Barta24

মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯, ৩১ আষাঢ় ১৪২৬

English Version

সম্মানীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইসলামের শিক্ষা

সম্মানীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইসলামের শিক্ষা
সম্মানীদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইসলামের শিক্ষা, ছবি: সংগৃহীত
মুফতি মো. আবদুল্লাহ
অতিথি লেখক
ইসলাম


  • Font increase
  • Font Decrease

হজরত যায়েদ ইবন হাইয়্যান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি হুসাইন ইবন সাবুরা (রা.) ও উমর ইবন মুসলিম (রা.) একসঙ্গে হজরত ইবন আরকাম (রা.)-এর কাছে গেলাম। যখন আমরা তার কাছে বসে পড়লাম, তখন হজরত হুসাইন (রা.) তাকে বললেন, হে হুসাইন! আপনি অনেক কল্যাণকর বিষয়াদি দেখার সৌভাগ্য পেয়েছেন। হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাক্ষাৎ লাভে আপনি ধন্য হয়েছেন। মহানবী (সা.)-এর অনেক হাদিস আপনি শুনেছেন। তার সঙ্গে অনেক যুদ্ধে আপনি শরিক হয়েছেন। তার পেছনে আপনি বহু নামাজ পড়েছেন। হে জায়েদ! নিঃসন্দেহে আপনি অনেক বরকত-কল্যাণের অধিকারী হয়েছেন। আপনি আমাদের সেসব হাদিস শোনান, যা আপনি নবী করিম (সা.)-এর কাছ থেকে শুনেছেন। হজরত জায়েদ (রা.) জবাবে বললেন, হে ভাতিজা! আমার বয়স অনেক হয়েছে। দীর্ঘ দিন অতিবাহিত হয়েছে। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছ থেকে শুনে যা মুখস্থ করেছিলাম তার কোনো কোনো কথা, ভুলে গেছি। তাই যা কিছু তোমাদের বয়ান করব, তা মেনে নেবে; আর যা বলব না, তেমন কিছু বলতে আমাকে বাধ্য করবে না। তার পর তিনি বললেন, এক দিন হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের উদ্দেশে ভাষণদানের লক্ষ্যে ওই পানির তীরে দাঁড়ালেন, যেটিকে ‘খুম’ বলা হয় এবং তা মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। নবী করিম (সা.) আল্লাহতায়ালার হামদ ও সানা পাঠ করলেন এবং ওয়াজ-উপদেশ প্রদান করলেন। তার পর ইরশাদ করলেন- হামদ ও সানার পর, ‘হে লোকসকল! আমি একজন মানুষ। অতিসত্বর আমার প্রভুর বাহক আমাকে নিয়ে যেতে আসবে এবং আমি তার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যাবো। আমি তোমাদের কাছে দু’টো মূল্যবান জিনিস রেখে যাচ্ছি। যার মধ্যে প্রথম বস্তুটি হলো- আল্লাহর কিতাব (কোরআন), যাতে রয়েছে হেদায়েত ও আলো। তোমরা আল্লাহর এ কিতাব গ্রহণ করো এবং তা শক্তভাবে ধরে রাখবে।’ এমনিভাবে নবী করিম (সা.) আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী আমল করার জন্য উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করলেন। অতঃপর বললেন, ‘দ্বিতীয় বস্তুটি হলো- আমার পরিবার-পরিজন। আমি তোমাদেরকে আমার ‘আহলে বায়ত’ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালাকে স্মরণ রাখতে নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছি।’

তা শুনে হজরত হুসাইন (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, হে জায়েদ! নবী করিম (সা.)-এর ‘আহলে বায়ত’ কারা? তার পবিত্র বিবিগণ কি ‘আহলে বায়ত’-এর অন্তর্ভুক্ত নন? হজরত জায়েদ (রা.) বললেন, নবী (সা.)-এর স্ত্রীরা তো আহলে বায়তের অন্তর্ভুক্ত আছেনই। তা ছাড়াও নবী (সা.)-এর আহলে বায়তের মাঝে সেসব লোকজনও অন্তর্ভুক্ত যাদের ক্ষেত্রে ‘সাদাকা’র সম্পদ হারাম করা হয়েছে। হজরত হুসাইন (রা.) প্রশ্ন করলেন, তারা কারা? তিনি বললেন, হজরত আলী (রা.), হজরত আকিল (রা.), হজরত জাফর (রা.), হজরত আব্বাস (রা.) ও এদের বংশধরেরা। হজরত হুসাইন (রা.) প্রশ্ন করলেন, এদের সবার জন্য সাদাকার মাল হারাম করে দেওয়া হয়েছে? হজরত জায়েদ (রা.) বললেন, হ্যাঁ।’ –সহিহ মুসলিম শরিফ: ৫/৯৫

মুমিন জননী হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসূলে আকরাম (সা.) নিজ সাহাবাদের মাঝে উপবিষ্ট ছিলেন। তার পাশে হজরত আবু বকর (রা.) ও হজরত উমর (রা.) বসা ছিলেন। সম্মুখপানে হজরত আব্বাসকে (রা.) আসতে দেখা গেল। তার জন্য হজরত আবু বকর (রা.) বসার স্থান করে দিলেন। তিনি হজরত আবু বকর ও হজরত নবী করিম (সা.)-এর মাঝখানে বসে গেলেন। তাতে নবী করিম (সা.) বললেন, ‘মর্যাদাশালীদের মর্যাদা মর্যাদাসম্পন্নরাই ভালো জানেন।’ তার পর নবী করিম (সা.) হজরত আব্বাস (রা.)-এর প্রতি মুখ ফিরিয়ে তার সঙ্গে কথাবার্তা বলতে লাগলেন। এ সময় প্রিয় নবী (সা.) স্বীয় বাক্যালাপের শব্দ অনেক নিচু করে দিলেন। তখন হজরত আবু বকর (রা.) হজরত উমরকে (রা.) বললেন, হুজুর (সা.)-এর কি কোনো কষ্ট হয়ে গেছে কি না? যে কারণে আমার মনে সংশয় জাগছে! হজরত আব্বাস (রা.) নবী করিম (সা.)-এর কাছে সেভাবেই বসা রয়েছেন। নবী করিম (সা.) যখন তার প্রয়োজন মিটিয়ে দিলেন; তিনি চলে গেলেন। তখন হজরত আবু বকর (রা.) নিবেদন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.)! আপনার এখন কি কোনো কষ্ট হয়েছিল? নবী করিম (সা.) বললেন, না। হজরত আবু বকর (রা.) বললেন, আমি লক্ষ করলাম, আপনার কথার স্বর একেবারে ক্ষীণ হয়ে পড়েছিল। নবী করিম (সা.) ইরশাদ করলেন, ‘হজরত জিবরাইল (আ.) আমাকে নির্দেশ দিলেন, যখন হজরত আব্বাস (রা.) আসবেন, আমি যেন অনেক নিচু স্বরে কথা বলি।’ যেমনটি আমি তোমাদের নির্দেশ দিয়ে থাকি যে, তোমরা আমার কাছে বা সামনে তোমাদের কথা নিচু স্বরে বলবে। -ইবনে আসাকির সূত্রে: কানয- ৭/৬৮

ইবনে শিহাব বর্ণনা করেন, হজরত আবু বকর (রা.) ও হজরত উমর (রা.) নিজ নিজ খেলাফতকালে যখনই হজরত আব্বাস (রা.)-এর সাক্ষাৎ পেতেন আর তারা বাহনে আরোহিত অবস্থায় থাকতেন, তাৎক্ষণিক তারা হজরত আব্বাস (রা.)-এর সম্মানে বাহন থেকে নেমে যেতেন এবং বাহনের জন্তুগুলোর লাগাম হাতে ধরে রেখে তার সঙ্গে হাঁটতে থাকতেন। যখন হজরত আব্বাস (রা.) নিজ বাড়ি কিংবা গন্তব্য স্থানে পৌঁছে যেতেন, তখন তারা তার থেকে পৃথক হতেন।’ -প্রাগুক্ত: ২৯

হজরত আনাস (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) মসজিদে বসা ছিলেন এবং সাহাবাগণ চার দিকে তাকে ঘিরে বসে অবস্থান করছিলেন। এমতাবস্থায় সামনের দিক থেকে হজরত আলী (রা.) এসে পৌঁছালেন এবং সামনে দাঁড়িয়ে মজলিসে বসার স্থান লক্ষ করছিলেন। নবী করিম (সা.) নিজ সাহাবাদের প্রতি তাকাচ্ছিলেন, তাদের কেউ তাকে বসার স্থান করে দিচ্ছেন কি না? হজরত আবু বকর (রা.) নবী করিম (সা.)-এর ডানে বসা ছিলেন। তিনি নিজ স্থান থেকে কিছুটা সরে গিয়ে বললেন, হে আবুল হাসান! আপনি এখানে এসে বসে পড়ুন। আর এভাবেই হজরত আলী (রা.) এসে নবী করিম (সা.) ও হজরত আবু বকর (রা.)-এর মাঝামাঝি বসে পড়লেন। তখন আমরা দেখতে পেলাম, নবী করিম (সা.)-এর চেহারা মোবারকে অত্যন্ত খুশির ছাপ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এর পর নবী করিম (সা.) হজরত আবু বকর (রা.)-এর প্রতি তাকিয়ে ইরশাদ করলেন, ‘হে আবু বকর! ‘সম্মানী লোকের কাছ থেকেই সম্মানজনক ব্যবহার প্রকাশ পায়।’ –আল বিদায়া: ৭/৩৫৮

লেখক: মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

আপনার মতামত লিখুন :

একাধিক জানাজা ও লাশ দাফনে বিলম্ব প্রসঙ্গে ইসলাম

একাধিক জানাজা ও লাশ দাফনে বিলম্ব প্রসঙ্গে ইসলাম
বায়তুল মোকাররম মসজিদে জানাজার নামাজের দৃশ্য, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

আমাদের দেশে বিখ্যাত কেউ মারা গেলে তার একাধিক জানাজার নামাজ পড়া হয়। অনেকক্ষেত্রে জানাজার নামাজের সংখ্যাকে গুরুত্ব দিতে যেয়ে মরদেহ দু’তিন পর দাফন করার ঘটনাও ঘটে। অথচ ইসলামে এসব কাজের অনুমতি নেই।

বর্ণিত বিষয়ে ইসলামি শরিয়তের নির্দেশনা হলো- কেউ মারা গেল বিলম্ব না করে মৃতদেহের গোসল দেবে, কাফন পরাবে। অতপর জানাজার নামাজ পড়ে দ্রুত দাফন করে দেবে। একাধিক হাদিসে মৃত্যুর পর থেকে দাফন পর্যন্ত সব কাজ দ্রুত করার কথা বলা হয়েছে এবং বিলম্ব করতে নিষেধ করা হয়েছে।

সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে, ‘হজরত তালহা ইবনে বারা (রা.) অসুস্থ হলে হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে গেলেন। অতপর বললেন, আমি তালহার মধ্যে মৃত্যুর আলামত দেখতে পাচ্ছি। অতএব (সে মারা গেলে) এ সম্পর্কে আমাকে অবহিত করবে। আর তোমরা দ্রুত কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করবে। কেননা কোনো মুসলমানের মৃতদেহকে পরিবারস্থ লোকদের মাঝে আটকে রাখা উচিত নয়।’ -হাদিস: ৩১৫৯

অন্য বর্ণনায় এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন, আমি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) কে বলতে শুনেছি যে, তোমাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তোমরা তাকে আটকে রেখো না। তাকে দ্রুত দাফন করে দিও।’ তাবারানি: ১৩৬১৩

সহিহ বোখারির এক হাদিসে জানাজার নামাজের পর লাশ দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও বিলম্ব না করার নির্দেশ এসেছে।

বর্ণিত হাদিসের আলোকে বলা যায়, মৃত্যুর পর বিলম্ব না করে কাফন, জানাজা দ্রুত সম্পন্ন করে তাড়াতাড়ি দাফন করে দেবে।

এ কারণে ইসলামি স্কলাররা বলেন, মৃতের গোসল, কাফন-দাফন ও জানাজা সংক্রান্ত যাবতীয় কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা উত্তম এবং বিনা কারণে বিলম্ব করা মাকরূহ।

তাই স্বাভাবিক সময়ের ভেতরে মৃতের জানাজা-দাফনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গেলে মৃতের অভিভাবক উপস্থিত লোকদের নিয়ে জানাজা পড়ে দ্রুত দাফন করে দেবে। এ সময়ের মধ্যে কোনো আত্মীয়-স্বজন বা বিশেষ কোনো ব্যক্তির উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হলে তার জন্য বিলম্ব করা সমীচীন নয়।

অবশ্য মৃতের অভিভাবক নিজেই যদি দূরে অবস্থান করার কারণে স্বাভাবিক সময়ের মধ্যে তার উপস্থিত হওয়া সম্ভব না হয়, সেক্ষেত্রে করণীয় হলো- তার অপেক্ষা করতে না বলে দ্রুত দাফন করে দিতে বলা।

কিন্তু অভিভাবক যদি তার জন্য অপেক্ষা করতে বলে তাহলে তার জন্য বিলম্ব করার অবকাশ রয়েছে। অবশ্য এক্ষেত্রেও এ পরিমাণ বিলম্ব করার অবকাশ নেই, যার কারণে লাশের মধ্যে পরিবর্তন হওয়ার আশংকা হয়। এত অধিক সময় বিলম্ব করা জায়েজ নয়।

আর দাফনে দীর্ঘ বিলম্বের উদ্দেশ্যে লাশের পরিবর্তন ও বিকৃতিরোধে লাশকে হিমাগারে রাখা কিংবা ঔষধ দিয়ে রাখা জায়েয নয়। বরং লাশের স্বাভাবিক অবস্থা পরিবর্তন হওয়ার পূর্বে দাফন করে দেওয়া জরুরি। এর অধিক বিলম্ব করা গোনাহ।

ইসলামি স্কলারদের অভিমত হরো- মৃতদেহকে হিমাগারে রাখা কিংবা মেডিসিন ইত্যাদি দিয়ে রাখা সম্মানপরিপন্থী ও কষ্টদায়ক। অথচ মৃত ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা জরুরি। হাদিসে আছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, কোনো মুমিন ব্যক্তিকে তার মৃত্যুর পর কষ্ট দেওয়া তেমনই যেমন জীবিত অবস্থায় তাকে কষ্ট দেওয়া। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা: ১১৯৯০
https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Jul/15/1563205495520.jpg

এ সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে হাজার (রহ.) বলেছেন, জীবিত ব্যক্তি যে সব বস্তু দ্বারা আরামবোধ করে মৃত ব্যক্তি তা দ্বারা আরামবোধ করে। ইবনুল মালেক (রহ.) বলেছেন, মৃত ব্যক্তি কষ্টদায়ক বস্তু দ্বারা কষ্ট পায়। -মিরকাতুল মাফাতিহ: ৪/১৭০

তাই মৃতকে হিমাগারে রাখা মূলত তাকে কষ্ট দেওয়ারই নামান্তর। এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকা অপরিহার্য।

অনুরূপ লাশ জানাজা ও দাফনের জন্য প্রস্তুত হওয়ার পর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রথা পালনের জন্য স্থানে স্থানে প্রদর্শন করা, পুষ্পস্তবক অর্পণ করা, ভিডিও করা, শোকের আবহে করুণ সুর বাজানো, লাশকে সামনে রেখে দীর্ঘ সময় ধরে জীবনালোচনা করা গর্হিত কাজ। এগুলোর মধ্যে জীবিত মৃত কারোরই কোনো কল্যাণ নেই।

জানাজার নামাজ একটি ফরজ ইবাদত। নবী করিম (সা.) আদেশ করেছেন, ‘তোমরা সবার জানাজার নামাজ আদায় করো। মৃত ব্যক্তি ভালো হোক আর মন্দ হোক।’

নবী করিম (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন, ‘একজন মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের পাঁচটি অধিকার রয়েছে। ওই সব অধিকারের পঞ্চমটি হলো- সে মারা গেলে তার জানাজার নামাজ আদায় করা।’

যেহেতু পৃথিবীর সব মুসলমানের জন্য প্রত্যেক মৃত মুসলিমের জানাজার নামাজ আদায় করা সম্ভব নয়, সেহেতু এটা ফরজে কিফায়া। অর্থাৎ কিছু মানুষ আদায় করলে সবার ওপর থেকে ফরজ আদায় হয়ে যাবে। আর এ কথা আমরা সবাই জানি যে, কোনো নির্দিষ্ট ফরজ আমল একাধিকবার করা যায় না। নফল বারবার করা যায়।

আর মৃতের একাধিক জানাজা পড়া জায়েজ নয়। মৃতের অভিভাবক কিংবা তার অনুমতি সাপেক্ষে জানাজার নামাজ আদায় হয়ে যাওয়ার পর দ্বিতীয়বার ওই মৃতের জানাজা পড়ার অবকাশ নেই। সাহাবারা কোনো মৃতের একাধিক জানাজা পড়া থেকে বিরত থাকতেন।

ইসলামি স্কলারহণ, জুমার দিনের শুরুতে জানাজা প্রস্তুত হয়ে যাওয়ার পর শুধু অধিক সংখ্যক মুসল্লি নিয়ে জানাজা পড়ার উদ্দেশ্যে জুমা পর্যন্ত বিলম্ব করাকেও মাকরূহ বলেছেন।

ইসলামি শরিয়ত মৃতের অভিভাবককে নামাজে জানাজার অগ্রাধিকার প্রদান করেছে, সেহেতু তার অসম্মতিতে কিংবা তার অগোচরে নামাজে জানাজা পড়া হলে শরিয়ত প্রদত্ত অভিভাবকের এ অগ্রাধিকার ক্ষুন্ন হয়। সেক্ষেত্রে অভিভাবকের অধিকার অক্ষুন্ন রাখার জন্য ইসলাম অভিভাবককে বিশেষ অনুমতি প্রদান করেছে, সে পুনরায় নতুন কিছু মানুষ নিয়ে নামাজে জানাজা আদায় করতে পারবে।

ইসলাম মতে মৃতের অভিভাবকের সম্মতিতে নামাজে জানাজা মাত্র একবার হবে। যারা কোনো কারণে নামাজে জানাজার জামাতে অংশ নিতে পারবে না- তারা মৃতের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করবে।

উল্লেখ্য, মৃতের জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে পারাটাই জীবিতদের একমাত্র কর্তব্য নয়। বরং দাফনের পরও মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতদের অনেক করণীয় রয়েছে। যেমন, মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাতের দোয়া করা, কবর জিয়ারত করা ও শরিয়ত মোতাবেক ইসালে সওয়াব করা ইত্যাদি।

ইসলামি শরিয়তের নির্দেশনা হলো- কোনো ব্যক্তি যে এলাকায় মারা যাবে তাকে সেখানের কবরস্থানে বা নিকটের কোনো কবরস্থানে দাফন করে দেবে। প্রয়োজন ব্যতিত দূরবর্তী এলাকায় লাশ নিয়ে দাফন করা অনুত্তম।

পশু মোটাতাজাকরণে ইসলামের নির্দেশনা

পশু মোটাতাজাকরণে ইসলামের নির্দেশনা
গরুর খামার, ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে কোরবানির পশু মোটাতাজা করার প্রক্রিয়া। অনেকে প্রাকৃতিকভাবে পশু মোটাতাজাকরণের পদ্ধতি অনুসরণ করলেও অসাধু কিছু খামারি নিষিদ্ধ ডাইক্লোফেন ও স্টেরয়েড হরমোন প্রয়োগ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব পশুর গোশত মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একশ্রেণির লোভী মানুষের কাছে জনস্বাস্থ্য কীভাবে জিম্মি হয়ে পড়ছে পশু মোটাজাতাকরণে ক্ষতিকর হরমোনের ব্যবহার তারই প্রমাণ।

চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, স্টেরয়েড দ্বারা মোটাতাজাকৃত পশুর গোশত খেলে উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও ধমনি বিকল হয়ে হৃদরোগ এমনকি ব্রেনস্ট্রোকও হতে পারে। এ ধরনের পশুর গোশত খেলে কিডনি ও লিভার বিকলসহ পঙ্গুত্বের আশঙ্কাও থাকে।

এমনিতে জনমনে ভুল ধারণা রয়েছে, কোরবানির গোশত বেশি খেলে তাতে কোনো ক্ষতি হয় না। এ ভুল ধারণার কারণে কোরবানির ঈদের সময় হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা বাড়ে।

কোরবানির পশু বিশেষ করে গরু কেনার সময় ক্রেতারা সতর্ক থাকলে অবশ্য এ বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। প্রাকৃতিকভাবে মোটাতাজা গরুর পাঁজরের হাড় দেখা যায় এবং দুই হাড়ের মধ্যে একটা ঢেউয়ের ভাব থাকে। কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা গরুর মাংসল স্থানে আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিলে অনেক দেবে যায় যা স্বাভাবিক গরুর ক্ষেত্রে হয় না।

উচ্চ আদালত হরমোন প্রয়োগে গরু মোটাতাজাকরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব যাদের তাদের অবহেলায় অবৈধভাবে পশু মোটাতাজাকরণ বন্ধ হয়নি।

আমরা আশা করব, জনস্বার্থে এ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে প্রশাসন সবকিছুই করবে এবং এটিকে তাদের নৈতিক কর্তব্য হিসেবে ভাববে।

দেখুন, কোরবানি শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো- কোনো কিছু উৎসর্গ করা কিংবা বিসর্জন দেওয়া। যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা যায়। আল্লাহতায়ালার ক্ষমা লাভের উদ্দেশ্যে মানুষ কোরবানি করে। কোরবানি একটি পবিত্র ও কল্যাণময় ইবাদত। এটি আদায় করা ওয়াজিব।

কোরবানির পশুর রক্ত-গোশত কোনোটিই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না। আল্লাহর কাছে বান্দার তাকওয়া (মনের কথা, ইচ্ছা) পৌঁছে। আল্লাহতায়ালা প্রত্যেকটি ইবাদত আদায়ের ক্ষেত্রে বান্দার তাকওয়া দেখে থাকেন। কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে তাদের রক্ত কিংবা গোশত কিছুই পৌঁছে না; বরং তার কাছে তোমাদের তাকওয়া পৌঁছে।’ -সূরা হজ: ৩৭

এমতাবস্থায় কোরবানির সময় জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিতায়ক পশু বাজারজাত করা নিশ্চয়ই অমানবিক বিষয়। সেই সঙ্গে কোরবানির পশুকে নানাভাবে কষ্ট দেওয়াও অনুচিত। আমরা আশা করবো, খামারিরা বিষয়টি আন্তরিকতার সঙ্গে ভেবে দেখে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন।

কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘মানুষের মধ্যে কিছু (লোক) আছে যারা বলে, আমরা আল্লাহতায়ালা ও আখেরাতের ওপর ঈমান এনেছি, কিন্তু তারা মুমিন নয়। তারা আল্লাহতায়ালা ও তার বান্দাদের সঙ্গে প্রতারণা করে যাচ্ছে, যদিও তাদের অন্য কাউকে নয়, নিজেদেরই ধোঁকা দিয়ে যাচ্ছে, যদিও তাদের কোনো প্রকারের চৈতন্য নেই।’ -সূরা বাকারা: ৮-৯

যারা কৃত্রিম উপায়ে কোরবানির পশু মোটাতাজা করে, তারা সবাই কিয়ামতের মাঠে ধোঁকাদানকারী অর্থাৎ শয়তানের দলভুক্ত হিসেবে চিহ্নিত হবে। যে ব্যক্তি অপর একজনকে ধোঁকা দিলো সে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করল। শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণকারীদের জন্য আল্লাহ কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন।

কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘সে তাদের প্রতিশ্রুতি দেয়, তাদের মিথ্যা বাসনার সৃষ্টি করে, আর শয়তান যা প্রতিশ্রুতি দেয় তা প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়। এরাই হচ্ছে সেসব ব্যক্তি; যাদের আবাস্থল হচ্ছে দোজখ, যার থেকে মুক্তির কোনো পন্থাই তারা পাবে না।’ -সূরা আন নিসা: ১২০-১২১

কোরবানির পশু মোটাতাজা করার ক্ষেত্রে পশুর প্রতি অবশ্যই সদাচারণ করতে হবে। পশুর যেন কোনোরূপ কষ্ট না হয় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, সমগ্র সৃষ্টিই আল্লাহতায়ালার পরিবার সদৃশ; সুতরাং সৃষ্টির মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক প্রিয়, যে আল্লাহর পরিবারের সঙ্গে সদাচরণ প্রদর্শন করে।’ -মেশকাত: ৪৭৮১

হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা পশুর মুখমণ্ডলে আঘাত করো না এবং পশুর গায়ে দাগ দিও না।’ - মেশকাত: ৩৯০০

কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘জমিনের বুকে বিচরণশীল যেকোনো জন্তু কিংবা বাতাসের বুকে নিজ ডানা দু’টি দিয়ে উড়ে চলা যে কোনো পাখিই- এগুলো তোমাদের মতোই।’ -সূরা আনআম: ৩৮

সুতরাং যারা কোরবানির পশু লালন-পালন করে থাকেন এবং যারা কোরবানি আদায় করবেন উভয়কেই কোরবানির পশুর প্রতি সদাচারণ করতে হবে। এর অন্যথ্যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র