ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে কতল ক্লাব!

এম. এম. কায়সার, স্পোর্টস এডিটর, বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান ও ইয়ংমেন্স ক্লাবে গোপনে চলেছে ক্যাসিনো- ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান ও ইয়ংমেন্স ক্লাবে গোপনে চলেছে ক্যাসিনো- ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর

  • Font increase
  • Font Decrease

টাকা নেই, বাজেট নেই, ক্লাব চালাবো কিভাবে? মনে হয় না এবারো ভালো দল গড়তে পারব?

দেখা হলেই এভাবেই গলা শুকিয়ে ফেলতেন মোহামেডানের এই ক্লাব কর্মকর্তা। অবশ্য যখন তার সঙ্গে কথা হচ্ছে তখন তার ব্র্যান্ডের ঝলমলে শার্ট থেকে ভুরভুর করে বেরিয়ে আসা সুগন্ধিতে আশপাশ সুরভিত।

বোঝাই যাচ্ছে ক্লাব অর্থ সঙ্কটে থাকলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ে তিনি বেশ আয়েশে। ক্লাব প্রাঙ্গণে তার কক্ষের শান-শওকতও বেশ ঠাটবাটের। অথচ ঠিক উল্টো চিত্র খানিকটা দূরুত্বে টিনের চালায় খেলোয়াড়দের থাকার আবাসস্থলের। নড়বড়ে খাটের পায়া, বিছানার চাদরের মলিন চেহারা, গাদাগাদি এলোমেলো করে থাকা জামা-জুতো প্রতিটি কোনা থেকে ঠিকরে বেরুচ্ছে অসহায়ত্বের কারুণ্য। এই জীবন চিত্রে আনন্দ নেই, উচ্ছ্বাস নেই; এ শুধু এঁটো হয়ে কোনোমতো টিকে থাকা আর কি!

ক্লাবের দেনা বেড়েছে। খেলোয়াড়দের অর্থও বাকি পড়েছে। ক্লাব সদস্যরা যে চাঁদা দেন সেই যৎসামান্য দিয়ে অর্থের উপায়ন্তর যে আর হচ্ছে না। স্পন্সররা এখন হাত গুটিয়ে নিয়েছে।

-তাহলে উপায়?

অর্থের এই আয়োজন করতে আরো পাঁচ ক্লাবের মতো ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবও ক্লাব চত্বরে ক্যাসিনোকে স্বাগত জানাল। কোষাগার ঠিক করতে ক্যাসিনোর সঙ্গে হাত মেলানো, এই সখ্য-সম্পর্কের বয়স পেরিয়েছে পাঁচ বছরের মতো।

কিন্তু মোহামেডান এখনো ‘দারিদ্রসীমার নিচে’!

তবে ব্যক্তিপর্যায়ে এই ক্লাবের অনেক কর্তার শান-শওকত চেকনাই ফুলেফেঁপে আকাশ ছুঁয়েছে প্রায়! পেছনের এই সময়টায় তারা অভিজাত হয়েছেন। আর ক্লাব ক্রমশ ভাগাড়ে পরিণত!

তাহলে ফল কি দাঁড়ালো?

ক্লাব পাড়ায় ক্যাসিনো বসিয়ে উপকৃত হয়েছেন কিছুসংখ্যক চিহ্নিত কর্তা। আর কতল হয়েছে গোটা ক্লাব।

একেই বলে উপকারীর মাংস কেটে নিজের উদোরপূর্তি করা! যে ক্লাবের পরিচয়ে এসব ক্লাব কর্তারা সমাজের বিভিন্ন স্তরে নিজেদের মান্যগণ্য বলে বুক ফুলিয়ে ভিড় ঠেলে সামনে এসে দাঁড়াতেন, সেই তারাই ক্লাবের পরিকাঠামো ও অস্থিমজ্জা কেটে টুকরো টুকরো করে গোপন বাজারে বিক্রি করে দিলেন!

ইয়ংমেন্স ফকিরেরপুল ক্লাব মূলত ফুটবল খেলার জন্য ক্রীড়াঙ্গনে পরিচিতি পেয়েছিল। ক্লাব পর্যায়ের সর্বোচ্চ আসরে তারা একবার বেশ ভাল ফলাফলও করে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপে ইয়ংমেন্স ফকিরেরপুল চ্যাম্পিয়ন হয়। সেই সুবাদে তারা ঘরোয়া ফুটবলের সর্বোচ্চ আসর বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।

কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ সেই টুর্নামেন্টে তারা খেললো না। কারণ হিসেবে ক্লাব কর্তারা জানালেন-টাকা নেই, তহবিল নেই! অথচ সেই ক্লাবে তখন ধুমসে চলছে ক্যাসিনো। যেখানে প্রতি রাতেই কোটি টাকা হাতবদল হচ্ছে।

সরল অঙ্কের মতোই হিসেবটা পরিষ্কার; ক্যাসিনো কখনো স্পোর্টিং ক্লাবের আর্থিক সমস্যার সমাধান করে না। ব্যক্তির ব্যাংক ব্যালান্স বাড়ায় শুধু!

মতিঝিল পাড়ার যে ক্লাবগুলো এই ক্যাসিনো কু-সংস্কৃতিতে ডুবেছিলো তাদের মধ্যে একটি ক্লাবও স্পোর্টস অঙ্গনে ভাল সাফল্য আনা তো দূরের কথা, এদের মধ্যে সিংহভাগ ক্লাবই কোনো পর্যায়ের খেলাধুলার সঙ্গেই এখন সম্পৃক্ত নয়! অথচ এই ক্লাবগুলো স্পোর্টিং ক্লাবের নামে সমাজসেবা অধিদপ্তরে নিবন্ধিত।

নতুন সমস্যা হলো ক্যাসিনোতে মজে যাওয়া এই ক্লাবগুলোর সামনের দিনের ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকার। এই ক্লাবগুলো এখন চরম ইমেজ সঙ্কটে। কোনো ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নিশ্চয়ই এই ক্লাবগুলোর সঙ্গে স্পন্সর হিসেবেও থাকতে চাইবে না।

বদনামের ভাগীদার হতে কে চায়?

ক্রীড়াঙ্গনে ক্যাসিনোর এই থাবায় বর্তমান এবং সাবেক ক্রীড়াবিদরা শঙ্কিত। রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রাপ্ত সাবেক ফুটবলার আব্দুল গাফফার চৌধুরী এই প্রসঙ্গে বার্তাটোয়েন্টিফোরকে দুঃখ নিয়ে বলেন-‘স্পোর্টিং ক্লাবগুলো এখন জুয়ার ক্লাবে পরিণত হয়েছে। এসব ক্লাবের হয়ে তো আমরা ফুটবল খেলেছি। আমাদের স্বর্ণালি সময় কেটেছে এখানেই। আজ সেই ক্লাবের কিছু স্বার্থান্বেষী কর্মকর্তাদের লোভের কারণে নিজেদেরকে পরিচয় দিতেই আমরা লজ্জা পাচ্ছি।’

পৃথিবীর বিভিন্ন বিখ্যাত ক্লাবগুলোতে তো কেউ আর্থিক যোগান দিতে জুয়া বা ক্যাসিনোর দ্বারগ্রস্ত হয় না। ব্যবসায়িক উপায় খুঁজে ক্লাবগুলোকে তারা স্বাবলম্বী করে। আর আমরা ক্যাসিনোর কাছে মাথা ঠেকছি।

পাপের টাকায় কখনো সাধনা হয় না!

 

আপনার মতামত লিখুন :