মায়ের কাছে শোনা বঙ্গবন্ধুর কথা



বিপাশা চক্রবর্তী
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

আমাদের ছোটবেলায় বঙ্গবন্ধু একপ্রকার নিষিদ্ধই ছিল। মা বলতেন, “তোর জন্ম এরশাদের আমলে, স্কুলে ভর্তি হয়েছিস খালেদা জিয়ার আমলে, তখনকার বাতাসে স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এইসব ছিল না।” ঐ সময়ের রেডিও, টেলিভিশন, বই, পত্রপত্রিকা কিংবা অন্য কোথাও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা ছিল না। ’৯১-এর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বিএনপি যখন সরকার গঠন করে, তখন রেডিও টেলিভিশনে মেজর জিয়ার সেই পুরনো ভাষণটি প্রচার হয়। এখনো স্পষ্ট মনে আছে, সেদিনে বিকেলের দিকে টেলিভিশনে প্রচার হচ্ছে মেজর জিয়ার ভাষণ, বাবা বললেন—“অন বিহাফ অফ শেখ মুজিব, কথাটা কেটে দিয়েছে।” তখন এসব রাজনৈতিক জটিলতা বুঝবার মতো বয়স যে হয়নি সেটা বলা বাহুল্য। মা বাবার মুখেই প্রথম শুনেছিলাম মুক্তিযুদ্ধের কথা বঙ্গবন্ধুর কথা। বঙ্গবন্ধু কে, উনি দেশের জন্য কী করেছেন, এই উপমহাদেশ কত বড় মাপের নেতা পেয়েছিল এই ব্যাপারগুলো অনুধাবন করার শুরুটা বাবা মায়ের মুখে শোনা কথা থেকেই।

প্রায় রাতেই মা যুদ্ধের কথা বলতেন, একাত্তরের গল্প করতেন। শুনতাম, বঙ্গবন্ধু কিভাবে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন। শুনতাম, ৭ই মার্চের ভাষণের কথা। পাকিস্তানী মিলিটারি বাহিনীর নৃশংসতার গণহত্যার কথা। মানুষের এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে পালিয়ে বেড়ানোর কথা। ভিটেবাড়ি ফেলে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে শরণার্থীর কথা! আমার মায়ের বয়স তখন খুব কম সম্ভবত আট নয় বছর কিন্তু মায়ের বড় বোন আমার তিন মাসী তখন তরুণী। মিলিটারি আর রাজাকারদের ভয়ে তারা কেমন করে বাড়ির পিছনের বিলে কচুরীপানার ভেতর, কিংবা ঝোঁপেঝাড়ে মাটির গর্তে লুকিয়ে দিন রাত পার করতেন। সংখ্যালঘু হবার কারণে সর্বক্ষণ বাড়তি আতঙ্কে থাকার কথা। মা বলতেন, মুক্তিযোদ্ধাদের কষ্টের কথা। কিভাবে মুক্তিযোদ্ধারা সাধারণ অস্ত্রশস্ত্র আর অসাধারণ দুঃসাহস নিয়ে যুদ্ধ করে দেশকে শত্রুমুক্ত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের কারাগারে আটকে রাখার গল্পও করতেন। বলতেন, “এদিকে দেশ স্বাধীন হয়ে যাচ্ছে, পাক মিলিটারিরা মুক্তি বাহিনীর কাছে মার খাচ্ছে, তাই ওরা শেখ মুজিবকে ভয় দেখানোর জন্য জেলখানার বাইরে কবর খোঁড়া শুরু করে। কিন্তু সে একটুও ভয় পায়নি, বুঝলি।”

বড় হয়ে বুঝেছি মায়ের গল্পগুলো ভীষণ আবেগ আর নানা (কল্পনা) স্বপ্ন মেশানো ছিল। আর তার বলার ধরন সব কিছু মিলিয়ে আমার শিশু মনে যা গভীর ছাপ ফেলেছিল। তা না হলে হয়তো আমি আজ মুক্তিযুদ্ধ আর বঙ্গবন্ধুকে এতটা আপন করে ভালোবাসতে পারতাম না। কারণ তো আগেই বলেছি—আমাদের শৈশবে বঙ্গবন্ধু প্রায় নিষিদ্ধ ছিল। মায়ের কাছে যুদ্ধের কথা শুনে আমার মন খারাপ হতো। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার ঘটনা শুনে মন খারাপ হতো। মা বলতেন, ছোট্ট রাসেল নাকি কেঁদেছিল, সে তাঁর মায়ের কাছে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু ওরা এই অবুঝ শিশুটিকেও মেরে ফেলেছিল। ঠিক রাসেলের বয়সী আমার একটি মেয়ে আছে এখন। মনে আছে, আমি ছোটবেলায় মায়ের মুখে রাসেলের কথা শুনে কেঁদেছিলাম। পরে রাসেলের ছবি দেখে আরোও অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে এত সুন্দর ফুটফুটে একটি বাচ্চাকে কিভাবে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট মেরে ফেলল ওরা। এমনকি পাক-সেনারাও ১৯৭১ সালে যাদের মারেনি, তাদের কিনা এদেশেরই কিছু লোকজন মেরে ফেলল। এত সাধারণ ঘটনা একটি দেশের এমন এক নেতাকে পরিবারশুদ্ধ হত্যা করা। যার নেতৃত্বের প্রভাবে একটি ভূখণ্ড সার্বভৌমত্ব অর্জন করেছে।

বাবা আমাকে প্রথম নিয়ে গিয়েছিলেন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে। খুব সম্ভবত ৯৪/৯৫ সালের দিকে, বাবা একদিন অফিস থেকে বাসায় এসে বললেন, বঙ্গবন্ধুর বাড়িটি খুলে দেওয়া হয়েছে সবার জন্য। এই কথা শুনে আমি জেদ ধরেছিলাম আমাকে নিয়ে যেতে হবে। বাবা এমনিতে আমাদের কোথাও তেমন একটা বেড়াতে নিয়ে যেতেন না কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে আমাকে ঠিকই নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে আরো বেশ কয়েকবার গিয়েছিলাম ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরে। কিন্তু প্রথমবার দেখার স্মৃতি সম্পূর্ণ অন্যরকম। আসলেই কী সাধারণ ছিল বঙ্গবন্ধু পরিবারের জীবন-যাপন। এই বাড়ির জিনিসপত্র আবহ ঠিক আমাদের বাড়ি ঘরের মতোই কত আপন কত চেনা। একটি দেশের রাষ্ট্রপতির বাড়ি বলে মনেই হয়নি আমার।

মায়ের কাছ থেকে শোনা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সবচেয়ে আকর্ষণীয় গল্পটি ছিল, বঙ্গবন্ধুর সাথে মায়ের দেখা হবার গল্পটি। আমার নানাবাড়ি ছিল নারায়ণগঞ্জ, বুড়িগঙ্গার নদীর অপর পাড়ে পানগাঁও নামের একটি জায়গায়। তখন মাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে। একদিন মা শোনে কী যেন এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু আসবেন নদী তীরের জেটিতে। মা-সহ স্কুল পড়ুয়া আরো কিছু বাচ্চাকাচ্চার সেখানে যেতে হবে। মা সেদিন অন্য বাচ্চাদের সাথে ভয়ে ভয়ে গিয়েছিলেন, খুব কাছ থেকে নাকি দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধুকে। মায়ের কথা অনুযায়ী, “উনি এত সাধারণ কোন পাইক পেয়েদা ছাড়াই একটি জিপে চড়ে ঐ অনুষ্ঠানে আসছিলেন। আমরা একদম তাঁর কোলের কাছে দাঁড়িয়ে জাতীয় সঙ্গীত গাইছিলাম। আমাদের বিস্কুট আর গুঁড়াদুধের প্যাকেট দিছিলেন।”

মায়ের কাছে বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনতে শুনতে আমি নিজেও যেন মায়ের চোখ দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে দেখতে পেতাম। মায়ের শৈশবকে আর আমার শৈশব ভাবতাম। আরেকটু বড় হয়ে টিভিতে বইতে পত্র-পত্রিকায় যখন দেখেছি—বঙ্গবন্ধুর ছবি ভিডিও গান দেখেছি তাকে নিয়ে লেখা পড়েছি তখন সেই অনূভুতিটা হয়নি হয়েছে অন্য আরেক অনূভুতি। যে মানুষটার কথা শুনতে একাত্তরের ৭ই মার্চ অগণিত মানুষ এসে জড়ো হয়েছিলেন রেসকোর্সের ময়দানে, যে অসংখ্য মানুষ বাহাত্তর সালের দশ জানুয়ারি আবেগ আপ্লুত হয়ে বঙ্গবন্ধুকে স্বদেশে বরণ করে নিয়েছিলেন—তারাই পরে কেমন করে বিভক্ত হয়ে গেলেন? ছোটবেলাতে ভাবতাম একই দেশের মানুষ আমরা, আমাদের একটাই পতাকা একটাই মাতৃভূমি একটাই জাতীয় সঙ্গীত, অথচ জাতির জনককে একদল পছন্দ করি; আরেকদল করি না। বড় হয়ে বুঝতে শেখার পর অবশ্য এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো ভালোভাবে জানার চেষ্টা করছি বোঝার চেষ্টা করছি। এবং বুঝতে পারছি এই বিভক্তির শিকড় একাত্তরে নয় বরং আরো সুদূর অতীতে।

মা বলতেন, “বুঝছিস বিপাশা, পৃথিবীর আরো অনেক দেশের জাতির জনক আছে, সেসব দেশের সব দলমত ধর্মের লোকেরা সবাই তাদের জাতির জনককে মানে শ্রদ্ধা করে, যেই দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, সব সরকারি দপ্তরে সব সময় তাদের জাতির পিতার ছবি ঝুলায়ে রাখে। খালি আমাদের দেশেই মানুষ এমন উল্টাপাল্টা করে। একদল আইসা উঠায় আরেক দল আইসা নামায়।” এসব তো আমার শৈশবের কথা। এখন হয়তো অবস্থা পাল্টেছে অনেকটা, সেটা করতে অনেকটা সময় লেগেছে। স্বাধীনতার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বছরের পর বছর ধরে তার বিরুদ্ধে চলা প্রপাগন্ডা অপপ্রচারে দাগ মুছে তাঁকে আবার তাঁর সত্যিকারের আসনে বসানোটা সহজ কাজ না। বাংলাদেশের জন্য বঙ্গবন্ধু কে? কী? কেন তিনি এত গুরুত্বপূর্ণ? দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে তাঁর ভুমিকা কতটা শক্তিশালী? তাঁর নেতৃত্ব কতখানি প্রভাব বিস্তার করেছিল যাতে করে একটি ভূখণ্ড সার্বভৌমত্ব অর্জনের পথে যায়? কে জানে এদেশ একজন বঙ্গবন্ধুকে পেয়েছিল বলেই হয়তো কাশ্মীর বা বেলুচিস্তান না হয়ে পৃথিবীর বুকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ হয়েছে। এসব কিছু আমার শৈশবে স্কুলে পড়ার দিনগুলোতে কেউ শেখায়নি জানায়নি। হঠাৎ একদিন শুনি স্কুলে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচনা প্রতিযোগিতা!

পরে বুঝেছি। সেটা ছিল ১৯৯৬ সাল। আর এখন আমাদের বাচ্চাদের জন্য বঙ্গবন্ধুকে জানার কত ব্যবস্থা। গল্প, কবিতা, কমিকস, নাটক, গান, চলচিত্র, চিত্রাঙ্কন কতকিছু। তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়, এত আয়োজন এত চাকচিক্য দিয়েও কি বঙ্গবন্ধুর আসল কারিশমাটা কি শিশুদের বোঝানো যায়? এসব দিয়ে কি শিশুদের অনুভব করানো যায় সে আবেগ যা আমি মায়ের মুখে শুনে শুনে অনুভব করেছি। এমন কোনো প্রবন্ধ গল্প নাটক অথবা চলচ্চিত্র আজও কি হয়েছে যেটা আমার সেই আবেগের জায়গাটা ছুঁতে পারবে?

আমার মা বাবা দুজন সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন। মা দীর্ঘদিন হাইকোর্টের পেপারব্যাক শাখায় ছিলেন, তারপর সুপ্রিমকোর্টের লাইব্রেরি শাখায় কাজ করেছেন। চাকরির সুবাদে মা প্রায়ই বিভিন্ন মামলার নথিপত্র পড়ার সুযোগ পেতেন। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিবরণী কিছুটা পড়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরে বুঝেছি মা অনেক আবেগ কল্পনা মিশিয়ে তার শিশু সন্তানকে যে গল্প বলতেন তার মধ্যে প্রচণ্ড এক সত্যের অনুভূতি ছিল। এভাবেই মা একে একে তার দুই ছেলে-মেয়ের ভেতর দেশপ্রেমের সঠিক শিক্ষার বীজ বুনে দিয়েছিলেন। এমনকি এই শিক্ষাটা আমি স্কুলে কিংবা বই পড়ে পাইনি। আমাদের স্কুলেও ছিল নানা মতের নানা আদর্শের শিক্ষক, বই-পত্রের বেলাতেও তাই। এর মধ্যে কোনটা সঠিক আর কোনটা বেঠিক সেটা বুঝে উঠতে সময় লেগেছিল। তবে মার কাছ থেকে পাওয়া অনূভুতিটা কখনো ম্লান হয়নি।

ক্লাস ওয়ানে পড়ুয়া আমার বড় মেয়ে নিসর্গ ২০২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী উদযাপন নিয়ে কত উত্তেজিত ছিল। প্রস্তুতি নিয়েছিল ছবি আঁকা প্রতিযোগিতার। কিন্তু কোডিভ-১৯ ভাইরাসজনিত কারণে সব অনুষ্ঠান স্থগিত হয়ে যায়। (জানি এতেও কিছু লোক খুশি হয়েছে, যাদের আসলে কোনো মাতৃভূমি নাই।) নিসর্গকে বুঝিয়ে বলেছিলাম—অনুষ্ঠান স্থগিত হয়েছে তো কী হয়েছে, বঙ্গবন্ধুকে ভালোবেসে যাওয়া সেটা তো কোনোদিন কোনো ভাইরাস স্থগিত করতে পারবে না।

বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ ও আদর্শে আমরা কতটুকু জাগরিত?



প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান মিয়া
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। আর এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের নায়ক একজন। তিনি আমাদের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি মহানায়ক, মহাননেতা, আমাদের জাতির পিতা। বাঙালি আর বাংলাদেশের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্দ হয়ে উঠেছিলেন শেখ মুজিব। টুঙ্গিপাড়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নায়ক হয়ে উঠে এসেছেন জাতীয় অঙ্গণে, এরপর মহানায়ক হিসেবে দ্যুতি ছড়িয়েছেন বিশ্বমঞ্চে।

বাংলার শোষিত, নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের মুক্তিই ছিল তাঁর জীবনের মূল লক্ষ্য ও আদর্শ। যে লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি আজীবন শুধু সংগ্রামই করে গেছেন। বাংলার মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বারংবার জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। মাত্র ৫৪ বছরের (১৯২০-১৯৭৫) জীবনকাল তার। শৈশব ও কৈশোরকাল পেরিয়ে ৩০ বছরের মতো তার রাজনৈতিক জীবন। এর মধ্যে তের (১৩) বছরই কাটিয়েছেন জেলখানায়। মোট ১৮ বার কারারুদ্ধ হয়েছিলেন। ২৪টি মামলা তিনি সাহসের সঙ্গে লড়েছেন। মৃত্যুর সামনে থেকে ফিরে এসেছেন ২ বার। বস্তত জেল-জুলুম-নিপীড়ন তার জীবনে এক নিয়মিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিজীবন বলতে কিছুই ছিলনা। তাঁর চিন্তা-চেতনা, ধ্যান, সপ্ন, কর্ম সবই ছিল দেশের মানুষের মঙ্গলের জন্য। তাঁর পুরো জীবনটাই ছিল বাঙালির জন্য নিবেদিত তাই ফাঁসির মঞ্চকেও কখোনো তিনি ভয় পাননি। ভোগ নয়, রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছিল ত্যাগের। বঙ্গবন্ধু রাজনীতিতে নীতি-আদর্শকে সর্বোচ্চ স্থান দিতেন। তাঁর রাজনীতির লক্ষ্য নিছক ক্ষমতায় যাওয়া ছিল না, তা ছিল বাঙালির অধিকার আদায় বা জাতীয় মুক্তি অর্জনে নির্দেশিত।

বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মূল দর্শন ছিল বাঙালির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি অর্জন। তিনি ছিলেন বাংলার অবিসংবাদিত নেতা। সারা জীবন নির্লোভ ও নির্মোহ থেকে বাংলার মানুষের অধিকার নিয়ে লড়াই করেছেন। বাংলার মানুষের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তিনি ছিলেন সম্পূর্ন আপসহীন। অসাধারণ ধৈর্য, সাহস ও দৃঢ়তা নিয়ে তিনি তার সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে অসংখ্য অগ্নি-পরীক্ষার মধ্যদিয়ে পাকিস্তানি শাসক ও শোষকচক্রকে রুখে দাঁড়িয়ে একটি স্বাধীন দেশের জন্ম দিয়ে গেছেন। যা বিশ্বে বিরল। তাঁর অদম্য সাহস, ইস্পাত-কঠোর সংকল্প, আদর্শ ও লক্ষ্যের প্রতি নিষ্ঠা এবং জনগণের ঐক্য ও সংহতিতে প্রগাঢ় বিশ্বাস থেকে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করার মুহূর্তেও তিনি এক বিন্দু সরে আসেননি।

বাংলাদেশকে নিয়ে জাতির পিতা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন তার সুযোগ্য উত্তরসুরী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সততা ও আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে বঙ্গবন্ধুর আর্শিবাদ সাথে তিনি এগিয়ে চলছেন দূর্বার গতিতে। চারদিকে কত শত বাধা। তারপরও তিনি থেমে নেই। দেশের আপামর জনসাধারণের সমর্থনে তিনি বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেলে রূপান্ত্রিত করেছেন। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগে এখন নেতা কর্মীর অভাব নেই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে নিঃস্বার্থভাবে দেশের জনগণের সেবায় নিজেদের উৎসর্গ করার মতো রাজনীতিবিদের ব্যাপক অভাব রয়েছে। আমরা অনেকেই মুখে বঙ্গবন্ধুর কথা বলি, বঙ্গবন্ধুর নামে গগণ বিদারী স্লোগান দেই কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ ও আদর্শ অন্তরে ধারণ করিনা। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকে সমর্থন করি, যতটা না দেশের প্রয়োজনে তার চেয়ে বেশী ব্যক্তি স্বার্থে। আজ বঙ্গবন্ধু নেই কিন্তু রয়েছে তার আদর্শ। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়তে হলে আওয়ামী লীগের প্রত্যেক নেতা কর্মীকে সততা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর দর্শন, ত্যাগ ও আদর্শ নিজেদের মধ্যে জাগ্রত করতে হবে। এর বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

লেখক: পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, (সাবেক শিক্ষক ফেলো, ইউনিভার্সিটি সায়েন্স মালেয়শিয়া, মালেয়শিয়া)।

;

আমার প্রণতি



ইকবাল হাসান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

এই সুশোভিত সবুজ উদ্যান, এই নদী ও অরণ্য; পাহাড় নিসর্গ,

নক্ষত্রখচিত রাতের আকাশ, দূরের গ্যালাক্সি থেকে

ছুটে আসা হিরন্ময় আলো সমুহ বিস্তৃত আজ, সাক্ষী থাকুক

এই মেঘ, এই বৃষ্টি, সমুদ্রের ঢেউ আর নদীর জলতরঙ্গ, রাখাইন-

সাওতাল জননীর লুপ্ত-প্রায় ভাষা, সাক্ষী থাকুক প্রাচীন পুঁথির

ব্যথিত অক্ষর আর একুশের বর্ণমালা-

আজকের এই কেন্নোপ্লাবিত দেশে তুমি যেন দামেস্কের ভারী তরবারি

কৃষক আর মজুরের কাস্তে-হাতুড়ি-

 

আমি যে স্বাধীন আজ- একথা বলার অহংকার একমাত্র তুমিই দিয়েছো।

শুভ জন্মদিনে হে মহামানব, তোমাকে জানাই আজ আমার প্রণতি।

 

ব্লু মাউনটেইন, কানাডা

মার্চ, ১৬/২১

 

;

জাতির জনকের সাথে ফটোসাংবাদিকদের হৃদ্যতা



ইয়াসিন বাবুল
জাতির জনক যতদিন বেঁচে ছিলেন, ফটোসাংবাদিকদের ততদিন বটবৃক্ষের মতো শীলত ছায়া তলে আগলে রেখেছিলেন।

জাতির জনক যতদিন বেঁচে ছিলেন, ফটোসাংবাদিকদের ততদিন বটবৃক্ষের মতো শীলত ছায়া তলে আগলে রেখেছিলেন।

  • Font increase
  • Font Decrease

কাঁদো বাংলার মানুষ কাঁদো/যদি বাঙালি হও নিঃশব্দে কাছে এসো, আরো কাছে/এখানেই শুয়ে আছেন অনন্ত আলোয় নক্ষত্র লোক। বাঙালির হৃদয় স্পন্দন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মৌমাছির গুঞ্জন পাখির কল-কাকলিতে করুণ সুর বাজে/গভীর অরণ্য পুস্পের সুগন্ধে/অনেক রক্তের মূল্য পাওয়া এ স্বাধীনতা/এখানে ঘুমিয়ে আছে, এইখানে দাঁড়াও শ্রদ্ধায়, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অকুতোভয় এবং জীবন বাজি রাখা নেতৃত্বে এ জাতি তার হাজার বছরের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা সূর্যকে ছিনিয়ে আনে। পাক হানাদার বাহিনীর আত্মসম্পর্নের মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। বাঙালি জাতি নিজেকে বিশ্বের কাছে বীরের জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়।

১৯৭৫ সালে স্বাধীন সোনার বাংলার পরম ধন পরশ মানিক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্ব-পরিবারে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হলে জাতির ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের অমানিসা নেমে আসে। স্বাধীনতা অর্জনের পরতে পরতে আত্মত্যাগ, আত্মউৎসর্গ আর মহামূল্যবান রক্তের ছোপ ছোপ দাগ আজও স্পষ্ট। ইতিহাসে হয়তো অনেক বিজয়ের কাহিনী লেখা আছে। কিন্তু বিজয়ের সে সব কাহিনী রক্তের শ্রোত ধারায় মিশেছে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ঐতিহাসিক বাড়িটিতে।

জাতির জনক কত বড় মনের অধিকারী হলে কোন এক ঈদের দিন ফটোসাংবাদিক রশিদ তালুকদারের কাঁধে হাত দিয়ে কথা বলতে বলতে ঈদের আনন্দ প্রকাশ করেন

স্বাধীনতার স্থপতির বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল স্বাধীন শ্যামল বাংলার মাটি। আকাশ ছোয়া জনপ্রিয় স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির জনকের সঙ্গে ছিল ফটো সাংবাদিকদের গভীর হৃদ্যতা। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত যে সকল ফটোসাংবাদিক মাঠে ময়দানে কাজ করতেন তাদের সকলকেই জাতির জনক নাম ধরে চিনতেন। জাতির জনকের বাড়ির দরজা ছিল সকল ফটো সাংবাদিকের জন্য উন্মুক্ত। নির্ভয়ে নিরাপত্তার করিডোর পেরিয়ে অবাধ যাতায়াত ছিল তাদের। বিভিন্ন সময় তিনি ফটো সাংবাদিকদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা ও মনের ভাব প্রকাশ করতেন। কখনো বুঝতে দিতেন না তিনি একজন জাতির জনক ও রাষ্ট্র নায়ক। আকাশের মতো বিশাল ও সমুদ্রের মতো গভীর হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। প্রয়াত ফটোসাংবাদিক জহির ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে জাতির জনক তার কানে মলা দিয়ে ঠাট্টা করছিলেন, এই দৃশ্য পৃথিবীতে আজ বিরল। এমন অনেক ঘটনাই বিভিন্নভাবে ইত্তেফাকের ডার্করুমে আড্ডাচ্ছলে উঠে আসতো। সবার জুনিয়র হিসেবে তখন শুনে যেতাম। আজ সময় এসেছে সেগুলে নিয়ে দু-চার কথা লেখার। যা নিজ কানে শুনেছি। তেমন কয়েকটি ঘটনার একটি হলো- প্রয়াত ফটোসাংবাদিক রশিদ তালুকদারের ছোট ভাই চুন্নুকে নিয়ে।

একবার গ্রাম থেকে ঢাকায় আসলেন জাতির জনককে সরাসরি দেখবেন বলে। রশিদ তালুকদার সময় বুঝে তার ছোট ভাই চুন্নুকে একদিন ৩২ নম্বর রোডের ধানমন্ডির বাড়িতে নিয়ে জাতির জনকের সঙ্গে দেখা করালেন। জাতির জনক তার চিরায়ত আঞ্চলিকতার মধুমিশ্রিত ভাষায় রশিদ তালুকদারকে বললেন- রশিদ টুংগীপাড়ার বাড়ি থেকে বড় বড় কইমাছ আনছি, সেই মাছ আজ বাসায় রান্না হইছে। তুই তোর ছোট ভাইকে নিয়ে খেয়ে যাবি।

ফটোসাংবাদিক আলহাজ্ব জহিরুল হককে জাতির জনক কানে মলা দিয়ে তার হৃদয়ের বিশালতা প্রকাশ করেন

তখনকার দৈনিক ইত্তেফাকের চার তলায় ডার্করুমে বসা দেশসেরা তিন ফটোসাংবাদিক রশিদ তালুকদার, আফতাব আহমদ ও মোহাম্মদ আলম। রশিদ ভাইয়ের তোলা ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, আলম ভাইয়ের তোলা ২৫ মার্চের নির্মম হত্যাকাণ্ড, আফতাব ভাইয়ের তোলা ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্থানী বাহিনীর আত্মসমর্পণ। এই নিয়ে কথা উঠলো। তখন রশিদ ভাই, আলম ভাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন- আলম তুই তো জাতির জনকের ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফার ছিলি আমার একটি স্মরনীয় অভিজ্ঞতার কথা শোন। আমার যতটুকু মনে পরে ৭২ বা ৭৩ সালে কোন একদিন দুপুরের একটু পড়ে আমি জাতির জনকের ধানমন্ডির বাড়িতে গেলাম। দো’তলায় জাতির জনক ওনার রুম থেকে আমাকে দেখে বলেন- এই রশিদ কী খবর, কী মনে কইরা তুই এই সময়ে আমার এখানে? রশিদ ভাই উত্তর দেয়- আপনাকে দেখতে আসছি। জাতির জনক রুম থেকে বাহিরে এসে রশিদ ভাইয়ের কাঁধে হাত দিয়ে বাড়ির রান্না ঘরের ভিতরে নিয়ে নিজে বিভিন্ন হাড়ির ঢাকনা তুলে দেখতে লাগলেন হাড়ির ভিতরে কি কি খাবার আছে। রশিদ ভাই বলেন- আমি দুপুরের খাবার খেয়ে এসেছি। জাতির জনক বলেন- রশিদ তুই আমার সাথে মিথ্যা কথা বলবি না। তোর মুখ শুকনা শুকনা লাগছে তুই দুপুরে না খেয়ে আমার বাড়িতে আসছোস। যা কিছু আছে তাই দিয়ে খেয়ে নে। রশিদ তালুকদার সেইদিন আপসোস করে বলেছিলেন- এমন মহান নেতা পৃথিবীতে আর এখনো আসবে না।

প্রয়াত ফটোসাংবাদিক আমার শিক্ষাগুরু মোহাম্মদ আলম যার হাত ধরে আমার এই পেশায় আসা তিনি ছিলেন জাতির জনকের ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফার, তার সাথে ছিল জাতির জনকের বহুস্মৃতি। একবার মধ্যেপ্রাচ্য সফরের সময় আলম ভাইকে জাতির জনক ওনার রুমে ভোর সকালে ডাকলেন- আলম বাংলাদেশে আমার ঘুম ভাঙে পাখির কিচিরমিচির আওয়াজে। আজ মধ্যে প্রাচ্যের এই হোটেল রুমে ঘুম ভাঙলো এয়ার কন্ডিশনের আওয়াজে। বাংলাদেশের মতো শান্তির ঘুম বিদেশের মাটিতে হয় না রে আলম। একজন মাটি ও মানুষের নেতা না হলে এমন সরল কথাগুলো একজন ফটো সাংবাদিকের সঙ্গে প্রকাশ করতে না।

জাতির জনক তার শয়ন কক্ষে বিছানায় শুয়ে ফটোসাংবাদিক রশিদ তালুকদারের ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার চেষ্টাও করেছেন

জাতির জনক একবার স্পিডবোটে পদ্মা পাড়ি দিচ্ছিলেন। ভিন্ন একটি বোট থেকে আলম ভাই লক্ষ্য করলেন জাতির জনক নিজেই স্পিডবোট চালাচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে তখন আলম ভাই তার স্পিডবোটের ড্রাইভারকে সরিয়ে নিজে স্পিডবোট স্টিয়ারিং ধরলেন। একপর্যায়ে জাতির জনকের স্পিডবোটটিকে অভারটেক করে সামনে এগিয়ে গেলেন। জাতির জনক ও চেষ্টা করলেন আলম ভাইয়ের স্পিডবোটকে অভারটেক করার জন্য কিন্তু সম্ভব হলো না। পরে ঘাটে এসে স্পিডবোট থেকে নেমে জাতির জনক হাসতে হাসতে বললেন- আলম আমি ড্রাইভার খারাপ না, কিন্তু আমার স্পিডবোটের হর্স পাওয়ার ছিলো না রে আলম।  গণভবনে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে জাতির জনক বৈঠক করছেন, ফটোসাংবাদিক আলম ভাইয়ের হাতে খবরের কাগজ দিয়ে মোড়ানো একটি প্যাকেট জাতির জনক রাখতে দিলেন। আলম ভাই সেই প্যাকেট তার জিপে রেখে দিলেন। ড্রাইভার জিপ পরিষ্কার করতে গিয়ে খবরের কাগজ দিয়ে মোড়ানো একটি প্যাকেট পেয়ে আলম ভাইয়ের হাতে দিয়ে বললেন- স্যার জিপে এই প্যাকেট পাওয়া গিয়াছে। আলম ভাই কিছুতেই মনে করতে পারছে না। এই প্যাকেট কোথা থেকে জিপে এলো? কয়েক দিন পর মনে পড়লো এই প্যাকেট তো জাতির জনক আমাকে গণভবনে বৈঠকের সময় রাখতে দিয়েছিলেন। পরে প্যাকেটটি জাতির জনকের হাতে ফিরিয়ে দিলেন। জাতির জনক আলম ভাইকে বলেন- আলম এই প্যাকেটের ভিতর কি আছে তুই জানিস? আলম ভাই না সূচক জবাব দিলেন। জাতির জনক খবরের কাগজ দিয়ে মোড়ানো প্যাকেটটি একটু ছিড়ে আলম ভাইকে দেখালেন ভিতরে কি আছে- ‘এই প্যাকেটের ভিতরে টাকা আছে, আলম তুই এই টাকা নিয়ে যা’। আলম ভাই অবাক হয়ে জাতির জনককে বললেন- স্যার এই টাকা তো পার্টির ফান্ডের টাকা, আপনি আমাকে এই টাকা দেন কেন, আমি এই টাকা নেব না। জাতির জনক হাসি দিয়ে বললেন- আলম এই কারণেই আমি তোকে এতো পছন্দ করি।

জাতির জনক একটি সেমিনারে যোগদানের জন্য সিঙ্গাপুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলেন। সফরসঙ্গী হিসেবে অনেকের মধ্যে ছিলেন-ফটো সাংবাদিক আফতাব আহমদ। প্লেন যখন মধ্য আকাশে, জাতির জনক তার সফর সঙ্গীদের এক এক করে ডেকে ওনার পাশের আসনে বসিয়ে বিভিন্ন খোঁজখবর নিতে শুরু করলেন। একপর্যায়ে ফটো সাংবাদিক আফতাব আহমদকে ডেকে বসালেন।

বলেন- কিরে আফতাব তুই আমার সাথে সিঙ্গাপুরে একটি আন্তর্জাতিক সেমিনারে যোগদান করতে যাবি, তোর গায়ে এমন সাধারণ জামা কেন? তোর কি কোন কোট নাই? আফতাব আহমদ সরল-সত্য উত্তর দেন- মুজিব ভাই আমার কোন কোট নাই। তাই আমি এই সাধারণ পোশাক পরে আপনার সফরসঙ্গী হয়েছি। জাতির জনক সঙ্গে সঙ্গে তার পকেট থেকে টাকা বের করে আফতাব আহমদকে দিয়ে বললেন- ‘এই নে টাকা। তুই এই টাকা দিয়ে তোর জন্য একটি কোট তৈরি করবি। সেই কোট তুই গায়ে দিয়ে আমার সাথে আবার অন্য কোন সফরে যাবি।’

আজকের জীবন্ত কিংবদন্তী সেই দিনের তরুণ ফটোসাংবাদিক রফিকুর রহমান জাতির জনকের সাথে অন্তরঙ্গ মনের ভাব বিনিময় করেন

জীবন্ত কিংবদন্তী ফটো সাংবাদিক রফিকুর রহমান ১৯৭২ সালে কোন একদিন ধানমন্ডির জাতির জনকের বাড়িতে গেলেন। দোতলায় ওনার শয়নকক্ষে উঁকি দিলেন। কক্ষের ভিতরে বসা জাতির জনক, তাকে দেখে সাথে সাথে ডেকে বলেন- এই রহমান ভিতরে আয়, এখানে বস আর কেমন আছিস, কী খবর বিভিন্ন কথা প্রসঙ্গে জাতির জনক বলেন- আমি কতো সম্পদের মালিক দেখবি? এই কথা বলে তিনি বাড়ির একজন স্টাফকে ডাকলেন। ওই ব্যক্তি কাছে এলে তিনি বলেন- আমার সমস্ত গুপ্ত ধনগুলো বাহির করো। ওই ব্যক্তি খাটের নিচ থেকে একটি বাক্স বাহির করলেন। বাক্সে খুলে জাতির জনক তার গুপ্ত ধনগুলো একে একে বাহির করা শুরু করলেন। সেই গুপ্ত ধনের মধ্যে ছিলো ১০টি তামাকের পাইপ ও মিস্টার ফিদেল কাস্ত্রোর উপহার দেওয়া দুই কার্টুন তামাক, যা দিয়ে তিনি বিভিন্ন সময় পাইপে তামাক খেতেন। এই হলো জাতির জনকের সম্পদ বা গুপ্তধন।

রহমান ভাই বলেন জাতির জনক ১০টি তামাক খাবার পাইপ ওই স্টাফকে দিয়ে সুন্দর করে সাজিয়ে তাতে তামাক ভরে একটা করে সুখ টানদেন আর বলতে থাকেন- এই পাইপটা দিয়েছেন মিসেস ইন্দিরা গান্ধী, তার পর আবার অন্য একটা পাইপে সুখটান দিয়ে বলেন এই পাইপটা দিয়েছেন মিস্টার ফিদেল কাস্ত্রো, এই পাইপটা দিয়েছেন মিস্টার মার্শাল টিটো। এইভাবে ১০টি পাইপে সুখটান দিতে দিতে কয়েক জন বিশ্ববরেণ্য রাষ্ট্র প্রধানদের উপহার দেওয়া পাইপগুলো জাতির জনক সম্পদ বলেই মনে করতেন। যাদের তিনি আপন ভাবতেন তাদেরকে বাক্স খুলে সব পাইপগুলো দেখাতেন। আর শখের সেই পাইপগুলো সাজিয়ে তাতে তামাক ভরে আয়েশ করে মনের সুখে সুখটান দিতেন।

১৯৭২ সালে কোন এক দিন জাতির জনক সকল ফটোসাংবাদিকদের সুগন্ধায় ডাকলেন। তিনি উপস্থিত সকল ফটোসাংবাদিককে বলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, ইন্দিরা গান্ধী দিল্লিতে এশিয়ান ফেয়ারে বাংলাদেশের জন্য একটি স্টল বরাদ্দ করেছেন তাই সেখানে বাংলাদেশকে অংশ নিতে হবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে কিছু নেওয়ার মতো, অথবা উপস্থাপন করার মতো কিছুই ছিলো না। জাতির জনক বলেন- আমি অনেক চিন্তা করে দেখেছি দিল্লি এশিয়ান ফেয়ারে তোমাদের তোলা গণআন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক ছবিগুলো প্রদর্শনী হলে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে খুব দ্রুত পরিচিত করতে সাহায্য করবে। জাতির জনকের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ শুরু হয়ে গেল। তারপর আনন্দের সংবাদ হলো এশিয়ান ফেয়ারে বাংলাদেশের গণআন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ছবি প্রর্দশনী দেখতে বাধ ভাঙা জোয়ারের  মতো উপচে পড়া বিদেশি মানুষের ভিড় লেগেই ছিল। সেই সংবাদ পৃথিবীর সব খবরের কাগজ ও টিভি চ্যালেনগুলোতে গুরুত্বসহকারে প্রচার পেলো। দিল্লি এশিয়ান ফেয়ারে প্রর্দশীত ছবিগুলির মধ্যে থেকে কয়েকটি লাইফ সাইজ ছবি জাতির জনকের স্বাক্ষরসহ বর্তমানে ধানমন্ডি বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে শোভা পাচ্ছে।

ডিজিটাল বাংলাদেশের বাজেট আজকে প্রায় ৫ লাখ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু একটা সময় এই বাংলাদেশ বিশ্বের সামনে উপস্থাপন করার মতো কিছুই ছিল না। সেই দিন জাতির জনক ফটো সাংবাদিকদের গুরু দায়িত্ব দিয়েছিলেন বিশ্বের সামনে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে উপস্থাপন ও পরিচিত করতে। সেই দায়িত্ব ফটো সাংবাদিকরা অত্যন্ত আন্তরিকতা ও দক্ষতার সাথে পালন করে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশর মুখ উজ্জ্বল করেছিলো। ফটো সাংবাদিকরা জাতির জনকের দিকে তাকাতেন ক্যামেরার চোখে। আর জাতির জনক ফটো সাংবাদিকদের দিকে তাকাতেন হৃদয়ের চোখ দিয়ে।

আজ জাতির জনক নেই, আছে তার সোনার বাংলা, রয়ে যাবে বিশ্ব মানচিত্রে অনাদিকাল। যতদিন থাকবে এই সোনার বাংলা ততোদিন থাকবে জাতির জনকের হৃদয়ের আপনজন ফটো সাংবাদিকদের ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি হওয়া ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, ২৫ মার্চের নির্মম হত্যাযজ্ঞ, ১৬ ডিসেম্বরের হানাদার বাহিনীর আত্মসর্ম্পনের দৃশ্য, বিজয়ের আনন্দ উল্লাস, আর শোকাবহ ১৫ আগস্ট স্বজন হারানো হাজারো ও স্বজনের নিঃশব্দ আর্তনাদ।

লেখক: ইয়াসিন বাবুল, সহ-সভাপতি বাংলাদেশ ফটোসাংবাদিক এসোসিয়েশন
;

৭ মার্চের অমর কবিতা ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়



প্রফেসর ড. সৈয়দ সামসুদ্দিন আহমেদ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পরতে পরতে মিশে আছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসামান্য অবদান। মহান ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জন-এই দীর্ঘ বন্ধুর পথে তাঁর অপরিসীম সাহস, সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষা, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং সঠিক দিক-নির্দেশনা জাতিকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অসীম সাহসিকতার সাথে রেসকোর্স ময়দানে লাখো জনতার উদ্দেশে বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন।

তিনি বলেছিলেন, ‘... এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। জয় বাংলা।’

মূলত এটাই ছিল স্বাধীনতার ডাক। তবে গ্রেফতার হওয়ার আগে একাত্তরের ২৬ শে মার্চ প্রথম প্রহরে জাতির পিতা ঘোষণা করেন বাঙালি জাতির বহুকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দীর্ঘ ন’মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে তাই ৭ মার্চের ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।

এই ভাষণকে ধারণ করেই মরণপণ যুদ্ধ করেছে বাংলার দামাল ছেলেরা। যার যেভাবে সুযোগ হয়েছে সেভাবেই দেশমাতৃকার জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন নিজেকে।

বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের ন'মাস পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে থাকলেও সর্বক্ষণ বাংলার মানুষের সঙ্গে ছিলেন তিনি। তাঁর বজ্রকণ্ঠের বক্তৃতায় রক্ত টগবগিয়ে উঠতো এ দেশের মানুষের। তাইতো শত কষ্টের মাঝেও জীবন দিয়ে দেশকে শত্রুমুক্ত করেছেন তারা।

আজ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় বঙ্গবন্ধুর দেওয়া সেই ঐতিহাসিক ভাষণ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পেয়েছে।

ভাষণটিকে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্ট্রারে’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে যেসব তথ্যভিত্তিক ঐতিহ্য রয়েছে সেগুলোকে সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্ম যাতে তা থেকে উপকৃত হতে পারে সে লক্ষ্যেই এ তালিকা প্রণয়ন করে ইউনেস্কো।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমবারের মতো ‘ঐতিহাসিক ৭ই মার্চ’কে জাতীয় দিবস হিসেবে উদযাপন করছে সরকার। কোভিড-১৯ পরিস্থিতিতে দিবসটি উদযাপনে অনুষ্ঠানমালা কিছুটা সীমিত করলেও বিভিন্ন আঙ্গিকে তা উদযাপন করা হচ্ছে।

ধারাবাহিক রাজনৈতিক আন্দোলনের পটভূমিতে ৭ই মার্চের প্রেক্ষাপট রচিত হয়। পাকিস্তানের চব্বিশ বছরের ইতিহাস ছিলো শোষণ-বঞ্চনার। দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত কৃত্রিম রাষ্ট্রটি শুরু থেকেই ছিল বাঙালি বৈরী। মূলত এরপর থেকেই শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালি অব্যাহতভাবে তার অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালিয়ে গেছে। এভাবে বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

এরমাঝে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ২৩ বছরের মধ্যে পাকিস্তানে কোনো সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১-এর জানুয়ারি। সেই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশে জাতীয় পরিষদের ১৬৯টি আসনের ১৬৭টি লাভ করে।

পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ছিল ৩১৩ আসনবিশিষ্ট। পশ্চিম পাকিস্তানে ৮৩ আসন পেয়ে জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। ওই নির্বাচন ছিল বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার প্রতি জনগণের রায়।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্র, জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি), কাইয়ুম খানের মুসলিম লীগ প্রভৃতি চক্র গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বাইরে গিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করে।

সব মিলিয়ে তাদের আচরণে স্পষ্ট ছিল যে, তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। অন্যদিকে নানা কৌশলে কালক্ষেপণ করছিল আর বাঙালির বিরুদ্ধে হামলে পড়ার জন্য সামরিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছিল।

এদিকে বঙ্গবন্ধু গণতান্ত্রিক রাজনীতির রীতিনীতিতে অবিচল থাকেন। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি তিনি তাঁর দলের জনপ্রতিনিধিদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভায় শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।

৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচনা এবং জনগণের রায়ের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার শপথ পাঠ করান। এর মাঝেই ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেন।

১৫ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে ভুট্টো জানান, তিনি ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগদান করবেন না। তিনি অধিবেশন ‘বয়কট’ করবেন।

এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র রচিত হলে পাকিস্তানের স্থিতিশীল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা নেই। তা ছাড়া ঢাকায় এলে তাঁর দলের সদস্যরা জিম্মি হয়ে পড়বেন। এসব ছিল তাঁর দায়িত্বজ্ঞানহীন উক্তি ও ষড়যন্ত্রের অংশ।

২২ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া হঠাৎ তাঁর মন্ত্রিপরিষদ বাতিল করেন। পিপলস পার্টির মুখপাত্র আবদুল হাফিজ পীরজাদা দাবি করেন, তাঁদের দলের চাপেই প্রেসিডেন্ট তাঁর মন্ত্রিপরিষদ বাতিল করেছেন। এসব আলামত দেখে বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর গভীর ষড়যন্ত্র চলছে।

এর মধ্যে ভুট্টো করাচিতে সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে তা হবে ‘ডিকটেটরশিপ অব দ্য মেজরিটি’ বা সংখ্যাগরিষ্ঠের একনায়কত্ম।

এ জাতীয় উসকানিমূলক বক্তব্যের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু কোনো উচ্চবাচ্য করেননি। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি বলেন, ভুট্টোর বক্তব্য গণতন্ত্রের পরিপন্থী। গণতন্ত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলই সরকার গঠন করে।

বঙ্গবন্ধু বলেন, ভুট্টো সাহেবের ইচ্ছা পাকিস্তানে সংখ্যালঘু দলের একনায়কত্ম প্রতিষ্ঠিত হোক, ডিকটেটরশিপ অব দ্য মাইনরিটি বাংলার মানুষ মেনে নেবে না।

তিনি বলেন, আমরা ৬ দফা কারও ওপরে চাপিয়ে দেব না। একজন সদস্যও যদি যুক্তিযুক্ত কোনো দাবি করেন, তা গ্রহণ করা হবে।

বঙ্গবন্ধু জানান, দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি মাওলানা ভাসানী, নূরুল আমিন, আতাউর রহমান খান, মোজাফ্ফর আহমদসহ অন্যান্য দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন।

৩ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশনে যোগদানের প্রস্তুতি হিসেবে পূর্বাণী হোটেলে ১ মার্চ আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠক হয়। ওই সময়ই রেডিওতে ঘোষিত হয়, প্রেসিডেন্ট জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করেছেন।

শাসকশ্রেণির স্বৈরতান্ত্রিক আচরণে বাংলাদেশের মানুষ আগেই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু রেডিও-তে ইয়াহিয়ার এই ভাষণের সঙ্গে সঙ্গে দলমত-নির্বিশেষে জনগণ রাজপথে নেমে পড়ে।

তাদের ‘তোমার আমার ঠিকানা—পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘পিন্ডি না ঢাকা—ঢাকা, ঢাকা’ ইত্যাদি স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠে চারপাশ।

লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে পুরো ঢাকা শহর। এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধু ছয়দিনের কর্মসূচি দেন। তা হচ্ছে- ২ মার্চ ঢাকায় পূর্ণ হরতাল ও ৩ মার্চ সারা দেশে হরতাল।

বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দেন, ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভায় ভাষণ দেবেন। দূরদর্শী নেতা বঙ্গবন্ধু এও বলেন, ভুট্টোর দল ও কাইয়ুম খানের মুসলিম লীগ ছাড়াও আমরা শাসনতন্ত্র রচনা করতে পারব।

একই সঙ্গে জানিয়ে দেওয়া হয়, ৭ মার্চের জনসভায় পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এমন প্রেক্ষাপটে রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দেন বঙ্গবন্ধু। পৃথিবীর সেরা রাজনৈতিক ভাষণের ইতিহাসে তাঁর এই ভাষণ ব্যতিক্রমী এবং অনন্য। অন্য সব সেরা ভাষণ ছিল লিখিত। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি অলিখিত।

তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁর মনের কথা জনতার উদ্দেশ্যে বলেছেন। প্রায় ১৯ মিনিটের ভাষণ শেখ মুজিব শুরু করেছিলেন জনতাকে ‘আপনি’ সম্বোধন করে।

বলেছিলেন ‘আপনারা সবই জানেন এবং বোঝেন’। তিনি জনতাকে তাঁর সহযাত্রী মনে করেছিলেন। সহযাত্রীর সব দুঃখ-বেদনা সম্পর্কে তিনি ছিলেন ওয়াকিবহাল। প্রকৃত নেতারা এমনই হয়, যেমনটা ছিলেন বঙ্গবন্ধু

তাঁর মনে প্রাণে ছিল শুধু বাংলার মানুষ। তাই তিনি সবার হয়ে তাদের দুঃখ-বেদনার কাব্য তুলে ধরেছিলেন তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণে

ভাষণের একপর্যায়ে বাংলার আপামর জনসাধারণের অনুভূতিগুলোকে নিজের অনুভূতির সঙ্গে ঝালিয়ে নিয়ে কখন যে উপস্থিত জনতা ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে পরিণত হয়ে গেছে তা বক্তা-শ্রোতা কেউ-ই খেয়াল করেননি।

বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘... তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইলো, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই দিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে।... মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দিব। এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্ ।’

এই বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ মুজিবুর রহমান একটি গেরিলাযুদ্ধের দিক-নির্দেশনা দিয়েছিলেন। ভাষণ শেষে স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগানমুখর হয়ে উঠেছিলো ঢাকার পথঘাট। কার্যত স্বাধীনতার ঘোষণা বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে-ই দিয়েছেন। এজন্য বেশ সতর্কতা অবলম্বন করেন জনতার নেতা শেখ মুজিব।

ষাটের দশকের শেষ দিকে পৃথিবীর অনেক দেশেই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছিল। নাইজেরিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতার জন্য বায়াফ্রা সশস্ত্র সংগ্রাম করছিল। রক্তপাত হচ্ছিল কিন্তু আন্তর্জাতিক সমর্থন পাচ্ছিল না বিদ্রোহীরা। আন্দোলন চলছিল ইন্দোনেশিয়াতেও। সেসব আন্দোলনের নেতিবাচক দিক ও দুর্বলতা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর ধারণা ছিল।

তিনি উপলব্ধি করেন হঠকারিতার পরিণতি শুভ হয় না এবং হঠকারী নেতা কখনো বিশ্ববাসীর সমর্থন পান না। ওই সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর সংযত আচরণের জন্য আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন তাঁর দিকে এবং প্রতিপক্ষ পাকিস্তান সরকার ধিক্কৃত।

তিনি এতটা সুকৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে দেন যে এই কৌশলের কারণে ইয়াহিয়া খানের নির্দেশ এবং প্রস্ততি তাকা স্বত্বেও এই জনসভার ওপর হামলা করার সাহস করেনি পাকিস্তানের সেনাবাহিনী।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক গোয়েন্দা প্রতিবেদনে একজন কর্মকতা বলেন যে, শেখ মুজিব কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে চলে গেল, কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারলাম না (ডয়েচে ভেলে, ৩১ অক্টোবর ২০১৭)।

বঙ্গবন্ধু সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষা ও শব্দ ব্যবহারে সাবলীল বক্তৃতা করেছেন। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে প্রতিদিন যে মানুষ মারা যাচ্ছিল তাও তুলে ধরেন তিনি। ৬ মার্চ এ ইয়াহিয়া যে, ২৫ মার্চে ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠানের কথাও উঠে আসে তাঁর ভাষণে। তুলে ধরেন পাকিস্তানের ২৩ বছরের রাজনীতির পটভূমি।

বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘... ২৫ তারিখ অ্যাসেমব্লি ডেকেছেন। রক্তের দাগ শুকায় নাই। রক্তে পাড়া দিয়ে, শহীদের উপর পাড়া দিয়ে, অ্যাসেম্বলি খোলা চলবে না। ... আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। দেশের মানুষের অধিকার চাই।...আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায় রাখতে পারবা না।’

তাঁর ঘোরতর প্রতিপক্ষ ও শত্রুকেও সৌজন্য রক্ষা করে সম্বোধন করেছেন। বঙ্গবন্ধু বলেছেন, জনাব ইয়াহিয়া খান সাহেব, জনাব ভুট্টো সাহেব। রাজনৈতিক সমস্যা সমাধান এবং জাতীয় পরিষদে যোগদানের এমন চারটি শর্ত ঘোষণা করেন যা কারও পক্ষে অযৌক্তিক বলা সম্ভব ছিল না। সে জন্য পৃথিবীর মানুষ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দেয়।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একজন নেতা। জনগণনন্দিত ও গণতান্ত্রিক এই নেতা শেষ পর্যন্ত চেয়েছিলেন, শান্তিপূর্ণ উপায়ে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের স্বাধিকার অর্জনের পথ খোলা রাখতে। ৭ই মার্চের পরও তিনি ইয়াহিয়া, ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনায় বসেছেন।

তারা চেয়েছেন অস্ত্রের মাধ্যমে বাঙালিকে দাবিয়ে রাখতে। পাকিস্তানি সৈন্যদের বারণ করে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বলেছেন, '... তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দমাতে পারবে না।'

কিন্তু নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র পশুশক্তি নিশ্চিহ্ন করতে করতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাঙালি আর মেনে নেয়নি, তারা রুখে দেয়।

শোষিত ও নির্যাতিত বাঙালি জাতিতে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। একাত্তরের মার্চ মাসের ৭ তারিখে তাঁর ভাষণেই যেন মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের নতুন এক দিগন্তের সূচনা করে।

আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করতে যাচ্ছি, উদযাপন করেছি জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী। এবছর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণেরও পঞ্চাশ বছর পূর্ণ হতে চলেছে।

এমতাবস্থায় এই ভাষণটি আজও আমাদের জাতীয় জীবনের অনুপ্রেরণা। বঙ্গবন্ধু নেই, কিন্তু তার দিকনির্দেশনা আজও রয়ে গেছে। সেই নির্দেশনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সামনের দিয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ, জয় বাংলা।

লেখক-উপাচার্য, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়; জামালপুর। ই-মেইল: [email protected], [email protected]

;