আবাসিকে গ্যাস সংযোগ নিয়ে ধূম্রজাল

সেরাজুল ইসলাম সিরাজ, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম
ছবি: সংগৃহীত

ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

আবাসিকে গ্যাসের নতুন সংযোগ নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। কয়েকদিন পূর্বে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব আনিসুর রহমান বলেছেন, ‘নতুন গ্যাস সংযোগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মৌখিক অনুমতি পাওয়া গেছে।’

অন্যদিকে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ একটি জাতীয় দৈনিককে বলেছেন, ‘আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’

অথচ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব বরাতে একটি জাতীয় দৈনিকে লেখা হয় প্রধানমন্ত্রীর দফতরে ফাইল জমা আছে। তার চূড়ান্ত অনুমোদন পেলেই বিতরণ কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বাসা-বাড়িতে গ্যাস সংযোগ দেয়া শুরু হবে। কিভাবে সংযোগ দেওয়া হবে তাও বাতলে দেন। তিনি বলেন, ‘ধাপে ধাপে অবশ্যই প্রি-পেইড মিটার হবে। আমরা দেখেছি প্রি-পেইড মিটারে খরচ কম হয় ভোক্তার। আবার মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় কম হয়।’

কয়েক দিনের ব্যবধানে মন্ত্রণালয়ের দুই শীর্ষ কর্তার এমন বিপরীতমুখী বক্তব্যে গ্যাস সেক্টর ও জ্বালানি খাতের সাংবাদিকদের মধ্যে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জ্বালানি বিভাগের সিনিয়র সচিব খোদ প্রধানমন্ত্রীর নাম ধরেই মিডিয়াকে বলার কয়েকদিন পর কেন এমন হলো এ নিয়ে নানান রকম গুঞ্জন চলছে।

অনেকেই মনে করছেন এলপিজি সিন্ডিকেটের কারণে এমনটি হতে পারে। এলপিজি ব্যবসায়ীরা কোনভাবেই চাইবেন না নতুন করে গ্যাস সংযোগ প্রদান করা হোক। এতে তাদের সিলিন্ডার ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বড় বড় রাঘোব বোয়ালরা এই সেক্টরে বিনিয়োগ করেছে।

গ্যাস সংকটের কথা বলে ২০১০ সালে আবাসিকে (বাসায় রান্নায়) নতুন সংযোগ বন্ধ করে দেয় সরকার। দশম সংসদ নির্বাচনের কিছুদিন আগে ২০১৩ সালের মে মাসে আবাসিক খাতে নতুন সংযোগ দেয়া চালু হয়। ওই সময় সিটি নির্বাচন সামনে রেখে রাজশাহীতেও বেশ কিছু আবাসিক সংযোগ দেয়া হয়। তবে ভোটের পর তা বন্ধ হয়ে যায়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৮ সালের এপ্রিলে আবাসিকে গ্যাস সংযোগ চালু করার ইঙ্গিত দেয়া হয়। কিছু লোক সেই সুযোগ কাজে লাগালেও বঞ্চিত হন অধিকাংশ সংযোগ প্রত্যাশী।

নয় বছরের বেশি (টানা সাড়ে ৬ বছর) সময় গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় রাজধানীসহ আশেপাশের জেলাগুলোতে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেয়ার মহোৎসব চলছে। যা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড। গ্যাস বিতরণ কোম্পানি অভিযান চালিয়ে মাঝে-মধ্যে লাইন কাটলেও কয়েকদিনের মধ্যেই অবৈধ সংযোগ আবার চালু হয়ে যায়।

পাইপলাইনের মাধ্যমে আবাসিকে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে দেয়ার কারণ হিসেবে গত এক দশক যাবত জ্বালানি বিভাগ সংশ্লিষ্ট একটি অংশ বলছে, বিশ্বের কোন দেশে পাইপলাইনে আবাসিক গ্যাস সংযোগ দেয়া হয় না। বাংলাদেশে বাসায় রান্নার কাজে পাইপলাইনে গ্যাস দিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাসের অপচয় হচ্ছে। অথচ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গঠিত এক কমিটির ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত, সিঙ্গাপুর, জাপানে আবাসিক খাতে বাসা-বাড়িতে রান্নায় পাইপ লাইনে গ্যাস সরবরাহ চলমান আছে এবং এর আওতা আরও বাড়ানো হচ্ছে। জাপান ও সিঙ্গাপুরে নাগরিক সেবায় পাইপলাইনে গ্যাসের পাশাপাশি এলপিজি ও বিদ্যুৎ দিয়ে রান্নার সুযোগও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে ।

জ্বালানি খাতের একাধিক বিশ্লেষকের মতে, দেশে এলপিজির (তরল পেট্রলিয়াম গ্যাস) একচেটিয়া বাজার সৃষ্টি করতে, জ্বালানি বিভাগের সুবিধাভোগী একটি অংশের অপতৎপরতায় পাইপলাইনের গ্যাস বন্ধ করা হয়েছে। আবাসিকে শুধু এলপিজি চালু করা জনগণকে জিম্মি করার শামিল বলেও মনে করেন তারা। এলপিজির বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না সরকার। বোতলের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য লেখার সরকারি নির্দেশও বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ওজনে কম দেয়া এবং টুইনিং (বোতলে পানি-হাওয়া ইত্যাদি ভরা) করার বিষয়টি মনিটরিং হচ্ছে না। প্রান্তিকে ঠকছেন গ্রাহকরা। লাভবান হচ্ছে উৎপাদক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা।

বিশ্লেষক মনে করছেন বাসা-বাড়িতে রান্নায় পাইপলাইন গ্যাস, এলপিজি এবং বিদ্যুৎ সব সুযোগই থাকা উচিত। যাতে মূল্য ও সুবিধাভেদে গ্রাহক তার পছন্দসই জ্বালানি বেছে নিতে পারেন। পাইপলাইনে প্রি-পেইড মিটার দেয়াটা জরুরি উল্লেখ করে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রি-পেইড মিটার হলে একজন গ্রাহক যতটুকু গ্যাস ব্যবহার করবেন, ততটুকু গ্যাসেরই বিল দেবেন। এতে সবার স্বার্থ রক্ষা হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস বিক্রি করা হয় ৪ টাকা ৪৫ পয়সা দরে। জনস্বার্থে আবাসিক খাতের গ্রাহকদের কাছে একই পরিমাণ (প্রতি ঘনমিটার) গ্যাস বিক্রি করা হয় ১২ টাকা ৬০ পয়সা দরে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বার্তা২৪.কম-কে বলেছেন, ‘বিইআরসি একটি হিসেবে করে দেখিয়েছে এলএনজি এনে বাসা-বাড়িতে দেওয়া হলেও এলপিজির চেয়ে অনেক কমমূল্য পড়ে। বাসা-বাড়িতে গ্যাস সংযোগ না দেওয়ার পেছনে এলপিজি ওয়ালাদের কারসাজি থাকতে পারে। এলপিজি ওয়ালাদের মুনাফা দেওয়ার জন্য এতদিন গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়নি, মানুষকে নির্যাতন করা হয়েছে। এর জন্য বিচারের দাবী উঠা উচিত।’

তিনি আরও বলেন, এলপিজি পুরোপুরি ক্লিন ফুয়েল বলা যায় না। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এর ব্যবহার উৎসাহিত করা যায় না। যেখানে পাইপলাইন নেই, বা অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনা সেখানে এলপিজি থাকতে পারে। তবে এর মুনাফা নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত।

আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগ বন্ধ করার সময় দেশে গ্যাসের গড় উৎপাদন ছিল ১৭শ’ ৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফ)। দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের গড় উৎপাদন প্রায় আড়াই হাজার এমএমসিএফ। তবে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি রয়ে গেছে। গ্যাসের বিকল্প হিসেবে আমদানিকৃত এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আসছে দৈনিক সাড়ে ৫শ’ এমএমসিএফ। দৈনিক উৎপাদিত ও আমদানিকৃত মোট গ্যাসের এক হাজার ২শ’ এমএমসিএফ বিদ্যুৎ উৎপাদনে, প্রায় ৫শ’ এমএমসিএফ আবাসিক খাতে, একশ ত্রিশ এমএমসিএফ সার কারখানায়, শিল্প কারখানা, বাণিজ্যিক খাত, চা বাগানসহ অন্যান্য খাতে অবশিষ্ট গ্যাস বিতরণ করা হয়।

রাষ্ট্রীয় ৬টি কোম্পানি তিতাস, কর্ণফুলী, পশ্চিমাঞ্চল, জালালাবাদ, বাখরাবাদ ও সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ করে আসছে। সারাদেশে বৈধ আবাসিক গ্রাহক রয়েছেন ৩৮ লাখ। সবচেয়ে বড় বিতরণ কোম্পানি তিতাসের আবাসিক গ্রাহক ২৮ লাখ ৪৬ হাজার। এরমধ্যে প্রি-পেইড গ্রাহক প্রায় দেড় লাখ। রাজধানীসহ আশেপাশের কয়েকটি জেলায় গ্যাস বিতরণ করে তিতাস। তবে ধারণা করা হয় বিপুল পরিমাণ অবৈধ সংযোগ রয়েছে। এসব সংযোগ বৈধ না হওয়ার সংশ্লিষ্ট বিতরণ কোম্পানির লোকজন কেউ কেউ মাসোয়ারা নিয়ে আসছেন।

রাষ্ট্রীয় ৩টি কোম্পানি ১৮টি গ্যাস ক্ষেত্র থেকে ৭০টি কূপের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে পৌনে ৯শ এমএমসিএফ গ্যাস উৎপাদন করছে। বহুজাতিক কোম্পানি শেভরন একাই তিনটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে ৩৮টি কূপের মাধ্যমে দৈনিক গড়ে এক হাজার ৫শ’ ৪০ এমএমসিএফ, তাল্লো একটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে ৫টি কূপের মাধ্যমে গড়ে একশ’ এমএমসিএফ গ্যাস উত্তোলন করছে।

আপনার মতামত লিখুন :