প্রশান্ত পশ্চিম



মাহমুদ হাফিজ
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

পর্ব-৮

বড় ভাইয়ের সঙ্গে মাছ ধরতে যাবো আটলান্টিকে। পূর্বরাতে আনুষ্ঠানিক নৈশাহার সেরে তিনি বিলম্বে ফেরায় পরিকল্পনায় দোনোমোনো ছিল। সকাল হলেও কোমল বিছানায় গড়াগড়ি করছি। খবর এলো, নিচে মান্যবর বড় ভাই ব্রেকফাস্ট সেরে তৈরি। ফিশিংয়ে গেলে এখনই তৈরি হয়ে নামতে হবে।

ঘড়িতে বেলা এগারোটা। পোটোম্যাক নদীবিধৌত মার্কিন মুলুকের অতলান্তিক পূব ভ্রমণে এ্যাক্টভিটি চাই আমার, একপায়ে খাড়া আমি। ধড়মড়িয়ে বিছানা ছেড়ে ত্রস্তহাতে তৈরি হতে গিয়ে দশা হলো মিস্টার বিনের দন্ত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার মতো । ব্রাশে পেস্ট লাগাতে গিয়ে হাতে লাগিয়ে ফেললাম। সেভ করতে গিয়ে জায়গায় জায়গায় শ্রুশ্মূগুম্ফ থেকেই গেল। গায়ে প্যান্ট টিশার্ট গলাতে গিয়ে  দৌড়ে নিচে নামি। ডাইনিং টেবিলে ব্রেকফাস্ট দেয়াই ছিল। ডিম রুটি নাকে মুখে গুঁজে বড় ভাইর অফিসে হাজির হই-

আই এ্যাম রেডি।

‌ওহ, আপনি তৈরি ! দ্যাটস ফাইন।  চলুন, বেরোই’।

নীল গ্যাবার্ডিন প্যান্টের ওপর ছাইরঙা টিশার্ট চাপিয়েছি। চুলটুল ঠিকঠাক নেই। আটলান্টিকে মাছ ধরার ড্রেসকোড সম্পর্কে আমি অজ্ঞ। জিজ্ঞেস করি, চলবে কী না!

এর চেয়ে খারাপ কিছু নাই আপনার। আমার মতো ব্যাগি প্যান্ট দেবো নাকি?

বললাম- না এতেই আমি সই।

আমি মাছ আরি, আর আলাউদ্দীন মাছ তুলে আইসবক্সে ভরে

গৃহসহকারী জসীম দুটি কাউবয় ক্যাপ এনে দিয়েছে, তাতে কোরিয়ার গল্ফ ক্লাবের মনোগ্রাম। টুপি দুটি নতুনই। মার্কিন মুলুকে কোরিয়া কোত্থেকে এলো এ নিয়ে ভাবতে গিয়ে দেখি   তিনি  সঙ্গে সঙ্গেই মাথায় পরে নিয়েছেন। তাকে লাগছে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট দলের সাবেক ক্যাপ্টেন অর্জুনা রানাতুঙ্গার মতো। আমারটা হাতে নিয়েই গাড়িতে উঠে বসলাম ফিশিংস্পটে গিয়ে পরবো বলে। আসনবহুল নতুন হোন্ডাগাড়িতে চেপে বসতেই চালক আলাউদ্দিন হুশ করে সবুজ প্রাঙ্গণের পিচঢালা বঙ্কিমপথ ঘুরে এ্যালাওয়ে কোর্ট সড়কে উঠলো। সোয়া ঘন্টার ড্রাইভের লক্ষ্যে তারপর উঠে গেল এ্যালাওয়ে ড্রাইভে- গন্তব্য বাল্টিমোর সাগরপ্রান্তের ফিশিং ঘাট ।

ওয়াশিংটন ডিসিকে বেড় দিয়ে রাখা ইন্টারস্টেট ক্যাপিটাল ৪৯৫ বেল্টওয়ে ধরে গাড়ি উঠলো ৯৫ নম্বর সড়কে। এই সড়ক ধরে বাল্টিমোর কেন নিউইয়র্ক হয়ে আমেরিকার আরও আরও নানা রাষ্ট্রে চলে যাওয়া যায়। ভেতরে শুরু হয়েছে নানারকম গল্প। পথের সবুজ, দূরের পাখি, পোটোম্যাক এলাকার ঝর্ণা, যুক্তরাষ্ট্রের সড়ক নেটওয়ার্ক, ড্রাইভিংয়র নানা রীতি এসব। গল্প এসে ঠেকেছে ভূরাজনীতি ও  সাদা কালো তামাটে বর্ণবৈষম্যে। বড় ভাই’র একটা কথা খুব মনে ধরলো আমার –

‘দেখুন বিশ্বজুড়ে যতো রকমের শাসন আছে, সেসব শাসন জাতি বা দেশের নামে যেমন মার্কিন শাসন, বৃটিশ শাসন, ফরাসি শাসন ইত্যাদি। একমাত্র ইসলামবিশ্বাসী জাতিগোষ্ঠির শাসনকে চিহ্নিত করতে মুসলিম শাসন নামে অভিহিত করা হয়। আমাদের অঞ্চলে ঘোরি, মামলুক, খিলজি, লোদী, তুর্কি মোগল আমলের শাসনকে বিদেশি দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলিম বা ইসলামী শাসন নামে অভিহিত করা হয়। তারা বাংলাসহ ভারতবর্ষ শাসন করতে গিয়ে ইসলামের আলোকে কিছু করে নাই। তাই এটা একধরনের চিন্তাগত বন্ধাত্ব।

মাছ ধরা

বিশ্বরাজনীতি নিয়ে আমার জ্ঞান ও আগ্রহ সীমিত বলে হা হু করে শুনে যাই। এ পর্যায়ে বলি-

আমাদের নিজেদের ইতিহাসবিদরাই তো মুসলিম বা ইসলামী শাসন নামে অভিহিত করেছে।‘

গাড়ি বড় সক ধরে বাল্টিমোর উপত্যকা, তারপর শহর নানা সড়ক ধরে আবারও সড়কে উঠে যায়। উপত্যকা ধরে ঢুকে বনবনানীময় একটি এলাকায়। দু’দিকে ঘনবনের মধ্য দিয়ে নির্জন সড়ক। তারপর গাড়ি আমাদের নিয়ে থামায় কানা রাস্তার মাথার এক নির্জন ডুপ্লেক্স বাড়ির চত্বরে। আমি খানিক্ষণ আগেই ভাবছিলাম গাড়ি হয়তো ভুল পথে যাচ্ছে। গাড়ির বনেটে বন্দুক নাই, খেয়াজাল। আমরা হরিণ বাঘ নয়, যাচ্ছি আটলান্টিক উপকূলে মাছ ধরতে!

আমার কথায় ঠিক। চালক আলাউদ্দিন বললো, পূর্বদিন যার কাছ থেকে জাল কেনা হয়েছিল। তার কার্ডের নম্বরটি গুগলম্যাপে দেয়ায় গুগল আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে। ভাবলাম, গুগল ম্যাপ তো আর আমাদের মনের খবর জানে না। আমরা জালবিক্রেতার বাড়িতে যাবো না, যাবো জাল নিয়ে সমুদ্র মাছ ধরতে।

এ নিয়ে খানিক্ষণ হাসাহাসি হলো। আলাউদ্দিন বললো-

সরি স্যার। উই আর গোনা টেন মিনিট লেট অনলি।

এ্যাবাউট টার্ন করে সে আবার বড় রাস্তায় উঠলো।

ছয় পাউন্ডের রুই

১৫০ ইস্টার্ণ বুলুভার্ড থেকে এক্সিট নিয়ে গাড়ি  উপত্যকার তীর চলতে শুরু করলো। এটা রিভারসাইড ড্রাইভ। বামে শহরের ঘরবাড়ি, ডানো উপত্যকা তীর। উপত্যকায় নৌ হারবার। এখানে দেখা যায় স্পিডবোট, সৌখিন মাছ ধরার ট্রলার আর মাঝে মধ্যে কাঠের পিয়ের বা ঘাট। বুঝে যাই এবার ঠিকপথে এগুচ্ছি। রিভারসাইড ড্রাইভের শেষ মাথা গিয়ে শেষ হয়েছে বৃত্তাকার এক ভূমিতে। যার পাশে আদিগন্ত সবুজ জলরাশি। এখানে সামুদ্রিক সবুজ বৃক্ষরাজি আর সামুদ্রিক উন্মুক্ত বায়ুকে কাজে লাগিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে পার্ক। মধ্যে মধ্যে বসার বেঞ্চি, বার বি কিউ করার উন্মুক্ত অঙ্গণ আর বৃক্ষছায়া ঘেরা জায়গাটিতে সামুদ্রিক বাতাস নিয়ত সঙ্গ দিচ্ছে। এই ভরদুপুরেও এখান সময় কাটাতে এসেছে দুয়েকটি পরিবার। মাছ ধরে পার্কেই বারবি কিউ করছে কেউ কেউ। জায়গাটি পেশাদার ও সৌখিন মৎস্যশিকারীদের প্রিয় গন্তব্য দেখেই বুঝে যাই। পার্কের শেষপ্রান্তে বৃত্তাকার তীরে পাথরের চাঁই। একপ্রান্তে কাঠের প্রশস্ত ঘাট। সৌখিন মৎসশিকারীরা পাথরে বসে কিংবা ঘাটের পাটাতনে বসে ছিপ ফেলে মাছ ধরায় নিমগ্ন। জায়গাটির নাম কক্সপয়েন্ট। আমাদের প্রিয় দরিয়ানগর কক্সবাজারের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বড় ভাই সবুজ প্রাঙ্গণ দেখেই বাচ্চাদের মতো উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। ভাবলাম, এই মাছ ধরার বাহানা নিজস্ব ঘেরাটোপ থেকে বের হয়ে বড় ভাই উদার সমুদ্রপারে এসেছেন, নিজের ভেতরের চাপ ঝাড়তে-যাকে পোশাকী ভাষায় বলে – আনউইন্ডিং।  

দুপা দুই কনুইয়ের ওপর করে করে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লেন। কোমর, উদর, ঘাড়, মস্তক সমান্তরাল। বললেন-

আসুন ব্যায়াম করি।

বোকার মতো ভাবলাম, সমুদ্রে নামার আগে এ বোধ হয় এক প্রিপারেশন। একই আসনে ব্যায়ামের ভঙ্গি করতে গিয়ে একমিনিটও থাকতে পারলাম না। বললাম-

চলুন। আপনাকে ইয়োগা শিখিয়ে দিই।

ইয়া বড় মাছ দেখতে ছুটে এলো ক্রিশ্চিয়ানো, ম ... শ্চিয়ান, ছেলে ক্রিস্টোফার ও দুই কন্যা

আলাউদ্দিন গাড়ির বনেট খুলে বারোহাত লম্বা দেশি খেয়াজাল, চারহাত লম্বা মার্কিন কারেন্ট জাল, মাছ রাখার আইসবক্স নিয়ে ঘাটে উপস্থিত। আমরা ব্যায়াম সেরে ঘাটে যাই। পাইনগাছের লম্বা কাঠ দিয়ে বানানো ঘাটের পাটাতন। চারদিকে মোটা মোটা খাম্বা পানির নিচ থেকে পাটাতন হয়ে বুকসমান উঁচু করে স্থাপন করা। পাটাতনের বিভিন্ন প্রান্তে দুই বাচ্চাসহ এক ভদ্রমহিলা, জার্মান কবি গুন্টাগ্রাস চেহারার এক বুড়ো আর শশ্রুমন্ডিত এক মধ্যবয়স্ক ছিপ ফেলে বসে আছে। ছিপ ফেলে সামুদ্রিক রোদে বসে উপত্যকার ঢেউ গুণতে গুণতে গুন্টারগ্রাসের ফর্সা চেহারা লাল টকটকে হয়ে গেছে। বয়সে ভাটার ছাপ পড়লেও তার আগ্রহে কোন ভাটা নেই। জানা গেল, সকালেই তারা ছিপ ফেলেছে। এখন বেলা দুইটা আড়াইটা পর্যন্তও কোন একটি মাছও তুলতে পারেনি। এদিকে সঙ্গের বাচ্চারা মাছ দেখার জন্য পাগলপারা। বুড়ো পেশাদার মৎস্যশিকারীর মতো বড়শি, ছিপ ও মৎস্যখাদ্য সম্ভারসহ একটি বিশেষ এ্যাঙলিং বক্স নিয়ে এসেছেন। জাল বের করে মৎস্যশিকারে আমাদের যোগারজন্ত বুড়ো দুটি শিশু দুটিকে দেখাচ্ছেন। বুঝে যাই, তিনটি ছিপ ফেললেও তারা আসলে একই পরিবারের। বাচ্চাকে মাছ ও মাছ ধরা দেখাতে নিয়ে এসেছেন।

সমুদ্রের বিস্তীর্ণ জলরাশির সামনে দাঁড়াতেই বুক ভরে দেয় স্বতঃশ্চল সামুদ্রিক বাতাস। এ জলরাশির একটি নাম আছে। আটলান্টিক পূর্ব উপকূলের সিজাপিক উপত্যকায় মিশেছে আশপাশের পাহাড়পুঞ্জে উৎপন্ন দেড়শর বেশি নদী। এই স্রোতময় এই নদীর নাম ব্যাক রিভার। রোজডেল কমিউনিটি অধ্যূষিত রোজডেল থেকে উৎপন্নের পর মাত্র ৯ মাইল পাড়ি দিয়েই বাল্টিমোর শহরের দুই মাইল পূর্বে তা আত্মাহুতি দিয়েছে অতলান্তদুহিতা সিজাপিক উপত্যকায়। আমরা ব্যাক রিভারের মোহনায় ফিশিং করতে নেমেছি।

খেয়া জাল ফেলা

পানির ওপরে খুব নিচু হয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে কয়েকটি  ঈগল। পাখি দেখেই আমি বুঝতে পারি এই নদীতে মাছ আছে। ছোটবেলায় আমার গ্রামের খন্দকার পাড়ার অগ্রজতুল্য বাকপ্রতিবন্ধী আমিনের সঙ্গে খেয়াজালে মাছ ধরেছি খুব। পানি দেখেই আমিন বুঝে যেতো পানির নিচে মাছ আছে কিনা। বড়শি হোক বা খেয়াজাল, মাছ ধরায় আমিনকে কেউ কোনদিন হারাতে দেখেনি। যাহোক, বড় ভাই সিগারেট ধরিয়ে আয়েশি ভঙ্গিতে সামুদ্রিক বাতাস উপভোগ করছেন। আলাউদ্দিন ছয়হাতি কারেন্ট জালটি বাম হাত দিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। মান্যবর  জালের ধারে কাছেও আসছেন না, অথচ সকাল থেকে মাছ ধরায় বেরোতে তার তোড়জোড়ে ছিল অন্তহীন। হয় তিনি জাল মারতে পারেন না, নয় আমাকে সুযোগ দেয়ার জন্য এই কৌশল। আমি খেয়াজালে হাত দিতে গেলে বললেন-

জসিমই ফেলবে। উয়ো চিজ আপকে লিয়ে নেহি, আপনি পারবেন না।

আনকোরা জাল আর নদীর পানি দেখে আমার ভেতরে নষ্টালজিয়া উথলে ওঠে। কোন উত্তর না দিয়ে জাল বাগিয়ে কাঠের পাটাতনে ঝুঁকে সজোরে পানিতে ফেলি। জালটি এমন গোলাকার বৃত্ত আঁকে যা দেখে বড় ভাই উল্লাসে ফেটে পড়ে একের পর ছবি তুলতে থাকেন। বলি-

ভিডিও, ভিডিও। ইউটিউবে মাছ মারার প্রচুর ভিডিও দেখেছি। খুব জনপ্রিয়।

বললেন-

আগে পারফরেমেন্স ভাল হোক, তারপর ভিডিও আর রেওয়ার্ড।

প্রথম খ্যাওয়ে কয়েকটি মাছ উঠলো। আমাদের কই মাছের চেয়ে বড়, তেলাপিয়ার চেয়ে ছোট। হলুদাভ গা। স্থানীয় নাম ইয়েলো পার্সার।

পরিব্রাজক যখন মৎস্যশিকারী

সূর্য মাথার ওপর জ্বলছে অসীম তেজে। পাটাতনের সামনের দিকে বড়শি ফেলে অপেক্ষমান গুন্টারগ্রাসের পরিবার। পেছনের পানিতে ছায়া পড়েছে। আমি কৈবর্ত্যপ্রিয় মানুষ। দক্ষ ধিবরের মতো ভাবি, এখানে মাছ যা আছে, তা ছায়ার দিকেই আছে। সমুদ্রের দিকে পিছন ফিরে আমি পাটাতনের ছায়ার দিকে জাল ফেলি। মূহুর্তেই টের পাই বড় কিছু একটা বাধিয়েছি। রশি ধরে টান দিতেই বড় মাছ লাফাতে থাকে। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বড় ভাই মোবাইল ক্যামেরা তাক করেন। জাল তুলতেই পুরো নদীপার জসিম, বড় ভাই আর গুন্টারগ্রাসের পরিবারের উল্লাসে ফেটে পড়ে। অবাক হয়ে দেখি জালে লাফাচ্ছে তিন কেজির বেশি ওজনের গ্রাসকার্প, এক কেজি ওজনের এলওয়াইফ-যা দেখতে একদম পদ্মার ইলিশের মতো। সাত আটটা ইয়েলো পার্সও উঠেছে জালে। আমি হৎবিহ্বলতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। জসিম মাছগুলো বের করে বক্স রাখতে থাকে, বড় ভাই ছবি তোলায় ব্যস্ত। গুন্টারগ্রাস ততক্ষণে নাতি-নাতনিদের নিয়ে বিস্ময় বিমুগ্ধ চোখে আমাদের ফিশ বক্সের ওপর ঝুঁকে পড়েছে। পিয়েরে চলতে থাকা আমাদের এসব কাণ্ড দেখে ছিপ রেখে  ছুটে আসে অদূরের এক এ্যাঙলার।  মাছ দেখে হতবাক হয়ে আনন্দ করে করতে করতে ফিরে যায়।

বিশেষ জাল দিয়ে মাছ ধরার খবর  কক্সপয়েন্ট এলাকায় রাজ্য হয়ে যায়। এ্যাঙলাররা একের পর এক পাটাতনে এসে মাছ দেখে ওয়াও ওয়াও বলে উল্লাস করতে থাকে। সকাল থেকে অর্ধদিন কাটিয়েও যারা  পানি থেকে তুলতে পারেনি চুনোপুটি, কয়েক মিনিটের মধ্যে অর্ধবক্স মাছ ধরা তাদের কাছে অবাকবিস্ময়।  কয়েকজন এ্যাঙলার অনুমতি নিয়ে আমাদের মাছে ছবি তোলে। অনেকে তাদের মোবাইলের ছবি গ্যালারি থেকে পূর্বে ধরা মাছের ছবি দেখায়। একজন বলে- দিস ইজ রেয়ার ফিশ। এসব উল্লাসে পার্কে বেড়াতে আসা একটি পরিবারকে বেঞ্চ আটকে রাখতে পারেনি। ছুটে এসে বক্সের ওপর ঝুঁকে পড়ে দারা পরিবার। কর্তার নাম ক্রিশ্চিয়ানো। জাতিতে মেক্সিকান। সঙ্গে মিসেস ক্রিশ্চিয়ানো, ক্রিস্টোফার নামের তাদের কনিষ্ঠপুত্র আর পিঠেপেঠি বয়সের দুই কন্যা। বড় মেয়েটি কৈশোরে পা দিতে চলেছে। ওয়াও বলে মাছের বক্সের দিকে ঝুঁকে থাকে সে। পরিবারটির আগ্রহ দেখে বড় ভাইয়ের ইশারায় কিছু মাছ উপহার দেয়ার প্রস্তাব দিই। ক্রিশ্চিয়ানো সম্মত হলেও মিসেস ক্রিশ্চিয়ানো তাকে নিরস্ত করেন। বোঝা যায়, তাজা মাছ কেটে বেছে রান্নার ঝামেলায় যেতে নারাজ এই মেক্সিকান বধু।

অতি উৎসাহী দুয়েকজন এ্যাঙলার তো এই্ সাফল্যে আমেক কোলে তুলে নাচায় আর কী! ব্যাক রিভারের পাটাতনে দাঁড়িয়ে আমি সিজাপিক উপত্যকার ওপর দিয়ে আটলান্টিক মহাসমুদ্রের তাকিয়ে থাকি। চোখের কোণায় অশ্রু। আব্বার স্মৃতি মনে ভেসে উঠে কান্না এলো বড়। আব্বা আজ নেই। ছেলেবেলায় তাঁর শেখানো খেয়াজাল ফেলার কসরত জীবনের প্রান্তবেলায় সাতসমুদ্র তেরোনদী পারে দেশিবিদেশিদের আনন্দ জোগালো! আব্বার সখের অন্যতম ছিল নিজস্ব খেয়াজাল দিয়ে মাছ ধরা, খাওয়া ও বিতরণ।

সাগরে পাখি ওড়াওড়ি করে্। দ্রুতবেগে মোটরবাইক ও স্পিডবোডে অনেকে মাছ ধরে। সকালে বের হওয়া মাছ ধরার বোটগুলো অদূরের বোটঘাটে ফিরে আসতে থাকে। সম্মানিত আমাকে বলেন-

পরেরবার স্পিডবোট ভাড়া নিয়ে আমরা সাগরের গভীরে যাবো, দ্বীপে যাবো। আপনার যে দক্ষতা দেখবেন মাছ কাহাকে বলে।

আমরা বিরতি নিই। সেভেন ইলেভেন থেকে আনা হটডগ আর বোতলজাত ডাবলশট কোল্ড কফিতে এনার্জিজাইজড হই। আরও খানিক্ষণ মাছ ধরে প্রতি খ্যাওয়ে মাছ ওঠার সংখ্যা কমতে থাকে। তখন ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিই। মাছের বক্সটির সামনে হাতল, পেছনে চাকা লাগানো। হাতল ধরে টেনে নিতে থাকেন বড় ভাই। আমি পানির বোতল আর কফির ক্যান হাতে পেছনে পেছনে হাটি। জাল দুটি নিয়ে আগে আগে হাটতে থাকে আলাউদ্দিন। কক্সপয়েন্ট পার্ক ও সাগরতীরে যতো মানুষ ছিল- তারা বাঙালির দীপ্ত, দৃঢ় ও বীর পদক্ষেপের দিকে তাকিয়ে থাকে।

ব্যাক রিভারকে ব্যাকে রেখে গাড়ি ছুট পোটোম্যাক রিভারের দিকে। আমরা চিকের গরম চিকেন র‍্যাপে কামড় দিয়ে কোল্ড কফিতে চুমুক দিই। আমেরিকায় গরম ও ঠান্ডা একসঙ্গে চলে।

বাংলাদেশি পর্যটক আকর্ষণে ঢাকায় ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার রোড শো



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর-ট্রাভেল এন্ড ট্যুর, বার্তা২৪.কম
বাংলাদেশি পর্যটক আকর্ষণে ঢাকায় ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার রোড শো

বাংলাদেশি পর্যটক আকর্ষণে ঢাকায় ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার রোড শো

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনাভাইরাসের প্রভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর  চলতি বছরের ১ এপ্রিল সীমান্ত খুলে দেয় মালয়েশিয়া। মূলত ওইদিন থেকে দেশটিতে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। এর ফলে ফের পর্যটক টানতে নানা উদ্যোগ নেয় মালয়েশিয়া। এর অংশ হিসেবে দেশটির পর্যটন উন্নয়ন সংস্থা ‘ট্যুরিজম মালয়েশিয়া’ ২ থেকে ৭  জুন বাংলাদেশের  গুরুত্বপূর্ণ শহর ঢাকা এবং চট্রগ্রামে প্রথমবারের মতো রোডশো’র আয়োজন করছে।

ঢাকায় রোববার (৫ জুন) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁ হোটেলে বাংলাদেশি ট্রাভেল এজেন্ট ও ট্যুর অপারেটরদের জন্য  রোডশো’র আয়োজন করে মালয়েশিয়া পর্যটন উন্নয়ন বোর্ড- ট্যুরিজম মালয়েশিয়া।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনা এমডি. হাশিম, ট্যুর অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (টোয়াব)-এর নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট শিবলুল আজম কোরেশী সহ স্বনামধন্য সকল ট্রাভেল এজেন্ট এবং ট্যুর অপারেটররের শীর্ষকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অন্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার সিনিয়র পরিচালক সৈয়দ ইয়াহিয়া সৈয়দ ওথমান এবং ‘দ্য বাংলাদেশ মনিটর’র সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুর আলম।

এদিকে রোডে শো উপলক্ষে ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার সিনিয়র পরিচালক (কৌশলগত পরিকল্পনা বিভাগ) সৈয়দ ইয়াহিয়া সৈয়দ ওথমান এর নেতৃত্বে একটি মালয়েশীয় প্রতিনিধি দল বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। প্রতিনিধি দলে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে মালয়েশিয়ার ৫টি ট্রাভেল এজেন্সি এবং দুটি স্বাস্থ্যশিল্প সংস্থার প্রতিনিধিরাও।

বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনা এমডি. হাশিম বক্তব্য রাখছেন

অনুষ্ঠানে রোড শো’র আয়োজন প্রসঙ্গে বক্তরা জানান, মালয়েশিয়া ভ্রমণে বাংলাদেশিদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করার সাথে সাথে এই রোডশো’র লক্ষ্য হলো ভ্রমণ ও পর্যটন শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম প্রদান করা যার মাধ্যমে তারা পর্যটনকে পূর্বাবস্থায় বা আরো ভালো অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে।

সৈয়দ ইয়াহিয়া সৈয়দ ওথমান বলেন, বাংলাদেশে ফিরে আসার এটি একটি দারুণ সময় এবং রোডশো আয়োজনের জন্য যথার্থ। বাংলাদেশে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পুনরায় শুরু এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য মালয়েশিয়ার সীমান্ত উন্মুক্তকরণ বলতে গেলে একই সময়ে সংঘঠিত হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশি পর্যটকদের মালয়েশিয়ায় স্বাগত জানানোর সূযোগ পেয়ে আমরা সত্যিই রোমাঞ্চিত। পর্যটকরা এখন মালয়েশিয়ার শ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ রোমাঞ্চকর আকর্ষণগুলো সাশ্রয়ী খরচে উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছেন। দীর্ঘ দুবছর পর পর্যটকরা এখন অনেক কিছুই এক্সপ্লোর করতে পারবেন যার মধ্যে রয়েছে সম্প্রতি চালু হওয়া আউটডোর থিমপার্ক, গেন্টিং স্কাইওয়ার্ল্ড, কুয়ালালামপূরে নতুন সাজে সজ্জিত সানওয়ে রিসোর্ট এবং জাকজমকপূর্ণ নতুন আকর্ষণ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উঁচু অট্টালিকা ‘মারদেকা ১১৮’। অনিন্দ্য সুন্দর সমূদ্রতট, চিত্তাকর্ষক পর্বতমালা ও বনোরাজিসহ বিভিন্ন আনন্দদায়ক ও রোমাঞ্চকর কর্মকান্ড আপনার ভ্রমণকে স্মরণীয় করে রাখবে।

উল্লেখ্য, বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যার হিসেবে মালয়েশিয়ার তালিকায় বাংলাদেশের স্থান প্রথম দিকে। ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১ লাখ ৮৯ হাজারের বেশি বাংলাদেশি মালয়েশিয়া ভ্রমণ করেছেন; যা মোট সংখ্যার ১৯.৩০ শতাংশেরও বেশি। চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে পূর্ণ কোর্স কোভিড টিকাপ্রাপ্ত বিদেশিদের জন্য মালয়েশিয়া ভ্রমণে কোন কোয়ারেন্টাইনের প্রয়োজন নেই। আসার আগে ও যাওয়ার পর  পর্যটকদের কোভিড-১৯ পরীক্ষা লাগবে না। ১৭ বছর বা তার নিচের বয়সী শিশুদের জন্যও করোনা পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। বর্তমানে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স, বাটিক এয়ার এবং এয়ার এশিয়া ঢাকা এবং মালয়েশিয়ার মধ্যে ভ্রমণের জন্য সপ্তাহে ৩ হাজার ৯১০ টির বেশি আসন অফার করছে।

;

ফের ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করছে মালয়েশিয়া



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ফের ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করছে মালয়েশিয়া

ফের ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করছে মালয়েশিয়া

  • Font increase
  • Font Decrease

দুই বছর পর পুরোদমে ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করার ঘোষণা দিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি ইসমাইল সাবরি ইয়াকোব। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ১ এপ্রিল থেকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের জন্য সীমানা সম্পূর্ণরূপে খুলে দেওয়া হবে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, দর্শনার্থীদের পাশাপাশি মালয়েশিয়া থেকে ফেরত আসা কর্মী যারা দুই ডোজ বা বুস্টার ডোজ গ্রহণ করেছেন তারা খুব সহজেই মালয়েশিয়ায় ঢুকতে পারবেন। তাদের কোয়ারেনটিনে থাকার প্রয়োজন নেই। তবে তাদের অবশ্যই যাত্রার দুই দিন আগে একটি আরটি-পিসিআর পরীক্ষা এবং পৌঁছানোর পরে একটি দ্রুত পরীক্ষা (আরটিকে) করতে হবে।

করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালের মার্চ থেকে পর্যটনসহ সব ধরনের ভিসার কার্যক্রম বন্ধ করে দেশের সীমানা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছিল দেশটির সরকার। মালয়েশিয়ার প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৯৮ শতাংশকে দুই ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে এবং অর্ধেকেরও বেশি বুস্টার ডোজ পেয়েছেন।

;

করোনা টেস্ট ছাড়াই ভ্রমণ করা যাবে মালদ্বীপ



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
করোনা টেস্ট ছাড়াই ভ্রমণ করা যাবে মালদ্বীপ

করোনা টেস্ট ছাড়াই ভ্রমণ করা যাবে মালদ্বীপ

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনার টিকার দুই ডোজ সম্পন্ন করলেই যাওয়া যাবে মালদ্বীপ। বিশ্বের যেকোনো দেশের পর্যটকরাই এ সুযোগ নিতে পারবে।

সম্প্রতি মালদ্বীপের পর্যটন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে, যা গত শনিবার থেকে কার্যকর হয়।

নতুন নির্দেশনায় বলা হয়, কোনো যাত্রী যদি করোনা প্রতিরোধ টিকার পূর্ণাঙ্গ ডোজ (বুস্টার ডোজ প্রয়োজন নেই) নিয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে ৫ মার্চ থেকে সেসব যাত্রীর মালদ্বীপ ভ্রমণের আগে আরটি-পিসিআর টেস্টের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করা হলো। সূত্র: লয়ালটিলবি ডটকম

;

সাদা পানির ঝর্ণা



তৌফিক হাসান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

অন্ধকার থাকতেই ভোর ৫টা নাগাদ হোটেল ছেড়ে নৌকা ঘাট পৌঁছে গেলাম। ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই কিছু জেলে নৌকা নিয়ে নেমে গেছে কাপ্তাই লেকের জলে জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে। আজকের যাত্রা সাদা পানির ঝর্ণা তথা ধুপপানির উদ্দেশ্যে। রাঙমাটির বিলাইছড়ি ঘাট থেকে সকাল সাড়ে ৫টা নাগাদ আমাদের বোট ছাড়ল উলুছড়ির উদ্দেশ্যে, সেখান থেকেই শুরু হবে ঝর্ণার উদ্দেশ্যে মূল ট্রেকিং। লোকালয়ের পাশ দিয়েই এগিয়ে চলছে আমাদের বোট। স্থানীয়রা কেউ কেউ লেক ঘেষা রাস্তায় প্রাতঃভ্রমণ করছেন, কেউ কেউ কৌতুহলী দৃষ্টি আমাদের বোটের দিকে তাকিয়ে আছেন। এবারের যাত্রায় আমরা মোট ৯ জন যাচ্ছি। সবারই পাহাড়ে হাঁটার অল্প বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে। ঢাকা থেকে সেন্টমার্টিন নন-এসি বাসে করে কাপ্তাই এসেছিলাম। কাপ্তাই ঘাট থেকে দুই দিনের জন্য ৫৫০০ টাকায় নৌকা ভাড়া নিয়ে আমরা রাঙ্গামাটির বিলাছড়িতে পৌঁছেছি। রাত্রিবাস হয়েছে ঘাট লাগোয়া স্মৃতিময় বোডিং-এ। কোনরকমে থাকা যায় সেরকম রুমের ভাড়া পড়েছে ১০০০ টাকা।

কাপ্তাই লেকের বুক চিরে আমাদের নৌকা এগিয়ে চলছে। বিগত কয়েকদিন বৃষ্টিজনিত পাহাড়িঢলের কারণে সব পলিমাটি এসে জমা হয়েছে সুন্দরি কাপ্তাইয়ের বুকে, তাই পানি একেবারে ঘোলা। সুন্দর পানিপথের মাঝে মাঝে জংলার মতন আবার কখনো বা নাম না জানা জলজ ফুল দেখতে পাচ্ছি। সামান্য যাবার পর বিলাইছড়ি আর্মি সদর দফতরের নৌ-চেক পোস্ট পড়লো সেখানে যথাযথ পরিচয় লিপিবন্ধ করেই আবার সচল হলো আমাদের নৌকার ইঞ্জিন। নৌকা এবার নদী বা খালের মতো সরু পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। কি মনোরম এই পথ, সবুজে ঘেরা খাড়া পাহাড়কে পাশে রেখে চলছি। মাঝে মাঝে পাহাড়ের খাজে শুভ্র মেঘকে আটকে থাকতে দেখছি যেন সবুজ পাহাড় তার শুভ্রতায় ভরা প্রেয়সীকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে। আমরা কেউ কোনো কথা বলছিনা, অবারিত সৌন্দর্যে অবগাহন করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছি।

কাদা মাটি মাড়িয়ে ঝর্ণার উদ্দেশ্যে মূল ট্রেকিং শুরু

এক পর্যায়ে আমরা আলীক্ষিয়াং নামক একটা স্থানে দাঁড়িয়ে নাস্তা সেরে নিলাম। এখানে খুব কম সংখ্যক পরিবারই বাস করে যার মধ্যে মাত্র ৩টি পরিবার আছে বাঙালি। লাল মিয়া নামে এক বাঙালির হোটেলে ঝটপট নাস্তা করেই যাত্রা শুরু হলো। মিনিট ৫/৭ পরেই আবার দাঁড়াতে হলো আরেকটা আর্মি চেক পোস্টে, যথারীতি পরিচয় লিপিবদ্ধ করার পালা। এবারে চেক পোস্ট থেকে আমাদের সতর্ক করা হলো ফিরতি পথে বিকেল ৫টার মধ্যেই এই চেকপোস্ট পার হতে হবে। চেকপোস্ট পেরিয়ে সুন্দর নদীপথ ধরে যেতে যেতে মোটামুটি আড়াই ঘণ্টায় উলুছড়ি পৌঁছে গেলাম। ঘাট থেকে ৫০০ টাকার বিনিময়ে এক ক্ষুদে গাইড বিচ্ছুকে সাথে নিয়ে শুরু হলো মূল ট্রেকিং। যাত্রা শুরুর পূর্বে মাঝির মাধ্যমে দুপুরের খাবার ব্যবস্থা করে গেলাম স্থানীয় এক ব্যক্তির বাড়িতে, কারণ এখানে কোন খাবারের দোকান নেই। ২০০ টাকায় আমাদের ভাত, মুরগি, আলু ভর্তা আর ডাল খাওয়ার ব্যবস্থা হলো।

যাইহোক ট্রেকিং এর শুরুতেই পথটা বেশ খারাপ। খানিকটা পথ বেশ পিচ্ছিল, গ্রিপ পেতে বেশ সমস্যা হচ্ছিল। আর বেশ খানিকটা পথ ভয়াবহ কর্দমাক্ত, মোটামুটি হাঁটুর সমান কাঁদা। এ ধরনের রাস্তার আলাদা একটা মজা আছে, আমরা পাহাড়ে আসি রোমাঞ্চের খোঁজে আর এরকম পথ, নালা, জংগল, চড়াই-উতরাই ও ঝর্না দেয় ভীষণ রকম আনন্দ। ধুপপানিতে বর্ষার শেষ দিকে যাওয়াই উত্তম বিধায় আমরা সেপ্টেম্বর মাসে যাচ্ছি এই পথে। অন্য সময় গেলে হয়তো অন্যরকম সৌন্দর্য দেখতে পাবো কিন্তু ঝর্ণায় বেশি পানি পেতে হলে এর থেকে দেরিতে যাওয়া ঠিক হবে না।

অবারিত সৌন্দর্যে অবগাহন করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছি

 

ট্রেকিং শুরুর খানিক পরেই একটা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গ্রাম পড়ল, চারিদিকে পাহাড় মাঝখানে সমতল আর সেখানে ধান পেকে সোনালি রঙ ধারন করে আছে। কি সেই সৌন্দর্য, সবুজের মাঝে খানিকটা সোনালি আভা একেবারে চিরায়ত বাংলার রূপ। গ্রামবাসীরা তাদের উৎপাদিত ফল বিক্রি করছিল আমরা সেখান থেকে দেশি লাল পেয়ারা আর পেঁপে কিনে খেয়ে হাঁটা দিলাম।

এরপর প্রথমে একটা সিড়ি তারপর খাঁড়া তিনটে পাহাড় ডিঙিয়ে বেশ হাঁপিয়ে গিয়ে বিশ্রাম নেবো বলে চিন্তা করতেই দূরে তাকিয়ে দেখি দুটো শিশু কি যেন বিক্রি করছে! ওদের কাছে গিয়ে দেখি কলার ছড়ি ঝুলিয়ে রেখেছে, প্রতি পিস ৫ টাকা। অতঃপর বেশকিছু কলার সুব্যবস্থা করে সেখানে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা শুরু হলো আমাদের। আরও কিছুদূর গিয়ে ধুপপানি গ্রামে পৌঁছে দেখি টেবিল পেতে রীতিমতো দোকান সাজিয়ে বসে আছে, জুস পানি চিপস শসা আর ফল-মূল কি নেই সেখানে! আবারও পেয়ারা কিনে নিয়ে যাত্রা শুরু হলো আমাদের।

সাদা পানির ঝর্ণা

হাচরে-পাচরে প্রায় আড়াই ঘণ্টা হেঁটে পৌঁছে গেলাম ধুপপানিতে। রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে এর অবস্থান। খুব বেশিদিন হয়নি মানুষজন এই ঝর্ণার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পেরেছে। কিছু বছর আগে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এই স্থানে ধ্যান করার কারণে নয়নাভিরাম এই ঝর্ণাটি মানুষের নজরে আসে। তঞ্চঙ্গ্যা শব্দে ধুপ অর্থ সাদা আর পানিকে পানিই বলা হয় অর্থাৎ ধুপানির অর্থ সাদা পানির ঝর্ণা ।

মূলত এই ঝর্ণার পানি স্বচ্ছ এবং যখন অনেক উঁচু (প্রায় ১৫০ মিটার) থেকে ঝর্ণার জল আছড়ে পড়ে তখন তা শুধু সাদাই দেখা যায়। তাই একে ধুপপানি ঝর্ণা বলা হয়। বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর ঝরনাগুলির মধ্যে অন্যতম এই ঝরনায় নিচের দিকে একটি গুহার মতন আছে। যা এই ঝরনাকে করেছে অনন্য।

;