Alexa

ইমরান জমানায় পাক-মার্কিন সম্পর্ক কোন পথে?

ইমরান জমানায় পাক-মার্কিন সম্পর্ক কোন পথে?

পাকিস্তান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক।

 

পুরনো বন্ধু পাকিস্তান-আমেরিকার সখ্যতা  জঙ্গি দমন প্রশ্নে ছিল সাম্প্রতিক সময়ে ভঙ্গুর। রাশিয়া থেকে পাক সেনাবাহিনীর জন্য অস্ত্র কেনা আর ট্রেনিং নেওয়ার চুক্তির ফলেও দুদেশের সম্পর্ক নাজুক হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে নব্য ক্ষমতাসীন প্লেবয় থেকে রাজনীতিবিদ ইমরান খানের জমানায় খেপাটে ট্রাম্পের আচরণ কেমন হবে? চিড়-ধরা দু’দেশের সম্পর্ক সামনের দিনগুলোতে কোন পথে চলবে?

বলা হচ্ছে পাক-মার্কিন ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক এখন রয়েছে সবচেয়ে নাজুক অবস্থান। দূরত্ব ও শীতলতাই শুধু নয়, পাকিস্তানকে আর্থিক সাহায্যের একাংশও বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমেরিকা। তবে সেটা ছিল আগের সরকারের আমল থেকে চলে আসা ঘটনা।

পাকিস্তানের সঙ্গে বিরাজমান শীতল ও দূরত্বপূর্ণ সম্পর্ক সম্ভবত দীর্ঘায়িত না হয়ে কেটে যাওয়ার লক্ষ্যণ দেখা দিয়েছে ইমরান খানের ক্ষমতায় আরোহণের পর পরই। কারণ প্রকাশ্যেই কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে বিদ্যমান শীতল পরিস্থিতিতে ইমরান খান সরকারের সঙ্গে ‘নতুন’ সম্পর্ক শুরু করার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইমরান খানের সরকার ভালো ভাবে পা ফেলার আগেই ইসলামাবাদে এসে হাজির হয়েছে মার্কিনিরা। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তান সফরের মাধ্যমে সেই কাজই শুরু করলেন মার্কিন বিদেশসচিব মাইক পম্পেয়ো। ক্ষমতায় বসতে না বসতেই ওয়াশিংটনের পক্ষে পাক সরকার প্রধান ইমরানকে এসে ঘিরে ধরলেন তিনি।

পাকিস্তানের নতুন সরকারকে কব্জা করার মতলবটিকেও লুকিয়ে রাখেনি মার্কিনিরা। পাকিস্তানের পথে বিমানে আসার সময়েই পম্পেয়ো সাংবাদিকদের জানান, 'পাক-মার্কিন সম্পর্কের সাম্প্রতিক অবনতির বেশিরভাগটাই হয়েছে ইমরান ক্ষমতায় আসার আগে। ফলে এই সরকারের সঙ্গে নতুন ভাবে শুরু করতে চায় আমেরিকা।'

পাকিস্তানে এসে চুপ করে বসে থাকেন নি মার্কিন মন্ত্রী। ইসলামাবাদে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, বিদেশমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি ও সেনাপ্রধান কমর বাজওয়ার সঙ্গে তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক করেন তিনি। যদিও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে সাবধানী ভাষায় জানানো হয়, 'মার্কিন সাহায্য বন্ধ রাখা ও আফগানিস্তানে শান্তিপ্রক্রিয়া নিয়ে পাক নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা করেছেন পম্পেয়ো', তথাপি আলোচনা যে আরও অনেক গুরুতর বিষয়ে হয়েছে, সেটা টের পাওয়া যায় ইমরানের কথায়। আলোচনার পরে ইমরান বলেন, 'আমি সব সময়েই আশাবাদী। খেলোয়াড়কে সব সময়েই আশাবাদী হতে হয়। কারণ, মাঠে নেমে জেতার কথাই ভাবতে হয়।' নতুন প্রধানমন্তী হলেও ইমরানের কূটনৈতিক ধরনের বক্তব্যে পাক-মার্কিন সম্পর্কের আসন্ন উন্নতির বিষয়টি আঁচ করতে অসুবিধা হয় না।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রীও আলোচনার ভেতরকার সব কথা খুলে না বলে জানিয়েছেন জঙ্গি দমন নিয়ে তার দেশের কড়া অবস্থানের বিষয়টিকে। আগের অবস্থান থেকে এক লাফে যে আমেরিকা সরে আসবে না, তাও বুঝিয়ে দিয়েছেন পম্পেয়ো। তাঁর কথায় অতীতের পাকিস্তান সরকারের প্রতি ক্ষোভ স্পষ্ট, 'জঙ্গি দমনে যেমন পদক্ষেপ দেখব বলে আমরা আশা করেছিলাম, তা দেখতে পাইনি। তার ফলেই পাকিস্তান ওই আর্থিক সাহায্য পাচ্ছে না।' তবে তিনি পাকিস্তানের মুখের উপর আশার মূলাটিও ঝুঁলিয়ে রেখেছেন যে, 'অবস্থার পরিবর্তন হলে আমাদের সিদ্ধান্তও পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।'

পাকিস্তানকে সামাল দিয়েই ওয়াশিংটন ফিরে যান নি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। দক্ষিণ এশিয়ার আরেক গুরুত্বপূর্ণ দেশ ভারতে হাজির হয়েছেন আঞ্চলিক পরিস্থিতিটি চাক্ষুষ বোঝার জন্য। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের সঙ্গে আলোচনায় নিজে একা নন, ডেকে এনেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব জেমস ম্যাটিসকেও।

রাশিয়া থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র-বিরোধী ব্যবস্থা কেনায় ভারত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় পাবে কি না তা যখন অস্পষ্ট, ঠিক তখনই গুরুত্বপূর্ণ দুই মার্কিন মন্ত্রীর পাকিস্তান ঘুরে ভারতে আসা নানা কিছুর ইঙ্গিতবাহী। তদুপরি ইরান থেকে তেল কেনার ক্ষেত্রেও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কোপে পড়ার আশঙ্কার মধ্যে মার্কিন  মন্ত্রীদ্বয় দিল্লিকে আদপে কি বার্তা দিয়েছেন, সেটাই দেখার বিষয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় আসা মার্কিন মন্ত্রীর লক্ষ্য যে একমাত্র পাকিস্তান বা ইমরান খান নয়, সেটাও ওয়াশিংটন স্পষ্ট করেছে সফরের গোড়াতেই।বিমানে সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকের সময়ে পম্পেয়ো প্রসঙ্গত এটাও বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলো আমরা এই আলোচনায় মেটাতে পারব বলে মনে হয় না। ভারত আমাদের একমাত্র বড় প্রতিরক্ষা সহযোগী। দীর্ঘ দিন ধরে হাত মিলিয়ে কাজ করতে হবে এমন অনেক প্রকল্প রয়েছে। সেগুলো নিয়েই মূল আলোচনা হবে।’

উল্লেখ্য, প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে ভারত-মার্কিন আলোচনা দু’বার পিছিয়ে গিয়েছিল। সম্ভবত পাকিস্তানে ক্ষমতার পালাবদলের জন্য অপেক্ষা করছিল মার্কিনিরা। ইমরান খান ক্ষমতায় আসার পর আর দেরি করেনি মার্কিন পক্ষ। ভারত ও পাকিস্তান, দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক ঝাঁলাই আর আলাপ-আলোচনার ইস্যুগুলোকে নবায়নযোগ্য করে নিয়েছে ওয়াশিংটন।

ওয়াশিংটনের এই আগ্রহ ও তাড়ার পেছনে অবশ্য আরেকটি অতীব জরুরি কারণও লুক্কায়িত রয়েছে। তাহলো, ইতিমধ্যে দক্ষিণ চীন সাগর এলাকায় আরও বেশি শক্তি প্রদর্শন শুরু করেছে চিন। ভারত-মার্কিন কৌশলগত আলোচনায় এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব ইস্যু বলে মনে করেছেন কূটনীতিকেরা। আর এ কাজে চীনের কাছ থেকে সরিয়ে পাকিস্তানকে পাশে রাখাও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত জরুরি। নইলে বেইজিং ইসলামাবাদকে হাত করে দক্ষিণ এশিয়ায় কর্তৃত্ব ক্রমেই বাড়িয়ে তুলতে পারে।

সব মিলিয়ে সামনের দিনগুলোতে পাক-মার্কিন সম্পর্কে এবং মার্কিনিদের দক্ষিণ এশিয়া নীতিতে যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী, সে কথা আগাম বলে দেওয়া যায়।

আপনার মতামত লিখুন :