ভাড়া কমানোর পরও ভাড়াটিয়া খুঁজে পাচ্ছেন না বাড়িওয়ালারা

মো. আকরাম হোসেন, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
ভাড়া কমানোর পরও ভাড়াটিয়া খুঁজে পাচ্ছেন না বাড়িওয়ালারা

ভাড়া কমানোর পরও ভাড়াটিয়া খুঁজে পাচ্ছেন না বাড়িওয়ালারা

  • Font increase
  • Font Decrease

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে ৪ তলা বাড়ির মালিক আসলাম হোসেন। পরিবারের জন্য এক তলা ও বাকি তিন তলায় ৩টি করে মোট ৯টি ফ্ল্যাট রয়েছে। নিজের জমানো টাকা আর ব্যাংক লোন নিয়ে বাড়িটি বানিয়েছেন তিনি। ভাড়া বাবদ যে টাকা পেতেন তা দিয়ে নিজের সংসার ও ব্যাংক লোন ভালোভাবে চালাতে পারতেন। তবে এখন বিপাকে পড়েছেন। ৯টি ভাড়া দেওয়া ফ্ল্যাটের মধ্যে ইতিমধ্যে দুই মাস যাবত ১টি ফ্ল্যাট ফাঁকা পড়ে আছে ৷ চলতি মাসে আরও একটি ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া চলে যাবে। আগামী মাসে আরও দুইটি ফ্ল্যাট খালি হবে বলে জানান তিনি। চেষ্টা করেও নতুন ভাড়াটিয়া খুঁজে পাচ্ছেন না।

এদিকে বাকি ভাড়াটিয়াদের জন্য ভাড়ার পরিমাণও কমাতে হয়েছে। এখন বাসা ভাড়া বাবদ যে টাকা পান তা দিয়ে ব্যাংক লোন, পানি-গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল নিজের সংসার, বাড়ির নিরাপত্তাকর্মীর বেতন গৃহপরিচারিকার বেতন পরিশোধ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এমন চলতে থাকলে আগামীতে আরও বিপাকে পড়বেন বলে আশঙ্কা করছেন আসলাম হোসেন। শুধু আসলাম হোসেন নয় এ চিত্র প্রায় ঢাকার অধিকাংশ বাড়িওয়ালাদের।

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের মহামারিতে ভেঙে পড়েছে সারা বিশ্বের অর্থনীতির চাকা। বাদ পড়েনি বাংলাদেশও। এতে করে দুস্থ ও শ্রমজীবী মানুষদের সঙ্গে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন মধ্যবিত্তের মানুষ। এর মধ্যেই কেউ কেউ চাকরি হারিয়েছেন, কারো বেতন কমেছে। নিম্ন ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের আয় কমেছে। অন্যদিকে সাড়ে তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। কবে খুলবে তারও ঠিক নেই। কর্মহীন হয়ে পড়ায় রাজধানী ঢাকা ছাড়ছেন অনেকে। জানা যায়, ইতিমধ্যে ৫০ হাজারেও বেশি মানুষ পরিবার নিয়ে ঢাকা ছেড়েছেন। এ কারণে রাজধানীর বাসা মালিকরাও পড়েছেন ভাড়াটিয়া সংকটে, বেড়েছে তাদের দুশ্চিন্তা।

সিংগভাগ বাড়িতে ঝুলছে বাসা ভাড়া দেওয়ার বিজ্ঞাপন

মিরপুরের বাসিন্দা আফসানা জেরিন। বাড়ি বাড়া থেকে যে টাকা আসে তা দিয়েই সংসারের যাবতীয় খবর চালান। গত চার মাসের বাড়ি ভাড়ার অধিকাংশই পাননি তিনি। এদিকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান জেরিনের বাবা। বর্তমানে জেরিনসহ পরিবারের তিন সদস্যও করোনায় আক্রান্ত আছেন।

বার্তা২৪.কম-কে জেরিন বলেন, করোনার সময় ভাড়াটিয়ার গ্রামের বাড়িতে চলে যান। এখন কেউ কেউ এসেছেন। এসময়ে তাদেরও কাজ নেই, তারাও নানা সমস্যায় আছে। যার কারণে ঠিকমতো ভাড়া দিতে পারছেন না। মানবিকতার জায়গা থেকে তাদেরকে কিছু বলতে পারছি না। একটা ফ্ল্যাটে শিক্ষার্থীরা থাকতো। ভাড়া দিতে না পেরে বাসা ছেড়ে দিয়েছে তারা। চলতি মাসের শুরুতে তাদের মালামাল নিয়ে গেছে।

মিরপুরের পূর্ব শেওড়াপাড়ার বাড়িওয়ালা সাদি হোসাইন। করোনাভাইরাসের মহামারি শুরুর আগে থেকেই নিচতলার ফ্ল্যাট খালি ছিল তার। গত চার মাসে নতুন ভাড়াটিয়া না পাওয়ায় বাসা ভাড়া দিতে পারেননি তিনি। চলতি দুর্যোগে দ্বিতীয় তলার বাসা ছেড়ে দিয়েছে ভাড়াটিয়া। ফলে নতুন করে বাসা খালি হয়েছে। এদিকে যে ভাড়াটিয়া আছে তারাও ঠিকমতো ভাড়া দিচ্ছেন না। করোনার কারণে বাসা ভাড়া কমিয়েছেন তিনি। তারপরও আরও কমানোর দাবি ভাড়াটিয়াদের।

রাজধানীতে বাড়িতে বাড়িতে ঝুলছে টু লেট

মহামারির মধ্যে অনেক জায়গায় ভাড়াটিয়ার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করছে বাড়িওয়ালা। ভাড়া ঠিকমতো দিতে না পাড়ায় বাসা থেকে বের করে দেওয়ার মতোও ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষার্থীদের সার্টিফিকেটসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ভাগাড়ে ফেলে দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

কেউ কেউ আবার মাসের পর মাস গ্রামের বাড়িতে থাকার পরও বাড়িওয়ালাকে নিয়মিত বাসা ভাড়া পাঠিয়ে দিচ্ছেন। স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তৌহিদুল সরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটির পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া গ্রামের বাড়িতে চলে যান। এরমধ্যে কয়েক দফা ছুটি বৃদ্ধি করেছে সরকার। ঢাকায় ফেরা না হলেও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্য বাড়িওয়ালা ফোন দিয়ে বাসা ভাড়া আদায় করছেন। গ্যাস বিল ও বিদ্যুৎ বিল বন্ধ থাকলেও গত মাসে বকেয়াসহ দিতে হয়েছে। এভাবে আর কত মাস দিতে হবে তাও জানেন না তিনি।

কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বার্তা২৪.কম-কে বলেন, এই দুঃসময়ে ভাড়াটিয়ারা খুব সমস্যায় আছে। এসময় বাড়িওয়ালাদেরও সহনশীল হওয়া উচিত। আইনটা এমন হওয়া উচিত যাতে কোনো দুর্যোগের সময় কোনো ভাড়াটিয়াকে বাড়ি থেকে তুলে দিতে না পারে বাড়ির মালিক। কিছু বাড়িওয়ালা আছে যারা সচ্ছল না। তাছাড়া অধিকাংশ বাড়িওয়ালা সচ্ছল । তবে অনেক বাসা খালি হয়ে গেলে ভাড়া কমে আসবে।

আপনার মতামত লিখুন :