নারী হিসেবে সুবিধা নিয়ে নয়, সমতা আসবে লড়াইয়ে

, নারীশক্তি

শারমিন শামস্ | 2023-08-30 01:17:13

শারমিন শামস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ায় সাংবাদিকতা করেছেন দীর্ঘদিন। নারীবাদ তার লেখার ও অন্যান্য কাজের অন্যতম ক্ষেত্র। লিখছেন গল্প, উপন্যাস, কবিতা ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কলাম। সাথে শিশুতোষ বইও। নির্মাণ করেছেন কয়েকটি প্রামাণ্যচিত্র। প্রকাশিত হয়েছে নারীবাদ বিষয়ক কলাম সংকলন ‘অল দ্য বেস্ট পুরুষতন্ত্র’, গল্পগ্রন্থ ‘ভালোবাসা আর ভালো না বাসার গল্প’, ‘পাপ ও পারফিউম’, উপন্যাস ‘কয়েকজন বোকা মানুষ ও কাঠগোলাপের পৃথিবী’। তাঁর সম্পাদিত ও প্রকাশিত অনলাইন পত্রিকা ‘ফেমিনিস্ট ফ্যাক্টর’ ইতিমধ্যেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।


পশ্চিমে নারীবাদ চর্চার প্রায় চারশো বছর পেরুচ্ছে। চতুর্থ ওয়েভে নারীবাদ প্রবেশ করেছে সেও বছর ছয়/সাত হলো। বাংলাদেশে নারীবাদ চর্চা গুটি গুটি পায়ে এগুচ্ছে সে অর্থে। কাজের চেয়ে বাধা সামলানোই বড় কাজ হয়ে উঠছে। এদেশে যখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপনার কাজের প্রতি লোকের সহযোগিতার পরিবর্তে অসহযোগিতা ও প্রতিহিংসামূলক আচরণই বেশি—সেখানে নারীবাদ অবশ্যম্ভাবীরূপে প্রতিরোধ প্রতিশোধের মুখে পড়বে এতে অবাক হবার অবশ্য কিছু নেই।

কিন্তু তাই বলে, এদেশে নারীবাদ অচল অথর্ব গতিহীন নয়। পরিবর্তন আসছে। অন্তত আজ যে বক্তব্য রাখবার জন্য, যে দাবি তুলবার জন্য আপনারা নারীবাদীদের গাল পাড়ছেন, মাস কয়েক পর কি বছর পেরুলে সেই বক্তব্যেরই সত্যতা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন। সেই একই দাবি একদিন আপামর জনতার মুখেও শোভা পাচ্ছে।

নারীবাদের লড়াই চিরকালই কঠিন। এই বঙ্গদেশে কঠিনতম।
নারী স্বাধীনতা, লিঙ্গ বৈষম্য ও সমঅধিকার নিয়ে কথা বলতে গেলে, আমি সবসময় একটা কথা বারবার বলি। সেটি হলো, এসব ইস্যুতে বরাবর একতরফাভাবে পুরুষকে দোষারোপ করাটা অর্থহীন। যে সিস্টেমের বিরুদ্ধে আমরা লড়ছি, সেই পিতৃতন্ত্র পুরুষকে ক্ষমতাশালী করেছে, পুরুষকে করেছে নারীর মালিক। এ সবই পিতৃতান্ত্রিক সিস্টেমের চাল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পিতৃতন্ত্রের শোষণের শিকার নারী পুরুষ দুই পক্ষই। নারীবাদের লড়াই তাই পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, একতরফাভাবে নারীর পক্ষেও নয়। নারীবাদের লড়াই পিতৃতান্ত্রিক সিস্টেমের বিরুদ্ধে, যে সিস্টেম লিঙ্গগত বৈষম্য জিইয়ে রেখে অসম পৃথিবী গড়ে তুলেছে, তার বিরুদ্ধে। নারীবাদের লড়াই সাম্যের লক্ষ্যে। কাউকে বেশি আর কাউকে কম দেবার জন্য নারীবাদ নয়। এখানে নারীরও সুবিধাভোগী হবার কোনো সুযোগ নেই।

ঠিক এই জায়গাটিতে এসে অনেক নারী অধিকারকর্মীর সাথে আমার মতদ্বৈততা হবে। অনেক নারীই আমাকে ভুল বুঝবেন। তাদের বিরুদ্ধ মতকেও আমি পূর্ণ সম্মান করি। তবু আমার বক্তব্য এখানে স্পষ্ট।

শুরুতেই বলেছি, পশ্চিমে নারীবাদের যাত্রা চারশো বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। ১৬ শতকে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা নানা আঙ্গিকে নানা ফুল হয়ে ফুটছে। সে হিসেবে আমাদের দেশে নারীবাদ শিশুতুল্য। কিন্তু সময়টা তো কঠিন। আমাদের এই হাঁটি হাঁটি পায়ের দিন এই কঠিন সময়টিকে সত্যিকার অর্থেই যদি ধারণ করতে চায়, তবে এদেশে নারীবাদের সংঘবদ্ধ সুদৃঢ় একটি যাত্রা হিসেবে শুরু করে আদৌ কবে লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারবে, বলা কঠিন হবে।

তাহলে কিভাবে লড়াই করবে নারী? নারীবাদ?
আমি বলব, সমতার প্রশ্নে আপোষহীন এবং সুযোগপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতায় নিজেকে সামনে তুলে ধরার কাজটাই নারীকে করতে হবে। হ্যাঁ, জেন্ডার ব্যালান্সের প্রয়োজনে কোটা, সংরক্ষিত আসন ইত্যাদি তো বহু হলো। এবার বাকিটুকু বুঝে নিক নারী নিজে। নিজের সাহস, আত্মপ্রত্যয়, জিদ, আপোষহীন মনোভাব এবং শিক্ষাই নারীকে এই বুঝে নেবার কাজটুকু করতে শেখাক। কারণ সময় বড় কঠিন। সংরক্ষিত আসনের ঘেরাটোপে বসে, কোটার আদর বুঝে নিতে নিতে দিন হচ্ছে গত, আলস্যে। এদিকে এগিয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। কোথায় যাচ্ছে, সেটাও আমাদের ঠিকমত জানা নেই। আমরা লাভের গুড়টুকু মুখে নিয়ে সানন্দে চ্যাচাচ্ছি, ‘নারী অনেক এগিয়ে যাচ্ছে’—এই বুলি ছেড়ে।

পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেমের একটি বড় কৌশল হলো, নারীকে নানা উপায়ে প্রতারিত করা। এর একটি হলো, নারীকে দেখানো যে সে আসলে আদরে, আবেশে, তুলোয় মুড়ে রাখা একটি সম্পত্তি (সম্পদ নয় কিন্তু)। এদিকে আদতে নারীর ঘাড়ে হাজার বোঝা। সবচেয়ে বড় বোঝাটির নাম দাসত্ব। সেই সাথে রয়ে গেছে পুরুষের ওপর ভীষণমাত্রায় নির্ভরশীলতা। এই দুই বোঝা নারীর ঘাড়ে চাপিয়ে পুরুষতন্ত্র নিশ্চিত থাকে, কারণ এই বোঝাটিই একসময় নারীর অভ্যস্ততায় পরিণত হয়।

আমার এক বন্ধু দাম্পত্য জীবনে ভীষণ অসুখী ছিল। তার হাসব্যান্ড তাকে শারীরিক মানসিক সব রকম নির্যাতন করত। বহু বছর নির্যাতন সইবার পর আমি তাকে তালাকের কথা ভাবতে বললাম। সে তখন আমাকে বলেছিল, ‘মারুক ধরুক, তবু ধর্ রাতের বেলায় বাচ্চার খাবার, ওষুধ লাগলে কিনে আনতেছে, শুক্রবারে বাজার করতেছে। এই ঝামেলা কে পোহাবে আলাদা হলে?’

বলাবাহুল্য আমার বন্ধুটি ভালো প্রতিষ্ঠানে ভালো বেতনে কাজ করত। তবু পুরুষের প্রতি অসুস্থ নির্ভরশীলতার অভ্যাস কাটাতে পারত না বলে দিনের পর দিন মার খাওয়াকেও সে মেনে নিয়েছিল।

নারীর এই অদ্ভুত মনঃস্তত্ত্ব, এই অভ্যস্ততা, এই দাসত্বের অভ্যাস আমাকে আতংকিত করে। এই শেকলের চেয়ে বড় শেকল আর কিছু হতে পারে না। যে শেকল নারী নিজেই পরে আছে নিজের অজান্তে। যা খুলে ফেললেই মুক্ত পৃথিবীর আলো হাওয়া গায়ে লাগবে। তবু মনের কোথায় কী ভয় তার মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকে, কোন সে দুশ্চিন্তায় সে শেকল খোলে না! পুরুষের পায়ে মাথা গুঁজে শিশুর মতো অবোধ সেজে থাকাতেই তার নারীজন্ম কাটে। মানুষ হওয়া আর হয় না।

বাসে নারীর জন্য সংরক্ষিত আসন নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে না। এটা নারীকে দুর্বল হিসেবে প্রমাণ করে। অথচ নারী দুর্বল নয়। বরং নারী যখন পুরুষের পাশে দাঁড়িয়ে পুরোটা পথ যাত্রা করতে পারবে, তখন পুরুষের সাথে তার একই সক্ষমতার প্রমাণ পাওয়া যাবে।

নারীর জন্য সংসদে সংরক্ষিত আসন নারীকে সম্মানিত করে না। বিশেষ করে যখন তা নির্বাচন না হয়ে সিলেকশন হয়। নারী রাজনীতিবিদরা আলাদা কোনো প্রজাতি নয় যে তাকে আলাদা করে সংসদে জায়গা নিতে হবে। তাকেও পুরুষের সাথে সমান তালে লড়াই করে নিজের যোগ্যতায় জায়গা তৈরি করতে হবে। এখন সেটারই সময়। এটি ২০২০ সাল। রাজনৈতিক অধিকারের জন্য সেই সতের শতক থেকে পশ্চিমের নারী লড়েছে। কত যুদ্ধ, কত ত্যাগ আর কত আত্মাহুতি! ভোটাধিকার, রাজনৈতিক অধিকার—সবকিছু আদায় করেই ছেড়েছে তারা। আজ সেই ইতিহাসও প্রাচীন। এদিকে আমরা পড়ে আছি সংরক্ষিত আসনের আদর আহ্লাদ বুঝে নেবার আশায়! সত্যিই বড় দুর্ভাগা আমরা।

সংরক্ষিত আসন, কোটা ইত্যাদি নারীর প্রয়োজন নেই। বরং নারীর জন্য সুস্থ নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করুন যেন নারী ঘর থেকে নিরাপদে বাইরে যেতে পারে, সুশিক্ষা নিতে পারে। শিক্ষিত ও কাজের যোগ্য হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষা শেষে কর্মক্ষেত্রে যেতে পারে। নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে। তাহলেই নারী হয়ে উঠবে উপযুক্ত। আর একজন উপযুক্ত মানুষকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তার অবস্থান সে নিজেই তৈরি করে নিতে পারে। নারীকে সেই সুযোগটি শুধুমাত্র দেওয়া হোক। ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ, কুসংস্কারের ফাঁদে পড়ে নারীর শিক্ষাপ্রাপ্তি ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণকে যদি রাষ্ট্র কঠিন করে রাখে, সমাজ যদি তাকে নিচু চোখে দেখে, তাহলে হাজার বছরেও এই সংরক্ষিত আসন আর কোটার ব্যবহার শেষ হবে না। সেই কোটা বা সংরক্ষিত আসন দিয়ে শত যুগেও ভারসাম্য অবস্থা আনা সম্ভব হবে না। নারী যে অন্ধকারে ছিল, সেই অন্ধকারেই রয়ে যাবে।

নারীকে নিজের শক্তিতে জ্বলে উঠতে হবে নিজেকেই। এজন্য আসলে কেউ তাকে সাহায্য করবে না। না সমাজ, না রাষ্ট্র। এমনকি পরিবারও। অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকার যে অশালীন অভ্যস্ততা, সেই অভ্যস্ততা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে নারীকেই। মধ্যবিত্ত শিক্ষিত যেসব মেয়েরা ভালো স্বামীর আশায় দিনরাত সৌন্দর্য চর্চা করছেন, তাদের মনোযোগ ঘুরতে হবে নিজের ক্যারিয়ারের দিকে। অন্যের অর্থে নয়, নিজের রোজগারে চলবার সামর্থ্য অর্জন করতে হবে তাদের। পিতৃতান্ত্রিক সিস্টেম যেসব অর্থহীন ডিভিশন অব লেবার তৈরি করে রেখেছে হাজার বছর ধরে, সেই চক্রটি ভাঙতে হবে নারীকেই। পুরুষকে দিয়ে কঠিন কাজ, বাইরের কাজগুলো করিয়ে নেবার মানসিকতা বদলাতে হবে। একই সাথে নিজের ঘরের পুরুষ সদস্যদের দিয়ে গেরস্থালীর কাজ করানোটাও একটি চ্যালেঞ্জ। পিতৃতন্ত্রে ক্ষমতাশালী পুরুষ কিন্তু এত সহজে ছাড়তে চাইবে না তার গদি। তাই গদি ধরে টান মারার কাজটা নারীরই। সেজন্য সবার আগে প্রস্তুত করতে হবে নিজেকে। শারীরিকভাবে, মানসিকভাবে। শরীর ও মন—এই দুইয়েরই শক্তি সামর্থ্য চাই নারীর। নিজেকে শারীরিকভাবে শক্তিশালী করে গড়ে তুলবার কাজটিও করতে হবে একইসাথে। মনে রাখতে হবে, শারীরিক শক্তিমত্তা সামাজিক বেড়ে ওঠার ফল। প্রাকৃতিক নয়। তাই নিজেকে জিরো ফিগার না বানিয়ে শক্ত সমর্থ মানুষের শরীর বানাবার বিষয়টা মাথায় রাখতে হবে।

নারীর সামনে অনেক কাজ। অনেক লড়াই। অর্জন এত সহজ নয়। ঊনিশ শতকে ব্রিটেনের নারীবাদী এমেলিন প্যাঙ্কহার্স্ট নারীর ভোটাধিকারের দাবিতে দীর্ঘ সংগ্রাম করেছিলেন। একসময় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করল। তিনি অনশন করলেন। পুলিশ হেফাজতে তাকে নাকে নল ঢুকিয়ে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা চালানো হতো। অবর্ণনীয় অত্যাচার সয়েছিলেন। পরে মুক্তি মিললেও শরীর ভেঙে পড়ে। মারা যান দ্রুত।

নারীবাদের ইতিহাসে এরকম অসংখ্য রক্তাত্ত লড়াইয়ের গল্প লেখা আছে। প্রাপ্য বুঝে নিতে লড়াই ছাড়া আর কীইবা উপায় আছে? সংগ্রামই সমতা আদায়ের একমাত্র পথ—এটি নারীকে বুঝতে হবে। আর সেই লড়াই, সেই সংগ্রামের উপযুক্ত যোদ্ধা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে নিজেকে।

এ সম্পর্কিত আরও খবর