মালয়েশিয়ায় রক্তচোষা জনশক্তি সিন্ডিকেটের কপালে চিন্তার ভাঁজ

মালয়েশিয়ায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে রক্তচোষা বলে পরিচিতি জনশক্তি ব্যবসায়িদের একাংশের।

সাধারণ নির্বাচনে পরাজিত মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের ঘনিষ্ঠ স্বজন ও মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের সাথে সখ্য এমন একটি সিন্ডিকেটের এখন মাথায় হাত।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ কড়া হুঁশিয়ারী দেবার পর এই সিন্ডিকেট সদস্যরা এখন গা বাঁচাতে তৎপর বলে জানাচ্ছে মালয়েশিয়ার স্থানীয় সূত্রগুলো।

এতদিন বিগত সরকারের ঘনিষ্টদের সাথে দুর্নীতি জড়িয়েই বাংলাদেশ থেকে চলছিলো ওই সিন্ডিকেটের জনশক্তি রপ্তানীর নামে নিরীহ শ্রমিকদের বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেবার প্রতিযোগিতা।

সূত্রমতে, আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক বলে পরিচিত দুন ডা: মাহাথিরের ক্ষমতা ত্যাগের পর থেকেই বিপর্যয় নেমে আসে বাংলাদেশী শ্রমিকদের।

সংঘবদ্ধ একটি চক্র দেশে ও প্রবাসে গড়ে তোলে শক্তিশালী সিন্ডিকেট। সাগর জঙ্গল পাড়ি দিয়ে অবৈধ পথে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক প্রেরণ আবার তাদের বৈধ করার নামে মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নেয়া ছিলো সাধারণ ঘটনা।

এর বাইরে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানীতে কয়েকগুণ বেশী টাকা গ্রহণ করে মূলত শ্রমিকদের সেখানে মর্যাদাহীন ক্রীতদাশের মতোই খাটানো হতো বলে অভিযোগ করেছেন বেশ কয়েকজন শ্রমিক। এ মাধ্যমেই দেশ থেকে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়েছে বিপুল অংকের অর্থ। রক্ত চোষার কারবারী হয়ে মোটা অংকের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে কেউ কেউ লাভ করেছেন দাতশ্রীর মতো সামাজিক মর্যাদা। সেই প্রভাব খাটিয়ে সরকারি সকল প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করেছেন। নিজেরাই শ্রমিক রপ্তানী করতে ঘাটে ঘাটে গড়ে তুলেছিলেন সিন্ডিকেট।

আর সেই সিন্ডিকেট প্রধান হিসেবেই প্রবাসীদের মুখে আলোচনায় আছেন এসপিপিএ নামের জনশক্তি রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠানের কর্নধার দাতুশ্রী আমিন।

প্রবাসীরা বলছেন, এই দাতুশ্রী আমিন বাংলাদেশের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাগরিক হলেও তিনি মালয়েশিয়া পাড়ি দিয়ে রক্তচোষা বাণিজ্যের আড়ালে রাতারাতি ফুঁলেফেপে ওঠেন। নিজেকে পরিণত করেন সিন্ডিকেট প্রধান হিসেবে।

সরকারি পর্যায়ে শ্রমিক পাঠানো আশার আলো ছড়ালেও সাবেক সরকারের সহযোগীদের সাথে তার কারসাজি সেই চেষ্টাকে ভণ্ডুল করে দেয়।

রক্তচোষাদের নিয়ে দেশে সমালোচনার মুখে প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টির প্রয়াসে বাংলাদেশ থেকে উদ্যোগ নেয়া হয়- সকল রিক্রুটিং এজেন্সী মালয়েশিয়ায় চাহিদা মোতাবেক জনশক্তি রপ্তানী করতে পারবে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের তরফেও অনুরোধ জানানো হয় মালয়েশিয়াকে।

তবে দাতুশ্রী আমিনের নেতৃত্বে সিন্ডিকেট বাংলাদেশ সরকারের এই অনুরোধকে উপেক্ষা করে সাবেক সরকারের সহযোগীদের নিয়ে মাত্র ১০টি রিক্রুটিং এজেন্টের সিন্ডিকেটকে অনুমোদন করিয়ে নেয়। এভাবে এক হাত থেকে নানা হাতে শ্রমিক বিক্রি হওয়ায় কমিশন বাবদ বেড়ে যায় অভিবাসী শ্রমিকদের খরচ।

স্থানীয় সূত্রমতে, মালয়েশিয়ায় মাই ইজি, কেরিকম, সিনারফ্যাক্স, এফসিএমডব্লিউ, এসপিপিএ নামের এসব জনশক্তি কারবারীদের আড়ালে উঠে আসছে প্রবাসী ওয়াহিদ, মুকুল, কামরুজ্জামান কামাল, শাহীন, ইঞ্জিনিয়ার বাদলুর রহমান, বাবুল, মালয়েশিয়া বিএনপির সেক্রেটারী মোশারফ আর দাতুশ্রী আমিনের নাম।

শ্রমিকদের জিম্মি করে রক্ত চোষার মাধ্যমে এরা মূলত দেশ থেকে টাকা পাচার করে মালয়েশিয়ায় গড়ে তুলেছেন বিপুল বিত্তবৈভব। দেশ থেকে কোন মন্ত্রী বা প্রভাবশালীরা সেখানে গেলে মূলত এই সিন্ডিকেটের তত্বাবধানে তাদের সময় কাটে বলে একাধিক সিন্ডিকেট সদস্য প্রকাশ্যেই বলে বেড়ান এ ধরনের তথ্য। এভাবে মালয়েশিয়ার সাবেক সরকারের দুর্নীতিবাজ সদস্যদের সহযোগী হিসেবে তারাও শিগগির আইনের আওতায় আসবে বলে ধারণা প্রবাসী শ্রমিকদের।

তাদের ভাষায়, সাবেক সরকারের প্রধানকে বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞা, তার স্বজনদের বাসা বাড়িতে তল্লাশী। এগুলোতো কেবল শুরু। কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেড়িয়ে আসবেই।

আর ক্ষমতার এই পালাবদল পরিস্থিতিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন সরকারের কড়া হুশিয়ারীতেই কপালে চিন্তার ভাজ পড়েছে সিন্ডিকেট সদস্যদের।

আন্তর্জাতিক এর আরও খবর