রাজশাহীতে এসটিসি ব্যাংকের ৮ শাখা বন্ধ, কোটি টাকা লোকসানে কর্মীরা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, রাজশাহী
অনুমোদনহীন এসটিসি ব্যাংকের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়

অনুমোদনহীন এসটিসি ব্যাংকের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়

  • Font increase
  • Font Decrease

আব্দুল্লাহ আল মারুফ রাজশাহীর গোদাগাড়ী এসটিসি ব্যাংকের ম্যানেজার ছিলেন। দুই মাস ধরে ব্যাংকটি বন্ধ। চাকরি শুরুর সময় তিনি ৬ লাখ টাকা এসটিসি ব্যাংকে ডিপোজিটের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত হন।

মারুফের মতো আরও ছয়জন কর্মকর্তা আছেন গোদাগাড়ী শাখায়। তারাও বিভিন্ন অংকের টাকা ফিক্সড ডিপোজিটের মাধ্যমে গোদাগাড়ী শাখায় চাকরি নিয়েছিলেন। এর মধ্যে তিনজন সিনিয়র অফিসার ৫ লাখ টাকা, একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার ৩ লাখ টাকা ও একজন অফিস সহকারী ১ লাখ টাকা ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিটের মাধ্যমে চাকরি নেন। ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত এই ব্যাংক থেকে বিভিন্ন মেয়াদে গ্রাহকদের মাঝে ৭ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে।

২০১৯ সালের ৩ অক্টোবর গোদাগাড়ী শাখার কার্যক্রম উদ্বোধনের মাধ্যমে এসটিসি ৫০তম শাখা ব্যাংকের কার্যক্রম উদ্বোধন করেন। গোদাগাড়ী শাখার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ব্যাংকের রশিদ বাবদ এসটিসি ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে ১ লাখ টাকা প্রদান করতে হয়েছে গোদাগাড়ী শাখাকে। পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রতি মাসে মুনাফার জন্য ২০ হাজার টাকা দাবি করেছিল। সেই টাকাও মুনাফা হওয়ার সাপেক্ষে দেওয়ার কথা ছিল।

আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলেন, ‘আমরা কর্মীরা যে টাকা ফিক্সড ডিপোজিট করেছি, সে টাকায় গ্রাহকদের ১০ শতাংশ ইন্টারেস্টে লোন দেওয়া হয়েছে। লোনের মুনাফা থেকেই কর্মীদের বেতন দেওয়া হতো। কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ৭ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। এখন এই ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা যারা ওয়ার্কার আছি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। কারণ ব্যাংক না থাকায় ওই ৭ লাখ টাকা লোন তো তুলতে পারছি না। ব্যাংক না থাকায় অনেক গ্রাহক এখন আর লোন পরিশোধ করতে চাচ্ছেন না।’

তিনি আরও বলেন, ‘ব্যাংক কর্তৃপক্ষের যা লাভ করার তা তো করেই নিয়েছে। প্রতিটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে এক লাখ টাকা করে নিলেও তো ৫৯ লাখ টাকার ব্যবসা তাদের হয়ে গেছে। এছাড়া ব্যাংকের ডেকোরেশনের জন্য শাখা প্রতি ৫ লাখ টাকা আমাদেরই দিতে হয়েছে। তাতে রাজশাহী থেকেই তারা কোটি টাকার বেশি তুলে নিয়েছে।’

রাজশাহী নগরীর রেশমপট্টিতে এসটিসির বিভাগীয় কার্যালয় রয়েছে। সেখানকার প্রিন্সিপাল অফিসার সুলতান কবীরও ৫ লাখ টাকা ফিক্সড ডিপোজিটের মাধ্যমে চাকরি নিয়েছেন। তার মতো এই শাখার ১০ কর্মী একইভাবে বিভিন্ন অংকের অর্থ ফিক্সড ডিপোজিটের মাধ্যমে নিয়োগ নিয়েছেন।

সুলতান কবীর বলেন, ‘ব্যাংক বন্ধ হওয়ায় আমরা যারা কর্মী রয়েছি তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। আমার মতো শতশত কর্মী এখন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ব্যাংকিং কার্যক্রমের অনুমোদন না নিয়েই রাজশাহীতে ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনা করছিল স্মল ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ ব্যাংক বা সংক্ষেপে এসটিসি ব্যাংক। ছয় মাস পর অনুমোদন না থাকায় ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় জেলা প্রশাসন। তারপর ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সুপ্রিম কোর্টে অনুমোদনের আশায় দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন।

গত বছরের নভেম্বর মাসে ব্যাংক বন্ধ হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন নিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে দুই মাস ধরে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ব্যাংকের কর্মীরা। ইতোমধ্যে রাজশাহীর বিভাগীয় প্রধান রাজশাহীর সব শাখা বন্ধ করে দিয়েছে। সাইনবোর্ড-ব্যানারও খুলে নিয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্মল ট্রেডার্স কো-অপারেটিভ ব্যাংক লিমিটেড বা সংক্ষেপে এসটিসি ব্যাংক লিমিটেড ১৯৭৬ সালে নারায়ণগঞ্জে ‘ব্যাংক’ নাম নিয়ে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। তখন সমবায় মন্ত্রণালয় তাদের অনুমতি দিয়েছিল বলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ দাবি করে। এরপর ২০১২ সালে ‘ব্যাংক’ নামে কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না বলে সমবায় অধিদফতর বিজ্ঞপ্তি জারি করলে, তার বিরুদ্ধে এসটিসি কর্তৃপক্ষ কোর্টে রিট করে।

কোর্ট তখন স্ট্যাটাস কো জারি করে। স্ট্যাটাস কো’র মাধ্যমে সময় বাড়িয়ে নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল এসটিসি। এর মধ্যে এসটিসি রাজশাহীতে তাদের কার্যক্রম ২০১৮-এর এপ্রিল মাসে শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশে এসটিসির ৫৯ টি শাখা কার্যালয় রয়েছে। রাজশাহীতে রয়েছে আটটি শাখা কার্যালয়।

ব্যাংকের গ্রাহক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির নামের সঙ্গে ব্যাংক কথাটি লেখা থাকলেও ব্যাংক হিসাব খোলা, টাকা জমাদান গ্রহণ, আমানত সংগ্রহ কার্যক্রম ছিল না। শুধুমাত্র এমপ্লয়িদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অর্থ থেকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করা হতো। এই ঋণ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা থেকেই এমপ্লয়িদের বেতন প্রদান করা হতো।

তবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দাবি, কোর্ট তাদের আরও একবছর সময় দিয়েছে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য। কিন্তু এরপর আর সময় বাড়ানো হবে না বলে নির্দেশনা দিয়েছে।

এসটিসি ব্যাংকের রাজশাহীর রেশমপট্টি শাখার ব্যবস্থাপক কামাল পারভেজ বলেন, ‘রাজশাহী জেলা প্রশাসন থেকে বলা হচ্ছে রাজশাহীতে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে। হাইকোর্টের অনুমতি নিয়ে আসা হলে কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। অথচ তারা এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘দুই মাস থেকে ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা কর্মীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। রেশমপট্টির শাখা থেকে ৬০ লাখ টাকার মতো ক্ষুদ্র ঋণ প্রদান করা হয়েছে। এসবই আমাদের নিয়োগপ্রাপ্ত টাকা থেকে প্রদান করা হয়েছে। এখন ব্যাংক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেকেই ঋণের টাকা শোধ করছেন না। বলছেন ব্যাংক চালু হলে তবেই টাকা দেওয়া হবে। তবে দীর্ঘদিন ব্যাংক বন্ধ হওয়ায় লোকসানে পড়ছি আমরা।’

রাজশাহী জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) আবু আসলাম বলেন, ‘এসটিসি ব্যাংককে রাজশাহীতে তাদের সব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারা ২০১২ সালের হাইকোর্টের একটি নির্দেশনা স্ট্যাটাস কো দেখাচ্ছিল। স্ট্যাটাস কো হচ্ছে প্রতিষ্ঠান যেভাবে আছে ঠিক সেইভাবেই চলবে। কেউ কোনো ব্যবস্থা নিতে পারবে না। কিন্তু ওই স্ট্যাটাস কো বলবৎ থাকবে ২০১২ সালে যেসব এলাকায় তাদের কার্যক্রম ছিল সে এলাকার জন্য। এটা রাজশাহীর জন্য প্রযোজ্য না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা তাদের জানিয়ে দিয়েছি- এরপর রাজশাহীর কোনো শাখায় কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে দণ্ড প্রদান করা হবে।’

আপনার মতামত লিখুন :