১৫ আগস্ট, সিআইএ এবং জিয়া

দুলক আহমেদ
অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

অলঙ্করণ: আনিসুজ্জামান সোহেল

  • Font increase
  • Font Decrease

সম্প্রতি মুক্ত হওয়া ও প্রকাশিত মার্কিন গোপন দলিল মারফত জানা যায় ১৯৭৩ থেকেই খুনি চক্র মার্কিন দূতাবাসের সাথে যোগাযোগ শুরু করে। মার্কিন দূতাবাস সে সময় থেকে ধারণা করা শুরু করে মুজিব উৎখাত আসন্ন। ’৭৪ এর মাঝামাঝির আগে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসে প্রতিরক্ষা এটাশে ছিল না। ফলে খুনিদের অনেকেই বুঝে উঠতে পারেনি তাদের কার সাথে যোগাযোগ করা উচিত। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে পাঠানো কয়েকটি বার্তায় দেখা যায় বোস্টার লিখেছেন তার একজন কর্মকর্তার সাথেই কথা হয়েছে এবং আগত অফিসারের নাম মেজর মহিউদ্দিন।

’৭৪ সালে কতক খুনিদের কারো কারো সাথে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতাদের এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। তার আগেও খুনিদের কেউ কেউ সরকারি দায়িত্ব পালনে ক্ষমতার অপব্যাবহার করেন। এর জের ধরে কয়েকজন অফিসার বরখাস্ত বা অপসারিত হন। এ থেকেই খুনিরা সরকার উৎখাতের বড় পরিকল্পনার দিকে অগ্রসর হয়। ’৭৪ এর শেষ এবং জানুয়ারির প্রথম দিকে খুনিদের—দূতাবাস কর্মকর্তাদের সাথে বেশ কয়েকটি ধারাবাহিক বৈঠক হয়। সে বৈঠকে খুনিদের পক্ষে মার্কিন সমর্থন নিশ্চিত করা হয়।

’৭৪ এর শেষের দিকে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে কর্মরত ছিলেন ফিলিপ চেরি। তার পদ সেখানে কী ছিল তা জানা নেই তবে তাকে অনেকেই জানত রাজনৈতিক কর্মকর্তা হিসেবে। তবে পরে তিনি পরিচিত হয়েছেন সিআইএ ঢাকা স্টেশন প্রধান হিসেবে। ’৭৪ এর শেষের দিকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইগুয়েন বোস্টার মোটামুটি অবহিত হন সরকার পতন আসন্ন। তিনি তার সিআইএ স্টাফদের এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত থাকতে নিষেধ করে দেন। চেরি কিন্তু সে নিষেধ মানেননি। তিনি সরাসরি খুনিদের সাথে যোগাযোগ না করলেও খুনিদের পক্ষে আসতে পারে এমন সিনিয়র কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করেন। হয়তো তার ওপর কেন্দ্রীয় সিআইএর গোপন নির্দেশনা ছিল। সিআইএ কর্মকর্তা চেরি আগেই জানতেন সেনা প্রধান শফিউল্লাহ এবং তার সিজিএস খালেদ মোশাররফ ভারত অনুগত তাই তিনি এদের বাদ দিয়ে পূর্ব পরিচিত সেনা উপপ্রধান জিয়াকে পছন্দ করলেন। জিয়ার সাথে তার আগেই পরিচয় ছিল। জিয়া ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চৌকস গোয়েন্দা। আইএসআই-এ থাকাকালীন প্রায় দীর্ঘ ৪ বছর ক্যাপ্টেন জিয়া সিআইএ-র সাথে কাজ করেছেন। এতে সিআইএ-র অনেকের সাথে তার সদ্ভাব গড়ে উঠেছিল। সিআইএ-র এজেন্ট হিসেবে জিয়া তখন তিব্বতীয় গেরিলাদের উত্তরবঙ্গে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম তদারক করতেন। সিআইএ এ সময়ে চীনের বিরুদ্ধে তিব্বতীয় গেরিলা দ্বারা চীনের তিব্বতের পরিস্থিতি অবনতি করার কর্মসূচি নিয়েছিল। আর এজন্য তারা যুগপৎভাবে ভারত এবং পাকিস্তানে তিব্বতীয় গেরিলাদের প্রশিক্ষণ দিত। এক দেশের বিষয়টি অপর দেশ জানত না।

’৭৫-এ বাংলাদেশ বাকশাল কর্মসূচি নিলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতি আরো বৈরীভাবাপন্ন হয়। সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ ছিল বাকশালের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন। এদিন গভর্নরদের শপথ নিয়ে বাকশাল প্রশাসন চালুর কথা ছিল। খুনিরা এবং তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের এর আগেই কিছু করার পরিকল্পনা ছিল। আগস্টের প্রথম সপ্তাহে চেরি সেনা উপপ্রধান জিয়ার সাথে এক গোপন বৈঠকে মিলিত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এজন্য তিনি তার ঘনিষ্ঠ বাংলাদেশের এক শিল্পপতি ব্যবসায়ীর দ্বারস্থ হন। সে ব্যবসায়ী চেরির ঘনিষ্ঠ হলেও তিনি জানতেন না চেরি সিআইএ ঢাকা প্রধান। চেরির কথা মতো তিনি তার বাসায় ডিনারের ব্যবস্থা করলেন। সে ডিনারে চেরি পরিবারের বাইরে অতিথি কেবল একটি পরিবার। জিয়া ও তার পত্নী। ডিনারের আগে তারা বাগানের লনে দীর্ঘ বৈঠক করেন। ডিনারের পরেও আরেক দফা। কী হচ্ছে সে শিল্পপতি আন্দাজই করতে পারেননি। তাদের বৈঠকের বিষয় কী ছিল তা আন্দাজ করা যায়। জুনিয়ররা কাজ করবে সিনিয়ররা নিষ্ক্রিয় থাকবে। উল্লিখিত শিল্পপতি আবার ঘনিষ্ঠ ছিলেন Lawrence Lifschultz-এর সাথে। ফলে ঘটনাটি তিনি পরে জেনেছেন।

১৫ আগস্ট সকালে খুনিরা শফিউল্লাহকে, জিয়াকে বা খালেদ মোশাররফকে ডিস্টার্ব করতে যায়নি। তারা গিয়েছিল কর্নেল জামিলকে নিয়ন্ত্রণ করতে। ৪৬ ব্রিগেডে তখন তিনটি ব্যাটেলিয়নের একটি ছিল ১ ইবি জিয়ার জেড ফোর্সের। এদের অধিকাংশই জিয়া ভক্ত। সেদিন সকালে তারাই হাস্যজ্জল ছিল। বাকি দুই ব্যাটেলিয়ন ছিল খালেদের ৪ ইবি একটি অপরটি শফিউল্লাহর ২ ইবি। একটি আর্টিলারি রেজিমেন্ট ছিল ২ ফিল্ড আর্টিলারি যার কমান্ডার ছিলেন লেঃকঃ রশিদ। ট্যাঙ্ক বাহিনী বেঙ্গল লেন্সার ছিল লেঃকঃ ফারুক রহমানের নিয়ন্ত্রণাধীন। ব্রিগেডের ব্যাটেলিয়ন কম্যান্ডাররাও ছিলেন জিয়া অনুগত। তবে ব্রিগেড মেজর হাফিজ ছিলেন বিপক্ষে। খুনিরা ঢাকার রক্ষীবাহিনীকে গোনার মধ্যে রাখেনি তবে সাভারের রক্ষীবাহিনী প্রতিরোধের তাদের এক বড় প্রস্তুতি ছিল। ৪৬ ব্রিগেডে জিয়ার প্রভাব খালেদ বা শফিউল্লাহর চাইতে বেশি ছিল। পরবর্তীতে আমরা দেখেছি রশিদবিহীন ২ ফিল্ড আর্টিলারি জিয়াকে ক্ষমতায় এনেছিল। যদি সেদিন ব্রিগেড প্রতিরোধের পথে অগ্রসর হতো তবে সেখানেও একটি অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ হয়ে যেত।

১৫ আগস্টের ঘটনার পর সেই শিল্পপতি তার বাসায় আয়োজন করা ডিনারের মর্ম বুঝতে পেরে ক্ষোভে জ্বলতে থাকেন। তিনি ছুটে যান চেরির বাসায়। তিনি ঘটনার জন্য উত্তেজিতভাবে চেরিকে দোষারোপ করেন। এ সময় চেরির স্ত্রী শিল্পপতিকে শান্ত করেন। চেরি সেদিন শিৎল্পপতির সাথে কিছু বললেন না। এর পর থেকে দুজনের বন্ধুত্বে ছেদ পড়ে কেউ কারো সাথে আর যোগাযোগ করেননি।

পরবর্তীতে চেরি Lawrence Lifschultz-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মুজিব উৎখাতে তার জড়িত থাকার বিষয় অস্বীকার করেন। Lawrence Lifschultz ব্যাখ্যায় বলেন তিনি তখন এ বিষয়ে কিসিঞ্জার, হেরল্ড সেন্ডার্স, জর্জ গ্রিফিনের সাথে অসংখ্য বার্তা বিনিময় করেছিলেন।

১৩ আগস্ট মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী কিসিঞ্জার বলেন তার দেশ অপর কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যার সাথে জড়িত ছিল না এবং জড়িত থাকবেও না যা বাংলাদেশের পত্রিকায়ও প্রকাশ করা হয়। বিবৃতির ২ দিন পরেই বাংলাদেশে ঘটে যায় সিআইএ সমর্থনপুষ্ট ইতিহাসের নির্মম ঘটনা।


আংশিক তথ্যসূত্র: Lawrence Lifschultz ভায়া ইন্দ্রজিত ভরদ্বার ইন্ডিয়া টুডে, বিভিন্ন সময়ের মার্কিন ক্যাবল বার্তা, এবং অন্যান্য।