কর্ডোভা মসজিদ নামাজের জন্য খুলে দেওয়ার দাবি

মসজিদ পরিচিতি, ইসলাম

মো. আবু রায়হান, অতিথি লেখক, ইসলাম | 2023-09-01 14:13:16

স্পেনে মুসলিম শাসনের সূত্রপাত হয়েছিল মুর জাতির মাধ্যমে। ৭১১ সালে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর স্পেন আন্দালুসিয়া নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। মুসলিমদের শাসনাধীন আন্দালুসিয়ার রাজধানী ছিল কর্ডোভা। আরবিতে কর্ডোভার উচ্চারণ কুরতুবা। ৭১১ থেকে ১৪৯২ সাল পর্যন্ত মুসলিম শাসনামলে সভ্যতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায় স্পেন। এ সময় স্পেনে শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ব্যাপক প্রসার ঘটে। নির্মিত হয় অনেক লাইব্রেরি, হাম্মাম (গোসলখানা) ও মসজিদ। অসাধারণ শিল্পনৈপুণ্যে তৈরি অসংখ্য মুসলিম স্থাপনা যেকোনো মানুষের দৃষ্টি কেড়ে নিতে সক্ষম। এসব স্থাপনার মধ্যে কর্ডোভা মসজিদ অন্যতম।

স্প্যানিশ ভাষায় মসজিদকে বলা হয় মেজিকিতা, তবে স্থানীয়দের কাছে মসজিদটি ‘দ্য গ্রেট মসজিদ অব কর্ডোভা’ নামে বেশি পরিচিত। মসজিদটিকে রোমান ক্যাথলিক গির্জায় রূপান্তরিত করার পরও ঐতিহাসিক এ স্থাপনাকে পর্যটক ও স্পেনিশরা মসজিদ হিসেবেই দেখেন ও ডাকেন।

এক সময় শত শত বছর এই কর্ডোভা মসজিদই ছিল মুসলিম শাসনের কেন্দ্রবিন্দু। মসজিদের অবকাঠামো, কারুকাজ ও সৌন্দর্য সবকিছু অক্ষুণ্ন থাকলেও নেই কেবল মুসলিমদের নামাজ ও ইবাদতের কোনো কার্যক্রম। আজও সৌন্দর্য ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে কর্ডোভা মসজিদ। দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদ বিশ্ব মুসলিমদের হৃদয়ে হাহাকার জাগিয়ে রেখেছে।

মসজিদের মেহরাব

 

স্পেনের বৃহত্তর ও বিশ্ববিখ্যাত কর্ডোভা মসজিদের মালিক মুসলমানরা। তাই এটি মুসলমানদের কাছে হস্তান্তর ও নামাজের জন্য খুলে দেওয়ার দাবি দিন দিন জোরালো হচ্ছে। গত বছর সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজা নগরীর আমির সুলতান বিন মুহাম্মাদ কাসিমি এক টুইট বার্তায়ও এ দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা কর্ডোভা মসজিদকে আবারও মসজিদ হিসেবে ব্যবহারের দাবি জানাচ্ছি। আমাকে বলা হয়, সিটি কাউন্সিল তা খ্রিস্টানদের দিয়েছে। তখন আমি বললাম, মালিকানাহীন বস্তু অনুপযুক্তকে দেওয়া হয়েছে। অথচ এর মালিকানা শুধু মুসলিমদের।’ -আল জাজিরা

স্পেনে মুসলিম শাসনের গোড়াপত্তন ঘটার ৭৩ বছর পর স্পেনে উমাইয়া শাসনের প্রতিষ্ঠাতা আমির প্রথম আবদুর রহমান রাজধানী কর্ডোভায় মসজিদটি ৭৮৪ সালে নির্মাণ করেন। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় মসজিদের আয়তন ও শোভাবর্ধনসহ বিভিন্ন সংস্কার হয়। খলিফা প্রথম আবদুর রহমান নিজ তদারকিতে মসজিদের নির্মাণ কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। সুলতান নিজেও প্রতিদিন এক ঘণ্টা করে মসজিদের নির্মাণ কাজে শ্রম দিতেন। তার ৩ বছরের শাসনামলে মসজিদটির অবকাঠামো দাঁড় করাতে সক্ষম হন।

৭৮৬ সালে সুলতান প্রথম আবদুর রহমানের মৃত্যুর পর তার ছেলে হিশাম খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তিনিও মসজিদটি দৃষ্টিনন্দন ও সৌন্দর্য বাড়াতে অবদান রাখেন। ৭৯৩ সালে খলিফা হিশাম মসজিদটির প্রাথমিক কাজ শেষ করেন। প্রাথমিক কাজ শেষ কুরতুবা মসজিদের আয়তন দাঁড়ায় দৈর্ঘ্যে ৬০০ ফুট এবং প্রস্থে ৩৫০ ফুট। খলিফা হিশামের পর উমাইয়াদের সব শাসকই মসজিদের ধারাবাহিক কাজ ও উন্নয়ন অব্যাহত রাখেন। দশম শতাব্দীতে খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমান কুরতুবা মসজিদে পূর্ণাঙ্গ নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেন। আর তাতে মসজিদের আয়তন দাঁড়ায় ১ লাখ ১০ হাজার ৪০০ স্কয়ার ফুট। ৫০ দরজার এ বিশাল স্থাপনায় রয়েছে ১২৯৩টি স্তম্ভ। নির্মাণের পর মসজিদটি বিশ্বের অন্যতম স্থাপত্যশৈলীর মর্যাদা লাভ করে।

কর্ডোভা মসজিদে আল্লামা ইকবাল

 

১ লাখ ১০ হাজার ৪০০ বর্গফুট আয়তনের মসজিদটির নকশা করেন একজন সিরিয়ান স্থপতি। এর থামের সংখ্যা ৮৫৬টি। এছাড়াও ৯টি বাহির দরজা ও ১১টি অভ্যন্তরীণ দরজা রয়েছে। লাল ডোরাকাটা খিলানগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় স্থাপত্যশিল্পে মুসলিম মুন্সিয়ানার কথা। অনিন্দ্য সুন্দর এই মসজিদের থামগুলো নির্মিত হয়েছে মার্বেল, গ্রানাইড, জেসপার ও অনিক্স পাথর দিয়ে। কর্ডোভা মসজিদ নির্মাণে সেকালেই আড়াই থেকে তিন লাখ মুদ্রা ব্যয় করা হয়। পূর্ব-পশ্চিমে এর দৈর্ঘ্য ছিল ৫০০ ফুট। এর সুন্দর ও আকর্ষণীয় মিহরাবটি পাথরের নির্মিত এক হাজার ৪১৭টি স্তম্ভের ওপর। মিহরাবের কাছে একটি উঁচু মিম্বর ছিল হাতির দাঁত ও ৩৬ হাজার বিভিন্ন রং ও বিভিন্ন কাষ্ঠখণ্ডের তৈরি। সেগুলোর ওপর ছিলো- হরেক ধরনের হীরা-জহরতের কারুকাজ। দীর্ঘ সাত বছরের পরিশ্রমে মিম্বরটি নির্মাণ করা হয়। তৈরি করা হয় ১০৮ ফুট উঁচু মিনার, যাতে ওঠানামার জন্য নির্মিত দু’টি সিঁড়ির ছিল ১০৭টি ধাপ। মসজিদের মধ্যে ছোট-বড় ১০ হাজার ঝাড়বাতি জ্বালানো হতো। তার মধ্যে সর্ববৃহৎ তিনটি ঝাড়বাতি ছিল রুপার, বাকিগুলো পিতলের তৈরি। বড় বড় ঝাড়ের মধ্যে এক হাজার ৪৮০টি প্রদীপ জ্বালানো হতো। শুধু তিনটি রুপার ঝাড়েই ৩৬ সের তেল পোড়ানো হতো। ৩০০ কর্মচারী ও খাদেম মসজিদের তদারকিতেই নিয়োজিত ছিলেন। মুসলিম বিশ্বের কাছে সুপরিচিত বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থ কুরতুবি রয়েছে এ মসজিদের এক গভীর সম্পর্ক। এ মসজিদেই আল্লামা কুরতুবি (রহ.) মুসলিমদের তার রচিত তাফসিরে কুরতুবির পাঠ দিতেন। মসজিদে বসেই ইলমে তাসাউফের দরস দিতেন শায়খুল আকবর সুফি ইমাম ইবনে আরাবি। বাকি ইবনে মাখলাদের মতো ব্যক্তিত্ব এখানে বসেই ‘কালাল্লাহ’ এবং ‘কালার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলতেন৷ হজরত ইয়াহইয়া ইবনে ইয়াহইয়া আন্দালুসিও ইলমে দ্বীনের পাঠদান করতেন এ মসজিদে। ইলমে ফিকহের মাসয়ালা-মাসায়েল নিয়ে আলোচনা করতেন হজরত ইবনে হাজাম জাহেরি।

১২৩৬ সালে ক্যাসলের রাজা তৃতীয় ফার্ডিনান্দ ও রাণী ইসাবেলা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা করে স্পেন দখল করে নেয় আর মসজিদটিকে রোমান ক্যাথলিক গির্জায় রুপান্তরিত করে৷ তখন থেকে একে বলা হয় দ্য মস্ক ক্যাথেড্রাল অব কর্ডোভা।

অনেক পর্যটক লুকিয়ে নামাজ পড়েন মসজিদে, যদিও তা নিষিদ্ধ


স্থাপনের পর থেকে মুসলিমরা এখানে নামাজ আদায় করেছিল প্রায় ৫০০ বছর। ফলে মুসলমানদের একটানা ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা ঐতিহ্য প্রতিদিন ৫ বার আজানের ধ্বনি ও নামাজ বন্ধ হয়ে যায়। আর মসজিদটির মিনারে মাইকের বদলে লাগানো হয় গির্জার ঘণ্টা। আর এখন সে মিনার থেকে আজানের পরিবর্তে প্রতিধ্বনিত হয় গির্জার ঘণ্টাধ্বনি। স্পেন থেকে মুসলমানরা বিতাড়িত হওয়ার পর দীর্ঘ ৭০০ বছর কর্ডোভা মসজিদে কোনো আজান ও নামাজ হয়নি।

আল্লামা ইকবালের দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল এই মসজিদে দু’রাকাত নামাজ পড়ার। ১৯৩৩ সালে স্পেন সফরকালে আল্লামা ইকবাল এই মসজিদ পরিদর্শন করেন। মসজিদে নামাজ পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলেও শুধু আল্লামা ইকবালকে মসজিদে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে, প্রবেশের পর ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিতে বলা হয়। মসজিদে প্রবেশ করেই উচ্চস্বরে আজান দেন আল্লামা ইকবাল। দীর্ঘ সাতশ’ বছর পর ওই মসজিদে এটিই ছিল প্রথম আজান। মসজিদের দেয়াল ও স্তম্ভগুলো দীর্ঘকাল পর আজানের ধ্বনি শুনতে পায়। আজানের পর জায়নামাজ বিছিয়ে দু’রাকাত নামাজ আদায় করেন ইকবাল। নামাজে এমন এক অবস্থা সৃষ্টি হয় যে, তিনি বেহুঁশ হয়ে যান। জ্ঞান ফেরার পর তিনি অশ্রুসিক্ত নয়নে মোনাজাত করেন। মোনাজাতের প্রতিটি বাক্যই কবিতার মতো করে আবৃত্তি করেছিলেন তিনি। ঐতিহাসিক কর্ডোভা মসজিদে নামাজ পড়ে তিনি তার আবেগকে ৭টি কবিতার মাধ্যমে প্রকাশ করেন। ‘বাবে জিবরিলে দোয়া’ শিরোনামে দীর্ঘ কবিতাটি ওই মসজিদে বসেই লিখেছিলেন তিনি।

বর্তমানের যাতে কেউ সেখানে নামাজ, রুকু কিংবা সেজদা দিতে না পারে। সে জন্য অত্যাধুনিক সিসি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রিত বিশেষ সিকিউরিটি ফোর্স সার্বক্ষণিক পাহারায় নিয়োজিত। আজও সেখানে ক্রুশ টানিয়ে রাখা হয়েছে৷ ২০০০ সালের প্রথম দিকে স্প্যানিশ মুসলমানরা এই মসজিদের নামাজ আদায় করার দাবি জানালে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। মুসলিম সভ্যতার অনন্য নিদর্শন এই কর্ডোভা মসজিদটি এখনও গির্জা হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

কোনো মুসলিম হিজাব পরিধান করে মসজিদে গেলে পুলিশ তাকে অনুসরণ করে, কিন্তু খ্রিস্টান নারীরা যেতে পারেন 

 

২০১০ সালে এক দল মুসলিম পর্যটক শুধু রুকু করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। একজন সত্যিকার ও চিন্তাশীল মুসলমান মসজিদে কর্ডোভায় দাঁড়িয়ে না কেঁদে থাকতে পারে না৷ ১৯৮৪ সালে ঐতিহাসিক এ মসজিদটিকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত দেয়। মসজিদের ভেতরে ঢোকার জন্য টিকিট ফি ১০ ইউরো। প্রতিদিন অনেক পর্যটক ভিড় করেন ঐতিহাসিক এ মসজিদটি দেখার জন্য। হৃদয়গ্রাহী নকশা ও স্থাপত্যশৈলীর জন্য নবম ও দশম শতাব্দীতে এটি ছিল সারাবিশ্বের প্রথমসারির মসজিদগুলোর অন্যতম। শুধু স্পেন নয়, অটোমান সাম্রাজ্যের যে সব এলাকা বর্তমান খ্রিস্টান ইউরোপের দখলে যেমন- গ্রিস, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরি ইত্যাদি বলকান অঞ্চলে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর সেখানকার একাধিক মসজিদকে জোরপূর্বক গির্জায় রূপান্তরিত করা হয়েছে অথবা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

তুরস্কের অটোমান সুলতান দ্বিতীয় মোহাম্মদ তৎকালীন কনস্টান্টিনোপল শহর দখল করে তার নাম পরিবর্তন করে ইস্তাম্বুল (ইসলামের শহর) এবং আয়া সোফিয়াকে মসজিদ রূপান্তরিত করে বলেন- ‘এটি হলো ক্রিশ্চান ইউরোপের দাম্ভিকতার ধ্বংসের প্রতীক যারা আমাদের ভাইদের রক্তে স্পেনের জমিন লাল করেছে।’ খলিফা সুলতান সুলেমান বলেছিলেন, ‘ওরা ভেবেছিল ইউরোপের জমিন থেকে চিরতরে আজানের ধ্বনি মুছে দেবে, আয়া সোফিয়ার আজান এটাই প্রমাণ করবে যে, আল্লাহর বান্দারা কোনোদিন পরাজিত হয় না।’ ওসমানীয় খলিফা আবদুল হামিদ বলেছিলেন, ‘যেদিন খ্রিস্টান ইউরোপ মসজিদে কুরতুবাতে পুনরায় আজান দিতে দেবে সেদিন আয়া সোফিয়া নিয়ে তাদের কান্না সার্থক হবে তবে তার আগে নয়।’

এ সম্পর্কিত আরও খবর