ফেঁসে যাচ্ছেন মেয়র জাহাঙ্গীর, শুক্রবার সিদ্ধান্ত



স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট, বার্তা২৪.কম, ঢাকা
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম

  • Font increase
  • Font Decrease

বঙ্গবন্ধু ও মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটূক্তির ঘটনায় ফেঁসে যেতে পারেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম। দলীয় ও মেয়র পদ হারানোর পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে মামলা হতে পারে বলে দলীয় সূত্র আভাস দিয়েছে।

সূত্রটি জানিয়েছে, শুক্রবার (১৯ নভেম্বর) আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় গাজীপুর সিটি মেয়রের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে। শোকজের জবাব সন্তোষজনক হয়নি বলেই বিষয়টি সভায় উঠছে। মেয়র যেসব কথা বলেছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। তাকে শাস্তি দেওয়া না হলে দলের চেইন অব কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ভবিষ্যতে আরও অনেকেই এমন কটূক্তি করার দুঃসাহস দেখাতে পারেন। তাই আওয়ামী লীগ তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দিকেই অগ্রসর হচ্ছে।

অল্প বয়সে মেয়র হয়ে চমকে দেওয়া জাহাঙ্গীর আলমের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে। সেই অডিওতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এবং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে নানা রকম মনগড়া তথ্য উত্থাপন করেছেন তিনি। এতে বঙ্গবন্ধুকেও খাটো করা হয়েছে। অডিও ফাঁসের পর ফুঁসে উঠেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তারা মেয়রের কুশপুত্তলিকা দাহসহ ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।

মেয়র জাহাঙ্গীর প্রথম থেকেই অডিওটি এডিটিং করা বলে দাবি করে আসছেন। তার এসব বক্তব্যে স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিশ্বাস করতে চাইছে না। তাদের বক্তব্য হচ্ছে তাহলে মেয়র নিজেই প্রমাণ করুক বিষয়টি মিথ্যা।

স্থানীয়দের বিক্ষোভের পর কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ গত ৩ অক্টোবর শোকজ নোটিশ পাঠায় গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের এই সাধারণ সম্পাদককে। ইতিমধ্যেই শোকজের জবাব দিয়েছেন মেয়র জাহাঙ্গীর। তবে, তার সেই জবাব নিয়ে গত ২২ অক্টোবর আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায় অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়।

পরদিন (২৩ অক্টোবর) সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর আলম এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ অন্যান্য আরও কিছু সাংগঠনিক শৃঙ্খলাবিরোধী উপস্থাপনীয় অভিযোগ আগামী ১৯ নভেম্বর গণভবনে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভায় উত্থাপিত হবে।

গাজীপুরে মেয়রের কুশপুত্তলিকা দাহসহ ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শন

এবিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ গণমাধ্যমকে বলেছেন, মেয়র জাহাঙ্গীরের যে বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সেটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আমাদের আহত করেছে।

তিনি আরও জানান, জাহাঙ্গীরের বক্তব্যের সত্যতা খুঁজে পাওয়া গেছে বলেই তাকে শোকজ করা হয়েছে। ইস্যুটির মীমাংসা করতে কার্যনির্বাহী সংসদের সভা আহ্বান করা হয়েছে ১৯ নভেম্বর। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটূক্তি করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। সেই আলোকেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তরুণ এই মেয়রের জীবনটাই রহস্যে ঘেরা। এক যুগ আগেও হারিকেন এলাকায় ফজলুর রহমান মুন্সীর বাসায় ভাড়া থাকতেন। আর এখন তার বিত্তবৈভবের ইয়াত্তা নেই, বিশাল জমির ওপর প্রাসাদতম বাড়ি করেছেন। বাসার গ্যারেজে শোভা পাচ্ছে একাধিক বিলাসবহুল গাড়ি। বাসা থেকে বের হন ক্যাডার পরিবেষ্টিত গাড়ির বহর নিয়ে। যদিও উল্লেখ করার মতো দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা নেই। স্থানীয়রা দাবি করেছেন তার প্রধান আয়ের পথ হচ্ছে শিল্পনগরী গাজীপুরে চাঁদাবাজি, আর জমির দেন দরবার। তাকে বখরা না দিয়ে ব্যবসা করা প্রায় অসম্ভব বলে জনশ্রুতি রয়েছে। আর নতুন শিল্প করতে গেলে তো কথায় নেই। কৌশলে জমি-জমা নিয়ে জটিলতা বাঁধিয়ে দেওয়া হবে। এরপর সমঝোতার নামে বাসায় ডেকে লাইনে আনা হয়।

আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষনেতার আনুকূল্য পেয়ে অন্যদের থোড়াই কেয়ার করেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তার কাছে কোনই গুরুত্ব নেই, যারাই তার বিরুদ্ধে মুখ খোলার চেষ্টা করেছে তাদেরকেই নানাভাবে শায়েস্তা করেছেন।

গত বছরের মে মাসে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের (অঞ্চল-৪) নির্বাহী প্রকৌশলী দেলোয়ার হোসেনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। রহস্যবৃত্ত ওই হত্যাকাণ্ড নিয়েও নানা রকম জনশ্রুতি রয়েছে। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে প্রকৌশলী দেলোয়ার তার (নুরুন নবীর) ছেলেকে বলেছিলেন, সে আর চাকরি করবে না। এতো চাপ সহ্য হয় না। অনেক সময় তাকে মোবাইলে ফোন করে চাপ প্রয়োগ করা হতো।

মেয়র জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাহাড় পরিমাণ। প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প গৃহায়ন প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, ভূমিখোরদের সাথে আতাত, অধিগ্রহণকৃত ভূমির মূল্যপরিশোধে টালবাহানা, অবৈধ দখলদারদের সাথে সখ্য, সিটি করপোরেশনের লাইসেন্স নবায়নে অনীহা, দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারিতায় সিটির বাসিন্দারা ক্ষুব্ধ।

গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট আজমতউল্লাহ খান গণমাধ্যমকে জানান, দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি, স্বেচ্ছাচারিতা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতি এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে মেয়র জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ, দলীয় হাই-কমান্ড দলের গঠনতন্ত্র এবং আইনানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আওয়ামী লীগ কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করেনি। দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ, ভাবমূর্তি নষ্টকারী, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস বিকৃতিকারী কারও ঠাঁই আওয়ামী লীগে হবে না।

গাজীপুর সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর মামুন মন্ডল বলেন, গাজীপুর মহানগরের হাজার হাজার ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। শত শত পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে রাস্তায় বসবাস করছে। জমি দখল ও ঘরবাড়ি ভেঙে রাস্তা নির্মাণ করার নামে বহু পরিবার তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছে। তিনি বিভিন্ন সময়ে সময় মতো সিটি করপোরেশনের মাসিক সভা না করেই এককভাবে অনেক নীতি বর্হিভূত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টেন্ডার না দিয়েই অনেক কাজ করিয়েছেন। যা নিয়ে কাউন্সিলরদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য মেয়র জাহাঙ্গীরকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। পরে এসএমএস দিলেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।