Alexa

নবীর শহর মদিনায় যেভাবে পালিত হয় রমজান

নবীর শহর মদিনায় যেভাবে পালিত হয় রমজান

মসজিদে নববীতে ইফতারের দৃশ্য, ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ থেকে কিছুটা ভিন্ন নবীর শহর বলে পরিচিত মদিনা মোনাওয়ারার রমজান চিত্র। এখানকার খাওয়া-দাওয়া ইবাদত-বন্দেগি, বাচ্চাদের ছোটাছুটি, খেলাধুলা, ইফতার ও সেহেরির আয়োজন- সব মিলিয়ে খুব মনোরম এক পরিবেশ সৃষ্টি হয় রমজান মাসে। এ পরিবেশ অন্য মাসগুলো থেকে একেবারেই ভিন্ন। আলাদা ঘ্রাণ অনুভূত হয়, যেন দয়াময় আল্লাহ তার রহমত দিয়ে ঢেকে নিয়েছেন এই শহরকে।

মদিনায় শাবান মাস থেকেই শুরু হয় রমজানের প্রস্তুতি। তখন থেকেই সবাই যেন মনে এটা লিখে নেন, আগত মাস উত্তম আখলাকের মাস। সবাইকে সাহায্য করার মাস। সবাইকে নিজের করে নেওয়ার মাস, সবার সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার মাস।

রমজানে শহর সাজানো হয় লাইট এবং লাল নীল প্রিন্টের কাপড় দিয়ে। উঁচু উঁচু বিল্ডিং, শপিংমল এবং রাস্তার দু’ধারের সড়কবাতির খুঁটিগুলোতে লাগানো ছোটছোট লাইট। হোটেলের দরজা, টেবিলের দস্তরখান ও ঘরবাড়ির দেয়াল থেকে শুরু করে বিভিন্নস্থানে লাল নীল কাপড় লাগিয়ে সাজিয়ে তোলা হয় শহরকে।

ধনাঢ্য আরব পরিবারগুলো তাদের পরিচিত অসহায় পরিবারগুলোর প্রতি বিশেষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। অনেকে তো ঘরের ভাঙা ফার্নিচার বদলানো থেকে শুরু করে চাল ডাল তেল সব কিনে দেন। নিজেরাও নতুন প্লেট, বাটি, চামচ, গ্লাস, জগ কেনেন। পাড়া-পড়শীদের ইফতার ও সেহেরি দেওয়ার রেওয়াজ তো অনেক পুরোনো। এটা তাদের হররোজকার আমল।

রমজানে সুপারমার্কেটগুলোয় দেওয়া হয় নানা অফার। অন্যমাসে যে খাবারের দাম থাকে ১০ রিয়াল তা রমজান উপলক্ষে হয় ১ রিয়াল। খাবার থেকে শুরু করে সব কিছুরই দাম একদম কমে যায়।
মসজিদে নববীতে ইফতারের দৃশ্য

বিভিন্ন প্রকারের পানীয়, দই, জুস, ফল, খেজুর ও কেক ইত্যাদি দিয়ে ইফতারের প্যাকেট বানিয়ে ধনীরা পথে-ঘাটে মসজিদে বিতরণ করেন। এ ছাড়া পথে পথে, বিভিন্ন অলিগলিতে পেতে দেওয়া হয় টেবিল। ওই সব টেবিলে এলাকার বাচ্চারা এরাবিয়ান স্পেশাল ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, মান্তু ও বালিলা (চটপটির মতো) নিয়ে বসে থাকে রোজাদারদের আপ্যায়নের জন্য।

রমজানে প্রায় ঘরেই এ্যারাবিয়ান স্পেশাল সুরবা (স্যুপ) রান্না করা হয়। ওটস ও তাজা খাসির গোস্ত দিয়ে খুব ঘন করে রান্না হয়। এটা সারাদিন না খেয়ে থাকার ঘাটতি পূরণ করে খুব সহজে। রমজানে সুরবা হলো- আরবদের মূল খাবার। আমাদের দেশে যেমন বুটমুড়ি। সুরবা ছাড়া আরবদের ইফতার অনেকটাই অসম্পূর্ণ থাকে।

মাগরিবের এক ঘন্টা আগে থেকেই শুরু হয় বাসায় বাসায় ইফতারি দেওয়া। প্রতিবেশীর ঘরে পাঠানো ইফতারের তালিকায় থাকে সুরবা, গাহওয়া, খেজুর, সমুচা, জেলি, ক্যারোমিল ও পাস্তা ইত্যাদি। অবস্থাটা এমন কেউ যদি ঘরে ইফতার নাও বানায়, তাহলেও তার দস্তরখানা ভরে যায় নানান পদের খাবারে।

আরবরা কখনও একা ইফতার বা সেহেরি করেন না। এখানকার বয়স্ক নারীরা রমজান আসার আগে পাড়ার দু’তিন জনকে বলে রাখেন একসঙ্গে ইফতার বানানোর জন্য। রমজানে তারা একসঙ্গে ইফতার বানায় এবং আশেপাশে ১০/১৫ ঘর, দোকানপাট যা আছে সবখানে ইফতার পাঠান। আজানের আগে আগে ইফতার নিয়ে ছোট বাচ্চাদের এ বাড়ি-ও বাড়ি ছুটোছুটি করার দৃশ্য বড়ই চক্ষুশীতলকারী। বিশ্বের আর কোনো দেশে এমন দৃশ্য দেখা যায় কিনা জানি না।

মদিনায় ইফতারের প্রধান খাবার হচ্ছে- সুরবা, সমুচা ও পাস্তা। প্রধান পানীয় হচ্ছে ভিমটু (রূহআফজা) ও ট্যাং। আর ইফতার থেকে সেহেরি পর্যন্ত কিছুক্ষণ পরপর খাওয়া হয় গাহওয়া ও খেজুর। গাহওয়া হচ্ছে- খুবই তিতা কিন্তু খুবই উপকারী একটা কফি।
মসজিদে নববীতে ইফতারের দৃশ্য

মাগরিবের আজানের সঙ্গে সঙ্গে সামান্য কিছু খাবার খেয়ে নামাজ আদায় করেন। এরপর শুরু হয় খাবারের মূলপর্ব। এই হলো- ঘর-বাড়ির ইফতার। এবার মসজিদের ইফতার আয়োজনের কথা বলা যাক। মসজিদে নববীতে ইফতারে অন্য রকম আয়োজন করা হয়। মসজিদের ভেতরে এক রকম আর বাইরে আরেক রকম।

মসজিদের ভেতরে প্রতি কাতারে লম্বা দস্তরখানা বিছানো হয়। প্রতিজনকে এক কাপ দই, একবাটি খেজুর, বাদাম, জমজম পানি, রুটি, গাহওয়া ও একটা বিশেষ এক প্রকারের মশলা দেওয়া হয়। যার আরবি নাম দুজ্ঞা। অনেকটা আমাদের দেশের চটপটির মশলার মতো।

আর মসজিদের বাইরের আয়োজন তো বিশাল কারবার। সেখানে থাকে কাবসা, বিরিয়ানি, চিকেনফ্রাই, পরোটা, বিভিন্ন প্রকারের ফল, খেজুর ও জমজম। এক কথায় কোনো খাবারের অভাব নেই। লম্বা লম্বা দস্তরখানা বিছানো হয়। নামকরা রেস্টুরেন্টগুলো থেকে গাড়ি ভর্তি খাবার আসে। এসব খাবার দস্তরখানায় সাজিয়ে মানুষদের জোর করে এনে বসায়। আর হাসিমুখে বলে, আজ আমাদের সঙ্গে ইফতার করুন।

যে খাবারটা অর্ডার করতে ১ ঘন্টা সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকবেন বছরের অন্য মাসে। ঠিক ওই খাবারটা খাওয়ানোর জন্য আপনাকে জোর করা হবে রমজান মাসে।

ইকামত হওয়ামাত্র পুরো মাঠ পরিষ্কার হয়ে যায়। আজান থেকে ইকামত- এটুকু সময় থাকে খাবারের। মানুষজন নামাজে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ক্লিনাররা দস্তরখানা পরিষ্কার করে দিয়ে যান। এই হলো মসজিদে নববীর ইফতার আয়োজন।

মসজিদে নববীর ইফতারের বিশাল আয়োজনের মতো না হলেও মদিনার অন্য মসজিদগুলোর ইফতার আয়োজনও একেবারে ছোট নয়। মসজিদ কর্তৃপক্ষ ইফতারের আয়োজন করেন। মসজিদের বাইরে বিরাট ডেকচি খাসি দিয়ে রান্না করা এরাবিয়ান বিরিয়ানি, রোজ বোখারি ও কাবসা বিতরণ করা হয়। মসজিদের ভেতরে ও বাইরে ইফতারের জন্য দস্তরখান বিছানো হয়। অনেকে পেটপুরে খেয়ে বাসায়ও খাবার নিয়ে যান।

মদিনায় যারাই ইফতারের আয়োজন করেন না কেন, পথে-ঘাটে থাকা মানুষদের কথা ভুলেন না। তাই ছোট ছোট প্যাকেট সাজান ইফতারের। তাতে দই, রুটি, খেজুর ও জুস থাকে। কোনো প্যাকেটে থাকে বিরিয়ানি। সিগন্যালে গাড়ি থামলে যাত্রীদের হাতে হাতে তুলে দেওয়া হয় সেই প্যাকেট। ঘরে-বাইরে কোনো একটা মানুষও যেনে অনাহারে না থাকেন- এটা সবাই চিন্তা করেন।
মসজিদে নববীতে ইফতারের দৃশ্য

ইফতার শেষে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করেন তারাবির নামাজে অংশ নিতে। ইফতারের পর পরই মসজিদে নববীর ভেতর কানায় পূর্ণ হয়ে মাঠও ভরে যায়। মসজিদে নববী ছাড়া আরও বেশ কিছু বড় মসজিদে তারাবির নামাজ হয়। শেষ দশ দিন মসজিদগুলো উপচেপড়ে মুসল্লি দ্বারা। তখন রাস্তাঘাটে কার্পেট বিছিয়ে নামাজের ব্যবস্থা করা হয়। প্রায় সব মসজিদেই মহিলাদের জন্য আলাদা জায়গা থাকে।

মদিনায় খুব ধীরস্থিরভাবে তারাবির নামাজ হয়। অনেক সময় দেখা যায়, ২০ রাকাত নামাজ পড়তে ২ ঘন্টার বেশি সময় লাগে। তারাবি শেষে ক্লান্ত মহিলারা বাসায় ফেরেন, পুরুষরা চলে যান কর্মস্থলে। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খেলাধুলায় মেতে উঠেন রাস্তায়। এভাবে চলে সেহেরি পর্যন্ত।

মদিনায় ইফতারের যেমন আয়োজন হয়, সেহেরির সময়েও তেমন আয়োজন হয়। সেহেরিও আদান-প্রদান হয় ঘরে ঘরে। সেহেরিতে কাবসা, রোজ বুখারি থাকে। মসজিদের খাবার দেওয়া হয়। ইতেকাফকারী থেকে শুরু করে, ওমরা করতে যাওয়া ভিনদেশি ও স্থানীয় সবাই যেখানেই থাকেন না কেন, খাবার তার জন্য আশেপাশেই থাকে।

সেহেরি রান্না হয় ইফতারের সময়। তাই তারাবির পর নারীরা বেশ লম্বা সময় পান। তখন তারা কোরআন তেলাওয়াত, জিকির-আজকারসহ বিভিন্ন নফল ইবাদতে মশগুল থাকেন। ফজরের পর এলাকার কোরআন শিক্ষাকেন্দ্রগুলোতে সবাই এসে জমা হন। সেখানে উস্তাদের সঙ্গে কোরআন দেখে দেখে তেলাওয়াত করেন। প্রতিদিন আড়াই থেকে তিন ঘন্টা সময় নিয়ে দেড় পারা করে তেলাওয়াত করা হয়। এরপর সবাই যার যার ঘরে ফিরে ঘুম দেন। ঘুম থেকে উঠে আবার কোরআন তেলাওয়াত করেন। আসরের আগ পর্যন্ত কেউ ঘর থেকে নামাজ ছাড়া বের হন না। কারও সঙ্গে কথা বলেন, কোনো কাজও করেন না। আসরের পরেই শুরু হয় ইফতারের আয়োজন।

রমজানের শেষ দশ দিনের চিত্র আরও ভিন্ন। তখন নারীরা তারাবি পড়ে আর ঘরে ফেরেন না। তারা একসঙ্গে তাহাজ্জুদ শেষে ঘরে ফেরেন।

ঈদের ২-৩ দিন আগে ধনীরা দরিদ্র পরিবারের বাচ্চা থেকে শুরু করে সবাইকেই ঈদের নতুন কাপড় উপহার দেন। এই হলো নবীর শহর মদিনার রমজানচিত্র।

আপনার মতামত লিখুন :