Barta24

রোববার, ১৮ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬

English

হজ: বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের প্রতীক

হজ: বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের প্রতীক
আরাফাত ময়দান, ছবি, সংগৃহীত
ড. মাহফুজ পারভেজ
কন্ট্রিবিউটিং এডিটর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম


  • Font increase
  • Font Decrease

‘আল্লাহ, আমি উপস্থিত হয়েছি’, এই বাণীতে উচ্চকিত হয়ে শ্বেতশুভ্র  ইহরাম পরিহিত লক্ষ লক্ষ হাজি সাহেব সম্মিলিত হয়েছেন 'বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের প্রতীক' হজের আনুষ্ঠানিকতায়। মিনা, আরাফাত, মুজদালিফার প্রান্তরে অবস্থান শেষে পবিত্র মক্কায় কাবা গৃহে তাওয়াব করে তারা সম্পন্ন করবেন হজের কার্যক্রম।

হজের মিলনমেলায় সাদা, কালো, ধনী, দরিদ্র, নারী, পুরুষ নির্বিশেষে সকল মুসলিম শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করার মাধ্যমে পথভ্রষ্টতা ও শয়তানির প্রতি ঘৃণা ও প্রতিবাদ জানাবেন। পশু কোরবানি করে মহান আল্লাহর প্রতি প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করবেন। যে মুসলমানগণ হজে গমন করেন নি, তারাও ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী পশু কোরবানি করবেন।

পবিত্র কোরআন, হাদিস ও ইসলামি ধর্মতত্ত্বের নিরিখে এ কথা স্পষ্ট যে, কোরবানিকৃত পশুর রক্ত, মাংস আল্লাহ কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়, বিবেচ্য বিষয় হলো মানুষের মধ্যে খোদাভীতি বা তাকওয়া। এই তাকওয়ার অর্থ হলো, আল্লাহর আনুগত্য। তার আদেশ ও নিষেধের অনুসরণ। সৃষ্টিকর্তা-পালনকর্তা আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালোবাসার অনুভূতির নামই তাকওয়া।

ইসলাম ধর্ম বিভিন্ন ধর্মীয় নির্দেশ ও অবশ্য-পালনীয় আনুষ্ঠানিকতা, যেমন নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, কোরবানি ইত্যাদির মাধ্যমে মুসলমানদের মধ্যে খোদাভীতি তথা আল্লাহর আদেশ ও নিষেধের অনুসরণের প্রেরণা জাগায়। আদেশের মধ্যে যে ভালো ও কল্যাণকর কাজগুলো রয়েছে, সেগুলো করতে তাগিদ দেয়। নিষেধের মধ্যে যে বর্জনীয় কাজগুলো রয়েছে, সেগুলো থেকে বিরত থাকতে বলে।

কিন্তু বাস্তব জীবনে দেখা যায় বৈপরীত্য। অনেক ক্ষেত্রেই আল্লাহর আদেশ ও নিষেধগুলো যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হয় না। সমাজে ভালো কাজ যেমন, দয়া, ত্যাগ, পিতামাতা ও সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন, প্রতিবেশীর হক আদায়, দরিদ্র ও পীড়িতের সেবা ইত্যাদি করার ক্ষেত্রে অনেক শৈথিল্য দেখা যায়। আবার নিষিদ্ধ কাজ, যেমন, ধর্ষণ, ঘুষ, দুর্নীতি, ভেজাল, জাল-জালিয়াতি, ফেরেববাজি, প্রবঞ্চনা, ধোঁকা, হত্যা, গুম, নির্যাতন, নিপীড়ন অবাধে চলতে থাকে। 

ফলে ধর্মীয় জীবনের মূল আদর্শ বাস্তব জীবনে প্রতিফলিত করা অনেক সময়ই অনেকের পক্ষে সম্ভব হয় না। কিছু আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া ধর্মের মতাদর্শিক অনুভূমি জাগ্রত করা সকলের ক্ষেত্রে দৃশ্যমানও হয় না। যদি হতো, তাহলে মুসলিম প্রধান দেশে এতো ভেজাল, নির্যাতন, নিপীড়িন, অন্যায়, অসাধুতা হওয়ার কথা নয়। বাস্তবে যে ভয়াবহ নেতিবাচক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তেমনটিও হতে পারতো না।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পবিত্র হজ যে বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের ডাক দেয়, সেই ভ্রাতৃত্বকে আমরা কাজে ও চিন্তায় ধারণ করতে পারছি না। সকল মানুষকে ভ্রাতৃসুলভ বিবেচনা করে তাদের কল্যাণ সাধনও করা যাচ্ছে না। একজন আরেকজনকে ঠকাচ্ছি, ভেজাল বা মেয়াদোর্ত্তীণ খাদ্য খাওয়াচ্ছি, বিপদে ফেলছি, শক্তি ও ক্ষমতার বলে শোষণ ও নিপীড়ন করছি। ব্যক্তিগতভাবে আত্মস্বার্থ ও আত্মকেন্দ্রিকতার লোভের বাইরে সামাজিক ও সার্বজনীন কল্যাণকর মানসিকতা নিয়ে আমরা এগিয়ে আসতে পারছি না।

অথচ হজ সকল মুসলমানকে এক কাতারে এসে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা ও মুসলিম ঐক্য গঠনের প্রেরণা দেয়। জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্তরে তেমন ঐক্য মুসলিম উম্মাহ বা বিশ্ব মুসলিম সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয় নি। নিপীড়িত, নির্যাতিত মুসলমানদের পক্ষে বিশ্ব মুসলিম সমাজ এক ও ঐক্যবদ্ধভাবে সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে পারছে না। এখনো বিশ্বের সর্বত্র এবং আমাদের আশেপাশেই মুসলিম নিপীড়নের রক্তস্রোত বইছে। মুসলিম নর, নারী ও শিশুরা রক্তাক্ত হচ্ছে। বিশ্বের দেশে দেশে সবচেয়ে বেশি আহত ও নিহত হচ্ছে মুসলমানরাই। এর কোনও সুরাহা হচ্ছে না।

হজের আনুষ্ঠানিকতায় শয়তানের প্রতি পাথর নিক্ষেপের মাধ্যমে কুপ্রবৃত্তি ও অসততার বিরুদ্ধে যে দীপ্ত শপথ উচ্চারিত হচ্ছে, বাস্তব জীবনে সেটা সফলভাবে প্রয়োগ করা যাচ্ছে না। হত্যা, ধর্ষণ, জাতিয়ালির মাধ্যমে বরং শয়তানি কাজই চলছে প্রবল গতিতে। মানুষের নাম নিয়ে এমন সব পাশবিক অপরাধ ও নৃশংস অপকর্ম করা হচ্ছে, যা শয়তানকেও লজ্জিত করার জন্য যথেষ্ট।

পশু কোরবানির মাধ্যমে হজের আনুষ্ঠানিকতায় পশুত্বকে বিলীন করার চেতনাও অনেকে আত্মস্থ করতে পারছেন না। চরম পশুত্বের পরিচয় দিচ্ছেন নাবালক শিশু, কিশোর ও অবলা নারীকে ধর্ষণ, নির্যাতন করার মাধ্যমে; দরিদ্র ও অবহেলিতকে প্রচণ্ড আঘাত, অবহেলা ও বঞ্চিত করার মাধ্যমে। মানবিকতার জায়গা দখল করছে পাশবিকতা। সমাজের নিরাপত্তা ও মানুষের বসবাসের শান্তি বিপন্ন হচ্ছে। পরিস্থিতি ক্রমেই অমানবিকতার বিষবাষ্পের অন্ধকার গহ্বরে চলে যাচ্ছে।

এইসব ক্ষতিকর ও নেতিবাচকতার কবল থেকে মুক্ত হয়ে আমাদের সমাজে সুস্থতার স্বচ্ছ সুবাতাস প্রবাহিত করার কথাই বলে ইসলাম। মানবিক ধর্ম ইসলাম পবিত্র হজের মাধ্যমে মানুষকে এক ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে মানবিক কল্যাণের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে এবং অকল্যাণকর কাজ প্রতিহত করতে অনুপ্রেরণা জাগায়। হজের বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা ও কল্যাণমুখী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হওয়ার যে ডাক ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দান থেকে উচ্চারিত হচ্ছে এবং যে আরাফাতের ময়দানে বিশ্ব মানবাধিকারে রোল মডেল, মানবতার নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় হজের ভাষণে যে কল্যাণ ও মানব অধিকারের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, তাকে আন্তরিকভাবে আত্মস্থ ও চর্চা করা মাধ্যমেই মুসলমানদের ইহ ও পরকালের কল্যাণ নিশ্চিত হতে পারে। 

আপনার মতামত লিখুন :

মদিনা যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি হাজির মৃত্যু

মদিনা যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় বাংলাদেশি হাজির মৃত্যু
মদিনা হাইওয়ে, ছবি: সংগৃহীত

মক্কা (সৌদি আরব) থেকে: পবিত্র হজপালন শেষে হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রওজা জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মক্কা থেকে মদিনা যাওয়ার পথে বাংলাদেশি হাজি বহনকারী বাস দুর্ঘটনায় ১ জন হাজি ঘটনাস্থলে ইন্তেকাল ও ২২ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া হাজির নাম নুরুল ইসলাম (৭০)। তার গ্রামের বাড়ি ফেনী সদরে।

শুক্রবার (১৬ আগস্ট) রাত সোয়া ১১টার দিকে মদিনা থেকে একশ' মাইল আগে ওয়াদি ফারা নামক স্থান বাসের চাকা বিস্ফোরণ হয়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনায় বাসটি উল্টে যায়। ওই বাসটিতে ৩৫ জন হাজি ছিলেন। আহতদের মধ্যে ৭ জনের অবস্থা গুরুতর। বাসের যাত্রীরা স্কাই ট্রাভেলসের মাধ্যমে সৌদি আরবে হজপালনের উদ্দেশ্যে আসেন।

আহতদের মদিনার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে একজন নারী ছাড়া বাকিদের অবস্থা উন্নতির দিকে। গুরুতর আহতদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে।

আহতদের ৮ জন মদিনা কিং ফাহাদ হাসপাতালে, মিকাত হাসপাতালে ৪ জন, উহুদ হাসপাতালে ২ জন, সৌদি-জার্মান হাসপাতালে ২ জন ও ইয়াতামা হাসপাতালে ২ জন চিকিতসাধীন রয়েছেন।

এদিকে হজপালনে সৌদি আরবে এসে শনিবার (১৬ আগস্ট) রাত পর্যন্ত ৮১ জন হাজি ইন্তেকাল করেছেন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৭১ জন, নারী ১০ জন। মারা যাওয়া হাজিদের ৭২ জন মক্কায়, ৮ জন মদিনায় ও ১ জন জেদ্দায় ইন্তেকাল করেছেন।

আগামীতে হজ কার্যক্রম আরও সহজ করা হবে: ধর্ম প্রতিমন্ত্রী

আগামীতে হজ কার্যক্রম আরও সহজ করা হবে: ধর্ম প্রতিমন্ত্রী
সবার মাঝে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব এডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, ছবি: বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম

মক্কা (সৌদি আরব) থেকে: এবারের হজের ভুল-ক্রটি সংশোধন করে আগামীতে হজ কার্যক্রম আরও সহজ করা হবে বলে জানিয়েছেন ধর্ম প্রতিমন্ত্রী আলহাজ্ব এডভোকেট শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ।

শুক্রবার (১৬ আগস্ট) রাতে মক্কায় সৌদি সরকারের দক্ষিণ এশিয়া হজ সেবা সংস্থা মোয়াসসাসার সঙ্গে হজ এজেন্সিজ এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর মতবিনিময় ও নৈশভোজে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।

ধর্ম প্রতিমন্ত্রী বলেন, 'আগামীতে হাজিদের আরও সুবিধা নিশ্চিতের জন্য বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত হাবসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে দেশে ফিরে আলোচনা অব্যাহত রাখা হবে। কোনো অবস্থাতেই হাজিদের কষ্ট হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না বলেও জানান ধর্ম প্রতিমন্ত্রী।'

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মোয়াসসাসা চেয়ারম্যান ড. রাফাত ইসমাইল বদর। তিনি বাংলাদেশি হাজিদের সুবিধায় সৌদি আরব সরকারের নানা উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে বলেন, 'হাজিদের সুবিধা দেওয়ার ধারা অব্যাহত থাকবে। ভবিষ্যতে আরও সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। হাজিদের আল্লাহর মেহমান উল্লেখ করে ড. রাফাত বলেন, ই-ভিসা সিস্টেম ও মক্কা রুট ইনিশিয়েটিভ প্রকল্পের মতো সুযোগ-সুবিধা আরও কীভাবে বাড়ানো যায়, এটা নিয়ে কাজ চলছে।'

https://img.imageboss.me/width/700/quality:100/https://img.barta24.com/uploads/news/2019/Aug/17/1566052174957.jpg

হজ এজেন্সিজ এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব)-এর সভাপতি এম শাহাদত হোসাইন তসলিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় হজ এজেন্সিগুলোর মালিক, প্রতিনিধি ও ধর্মীয় পরামর্শক হিসেবে হজে আসা বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলেম-উলামারা উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে মোয়াসসাসার ডিরেক্টর জেনারেল ওমর সিরাজ আকবর নিজেকে বাংলাদেশি বলে উল্লেখ করে বলেন, 'আমি গর্ববোধ করি বাংলাদেশি হাজিদের সেবা দিতে পেরে।'

সৌদি আরব ধর্ম মন্ত্রণালয়ের (দক্ষিণ এশিয়া) জনসংযোগ কর্মকর্তা আবদুল আজিজ ফাহাদ রাহমা, হাব মহাসচিব ফারুক আহমদ সরদারসহ হাব নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে হাবের পক্ষ থেকে ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ও মোয়াসসারার উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।

উল্লেখ্য, সৌদি আরবে পৌঁছার পর বিমান বন্দর থেকে হোটেল, হোটেল থেকে হজের আনুষ্ঠানিকতার জায়গা মিনা, আরাফাত, মুজদালিফা ও কংকর নিক্ষেপের স্থান জামারার হাজিদের থাকা-খাওয়া ও যাতায়াতের ব্যবস্থা করে মোয়াসসাসা অফিস। মোয়াসসাসার অধীনে প্রায় শতাধিক মুয়াল্লিম রয়েছে। এই মুয়াল্লিমদের মাধ্যমে সৌদি আরবে হাজিদের বিভিন্ন সেবা দেওয়া হয়।

এ সম্পর্কিত আরও খবর

Barta24 News

আর্কাইভ

শনি
রোব
সোম
মঙ্গল
বুধ
বৃহ
শুক্র