া সবসময় সমাধান হতে পারে না। বরং আমরা চাচ্ছি, তাদের নিরাময় কেন্দ্রের মাধ্যমে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে এনে সমাজে ফেরত নিয়ে আসা। আমরা গণতন্ত্রের যুদ্ধ করে যাচ্ছি। আমরা উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। এ কাজে উন্নয়ন প্রতিনিধিরা পাশে থাকবে বলে আশা করি।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক

প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী বলেন, গণতন্ত্রের যাত্রা ঠিক রাখতে বর্তমান সরকার চেষ্টা করছে। মানুষ নানা ধরণের বৈষম্যের শিকার হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আমরা টার্গেট করে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করছি। গণতন্ত্র দারিদ্র্য দূরীকরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছি। আমাদের কিছু মতাদর্শিক সমস্যার কারণে কখনো কখনো সমস্যা হচ্ছে। তরুণ সমাজকে সন্ত্রাসের হাত থেকে মুক্তি দিতে আমরা কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তন করছি। আমরা যে সাম্যতার কথা বলি, আমাদের বুঝতে হবে যে অসাম্য সমাজে সাম্যতা সবসময় নিশ্চিত করা যায় না। আমাদের মতো দেশগুলোতে যেখানে সম্পদের সীমাবদ্ধতা আছে, সেখানে সুযোগের সমান অধিকার সবসময় নাগরিকদের দেওয়া যায় না।

এছাড়াও ঢাকায় নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত রেন্সজে টেরিংক ও জাপানের রাষ্ট্রদূত নাও কি ইতো বক্তব্য রাখেন। দিনব্যাপী আয়োজনের বিভিন্ন অধিবেশনের ওপর প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি সুদীপ্ত মুখার্জি।

আপনার মতামত লিখুন :