পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব ডাল মিল মালিকরা, ৫ বছরে বন্ধ ২৫০ মিল

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, রাজশাহী
ডাল মিলে বেশিরভাগই কাজ করেন নারী শ্রমিকরা, ছবি: বার্তা২৪.কম

ডাল মিলে বেশিরভাগই কাজ করেন নারী শ্রমিকরা, ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

ডাল প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাতকরণে খ্যাতি রয়েছে রাজশাহীর বানেশ্বরের ডাল মিলগুলোর। চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনার ঈশ্বরদী, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ, ফরিদপুর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া থেকে ডালশস্য ক্রয় করে এনে বানেশ্বরের মিলে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। দেশের বাজারে প্রায় ৬০ শতাংশ ডাল সরবরাহও করা হতো এখানকার মিলগুলো থেকে। বানেশ্বরকে তাই ‘ডালের রাজধানী’ও বলা হতো। তবে এখন তা অতীত।

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের সিন্ডিকেট এবং ঋণের ফাঁদে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন বানেশ্বরের ডাল মিল মালিকরা। পাঁচ বছর আগে ২০১৫ সালে এখানে ছিল প্রায় ৩০০ ডাল মিল। মালিকরা পুঁজি হারিয়ে মিল বন্ধ করতে করতে সেই সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫০টিতে। মিল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে এখানকার কয়েক হাজার শ্রমজীবী মানুষ।

বানেশ্বরের মিলে ডাল শুকানো হচ্ছে।
বানেশ্বরের মিলে ডাল শুকানো হচ্ছে

২৫ বছর ধরে ডাল প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণের সাথে জড়িত জালাল উদ্দীন। বানেশ্বর বাজারে তার রূপালী ডাল মিল নামে একটি মিল ছিল। আগে তিনি ডাল জাতীয় শস্য কৃষকদের কাছ থেকে ক্রয় করে তার মিলে প্রসেসিং করে বাজারজাত করতেন। গত তিন বছর ধরে লোকসান গুণতে গুণতে পুঁজি হারিয়ে মিলটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন।

শুধু পুঁজি হারিয়ে মিল বন্ধই হয়নি, তিনি ঋণের জালে জর্জরিত হয়ে গেছেন। ব্যাংকে তার লোন দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ২০ লাখ টাকা। তিনি এখন বাজারে ছোট একটি ওষুধের দোকান দিয়ে কোনোরকমে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

ডাল মিলে কাজ করছেন কয়েকজন শ্রমিক
ডাল মিলে কাজ করছেন কয়েকজন শ্রমিক

জালাল উদ্দীনের মতোই পুঁজি হারিয়ে মিল বন্ধ করে দিয়েছেন আলতাফ হোসেন। তিনি ২০০৭ সাল থেকে ডাল প্রসেসিং করে বাজারজাতকরণের সাথে যুক্ত। তারও বাজারে বিপ্লব ডাল মিল নামে একটি মিল ছিল। সেখানে তিনি ডাল শস্য থেকে প্রসেসিং করে মার্কেটিং করতেন। গত তিন বছরে তিনিও পুঁজি হারিয়ে ব্যাংকের ঋণে জর্জরিত হয়ে গেছেন। তার ব্যাংকে ঋণ রয়েছে ৫০ লাখ টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আশির দশকে বানেশ্বর বাজারে ডাল মিলের গোড়াপত্তন হয়। তখন থেকেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনার ঈশ্বরদী, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ, ফরিদপুর, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া থেকে ডাল শস্য ক্রয় করে এনে বানেশ্বরে মিলে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করা শুরু হয়। তবে ২০০০ সালের পর থেকে বানেশ্বরে ডাল ব্যবসা সারাদেশে প্রসার লাভ করে।

ডাল-মিলে-বেশিরভাগই-কাজ-করেন-নারী-শ্রমিকরা
ডাল মিলে বেশিরভাগই কাজ করেন নারী শ্রমিকরা

২০১৩ সালের দিক থেকে মেঘনা গ্রুপ, ফ্রেস, সিটি গ্রুপ, ডিকে গ্রুপ, এসিআই গ্রুপসহ বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বিদেশ থেকে মোটা দানার ডাল ক্রয় করে কম মূল্যে বাজারে ছাড়ে। তখন থেকেই ধীরে ধীরে ডালের বাজারে ধস নামে। ২০১৫ সালের শেষ দিকে এসে বাজার পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়। তারপরই একের পর একে ডাল মিল বন্ধ হয়ে যায়। গত তিনবছরে একটার পর একটা ডাল মিল বন্ধ হয়ে যায়। এখন যেসব ডাল মিল চলছে সেসব ভর্তুকি দিয়ে চলছে।

মিল মালিক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বহুজাতিক কোম্পানির লোকেরা এলসির মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা থেকে মোটা দানার মসুরের ডাল কিনে এনে দেশীয় মসুরের ডালের অর্ধেক দামে মাত্র ৫০ টাকা কেজি দরে ডাল বিক্রি করছেন। ফলে দেশি ডালের দামেও ধস নেমে যাচ্ছে। দাম কম হওয়ায় গুদামে দেশি ডাল অবিক্রীত পড়ে থাকছে। দাম কমে যাওয়ার কারণে কৃষকরাও ঠিক সেভাবে আর ডাল জাতীয় শস্য উৎপাদন করছেন না।

মেসার্স নর্থবেঙ্গল ডাউল মিলের স্বত্বাধিকারী সেলিম রেজা বলেন, ‘ডালের ব্যবসা মসুর ডাল দিয়েই। সবসময় মসুর ডালের চাহিদা বেশি থাকে ভোক্তাদের কাছে। কিন্তু মোটা দানার বিদেশি মসুর ডালের কারণে দেশি মসুর ডালের দাম কমে যাওয়ার কারণে মিল মালিকরা প্রচুর লোকসানে পড়েছে। এখন কোনোমতে মুগ ডালের ব্যবসা করে মিল টিকিয়ে রাখছি।’

ডাল মিলে কাজ করা শ্রমিকরা
ডাল মিলের শ্রমিকরা

রজব অ্যান্ড ব্রাদার্স ডাউল মিলের ম্যানেজার মোহাম্মদ আলী সরকার বলেন, ‘দেশি মসুর ডালের দাম যেখানে মণপ্রতি ২২০০ টাকা, সেখানে মোটা দানার মসুর ডাল বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ১৪০০ টাকায়। বিদেশ থেকে তা আমদানি করে বাজারে বিক্রি করছে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো।’

মেসার্স সাহা ডাউল মিলের প্রোপাইটার সুব্রত মোহন সাহা বলেন, ‘আগে কৃষকদের কাছ থেকে ডাল ক্রয় করে প্রসেসিং করে বাজারজাত করতাম। ব্যাংকে ঋণ হয়ে যাওয়ায় আর ডাল ক্রয় করতে পারি না। ব্যবসায়ীরা এসে আমার মিলে ডাল প্রসেসিং করে নিয়ে যায়। সেখান থেকে যা লাভ হয়।’

বানেশ্বর আঞ্চলিক ডাল ব্যবসায়ী অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ওবায়দুর রহমান বলেন, গত পাঁচবছর ধরে ডাল ব্যবসায়ীরা নিঃস্ব হয়ে গেছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সিন্ডিকেট করে কম দামে ডাল বিক্রি করে ক্ষুদ্র মিল মালিকদের নিঃস্ব করেছে। গত পাঁচবছরে আমার ক্ষতি হয়েছে ২০ কোটি টাকা।

তিনি আরও বলেন, ‘ভর্তুকি দিয়ে মিল চালাতে হচ্ছে। গুদামে অবিক্রীত পড়ে রয়েছে সাড়ে ১৭ হাজার মণ মসুরের ডাল। সরকারকে এসব ক্ষতি পূরণে এগিয়ে আসতে হবে। স্বল্পমূল্যে সুদে কৃষকদের ঋণ দেয়ার পাশাপাশি এসব বহুজাতিক সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের রোধ করতে হবে। বিদেশ থেকে ডাল আমদানিও বন্ধ করতে হবে।’