আগ্রা দুর্গে ইতিহাসের প্রতিধ্বনি



ড. মাহফুজ পারভেজ, অ্যাসোসিয়েট এডিটর, বার্তা২৪.কম
রাজসিক আগ্রা দুর্গ | ছবি: সংগৃহীত

রাজসিক আগ্রা দুর্গ | ছবি: সংগৃহীত

  • Font increase
  • Font Decrease

বৃষ্টির মধ্যে সকাল হলো আগ্রায়। কদিন ধরেই উত্তর ভারতে অবিরাম বর্ষণের রেশ থেমে থেমে চলছে। সকালের শুরুতে তাজমহলের দিকে এক চক্কর দেওয়ার ইচ্ছা ছিল, সেটা স্থগিত করতে হলো। কিছুক্ষণ হোটেলে অপেক্ষার পর বৃষ্টি সহনীয় হলে চলে এলাম আগ্রা দুর্গে।

আগ্রা দুর্গ নামটি শুনে মনে হতে পারে পারে যে, এটি কোনও সামরিক ছাউনি বিশেষ। আসলে মোটেও তা নয়। আগ্রা দুর্গ হলো একটি আস্ত শহর। মুঘল সচিবালয়, বাসগৃহ, সামরিক স্থাপনা মিলিয়ে দুর্গ-ঘেরা পরিকল্পিত এক রাজধানী।

তাজমহল থেকে আড়াই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত আগ্রা দুর্গের সামনে শাহজাহান গার্ডেন। বিশাল মুঘল উদ্যান আর আগ্রা দুর্গের মাঝখান দিয়ে চলে গেলে বিশাল এভিনিউ। দাঁড়িয়ে দেখলাম সুউচ্চ প্রাচীর ঘেরা দুর্গ-নগরী।

৯৪ একর আয়তন বিশিষ্ট অতিকায় আগ্রা দুর্গে প্রবেশের দুটি প্রধান প্রবেশ তোরণ আছে। একটির নাম অমর সিং গেট, যাকে লাহোর গেটও বলা হয়। আরেকটি দিল্লি গেট, যা দুর্গের পশ্চিমাংশে অবস্থিত। বর্তমানে দিল্লি গেট বন্ধ আর একমাত্র প্রবেশ পথ হলো অমর সিং গেট। তবে দুর্গের আরও দুটি ছোট আকারের প্রবেশ পথ আছে, যাতে প্রয়োজনে চারদিক দিয়েই আসা-যাওয়া, সৈন্য পরিচালনা করা যেতো। বর্তমানে দুর্গের অনেকটাই ভারতীয় সেনাবাহিনীর দখলে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্যারাসুট ব্রিগেডের সদর দফতর আগ্রা দুর্গের উত্তরাংশে অবস্থিত।

আগ্রা দুর্গ হলো একমাত্র স্থান, যেখানের ভারতের সব শাসকরাই কর্তৃত্ব করেছে। আফগান-গজনির শাসকরা আগ্রায় প্রথমে একটি ছোট্ট সামরিক ছাউনি গড়েন এই দুর্গের স্থানে। পরে চৌহান, রাজপুত, জাঠ, শিখরা এখানে কর্তৃত্ব করেন। মুঘল-পূর্ব মুসলিম শাসকরা দিল্লি দখল করে রাজধানী স্থাপন করলেও এক পর্যায়ে সিকান্দার লোদি সেখানে রাজধানী নিয়ে আসেন ষোড়শ শতকে।

পানিপথের প্রথম যুদ্ধ জয়ী হয়ে মুঘলরাজ বাবুরও এ দুর্গ থেকেই রাজত্ব করেন। পুত্র হুমায়ূনের রাজ-অভিষেকও আগ্রা দুর্গে সম্পন্ন হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আকবরের জীবনীকার আবুল ফজল ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে জানিয়েছেন। তা হলো আগ্রা দুর্গ নির্মাণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বাংলার কারিকরগণ, সঙ্গে ছিলেন গুজরাতের শ্রমিকরা।

হুমায়ূনের শাসনামলে বাংলার শাসক আফগান-সুরি বংশ শের শাহের নেতৃত্বে ভারত দখল করে আগ্রা থেকে শাসন চালায়। পরে মুঘলরা আবার ভারতের ক্ষমতা দখল করলে আগ্রার দুর্গ হয় শাসনের মূল কেন্দ্র। আকবর আগ্রা দুর্গকে বিশাল আকারে নির্মাণ করেন। তিনি কিছুদিনের জন্য রাজধানী পাশের ফতেহপুর সিক্রিতে নিয়ে গেলেও পরবর্তী শাসকরা আগ্রাকেই রাজধানী হিসাবে বেছে নেন। পরে রাজধানী কিছু দিনের জন্য লাহোর এবং আরও পরে দিল্লি স্থানান্তরিত হলেও মুঘল শাসনে আগ্রার গৌরব, শক্তি ও ঐতিহ্য সমুন্নত ছিল। ফলে আগ্রা দুর্গের প্রতিটি বালি-কণা ও ইটে-পাথরে ইতিহাসের জানা-অজানা বহু কথা ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয়। আগ্রা দুর্গের শরীরে লেপ্টে আছে সুপ্রাচীন ইতিহাসের প্রলেপ।

আগ্রার দুর্গ একজনের হাতে নয়, অনেক মুঘল নৃপতির দ্বারা সংস্কার ও পরিবর্ধন লাভ করে। তবে আকবরের সময় এর সর্বোচ্চ বিকাশ হয়। তিনি রাজস্থানের লাল বেলে পাথর দিয়ে আগ্রা দুর্গের ভেতরে অনেকগুলো স্থাপনা নির্মাণ করেন এবং সুউচ্চ প্রাচীর দিয়ে পুরো স্থাপনাকে পরিবেষ্টন করেন। সম্রাট জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান বেশ কিছু প্রাসাদ, মহল নির্মাণ করেন।

আগ্রার দুর্গস্থ সমগ্র এলাকা অর্ধবৃত্তাকারে সুপরিকল্পিতভাবে নির্মিত। প্রবেশ তোরণ থেকে শুরু করে দুর্গের প্রতিটি স্থাপনা অত্যন্ত সুনির্মিত ও কারুকার্যময়। লাল বেলে পাথরের সঙ্গে সাদা মার্বেলের ব্যবহারও দুর্গটির বিশেষ নির্মাণ বৈশিষ্ট। ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ দুর্গের দিকে তাকালেই গা ছমছম করে। ঝলকায় মুঘলদের সুনিপুণ নির্মাণশৈলী ও আভিজাত্য।

রাজকীয় মুঘলাই ফটক দিয়ে দুর্গে প্রবেশ করে লালের সঙ্গে সবুজের মিতালিতে চোখ জুড়িয়ে গেল। সাজানো উদ্যান দুর্গের ভেতরে নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। মুঘলরা যেখানেই গেছে, যে স্থাপনাই গড়েছে, তাতে বাগানের উপস্থিতি আবশ্যিক। বৃষ্টি থাকলেও দর্শনার্থীর ভিড় কম নেই। ঘুরে ঘুরে দেখলাম মুঘল ঐতিহ্যের অনবদ্য আকর্ষণ আগ্রা দুর্গ।

দুর্গের ভেতরেও একটি গেট আছে, যাকে বলা হয় হাতি গেট। খুবই পরিকল্পিত স্থাপত্য বিন্যাস চারিদিকে। অসংখ্য স্থাপনার মধ্যে কালের করাল গ্রাস থেকে সামান্যই রক্ষা পেয়েছে। শত শত যুদ্ধ, দাঙ্গা, বিশেষত দখলদার ইংরেজদের হাতে অনেক সম্পদ লুণ্ঠিত হয়েছে। ভেঙে ফেলা হয়েছে ভেতরের অনেক ইমারত ও প্রাসাদ। মুঘল সম্রাটের অধিষ্ঠানের ময়ূর সিংহাসন আর কোহিনূর হীরক সম্পদও ইংরেজরা এখান থেকে লুট করে নিয়ে গেছে বিলাতে। সিপাহি বিপ্লবের পর বিজয়ী হয়ে ইংরেজরা মুঘল ও মুসলমানদের শুধু গণহত্যাই করেনি, হীরা-জহরত, বই-পত্র, তৈজযপত্র, ব্যবহার সামগ্রী লুটে নিয়ে গেছে। ইংল্যান্ডের মিউজিয়াম, বাজার ও ব্যক্তিগত সংগ্রহশালায় এসবের কিছু কিছু এখনো রয়েছে।

আগ্রার দুর্গের প্রধান আকর্ষণ দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাস, জাহাঙ্গীর হৌস, যা আকবর নির্মাণ করিয়েছিলেন পুত্রের জন্য। বাবুরের আমলে নির্মিত বাওলি (পানির কূপ) আছে। আছে মসজিদ, আকবর মহল। সম্রাট শাহজাহানের আমলে নির্মিত মহলও আছে, যাতে তার দুই কন্যা রওশান আরা ও জাহান আরা বসবাস করতেন।

আশ্চর্য হলাম, আগ্রার দুর্গে বাংলা মহল দেখে। কথিত আছে, সম্রাজ্ঞী নূরজাহান এটি নির্মাণ করেছিলেন। এর নির্মাণশৈলীতে বাংলার কুটিরের ছাপ আছে। নূরজাহান সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে পরিণত সূত্রে আবদ্ধ হওয়ার পূর্বে ছিলেন বাংলার এক সু্বেদারের স্ত্রী। বাংলার সঙ্গে নূরজাহানের একটি সম্পর্ক ছিল। বাংলার আম গাছ তিনি আগ্রার দুর্গে রোপণ করেছিলেন এবং বাংলার বিশ্বসেরা মসলিন কাপড়ের উৎকর্ষ সাধনের চেষ্টা করেছিলেন।

দুর্গের যমুনা নদীমুখী একটি আবাসে সম্রাট শাহজাহানের বন্দি জীবন কেটেছিল। এর বারান্দা থেকে দূরের তাজমহল দেখা যায়। বন্দি সম্রাটের জীবন কাটে এখান থেকে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাজ দেখে আর তাজে শায়িত প্রিয়তমা স্ত্রী মমতাজমহলের স্মৃতি স্মরণ করে।

আগ্রার দুর্গ নিয়ে প্রচলিত আছে বহু উপকথা ও কাহিনী। দুর্গের নিচে সুরঙ্গপথ নাকি নানা জায়গার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। ছিল অনেক গোপন কুঠরী, যেখানে সঙ্কটকালে সম্রাট আত্মগোপন করতে পারতেন বা প্রতিপক্ষকে লোকচক্ষুর আড়ালে বন্দি করে রাখতে পারতেন।

মুঘল হেরেম নিয়ে শত শত উপাখ্যানের ভিত্তিভূমিও আগ্রার দুর্গ। যেখানে সেলিম (সম্রাট জাহাঙ্গীর) ও আনারকলির করুণ প্রেম-উপাখ্যান ছাড়াও বহু বাদশাহজাদি ও শাহজাদার নানা ঘটনা মিশে রয়েছে। বলতে গেলে মুঘল ইতিহাসের আখ্যান রচনা করতে গেলেই চলে আসে আগ্রা দুর্গের নাম। শার্লক হোমস পর্যন্ত আগ্রা দুর্গের পটভূমিতে গ্রন্থ রচনা করেছেন। এমন শত শত গ্রন্থ আছে আগ্রা দুর্গের সামগ্রিক বা বিশেষ বিশেষ ঘটনার আলোকে।

স্থাপত্য ও নির্মাণ প্রকৌশলেও আগ্রা দুর্গকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়। মধ্যযুগে বাগদাদ, দামেস্কো, ইস্পাহান, সিরাজ, কায়রোর মতোই আগ্রা ছিল এক আন্তর্জাতিক শহর, যার প্রাণকেন্দ্র ছিল আগ্রা দুর্গ কেন্দ্রীক রাজপ্রাসাদসমূহ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা। যে আগ্রা মুখরিত ছিল বিশ্বের নানা দেশের পর্যটক, ব্যবসায়ীর পদচারণায়। যেখানে বইতো সুরের নহর, আলোর রোশনাই আর তরবারির বিদ্যুৎচমক।

বৃষ্টি কমে এক সময় হাল্কা রোদ ঝলক দেওয়ায় মনে হলো শত শত বছরের ঘুম ছেড়ে চমকে উঠেছে আগ্রা দুর্গের ভেতরের স্থাপনাগুলো। মেঘের আড়াল ছেড়ে রোদ যেন এসে কড়া নাড়ছে ইতিহাসের উঠানে, দেয়ালে, প্রাসাদ প্রাঙ্গণে।

শুধু দর্শনীয় স্থান হিসাবে দুর্গের নানা স্থাপনা দেখাতেই সময় কেটে যায়না, প্রতিটি স্থানের পেছনের ইতিহাস ও ইতিবৃত্তও সামনে চলে আসে অশ্বধ্বনির ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে। বাস্তবতা চলে যায় পেছনের সানাই, নহবতের সুরধ্বনি গুঞ্জরিত মুঘল আমলে।

সুদূর মধ্য এশীয় অঞ্চলের মোঙ্গল-তুর্ক-পারস্য ঐতিহ্য নিয়ে যে মুঘলরা ভারতে এসেছিলেন, তারা শাসন ও সংস্কৃতির প্রতিটি অঙ্গনকে করেছিলেন আলোকিত ও সমৃদ্ধ। প্রাচীন ভারতীয় সমাজে আধুনিক জীবনবোধ ও যাপন প্রণালী মিলে আছে অর্ধ-সহস্র বছরের মুঘল শাসনের পরতে পরতে। তাদের প্রাসাদ, হর্ম্য, স্থাপনা, প্রশাসনিক রীতি, খাদ্য, পোষাক, লোকাচার, কাব্য, সঙ্গীত ইত্যাদি প্রতিটি বিষয়ই শুধু ভারত নয়, বিশ্ব সভ্যতা ও ঐতিহ্যের উজ্জ্বল রত্নস্বরূপ।

সেই মুঘলদের নাভিমূল আগ্রার দুর্গে প্রতিটি পদক্ষেপে কানে বাজে ইতিহাসের শব্দ-ঝঙ্কার। ছায়ায় ছায়ায় সঙ্গে চলে অতীতের স্বর্ণালী দিনগুলোও। অতীত পুরনো হলেও যে দীপ্তি হারায় না, মুঘল রাজধানী আগ্রা দুর্গের প্রসারিত স্থাপত্যের লালিত্য যেন সে সত্যটিই মনে করিয়ে দিল।

আরও পড়ুন: রাতের আগ্রায়

বাংলাদেশি পর্যটক আকর্ষণে ঢাকায় ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার রোড শো



তৌফিক হাসান, কন্ট্রিবিউটিং এডিটর-ট্রাভেল এন্ড ট্যুর, বার্তা২৪.কম
বাংলাদেশি পর্যটক আকর্ষণে ঢাকায় ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার রোড শো

বাংলাদেশি পর্যটক আকর্ষণে ঢাকায় ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার রোড শো

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনাভাইরাসের প্রভাবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর  চলতি বছরের ১ এপ্রিল সীমান্ত খুলে দেয় মালয়েশিয়া। মূলত ওইদিন থেকে দেশটিতে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। এর ফলে ফের পর্যটক টানতে নানা উদ্যোগ নেয় মালয়েশিয়া। এর অংশ হিসেবে দেশটির পর্যটন উন্নয়ন সংস্থা ‘ট্যুরিজম মালয়েশিয়া’ ২ থেকে ৭  জুন বাংলাদেশের  গুরুত্বপূর্ণ শহর ঢাকা এবং চট্রগ্রামে প্রথমবারের মতো রোডশো’র আয়োজন করছে।

ঢাকায় রোববার (৫ জুন) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁ হোটেলে বাংলাদেশি ট্রাভেল এজেন্ট ও ট্যুর অপারেটরদের জন্য  রোডশো’র আয়োজন করে মালয়েশিয়া পর্যটন উন্নয়ন বোর্ড- ট্যুরিজম মালয়েশিয়া।

অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনা এমডি. হাশিম, ট্যুর অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (টোয়াব)-এর নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট শিবলুল আজম কোরেশী সহ স্বনামধন্য সকল ট্রাভেল এজেন্ট এবং ট্যুর অপারেটররের শীর্ষকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া অন্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার সিনিয়র পরিচালক সৈয়দ ইয়াহিয়া সৈয়দ ওথমান এবং ‘দ্য বাংলাদেশ মনিটর’র সম্পাদক কাজী ওয়াহিদুর আলম।

এদিকে রোডে শো উপলক্ষে ট্যুরিজম মালয়েশিয়ার সিনিয়র পরিচালক (কৌশলগত পরিকল্পনা বিভাগ) সৈয়দ ইয়াহিয়া সৈয়দ ওথমান এর নেতৃত্বে একটি মালয়েশীয় প্রতিনিধি দল বর্তমানে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। প্রতিনিধি দলে অন্তর্ভূক্ত রয়েছে মালয়েশিয়ার ৫টি ট্রাভেল এজেন্সি এবং দুটি স্বাস্থ্যশিল্প সংস্থার প্রতিনিধিরাও।

বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনা এমডি. হাশিম বক্তব্য রাখছেন

অনুষ্ঠানে রোড শো’র আয়োজন প্রসঙ্গে বক্তরা জানান, মালয়েশিয়া ভ্রমণে বাংলাদেশিদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করার সাথে সাথে এই রোডশো’র লক্ষ্য হলো ভ্রমণ ও পর্যটন শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্টদের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম প্রদান করা যার মাধ্যমে তারা পর্যটনকে পূর্বাবস্থায় বা আরো ভালো অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে।

সৈয়দ ইয়াহিয়া সৈয়দ ওথমান বলেন, বাংলাদেশে ফিরে আসার এটি একটি দারুণ সময় এবং রোডশো আয়োজনের জন্য যথার্থ। বাংলাদেশে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পুনরায় শুরু এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণের জন্য মালয়েশিয়ার সীমান্ত উন্মুক্তকরণ বলতে গেলে একই সময়ে সংঘঠিত হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশি পর্যটকদের মালয়েশিয়ায় স্বাগত জানানোর সূযোগ পেয়ে আমরা সত্যিই রোমাঞ্চিত। পর্যটকরা এখন মালয়েশিয়ার শ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ রোমাঞ্চকর আকর্ষণগুলো সাশ্রয়ী খরচে উপভোগ করার সুযোগ পাচ্ছেন। দীর্ঘ দুবছর পর পর্যটকরা এখন অনেক কিছুই এক্সপ্লোর করতে পারবেন যার মধ্যে রয়েছে সম্প্রতি চালু হওয়া আউটডোর থিমপার্ক, গেন্টিং স্কাইওয়ার্ল্ড, কুয়ালালামপূরে নতুন সাজে সজ্জিত সানওয়ে রিসোর্ট এবং জাকজমকপূর্ণ নতুন আকর্ষণ বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উঁচু অট্টালিকা ‘মারদেকা ১১৮’। অনিন্দ্য সুন্দর সমূদ্রতট, চিত্তাকর্ষক পর্বতমালা ও বনোরাজিসহ বিভিন্ন আনন্দদায়ক ও রোমাঞ্চকর কর্মকান্ড আপনার ভ্রমণকে স্মরণীয় করে রাখবে।

উল্লেখ্য, বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যার হিসেবে মালয়েশিয়ার তালিকায় বাংলাদেশের স্থান প্রথম দিকে। ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১ লাখ ৮৯ হাজারের বেশি বাংলাদেশি মালয়েশিয়া ভ্রমণ করেছেন; যা মোট সংখ্যার ১৯.৩০ শতাংশেরও বেশি। চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে পূর্ণ কোর্স কোভিড টিকাপ্রাপ্ত বিদেশিদের জন্য মালয়েশিয়া ভ্রমণে কোন কোয়ারেন্টাইনের প্রয়োজন নেই। আসার আগে ও যাওয়ার পর  পর্যটকদের কোভিড-১৯ পরীক্ষা লাগবে না। ১৭ বছর বা তার নিচের বয়সী শিশুদের জন্যও করোনা পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। বর্তমানে মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স, বাটিক এয়ার এবং এয়ার এশিয়া ঢাকা এবং মালয়েশিয়ার মধ্যে ভ্রমণের জন্য সপ্তাহে ৩ হাজার ৯১০ টির বেশি আসন অফার করছে।

;

ফের ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করছে মালয়েশিয়া



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
ফের ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করছে মালয়েশিয়া

ফের ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করছে মালয়েশিয়া

  • Font increase
  • Font Decrease

দুই বছর পর পুরোদমে ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করার ঘোষণা দিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি ইসমাইল সাবরি ইয়াকোব। মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ১ এপ্রিল থেকে আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের জন্য সীমানা সম্পূর্ণরূপে খুলে দেওয়া হবে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী বলেন, দর্শনার্থীদের পাশাপাশি মালয়েশিয়া থেকে ফেরত আসা কর্মী যারা দুই ডোজ বা বুস্টার ডোজ গ্রহণ করেছেন তারা খুব সহজেই মালয়েশিয়ায় ঢুকতে পারবেন। তাদের কোয়ারেনটিনে থাকার প্রয়োজন নেই। তবে তাদের অবশ্যই যাত্রার দুই দিন আগে একটি আরটি-পিসিআর পরীক্ষা এবং পৌঁছানোর পরে একটি দ্রুত পরীক্ষা (আরটিকে) করতে হবে।

করোনা মহামারির কারণে ২০২০ সালের মার্চ থেকে পর্যটনসহ সব ধরনের ভিসার কার্যক্রম বন্ধ করে দেশের সীমানা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দিয়েছিল দেশটির সরকার। মালয়েশিয়ার প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৯৮ শতাংশকে দুই ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে এবং অর্ধেকেরও বেশি বুস্টার ডোজ পেয়েছেন।

;

করোনা টেস্ট ছাড়াই ভ্রমণ করা যাবে মালদ্বীপ



নিউজ ডেস্ক, বার্তা২৪.কম
করোনা টেস্ট ছাড়াই ভ্রমণ করা যাবে মালদ্বীপ

করোনা টেস্ট ছাড়াই ভ্রমণ করা যাবে মালদ্বীপ

  • Font increase
  • Font Decrease

করোনার টিকার দুই ডোজ সম্পন্ন করলেই যাওয়া যাবে মালদ্বীপ। বিশ্বের যেকোনো দেশের পর্যটকরাই এ সুযোগ নিতে পারবে।

সম্প্রতি মালদ্বীপের পর্যটন মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে, যা গত শনিবার থেকে কার্যকর হয়।

নতুন নির্দেশনায় বলা হয়, কোনো যাত্রী যদি করোনা প্রতিরোধ টিকার পূর্ণাঙ্গ ডোজ (বুস্টার ডোজ প্রয়োজন নেই) নিয়ে থাকে, সে ক্ষেত্রে ৫ মার্চ থেকে সেসব যাত্রীর মালদ্বীপ ভ্রমণের আগে আরটি-পিসিআর টেস্টের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করা হলো। সূত্র: লয়ালটিলবি ডটকম

;

সাদা পানির ঝর্ণা



তৌফিক হাসান
ছবি: বার্তা২৪.কম

ছবি: বার্তা২৪.কম

  • Font increase
  • Font Decrease

অন্ধকার থাকতেই ভোর ৫টা নাগাদ হোটেল ছেড়ে নৌকা ঘাট পৌঁছে গেলাম। ভোরের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে ইতিমধ্যেই কিছু জেলে নৌকা নিয়ে নেমে গেছে কাপ্তাই লেকের জলে জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে। আজকের যাত্রা সাদা পানির ঝর্ণা তথা ধুপপানির উদ্দেশ্যে। রাঙমাটির বিলাইছড়ি ঘাট থেকে সকাল সাড়ে ৫টা নাগাদ আমাদের বোট ছাড়ল উলুছড়ির উদ্দেশ্যে, সেখান থেকেই শুরু হবে ঝর্ণার উদ্দেশ্যে মূল ট্রেকিং। লোকালয়ের পাশ দিয়েই এগিয়ে চলছে আমাদের বোট। স্থানীয়রা কেউ কেউ লেক ঘেষা রাস্তায় প্রাতঃভ্রমণ করছেন, কেউ কেউ কৌতুহলী দৃষ্টি আমাদের বোটের দিকে তাকিয়ে আছেন। এবারের যাত্রায় আমরা মোট ৯ জন যাচ্ছি। সবারই পাহাড়ে হাঁটার অল্প বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে। ঢাকা থেকে সেন্টমার্টিন নন-এসি বাসে করে কাপ্তাই এসেছিলাম। কাপ্তাই ঘাট থেকে দুই দিনের জন্য ৫৫০০ টাকায় নৌকা ভাড়া নিয়ে আমরা রাঙ্গামাটির বিলাছড়িতে পৌঁছেছি। রাত্রিবাস হয়েছে ঘাট লাগোয়া স্মৃতিময় বোডিং-এ। কোনরকমে থাকা যায় সেরকম রুমের ভাড়া পড়েছে ১০০০ টাকা।

কাপ্তাই লেকের বুক চিরে আমাদের নৌকা এগিয়ে চলছে। বিগত কয়েকদিন বৃষ্টিজনিত পাহাড়িঢলের কারণে সব পলিমাটি এসে জমা হয়েছে সুন্দরি কাপ্তাইয়ের বুকে, তাই পানি একেবারে ঘোলা। সুন্দর পানিপথের মাঝে মাঝে জংলার মতন আবার কখনো বা নাম না জানা জলজ ফুল দেখতে পাচ্ছি। সামান্য যাবার পর বিলাইছড়ি আর্মি সদর দফতরের নৌ-চেক পোস্ট পড়লো সেখানে যথাযথ পরিচয় লিপিবন্ধ করেই আবার সচল হলো আমাদের নৌকার ইঞ্জিন। নৌকা এবার নদী বা খালের মতো সরু পথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। কি মনোরম এই পথ, সবুজে ঘেরা খাড়া পাহাড়কে পাশে রেখে চলছি। মাঝে মাঝে পাহাড়ের খাজে শুভ্র মেঘকে আটকে থাকতে দেখছি যেন সবুজ পাহাড় তার শুভ্রতায় ভরা প্রেয়সীকে বুকে জড়িয়ে রেখেছে। আমরা কেউ কোনো কথা বলছিনা, অবারিত সৌন্দর্যে অবগাহন করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছি।

কাদা মাটি মাড়িয়ে ঝর্ণার উদ্দেশ্যে মূল ট্রেকিং শুরু

এক পর্যায়ে আমরা আলীক্ষিয়াং নামক একটা স্থানে দাঁড়িয়ে নাস্তা সেরে নিলাম। এখানে খুব কম সংখ্যক পরিবারই বাস করে যার মধ্যে মাত্র ৩টি পরিবার আছে বাঙালি। লাল মিয়া নামে এক বাঙালির হোটেলে ঝটপট নাস্তা করেই যাত্রা শুরু হলো। মিনিট ৫/৭ পরেই আবার দাঁড়াতে হলো আরেকটা আর্মি চেক পোস্টে, যথারীতি পরিচয় লিপিবদ্ধ করার পালা। এবারে চেক পোস্ট থেকে আমাদের সতর্ক করা হলো ফিরতি পথে বিকেল ৫টার মধ্যেই এই চেকপোস্ট পার হতে হবে। চেকপোস্ট পেরিয়ে সুন্দর নদীপথ ধরে যেতে যেতে মোটামুটি আড়াই ঘণ্টায় উলুছড়ি পৌঁছে গেলাম। ঘাট থেকে ৫০০ টাকার বিনিময়ে এক ক্ষুদে গাইড বিচ্ছুকে সাথে নিয়ে শুরু হলো মূল ট্রেকিং। যাত্রা শুরুর পূর্বে মাঝির মাধ্যমে দুপুরের খাবার ব্যবস্থা করে গেলাম স্থানীয় এক ব্যক্তির বাড়িতে, কারণ এখানে কোন খাবারের দোকান নেই। ২০০ টাকায় আমাদের ভাত, মুরগি, আলু ভর্তা আর ডাল খাওয়ার ব্যবস্থা হলো।

যাইহোক ট্রেকিং এর শুরুতেই পথটা বেশ খারাপ। খানিকটা পথ বেশ পিচ্ছিল, গ্রিপ পেতে বেশ সমস্যা হচ্ছিল। আর বেশ খানিকটা পথ ভয়াবহ কর্দমাক্ত, মোটামুটি হাঁটুর সমান কাঁদা। এ ধরনের রাস্তার আলাদা একটা মজা আছে, আমরা পাহাড়ে আসি রোমাঞ্চের খোঁজে আর এরকম পথ, নালা, জংগল, চড়াই-উতরাই ও ঝর্না দেয় ভীষণ রকম আনন্দ। ধুপপানিতে বর্ষার শেষ দিকে যাওয়াই উত্তম বিধায় আমরা সেপ্টেম্বর মাসে যাচ্ছি এই পথে। অন্য সময় গেলে হয়তো অন্যরকম সৌন্দর্য দেখতে পাবো কিন্তু ঝর্ণায় বেশি পানি পেতে হলে এর থেকে দেরিতে যাওয়া ঠিক হবে না।

অবারিত সৌন্দর্যে অবগাহন করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছি

 

ট্রেকিং শুরুর খানিক পরেই একটা ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গ্রাম পড়ল, চারিদিকে পাহাড় মাঝখানে সমতল আর সেখানে ধান পেকে সোনালি রঙ ধারন করে আছে। কি সেই সৌন্দর্য, সবুজের মাঝে খানিকটা সোনালি আভা একেবারে চিরায়ত বাংলার রূপ। গ্রামবাসীরা তাদের উৎপাদিত ফল বিক্রি করছিল আমরা সেখান থেকে দেশি লাল পেয়ারা আর পেঁপে কিনে খেয়ে হাঁটা দিলাম।

এরপর প্রথমে একটা সিড়ি তারপর খাঁড়া তিনটে পাহাড় ডিঙিয়ে বেশ হাঁপিয়ে গিয়ে বিশ্রাম নেবো বলে চিন্তা করতেই দূরে তাকিয়ে দেখি দুটো শিশু কি যেন বিক্রি করছে! ওদের কাছে গিয়ে দেখি কলার ছড়ি ঝুলিয়ে রেখেছে, প্রতি পিস ৫ টাকা। অতঃপর বেশকিছু কলার সুব্যবস্থা করে সেখানে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা শুরু হলো আমাদের। আরও কিছুদূর গিয়ে ধুপপানি গ্রামে পৌঁছে দেখি টেবিল পেতে রীতিমতো দোকান সাজিয়ে বসে আছে, জুস পানি চিপস শসা আর ফল-মূল কি নেই সেখানে! আবারও পেয়ারা কিনে নিয়ে যাত্রা শুরু হলো আমাদের।

সাদা পানির ঝর্ণা

হাচরে-পাচরে প্রায় আড়াই ঘণ্টা হেঁটে পৌঁছে গেলাম ধুপপানিতে। রাঙ্গামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে এর অবস্থান। খুব বেশিদিন হয়নি মানুষজন এই ঝর্ণার অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পেরেছে। কিছু বছর আগে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এই স্থানে ধ্যান করার কারণে নয়নাভিরাম এই ঝর্ণাটি মানুষের নজরে আসে। তঞ্চঙ্গ্যা শব্দে ধুপ অর্থ সাদা আর পানিকে পানিই বলা হয় অর্থাৎ ধুপানির অর্থ সাদা পানির ঝর্ণা ।

মূলত এই ঝর্ণার পানি স্বচ্ছ এবং যখন অনেক উঁচু (প্রায় ১৫০ মিটার) থেকে ঝর্ণার জল আছড়ে পড়ে তখন তা শুধু সাদাই দেখা যায়। তাই একে ধুপপানি ঝর্ণা বলা হয়। বাংলাদেশের অন্যতম সুন্দর ঝরনাগুলির মধ্যে অন্যতম এই ঝরনায় নিচের দিকে একটি গুহার মতন আছে। যা এই ঝরনাকে করেছে অনন্য।

;